২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল, বাংলা ১৪৩৩ সনের দ্বিতীয় দিনে, জাগো নিউজের লাইফস্টাইল ডেস্ক গরমের দিনের জন্য একটি রেসিপি প্রকাশ করে: ঝিঙে-আলু পোস্ত, অর্থাৎ পোস্ত বাটায় রাঁধা ঝিঙে আর আলু। পত্রিকাটির যুক্তি ছিল সহজ। গরমের দিনে অনেকেই ভারী, তেলতেলে ও বেশি ঝালের খাবার এড়িয়ে হালকা, সহজপাচ্য কিছু খুঁজতে চান, বিশেষ করে দুপুরে ভাতের সঙ্গে। এ সময় বাজারে মৌসুমের সবজি ঝিঙে বা ঝিঙা পাওয়া যায়, আর আলু ও পোস্তের সঙ্গে মিলে এটি হয়ে ওঠে অল্প উপকরণে, অল্প সময়ে রাঁধা যায় এমন একটি ঘরোয়া পদ। এই প্রতিবেদনে রেসিপিটি পত্রিকার দেওয়া রূপেই রাখা হয়েছে, আর যোগ করা হয়েছে সেই সময়ের একজন পাঠক যা জানতে চাইতেন: কোন আবহাওয়ায় রেসিপিটি লেখা হয়েছিল, প্রতিটি উপকরণ আসলে কী, কোথা থেকে আসে এবং যে খেতে এগুলো ফলে, সেখানে তখন কী ঘটছিল।
যে গরমে রেসিপিটি এসেছিল
বাংলা নববর্ষের প্রথম তাপপ্রবাহের মধ্যেই রেসিপিটি প্রকাশিত হয়। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং ১৫ এপ্রিল তা অব্যাহত থেকে আরও এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেদিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৩৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর পাবনার ঈশ্বরদীতে ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি এবং সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ৩৭ ডিগ্রি। যশোরে তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রি, ঢাকায় ৩৫ ডিগ্রি। অধিদপ্তর জানায়, দিনের তাপমাত্রা আরও ১ থেকে ২ ডিগ্রি বাড়তে পারে।
গরম বাড়ছিল কয়েক দিন ধরেই। দ্য ডেইলি স্টার ১৩ এপ্রিল জানায়, ঢাকা, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী ও ফরিদপুর এবং খুলনা বিভাগের দশটি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বইছে, আর তার আগের শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল যশোরে ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অধিদপ্তরের একজন আবহাওয়াবিদ পত্রিকাটিকে বলেন, সারা দেশে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা কম, তবে সিলেটে বৃষ্টি হতে পারে।
৪ এপ্রিল প্রকাশিত খবরে আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাসিক পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দুই থেকে চারটি মৃদু থেকে মাঝারি এবং এক থেকে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ হতে পারে। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দেখে অধিদপ্তর তাপপ্রবাহের মাত্রা ঠিক করে: ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু, ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে মাঝারি এবং ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে তীব্র তাপপ্রবাহ। ৩ এপ্রিলেই চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রিতে। আবহাওয়াবিদেরা বলেন, এপ্রিলে তাপপ্রবাহ স্বাভাবিক, তবে ২০২৪ সালের মতো দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, যা টানা ৩৬ দিন চলেছিল, এবার তাঁরা আশা করছেন না। এমন আবহাওয়াতেই পত্রিকাটি দুপুরের পাতে হালকা একটি পদের প্রস্তাব দেয়।
উপকরণ, জাগো নিউজের দেওয়া মাপে
রেসিপিটি পরিবারের এক বেলার খাবারের জন্য, উপকরণ মাত্র আটটি, যার বেশির ভাগই বাংলাদেশের প্রায় সব রান্নাঘরে থাকে। নিচের মাপগুলো পত্রিকার নিজের।
- ঝিঙে: ৩ থেকে ৪টি, টুকরা করা
- আলু: ১ থেকে ২টি, টুকরা করে কাটা
- পোস্ত বাটা: ৩ টেবিল চামচ
- পেঁয়াজ কুচি: ১টি পেঁয়াজের
- কাঁচামরিচ: ২ থেকে ৩টি
- হলুদ গুঁড়া: সামান্য (ইচ্ছা হলে বাদ দেওয়া যায়)
- লবণ: স্বাদমতো
