সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

দাম না পেয়ে জয়পুরহাটে আলু গরুকে খাওয়াচ্ছেন চাষিরা, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সতর্কতা

২০২৫ সালের এপ্রিলে দাম কেজিপ্রতি ৮ থেকে ৯ টাকায় নেমে আসায় এবং হিমাগারে জায়গা না পাওয়ায় জয়পুরহাটের চাষিরা আলু সেদ্ধ করে গরুকে খাওয়াচ্ছিলেন। বেশি আলু, বিশেষ করে কাঁচা আলু খাওয়ালে গরুর পেটফাঁপাসহ অসুখ হতে পারে বলে সতর্ক করেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।

দাম না পেয়ে জয়পুরহাটে আলু গরুকে খাওয়াচ্ছেন চাষিরা, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সতর্কতা
লাইভস্টক

দেশের অন্যতম প্রধান আলু উৎপাদনকারী জেলা জয়পুরহাটে ২০২৫ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি নাগাদ চাষিরা অবিক্রীত আলু সেদ্ধ করে গরুকে খাওয়াতে শুরু করেছিলেন। কারণ, বাজারে আলুর দাম তখন উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল। জাগো নিউজের জয়পুরহাট প্রতিনিধি ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল জানান, জেলার পাঁচটি উপজেলাতেই আলু তখন গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছিল। একই প্রতিবেদনে একজন সরকারি প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সতর্ক করেন, গরুকে বেশি পরিমাণে আলু, বিশেষ করে কাঁচা আলু খাওয়ালে পশু অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।

ঘটনাটি ছিল একটি জাতীয় সমস্যার স্থানীয় চেহারা। আগের বছরের চড়া দামে উৎসাহিত হয়ে ২০২৪-২৫ মৌসুমে দেশে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আলু লাগানো হয়, ফলন হয় বিপুল, হিমাগারগুলো আগেভাগেই ভরে যায়, আর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে কৃষকের হাতে পাওয়া দাম উৎপাদন খরচের অনেক নিচে থাকে।

সংখ্যায় জয়পুরহাটের আলু মৌসুম


প্রতিবেদনে বলা হয়, জয়পুরহাটের মাটি ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী, আর কৃষিপ্রধান জেলা হওয়ায় এখানে প্রচুর আলু আবাদ হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জেলা কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার হেক্টর। কিন্তু কৃষকেরা আলু লাগিয়েছেন ৪৩ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি।

ডিএইর হিসাবে উপজেলাভিত্তিক আবাদ ছিল এরকম:

  • কালাই: ১০ হাজার ৯০৫ হেক্টর
  • ক্ষেতলাল: ৯ হাজার ২২০ হেক্টর
  • পাঁচবিবি: ৮ হাজার ৯৪৫ হেক্টর
  • জয়পুরহাট সদর: ৭ হাজার ৮০০ হেক্টর
  • আক্কেলপুর: ৬ হাজার ৬০০ হেক্টর

মৌসুমে জেলার আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৯ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন। আবাদ কেন বেড়েছে, তা ব্যাখ্যা করে জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ রাহেলা পারভীন জাগো নিউজকে বলেন, 'গত বছর কৃষক আলুর ভালো দাম পেয়েছে। এজন্য এবার বেশি জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এছাড়া বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে।'

এই চিত্র শুধু জয়পুরহাটের নয়। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৪ সালের নভেম্বরে রোপণের মৌসুমে চড়া দামে আকৃষ্ট হয়ে রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া ও জয়পুরহাটের কৃষকেরা নজিরবিহীন হারে আলুর আবাদ বাড়িয়েছেন। ডিএইর মাঠ পরিষেবা শাখার একজন পরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, দেশে এর আগে কখনো এত জমিতে আলু চাষ হয়নি। আর ডিএইর ফসল শাখার পরিচালক বেশি ফলনের কারণ হিসেবে অনুকূল আবহাওয়া এবং আলুর ছত্রাকজনিত রোগ নাবি ধসা বা লেট ব্লাইট না থাকার কথা বলেন।

ময়মনসিংহ জেলার চরপুলিয়ামারীতে আলুখেতে কাজ করছেন এক নারী; ছবিটি দেশের আলু চাষের, জয়পুরহাটের নয়। ছবি: Hridoye Mati O Manush / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
ময়মনসিংহ জেলার চরপুলিয়ামারীতে আলুখেতে কাজ করছেন এক নারী; ছবিটি দেশের আলু চাষের, জয়পুরহাটের নয়। ছবি: Hridoye Mati O Manush / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

