বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের ১৫ জুন ঢাকায় ‘রিপারপাজিং অ্যাগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশ’স অ্যাগ্রিফুড সিস্টেম’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ কৃষিকে উচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এবং মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ করে। কিন্তু অর্থের বড় অংশ যায় ভর্তুকি ও ধানসংশ্লিষ্ট সহায়তায়; অথচ খামারের উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয় বাড়াতে যা জরুরি, সেই গবেষণা, পরামর্শ সেবা, সেচ, বাজারে প্রবেশাধিকার ও জলবায়ু সহনশীলতায় তহবিলের ঘাটতি থেকে যায়।
প্রতিবেদনের নীতি-সংক্ষেপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় অর্ধেক কর্মজীবী মানুষ কৃষিতে নিয়োজিত এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) এক-দশমাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। তবু বিশ্বব্যাংক বলেছে, কৃষির প্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে, উৎপাদনশীলতার অগ্রগতি দুর্বল হয়েছে এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য পিছিয়ে আছে।
কৃষি বাজেটের টাকা কোথায় যায়
নীতি-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সরকার খাদ্য ও কৃষিভিত্তিক কর্মসূচিতে বছরে প্রায় ৩২১ বিলিয়ন টাকা (৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয় করেছে, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ১০.১ শতাংশ এবং জিডিপির ১.১ শতাংশ। এর ৪০ শতাংশের বেশি গেছে শুধু ভর্তুকিতে। মোট ব্যয়ের মাত্র ৪ শতাংশ পেয়েছে কৃষি গবেষণা, ৮ শতাংশ জ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং ৫ শতাংশ সেচ অবকাঠামো।
প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, বন, ফল ও সবজি মিলে কৃষি জিডিপির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জোগালেও এসব উপখাত একসঙ্গে পেয়েছে এই ব্যয়ের ২০ শতাংশেরও কম।

সার ভর্তুকি: সবচেয়ে বড় খরচ, সুবিধা বেশি বড় কৃষকের
কৃষিতে সরকারি সহায়তার সবচেয়ে বড় রূপ সার ভর্তুকি, যা কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ। নীতি-সংক্ষেপ দেখায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই হিস্যা ছিল ৬৩ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা প্রায় ৮০ শতাংশে ওঠে; সে বছর বিশ্ববাজারে দামের ধাক্কা ও বাড়তি আমদানিনির্ভরতায় ভর্তুকির অঙ্ক দাঁড়ায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। দেশের সারের চাহিদার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মেটে আমদানিতে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এই ভর্তুকি উৎপাদন ধরে রাখতে ও দাম স্থিতিশীল রাখতে কৃষককে সাহায্য করেছে। কিন্তু ভর্তুকি যেহেতু কেনা সারের পরিমাণের সঙ্গে যুক্ত, যাঁর জমি বেশি তিনি সুবিধাও বেশি পান। জমির মালিকানায় শীর্ষ ২০ শতাংশ কৃষক পান মোট সার ভর্তুকি-সুবিধার প্রায় অর্ধেক, আর নিচের দিকের ৪০ শতাংশ পান মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ।

অসম সার প্রয়োগ ও ধাননির্ভরতা
সার ব্যবহারেও ভারসাম্য নেই। মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার মধ্যে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফারের সুষম মিশ্রণ প্রয়োগ করেন। ২০১৯ সালের পারিবারিক জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে নীতি-সংক্ষেপ বলছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কৃষক বেশি ফসফরাস দেন, প্রায় প্রতি দশজনে নয়জন কম সালফার দেন এবং দশজনে ছয়জন কম পটাশিয়াম দেন। প্রতিবেদনের হিসাবে সঠিক পুষ্টি-ভারসাম্যে ফলন বোরো ধানে প্রায় ৩৩ শতাংশ, রোপা আমনে ৬৫ শতাংশ এবং আলুতে ৮৭ শতাংশ বাড়তে পারে।
সরকারি ব্যয় ধান উৎপাদনের দিকেও ঝুঁকে আছে, যা ফসলের বৈচিত্র্যকে নিরুৎসাহিত করে। আবাদি জমির প্রায় ৭২ শতাংশে ধান হয় এবং ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশ সুবিধা যায় ধানে, যদিও প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, সবজি ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণে আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ বেশি।
বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে বলেন, “বাংলাদেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের কেন্দ্রে রয়েছে কৃষি। কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি, ভোগের ধরনে পরিবর্তন, সংকুচিত রাজস্ব সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সারের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহে বিঘ্ন নীতি ও ব্যয়ের ফাঁকগুলো সামনে নিয়ে আসছে।”
ধাপে ধাপে সংস্কারের সুপারিশ
প্রতিবেদনটি হঠাৎ পরিবর্তন নয়, ধাপে ধাপে সংস্কারের সুপারিশ করেছে। স্বল্পমেয়াদে মাটি পরীক্ষার পরিসর বাড়ানো, কৃষক পরামর্শ সেবা শক্তিশালী করা এবং কৃষক কার্ড ও ই-ভাউচার চালুর কথা বলা হয়েছে, যাতে কৃষি ব্যয় দরিদ্র ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পৌঁছায়। নীতি-সংক্ষেপ অনুযায়ী কৃষক কার্ড, ডিজিটাল কৃষক নিবন্ধন ও ই-ভাউচারের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বিশ্বব্যাংক-সহায়তাপুষ্ট ‘পার্টনার’ কর্মসূচির আওতায়। বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত হলে সময়ের সঙ্গে গবেষণা, সম্প্রসারণ, সেচ ও উচ্চমূল্যের কৃষিতে বিনিয়োগের জন্য অর্থ বের করা যাবে বলে প্রতিবেদনের যুক্তি।
ইউএনবি ২০২৬ সালের এপ্রিলে জানায়, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদের ভাষ্যে কৃষক কার্ডের প্রথম পর্যায়ে ১০ জেলার ১১টি উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষক বাছাই করা হয়েছে। প্রত্যেকের বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা পাওয়ার কথা; সোনালী ব্যাংকের ডেবিট কার্ড হিসেবে কাজ করা এই কার্ডে সার, বীজ ও পশুখাদ্যও কেনা যাবে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও প্রতিবেদনের সহ-লেখক মনসুর আহমেদ বলেন, “সার ভর্তুকির নকশা ও বিতরণ আধুনিক করা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং যেসব কৃষকের সবচেয়ে বেশি দরকার তাঁদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার বড় সুযোগ।”

ছবি: Shahidul Hasan Roman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিশ্বব্যাংক (সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও নীতি-সংক্ষেপ, ১৫ জুন ২০২৬), ঢাকা ট্রিবিউন (১৫ জুন ২০২৬), ইউএনবি/ঢাকা ট্রিবিউন (১২ এপ্রিল ২০২৬)





মন্তব্য
(০)