- সরিষার তেল: ২ টেবিল চামচ
রান্নার ধাপগুলো
এই রান্নায় ঝিঙের নিজের রসই কাজে লাগে, তাই পানি দিতে হয় খুব কম। পত্রিকাটি ধাপগুলো এভাবে সাজিয়েছিল।
- কড়াইয়ে সরিষার তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি ও কাঁচামরিচ ভেজে নিন।
- এরপর আলুর টুকরা দিয়ে কিছুক্ষণ ভাজুন, যাতে হালকা সোনালি রং ধরে।
- তারপর ঝিঙে দিয়ে নেড়ে দিন। রান্নার সময় ঝিঙে থেকে পানি বের হয়, তাই আলাদা করে বেশি পানি দেওয়ার দরকার নেই।
- এবার হলুদ ও লবণ দিয়ে ঢেকে মাঝারি আঁচে রান্না হতে দিন। হলুদ না দিলেও পদটির কোনো সমস্যা হয় না।
- ঝিঙে ও আলু প্রায় সেদ্ধ হয়ে এলে পোস্ত বাটা দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নেড়েচেড়ে নিন।
- আরও কিছুক্ষণ রান্না করুন; তরকারি ঘন হয়ে সবজির গায়ে মাখো মাখো হয়ে এলে নামিয়ে নিন।
- গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
ঝিঙে থেকে পানি বের হয় বলে পোস্ত বাটা দেওয়ার সময়টাই আসল: শেষে দিলে তা রান্নার রসকে বেঁধে ঘন মাখো মাখো আবরণ তৈরি করে, পাতলা ঝোল হয় না। আলু আগে দেওয়া হয়, কারণ নরম হতে আলুর সময় বেশি লাগে, আর ঝিঙের শাঁসের বেশির ভাগই পানি। জাগো নিউজ পদটিকে গরমের দিনের জন্য হালকা ও স্বস্তিদায়ক বলে বর্ণনা করে।

ঝিঙে: পাতের মাঝখানের গ্রীষ্মকালীন সবজি
ঝিঙে হলো লাউ-কুমড়া পরিবারের (কিউকারবিটেসি) লতানো গাছ Luffa acutangula-এর ফল। গাছটির আদি নিবাস দক্ষিণ এশিয়া, পরে অন্য অঞ্চলেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। ইংরেজিতে একে রিজ গার্ড, অ্যাঙ্গেলড লুফা, রিবড গার্ড, চায়নিজ ওকরা বা সিল্ক গার্ডও বলা হয়। ফলটি দেখতে কিছুটা শসা বা জুকিনির মতো, তবে গা বরাবর লম্বা ধারালো শিরা থাকে। কাঁচা ফলের জন্যই এর বাণিজ্যিক চাষ হয়; কাঁচা ফল সবজি হিসেবে রান্না হয়, আচার হয়, কখনো কাঁচাও খাওয়া হয়, আর কোনো কোনো জাতের ডগা ও ফুলও খাওয়া হয়। গাছে রেখে দিলে ফলটি শুকিয়ে আঁশের জালে পরিণত হয়, যা পরিষ্কার করে স্পঞ্জ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, ঠিক এর নিকটাত্মীয় ধুন্দলের মতো। গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা ফোটে, আর গাছের ছোট মধুগ্রন্থি লাল পিঁপড়া (উইভার পিঁপড়া) টেনে আনে।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া ঝিঙাকে দেশের প্রধান গ্রীষ্মকালীন সবজির তালিকায় রেখেছে; একই তালিকায় আছে মিষ্টিকুমড়া, করলা, কাঁকরোল, চালকুমড়া, ঢ্যাঁড়স, বরবটি ও পুঁইশাক। বাংলাপিডিয়া বলছে, প্রতিকূল আবহাওয়া ও পোকার আক্রমণ গ্রীষ্মকালে সবজি চাষকে সীমিত করে। কুমড়াজাতীয় ফসলের প্রধান শত্রু পোকা হিসেবে এতে উল্লেখ আছে মাছি পোকা (মেলন ফ্রুট ফ্লাই) ও লাল কুমড়া পোকার, আর প্রধান রোগ হিসেবে পাউডারি মিলডিউ, ডাউনি মিলডিউ, সারকোস্পোরা পাতার দাগ ও মোজাইক রোগের। এসব সমস্যা দেখা দিলে কোনো বালাইনাশক ব্যবহারের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
গবেষকেরাও একই সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন। ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টারের (ওয়ার্ল্ডভেজ) সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা ২০২০ সালের জুলাইয়ে Agriculture সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, ঝিঙে ও ধুন্দল এশিয়াজুড়ে ক্ষুদ্র কৃষকেরা ব্যাপকভাবে চাষ করেন এবং এদের অর্থনৈতিক ও পুষ্টিগত গুরুত্ব বড়, কিন্তু টমেটো লিফ কার্ল নিউ দিল্লি ভাইরাস ও ডাউনি মিলডিউ এদের উৎপাদনের বড় বাধা। থাইল্যান্ডের কামফায়েং সায়েনে ওয়ার্ল্ডভেজের যে কেন্দ্রে এই দুই রোগ প্রাকৃতিকভাবেই হয়, সেখানে স্থানীয় জাত থেকে তৈরি প্রজনন লাইন পরীক্ষা করে দলটি ঝিঙের ১৩টি লাইন পায়, যেগুলো দুই রোগই প্রতিরোধ করতে পারে।