ফসলের তুলনায় হিমাগারে জায়গা কম


ফেব্রুয়ারি-মার্চে তোলা আলু হয় দ্রুত বিক্রি করতে হয়, নয়তো বছরের পরের দিকে দাম ফেরা পর্যন্ত ঠান্ডা জায়গায় রাখতে হয়। জয়পুরহাটে সেই জায়গা ফসলের তুলনায় অনেক কম। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯টি হিমাগার রয়েছে এবং সবগুলোতেই আলু রাখা হয়। কিন্তু জেলায় আলুর উৎপাদন যেখানে ৯ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে, সেখানে এসব হিমাগারে সব মিলিয়ে মাত্র ১ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন আলু রাখা যায়। এর মধ্যে খাবার আলু ১ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন এবং বীজ আলু ৬২ হাজার মেট্রিক টন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জেলায় প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন বীজ আলু এবং প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন খাবার আলুর প্রয়োজন হয়। বাকি আলু হয় জেলার বাইরে পাঠাতে হয়, নয়তো সংরক্ষণ করতে হয়, আর এই উদ্বৃত্ত আলু সংরক্ষণ করতে পারছিলেন না চাষিরা। ব্যবসাবিষয়ক দৈনিক বণিক বার্তাও ২০২৫ সালের ১৬ মার্চের প্রতিবেদনে জয়পুরহাটের হিমাগারে প্রাপ্য ধারণক্ষমতা প্রায় ২ লাখ টন বলে উল্লেখ করে।

সংকটটি ছিল পুরো অঞ্চলের। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের বাংলা সংস্করণ ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল জানায়, হিমাগার মালিকদের হিসাবে বগুড়া ও জয়পুরহাটে মোট ৫৫টি হিমাগার রয়েছে, যাদের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন। রংপুর, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া ও জয়পুরহাটের কৃষকেরা পত্রিকাটিকে বলেন, তাঁদের এলাকায় উৎপাদিত আলুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের হিমাগারে জায়গা হয়নি। অনেক কৃষক তাই বাড়িতেই আলু রাখছিলেন। প্রথাগত পদ্ধতিতে সংরক্ষণ পরীক্ষা করতে বগুড়ার জেলা প্রশাসন বাঁশ ও কাঠের ৬৭টি মাচা তৈরি করেছিল, যার প্রতিটিতে ৩৫ টন আলু রাখা যায়, জানায় পত্রিকাটি।

উত্তরের রংপুর বিভাগের অবস্থা তুলে ধরে দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ১১ মার্চের সম্পাদকীয়তে লেখে, বিভাগে ১০১টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা ১১ লাখ টন, যা জায়গার চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে দিনাজপুর ও সৈয়দপুরে হিমাগারের সামনে আলুবোঝাই শত শত ট্রাক দিনের পর দিন মহাসড়কে আটকে ছিল, আর অপেক্ষার কারণে পরিবহনকারীরা বস্তাপ্রতি ভাড়া ৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ, ৬৫ টাকা করেছিলেন। কৃষকদের অভিযোগ ছিল, হিমাগার পরিচালকেরা ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছেন; অন্যদিকে পরিচালকেরা দায় দেন জায়গার বিপুল চাহিদাকে, জানায় সম্পাদকীয়টি।

আলু এখন গরুর খাবার


ক্ষেতলাল উপজেলার পাঠানপাড়া গ্রামের রাসেল হোসেন জাগো নিউজকে জানান, তিনি ৬ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছেন। সময়মতো বুকিং দিতে না পারায় হিমাগারে বেশি আলু রাখতে পারেননি। তখন বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছিল ৮ থেকে ৯ টাকায়, অথচ তাঁর প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১৫ টাকার বেশি। তাই তিনি আলু সেদ্ধ করে গরুকে খাওয়াচ্ছিলেন, অন্য খাবার কমিয়ে গরুকে বেশি বেশি আলু দিচ্ছিলেন।

কালাই উপজেলার বড়াইল গ্রামের রোজিনা আক্তারের পাঁচটি গরুর নিত্যদিনের খাবারে পরিণত হয়েছিল সেদ্ধ আলু, জানায় প্রতিবেদনটি। সময় না পেলে মাঝে মাঝে তিনি কাঁচা আলুই গরুকে খেতে দিতেন।

রোজিনা আক্তারের স্বামী মফিদুল ইসলাম বলেন, 'এবার ৪ বিঘা (৩৩ শতকে ১ বিঘা) জমিতে স্টিক জাতের আলু আবাদ করেছি। খরচ হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা। বাজারে আলুর দাম কম হওয়ায় গরুর বিকল্প খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছি।'

প্রতিনিধি লেখেন, শুধু কালাই ও ক্ষেতলালেই নয়, জয়পুরহাটের পাঁচটি উপজেলাতেই আলু তখন গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছিল। তবে পশু চিকিৎসকেরা আলুকে গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন।

কৃষকদের বলা দাম উত্তরাঞ্চলের অন্য পত্রিকার প্রতিবেদনের সঙ্গেও মিলে যায়। দ্য ডেইলি স্টারের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে জয়পুরহাটের এক চাষির কথা ছিল, যিনি প্রতি কেজি ১০ টাকায় বিক্রি করে কোনোমতে খরচ তুলেছিলেন; পত্রিকাটি তাঁকে অনেকের চেয়ে ভাগ্যবান বলে বর্ণনা করে, কারণ উত্তরের কয়েকটি জেলার কৃষকেরা তখন প্রতি কেজি ১১ টাকারও কম দাম পাচ্ছিলেন, অথচ ডিএইর হিসাবে উৎপাদন খরচ ছিল কেজিপ্রতি ১৫ টাকা। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এপ্রিলের প্রতিবেদনে উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৪ থেকে ১৬ টাকা এবং মাঠে বিক্রির দাম ১০ থেকে ১২ টাকা বলা হয়।

প্রাণিসম্পদ ও কৃষি কর্মকর্তারা যা বলেছেন


ঝুঁকির কথা ব্যাখ্যা করে জয়পুরহাট সদর উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, 'আলু শর্করা জাতীয় খাবার। বেশি পরিমাণে খাওয়ালে গরুর পেটফাঁপা অসুখ দেখা দিতে পারে। কাঁচা আলু বেশি খাওয়ালে গরুর অন্যান্য অসুখও হতে পারে। আলুতে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। কাঁচা আলু গরুকে খাওয়ানো হলে বিষক্রিয়া হতে পারে।'

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা; গবাদিপশুর খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে কৃষক তাঁর কাছেই পরামর্শ নিতে পারেন। উদ্বৃত্ত আলু যাঁরা গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে চান, নিজের পশুকে কতটা আলু নিরাপদে দেওয়া যায়, তা তাঁদের উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে জেনে নেওয়া উচিত।

চট্টগ্রামের আনন্দবাজারে দেশি জাতের গরু; ছবিটি প্রসঙ্গ বোঝাতে দেওয়া, জয়পুরহাটে তোলা নয়। ছবি: Raihan Rana / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চট্টগ্রামের আনন্দবাজারে দেশি জাতের গরু; ছবিটি প্রসঙ্গ বোঝাতে দেওয়া, জয়পুরহাটে তোলা নয়। ছবি: Raihan Rana / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

গোখাদ্য হিসেবে আলু: এফএও-সমর্থিত খাদ্য তথ্যভান্ডার যা বলে


আলু উৎপাদনকারী দেশগুলোতে গবাদিপশুকে আলু খাওয়ানো পুরোনো চর্চা। ফ্রান্সের গবেষণা সংস্থা ইনরাএ (INRAE) ও সিরাদ (CIRAD), ফরাসি পশুখাদ্য সমিতি এএফজেড (AFZ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ কর্মসূচি পশুখাদ্য তথ্যভান্ডার ফিডিপিডিয়ায় (Feedipedia) পশুখাদ্য হিসেবে আলুর একটি তথ্যপত্র রয়েছে, যা সর্বশেষ হালনাগাদ হয় ২০১৮ সালের জুনে। এর তথ্য প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সতর্কতাকে বুঝতে সাহায্য করে।

তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত আলু সাধারণত বাছাই করে বাদ দেওয়া আলু, যা আকার, চেহারা, রোগ বা ক্ষতির কারণে বাজারের মান পূরণ করেনি, অথবা যা চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়েছে। জয়পুরহাটের চাষিরা ঠিক এই দ্বিতীয় অবস্থায় ছিলেন। আলু মূলত শ্বেতসারের (স্টার্চ) উৎস; গবাদিপশুর শক্তির খাদ্য হিসেবে একে ভালো মানের ভুট্টা সাইলেজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু এতে আমিষ ও আঁশ কম। তাই তথ্যপত্রটি আলুকে খড়-ঘাসের মতো আঁশজাতীয় খাদ্য নয়, বরং রেশনে দানাদার খাদ্যের আংশিক বিকল্প হিসেবে দেখে এবং আমিষসমৃদ্ধ খাদ্য ও আঁশজাতীয় খাদ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে বলে। বাদ দেওয়া আলুতে শুষ্ক পদার্থ মাত্র ১৬ থেকে ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ এর ওজনের বেশির ভাগই পানি।