মৌলভীবাজারে ঝিঙেখেতের গ্রাম
ফসলটি কতটা লাভজনক হতে পারে, তা উঠে এসেছিল ২০২৪ সালের ১১ মে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে, মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার মোহাম্মদনগর গ্রাম থেকে। গ্রামটির প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে ঝিঙের চাষ হচ্ছিল, দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নে প্রায় ৪০০ বিঘায় এবং পুরো উপজেলায় ১ হাজার ৩২০ বিঘায়। উপজেলা কৃষি কার্যালয় জানায়, সেখানে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে ঝিঙের চাষ চলছে, আর গ্রামবাসীর ভাষ্য, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পরিবারই এই সবজি চাষ করে।
সেখানে চাষের ক্যালেন্ডার চলে আলুর পেছনে পেছনে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আলু তোলার পর কৃষকেরা ঝিঙে লাগান, আর ৫০ থেকে ৫৫ দিন পর তোলা শুরু হয়। এরপর সাড়ে তিন মাস পর্যন্ত, প্রতি তিন দিন পরপর ফল তোলা চলে। কৃষকেরা জানান, প্রতি কিয়ারে, অর্থাৎ ৩০ শতাংশ জমিতে, প্রায় ৫০ মণ ফলন হয়। মৌসুমের শুরুর ঝিঙে বিক্রি হয়েছিল কেজিপ্রতি ৪৫ থেকে ৫৫ টাকায়, প্রতিবেদনের সময় দাম ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। কৃষকদের হিসাবে, বিঘাপ্রতি খরচ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, আর লাভ ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। রবি, মঙ্গল ও শুক্রবার সকালে বড়লেখা সদরের হাটে তাঁরা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন, কোনো কোনো পাইকার সরাসরি খেত থেকেও কেনেন। চাষিরা বলেন, অন্য ফসলের তুলনায় ঝিঙেতে পোকামাকড় ও রোগ কম, আর পানির সংকট হয় শুধু শুকনা মৌসুমে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, কৃষকদের স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ ও সেচযন্ত্র দেওয়া হয়, আর প্রদর্শনী খেতের কৃষকেরা বিনা মূল্যে বীজ ও সার পান।
পাতে কী থাকে: খাদ্য উপাদান তালিকার হিসাব
মূল রেসিপিতে বলা হয়েছিল, ঝিঙে পানিতে ভরপুর এবং শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। এর প্রথম অংশের সমর্থন মেলে ‘ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ’-এ, যা ২০১৩ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট খাদ্য মন্ত্রণালয়, এফএও ও অন্যদের সহায়তায় প্রকাশ করে। শরীর ঠান্ডা রাখার দাবিটি এই প্রতিবেদনে রাখা হয়নি, কারণ আমরা যেসব স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য দেখেছি, তাদের কেউ তা বলেনি। তালিকা অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম খাওয়ার উপযোগী কাঁচা ঝিঙেতে পানি থাকে ৯২ দশমিক ৪ গ্রাম, শক্তি ২৯ কিলোক্যালরি, আমিষ ১ দশমিক ৩ গ্রাম, চর্বি শূন্য দশমিক ৪ গ্রাম, শর্করা ৪ দশমিক ৬ গ্রাম এবং খাদ্যআঁশ ১ দশমিক ১ গ্রাম। এ ছাড়া এতে আছে ২১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম আয়রন, ১৩৯ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও ৪ দশমিক ৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। তালিকাটি ফলের প্রায় ৮২ শতাংশকে খাওয়ার উপযোগী ধরে; বাকিটা খোসা ও দুই প্রান্ত।