একই তথ্যপত্রে ঝুঁকিগুলো এভাবে তুলে ধরা হয়েছে:

  • গলায় আটকে যাওয়া: গোটা আলু, বিশেষ করে ছোট আলু গরুর গলায় আটকে যেতে পারে; আলু কেটে, টুকরো করে বা থেঁতো করে দিলে এবং খাওয়ার সময় পশুর মাথা নিচু রাখার ব্যবস্থা করলে এই ঝুঁকি কমে।
  • হজমের গোলমাল: বেশি পরিমাণে খাওয়ালে শ্বেতসার রুমেন পেরিয়ে অন্ত্রের নিচের অংশে চলে যেতে পারে; আর আলুতে প্রায় কোনো আঁশ না থাকায় যথেষ্ট আঁশ ছাড়া রেশনে আলুর ভাগ বেশি হলে রুমেনের কাজে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
  • পাতলা পায়খানা: কাঁচা আলুতে পানির ভাগ বেশি, তাই এটি জোলাপের মতো কাজ করতে পারে; এ কারণে ধীরে ধীরে খাদ্যতালিকায় যোগ করতে হয়।
  • সবুজ ও অঙ্কুরিত আলু: বেগুন পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো আলুতেও বিষাক্ত গ্লাইকোঅ্যালকালয়েড থাকে, মূলত সোলানিন ও চ্যাকোনিন; অঙ্কুরে এবং আলোয় সবুজ হয়ে যাওয়া খোসায় এর মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, তাই অঙ্কুর ফেলে দিতে হয় এবং সবুজ আলু এড়াতে হয় বা বেশি পরিমাণে দেওয়া যায় না।
  • নষ্ট আলু: জমে শক্ত হয়ে যাওয়া, ময়লা, পচা বা গলে যাওয়া আলু গবাদিপশুকে একেবারেই খাওয়ানো উচিত নয়।

রান্নার বিষয়ে তথ্যপত্রটি বলে, উদ্বৃত্ত আলু কাঁচা বা রান্না করা, দুইভাবেই বেশির ভাগ গবাদিপশুর জন্য উপযোগী; শ্বেতসারের পুরো মূল্য পেতে আলু সেদ্ধ বা ভাপে রান্না করা ভালো, আর সেদ্ধ করার পানি ফেলে দিতে হবে। এতে আরও উল্লেখ আছে, রান্না করলে রুমেনে শ্বেতসার গাঁজনের গতি অনেক বেড়ে যায়। প্রায় দুই সপ্তাহের অভ্যস্ততার পর গরু কাঁচা আলু খেতে শেখে বলে জানা গেছে। সেরা ফলের জন্য শুষ্ক পদার্থের হিসাবে গরুর রেশনে আলুর ভাগ ৩০ শতাংশের বেশি না রাখার একটি সুপারিশও তথ্যপত্রে উদ্ধৃত হয়েছে। এগুলো বিদেশের গবেষণার সাধারণ ফল; নির্দিষ্ট একটি গরুর জন্য সঠিক পরিমাণ নির্ভর করে তার আকার, অন্য খাবার এবং সে দুধ দিচ্ছে কি না তার ওপর। সে কারণেই উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নেওয়া দরকার।

অঙ্কুরসহ আলু, কাটা ও গোটা; অঙ্কুর ও সবুজ খোসায় গ্লাইকোঅ্যালকালয়েড সোলানিন বেশি থাকে। ছবি: ZooFari / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
অঙ্কুরসহ আলু, কাটা ও গোটা; অঙ্কুর ও সবুজ খোসায় গ্লাইকোঅ্যালকালয়েড সোলানিন বেশি থাকে। ছবি: ZooFari / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

দেশজুড়ে রেকর্ড ফলন, পড়তি দাম


দরপতনের পেছনের জাতীয় পরিসংখ্যান তুলে ধরে দ্য ডেইলি স্টারের ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন। ডিএইর তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৫ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ) এ মৌসুমে ১ কোটি ২০ লাখ টন উৎপাদনের পূর্বাভাস দেয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রাক্কলন করে ১ কোটি ৬ লাখ টন, আর ডিএই জানায় আগের মৌসুমে উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টন। দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন, জানায় পত্রিকাটি।

আলু চাষের খরচও বেড়েছিল। ডিএইর প্রাক্কলন অনুযায়ী এ মৌসুমে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ছিল ১৫ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ২ টাকা বেশি। আগের মৌসুমে যে বীজ আলুর দাম ছিল কেজিপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে রোপণের সময় তা ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, আর হিমাগার ভাড়া আগের মৌসুমের চেয়ে কেজিপ্রতি প্রায় ৪ টাকা বেশি ছিল, জানায় প্রতিবেদনটি।

আবাদের এই হুড়োহুড়ির কারণ ছিল আগের বছরের দাম। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০২৪ সালে খুচরা বাজারে আলুর দাম কেজিপ্রতি ৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল; অথচ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে ঢাকায় খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা। পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় মোট আলুর প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয় বলে সরকারের প্রাক্কলন, যোগ করে পত্রিকাটি। ডিএইর ফসল শাখার পরিচালক তখন দরপতনকে সাময়িক বলে বর্ণনা করেছিলেন।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের বাংলা সংস্করণ ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল বিবিএসের হিসাব উদ্ধৃত করে জানায়, আগের অর্থবছরে আলুর উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার টন, আর সংগ্রহোত্তর অপচয়সহ দেশের বার্ষিক প্রয়োজন প্রায় ৯০ লাখ টন। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে এ মৌসুমে দেশে আলুর উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি, জানায় পত্রিকাটি।

হিমাগার ভাড়া নিয়ে বিরোধ


আলুর এই আধিক্যের সঙ্গেই শুরু হয় হিমাগার ভাড়া নিয়ে বিরোধ। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জানায়, বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সদস্যদের প্রতি কেজি আলুর জন্য ৮ টাকা ভাড়া নিতে বলেছে, আর প্রতি বস্তায় সর্বোচ্চ ৫০ কেজি রাখা যাবে। আগে ৭০ কেজি পর্যন্ত বস্তার জন্য একমুঠো ৩৫০ টাকা নেওয়া হতো। কৃষকেরা বলেন, ভাড়া কেজিপ্রতি ৪ টাকা থেকে দ্বিগুণ হয়ে ৮ টাকা হয়েছে; অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, আগের বছর ভাড়া ছিল ৭ টাকা। পত্রিকাটি জানায়, অ্যাসোসিয়েশনের আওতায় ৪০৫টি হিমাগার রয়েছে, যার ৩৬৫টি চালু; এগুলোর সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৪৫ লাখ টন, যেখানে আগের বছর রাখা হয়েছিল ২৫ লাখ টন।

বণিক বার্তা ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ জানায়, কৃষকদের প্রতিবাদের পর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ভাড়া ১ টাকা ২৫ পয়সা কমিয়ে কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করে। পত্রিকাটি উল্লেখ করে, কৃষি বিপণন আইন ২০১৮ অনুযায়ী হিমাগার ভাড়ার যেকোনো পরিবর্তন কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পরামর্শে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে করতে হয়, অথচ অ্যাসোসিয়েশন ৮ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল। কৃষকেরা নতুন হারও প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ চালিয়ে যান, জানায় পত্রিকাটি।

দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ১১ মার্চের সম্পাদকীয়তে কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সার এই সীমাকে সরকার আরোপিত সর্বোচ্চ ভাড়া হিসেবে বর্ণনা করে এবং জানায়, কৃষকেরা তা কমিয়ে ৫ টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। সম্পাদকীয়তে হিমাগারে কৃষক ও ব্যবসায়ীর জন্য সরকারনির্ধারিত ৬০:৪০ অনুপাতে জায়গা বরাদ্দ মানা এবং সরকারি ও বেসরকারি হিমাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বানও জানানো হয়।

কালাই ও ক্ষেতলালের চাষিদের জন্য এই বিরোধের প্রভাব ছিল সরাসরি: বুকিং না পেলে উপায় ছিল মাঠের দামে বিক্রি, বাড়িতে রাখা, নয়তো এপ্রিলের প্রতিবেদনে যেমন দেখা গেছে, আলু গরুকে খাওয়ানো।