অন্য উপকরণগুলো পদটির ভারসাম্য বদলে দেয়। তালিকায় থাকা ডায়মন্ড জাতের প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা আলুতে পানি ৮১ দশমিক ৭ গ্রাম, শক্তি ৬৬ কিলোক্যালরি, শর্করা ১৪ গ্রাম, খাদ্যআঁশ ২ দশমিক ১ গ্রাম, পটাশিয়াম ২৮৬ মিলিগ্রাম এবং ভিটামিন সি ১৯ দশমিক ১ মিলিগ্রাম। পোস্তদানা ঘন খাবার: ১০০ গ্রামে ৫২৩ কিলোক্যালরি, চর্বি ৪৩ দশমিক ১ গ্রাম, আমিষ ১৭ দশমিক ২ গ্রাম, খাদ্যআঁশ ১৯ দশমিক ৫ গ্রাম, সঙ্গে ১ হাজার ৪৯০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও ৯ দশমিক ৬ মিলিগ্রাম আয়রন। সরিষার তেল পুরোটাই চর্বি, প্রতি ১০০ গ্রামে ৯০০ কিলোক্যালরি। ফলে রেসিপির তিন টেবিল চামচ পোস্ত বাটা আর দুই টেবিল চামচ তেল থেকেই পদের বেশির ভাগ শক্তি আসে, আর পরিমাণের বড় অংশ জোগায় ঝিঙে। কোনো রোগের কারণে বিশেষ খাদ্যতালিকা মেনে চলা ব্যক্তিদের এমন পদ তাঁদের খাদ্যতালিকায় কীভাবে মানাবে, তা চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।

আলু: রেকর্ড উৎপাদন, বিপাকে কৃষক
কড়াইয়ের দ্বিতীয় সবজি আলু উপমহাদেশে এসেছে অনেক পরে। বাংলাপিডিয়া বলছে, ধারণা করা হয় সপ্তদশ শতকের শুরুতে পর্তুগিজ নাবিকেরা ভারতে আলু নিয়ে আসেন, আর গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের সময়ে (১৭৭২ থেকে ১৭৮৫) এর চাষ বহু প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে আলু শীতের ফসল; নভেম্বরের প্রথম পক্ষ লাগানোর সবচেয়ে ভালো সময়, তোলা হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চে। দেশে আলু মূলত সবজি হিসেবেই খাওয়া হয়, মাছ, মাংস বা ডিমের তরকারিতে।
২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ দেশে আলু হচ্ছিল চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। ২০২৫ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৯২ লাখ হেক্টর জমিতে রেকর্ড ১ দশমিক ১৫ কোটি টন আলু উৎপাদিত হয়, যা আগের বছরের ১ দশমিক ০৬ কোটি টনের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি। কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র ও বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) হিসাবে দেশের মোট চাহিদা ৯০ লাখ টনের কিছু বেশি, যার মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টন বীজ হিসেবে রাখা হয়। বিসিএসএর হিসাবে তখন মাঠপর্যায়ে কেজিপ্রতি দাম ছিল ১৪ থেকে ১৫ টাকা, অথচ উৎপাদন খরচ ২৫ থেকে ২৭ টাকা।
২০২৫-২৬ মৌসুমের আলু আবহাওয়ার ধাক্কা খায়। ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি ভারী বৃষ্টিতে উত্তরাঞ্চলের আলুখেত ডুবে যায়। দ্য ডেইলি স্টার ১৫ মার্চ জানায়, রংপুরে তিন দিনে প্রায় ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, জয়পুরহাটে ৯০ হেক্টর আলুখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঠাকুরগাঁওয়ে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির আলু তখনো তোলা বাকি ছিল। ২৫ মার্চ কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বিসিএসএ উত্তরাঞ্চলের ১২ জেলায় প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর আলুর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে হিসাব দেয়, ক্ষতির পরিমাণ ধরে প্রায় ৬৭৫ কোটি টাকা। সংগঠনটি জানায়, বৃষ্টিতে নষ্ট আলু কৃষকেরা কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৬ টাকায় বিক্রি করছেন, অথচ গড় উৎপাদন খরচ প্রায় ১৬ টাকা। চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালে ১ দশমিক ১২ কোটি টন আলু উৎপাদন হয়েছিল, যা চাহিদার চেয়ে প্রায় ২২ লাখ টন বেশি।