জয়পুরহাট জেলা ও বাংলাদেশে আলু


বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের জেলা জয়পুরহাটের আয়তন ১০১২.৪১ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে দিনাজপুর, দক্ষিণে নওগাঁ ও বগুড়া, পূর্বে বগুড়া ও গাইবান্ধা এবং পশ্চিমে নওগাঁ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। জেলার পাঁচটি উপজেলা হলো আক্কেলপুর, কালাই, ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি; প্রধান নদী ছোট যমুনা, তুলসীগঙ্গা ও হারাবতী। ১৯৭১ সাল থেকে বগুড়া জেলার একটি মহকুমা ছিল জয়পুরহাট, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। জ্ঞানকোষটি জানায়, জেলার কর্মজীবী মানুষের ৬৯.৫১ শতাংশের প্রধান পেশা কৃষি, আর ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৯ লাখ ১৩ হাজার ৭৬৮ জন।

বাংলাপিডিয়া বলছে, আলু (Solanum tuberosum) সোলানেসি বা বেগুন পরিবারের উদ্ভিদ এবং আমেরিকার আদি বাসিন্দাদের প্রধান ফসল ছিল; ধারণা করা হয়, ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা পেরু থেকে এটি স্পেনে নিয়ে যান। বাংলাদেশে আলু সব জেলায় শীতকালীন ফসল হিসেবে চাষ হয়। রোপণের সবচেয়ে ভালো সময় নভেম্বরের প্রথম পক্ষ, যদিও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু কৃষক আগাম ফসলের জন্য অক্টোবরেই লাগান; বেশির ভাগ জাতের আলু তোলা হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চে, যখন পাতা হলুদ ও বাদামি হয়ে গাছ মরে যায়।

বাংলাপিডিয়ায় প্রায় ২৭টি দেশি জাতের উল্লেখ আছে, যার মধ্যে রয়েছে বগুড়ার লাল শীল, যা লাল মাদ্দা বা বগুড়াই নামেও পরিচিত, এবং দিনাজপুর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের লাল পাকরি; জনপ্রিয় উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে কার্ডিনাল ও ডায়মন্টের নাম রয়েছে। বাংলাদেশে আলু প্রধানত সবজি হিসেবে মাছ, মাংস বা ডিমের তরকারিতে খাওয়া হয়, আর সেদ্ধ, ভাজা ও ভর্তা আলু, চপ, সিঙাড়া ও চিপস হিসেবেও; ইউরোপে বিপুল পরিমাণ আলু শ্বেতসার, অ্যালকোহল, আটা ও পশুখাদ্য তৈরিতে যায়, জানায় জ্ঞানকোষটি। বেশির ভাগ ক্ষুদ্র কৃষক প্রথাগত পদ্ধতিতে বাড়িতে আলু রাখেন, তাতে শুকিয়ে যাওয়া, পোকা ও রোগে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। এ কারণেই ২০২৫ সালের মতো বাম্পার ফলনের বছরে হিমাগারে জায়গা পাওয়া-না-পাওয়াই কৃষকের আয়ের বড় অংশ ঠিক করে দেয়।

ছবি: NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বণিক বার্তা, ফিডিপিডিয়া (ইনরাএ, সিরাদ, এএফজেড ও এফএও), বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

সৌরপ্যানেলের নিচে ভেড়া চরালে বাড়ে মৌমাছি, তবে সংখ্যা রাখতে হবে কম

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরখামারে হেক্টরপ্রতি দুটি ভেড়া চরালে ঘাস কাটার তুলনায় উপকারী পোকা ৩৮ শতাংশ বাড়ে। খামারিদের জন্য ভেড়ার পাল পরিকল্পনার একটি সহায়ক টুলও তৈরি করেছেন গবেষকেরা।

Farms.com১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

প্রোটিনের চাহিদায় বদলে গেল কানাডার দুধের বাজার, মাখনের উদ্বৃত্ত শেষ

দুগ্ধজাত প্রোটিনের চাহিদা বাড়ায় পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার দুধের বাজারে মাখনচর্বির কাঠামোগত উদ্বৃত্ত মিটে গেছে, দুধের দাম নির্ধারণেও এসেছে পরিবর্তন।

Manitoba Co-operator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সিকি হেক্টরে ওটের বীজ চাষ, ইথিওপিয়ার এক কৃষকের পারিবারিক ব্যবসা

ইথিওপিয়ার এক ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে বীজের জন্য ওট চাষ করে প্রথম ফসল ৪৫ হাজার বির্রে বিক্রি করেন এবং পরের বছর চাষ বাড়ান। আইএলআরআইয়ের পশুখাদ্যের বীজকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ এটি।

ILRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)