জেলাগুলোর খবরেও একই চিত্র। ঠাকুরগাঁওয়ে ২৮ হাজার হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৮ হাজার ২৮৫ হেক্টরে আলু চাষ হয়, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ লাখ টন। সেখানকার এক কৃষক ১৬ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, এক কেজি আলু উৎপাদনে তাঁর খরচ ১৫ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ৯ থেকে ১০ টাকায়। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, এলাকায় চাহিদার চেয়ে বেশি আলু হয়, কৃষকের ন্যায্য দাম পেতে আলুর ব্যবহার বাড়াতে হবে। রাজশাহীতে আলুর আবাদ আগের বছরের ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর থেকে কমে ৩৪ হাজার ২৮০ হেক্টরে নামে। প্রথম আলো ২৮ মার্চ জানায়, আগের বছর যে পাটের বস্তা ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় পাওয়া যেত, তার দাম উঠেছে ১৯৫ টাকা পর্যন্ত, আর দুই দিনে আলুর দাম কেজিপ্রতি ১৬ টাকা থেকে নেমে এসেছে ১৩ টাকায়। সেই মৌসুমে এপ্রিলের দুপুরের পাতে আলু রাখার রেসিপি তাই দেশে প্রচুর পরিমাণে থাকা একটি ফসলেরই ব্যবহার।

পোস্ত: নিয়ন্ত্রিত গাছের বীজ, বাঙালির প্রিয় উপকরণ
পোস্ত হলো আফিম গাছ, অর্থাৎ Papaver somniferum-এর বীজ। বাঙালি রান্নায় সাদা পোস্তদানা বেটে ঘনত্ব, মসৃণতা ও স্বাদের জন্য দেওয়া হয়। সবচেয়ে পরিচিত পদ আলু পোস্ত, আর একই মসলায় রাঁধা হয় পেঁয়াজ পোস্ত, পটোল পোস্ত, ঝিঙে পোস্ত, মুরগি ও চিংড়ি পোস্ত। পোস্ত দিয়ে বড়া ভাজা হয়, আর কাঁচা পোস্ত বাটা, অর্থাৎ সরিষার তেল, কাঁচামরিচ কুচি ও পেঁয়াজ মেশানো বাটা পোস্ত ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়; পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ দুই জায়গাতেই পদটি জনপ্রিয়। পোস্তদানা খুবই ছোট: প্রায় ৩ হাজার ৩০০ দানার ওজন এক গ্রাম।
বাংলাদেশে এই বীজ সাধারণ পণ্য নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস পাখির খাবার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তান থেকে আনা একটি চালানে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ২৫ টন পোস্তদানা জব্দ করে। কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার তখন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২০২৪ অনুযায়ী পোস্তদানা আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, আর বীজগুলো অঙ্কুরোদ্গমে সক্ষম হলে তা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ‘ক’ শ্রেণির মাদকের আওতায় পড়ে। নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হয় চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানোটেকনোলজি সেন্টার এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট)।
বীজটি নিজে মাদক নয়, তবে এতে মাদকের অবশেষ লেগে থাকতে পারে। ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (ইএফএসএ) ২০১৮ সালের ১৬ মে প্রকাশিত হালনাগাদ বৈজ্ঞানিক মতামতে জানায়, পোস্তদানায় মরফিন ও কোডিনের মতো আফিম অ্যালকালয়েড থাকে না, তবে পোকার আক্রমণে এবং ফসল তোলার সময় এগুলো দানায় লেগে যেতে পারে। ইএফএসএ শরীরের প্রতি কেজি ওজনে ১০ মাইক্রোগ্রাম মরফিনকে স্বল্পমেয়াদি নিরাপদ মাত্রা (একিউট রেফারেন্স ডোজ) হিসেবে নিশ্চিত করে। সংস্থাটি দেখেছে, মূলত ওষুধশিল্পের জন্য চাষ হওয়া উচ্চ অ্যালকালয়েডযুক্ত জাতের দানা খেলে বেশির ভাগ বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে এই মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, আর খাবারের জন্য চাষ হওয়া জাতের দানায় তা ছাড়ায় কেবল বেশি পরিমাণে খেলে। পরিবারের জন্য এক কড়াই ঝিঙে-আলু পোস্তে তিন টেবিল চামচ বাটা রান্নার সাধারণ পরিমাণ, তবু বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে পোস্ত কেনার এটি একটি কারণ।
ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত), ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ (পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৩), বাংলাপিডিয়া, Agriculture সাময়িকীতে ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টারের গবেষণা (২০২০), ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)