সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

কোরবানির হাটে ভেড়ার চাহিদা কম, ধর্মীয়ভাবে বৈধ হলেও হতাশ খামারিরা

২০২৬ সালের ঈদুল আজহার আগে জাগো নিউজের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, ইসলামী বিধানে ভেড়া কোরবানি সম্পূর্ণ বৈধ হলেও বড় পশুর সামাজিক টান, খাদ্যাভ্যাস ও সংগঠিত বাজারের অভাবে হাটে ভেড়ার চাহিদা কম, আর তাতে দাম পাচ্ছিলেন না চর ও উপকূলের প্রান্তিক খামারিরা।

কোরবানির হাটে ভেড়ার চাহিদা কম, ধর্মীয়ভাবে বৈধ হলেও হতাশ খামারিরা
লাইভস্টক

ঈদুল আজহার আগের দিন, ২০২৬ সালের ২৭ মে, জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত খায়রুল বাশার আশিকের এক বিশেষ প্রতিবেদন দেশের কোরবানির হাটের একটি চেনা কিন্তু কম আলোচিত দৃশ্য সামনে আনে। ঈদ এলেই পশুর হাটে মানুষের ভিড় বাড়ে, গরু, ছাগল আর মহিষ ঘিরে চলে দরদাম, আলোচনা আর উৎসবের আমেজ। হাট যখন হাঁকডাকে মুখর, তখন কিছু ভেড়া নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে হাটের এক কোণে। তাদের ঘিরে বাড়তি আগ্রহ নেই, ছবি তোলার ভিড় নেই, দরদামও চলে ধীরগতিতে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক সময় দিনের পর দিন হাটে থেকেও ভেড়া বিক্রি হয় না, আর দুই একটি বিক্রি হলেও দাম ওঠে না প্রত্যাশামতো।

প্রতিবেদনটির মূল প্রশ্ন ছিল সরল: ইসলামী শরিয়তে ভেড়া কোরবানির জন্য সম্পূর্ণ বৈধ ও গ্রহণযোগ্য পশু, তবু বাংলাদেশে কোরবানিতে এর চাহিদা তুলনামূলক কম কেন। খোলা মাঠে বা চরাঞ্চলে যাঁরা ভেড়া পালন করেন, সেই প্রান্তিক খামারিরা কোরবানির মৌসুমেও কেন খুব আশাবাদী হতে পারেন না। প্রতিবেদকের ভাষায়, এর উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসে ধর্মীয় ধারণা, সামাজিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও মানুষের মনস্তত্ত্বের জটিল এক চিত্র। সেবার দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয় ২৮ মে, বৃহস্পতিবার; জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ মে সন্ধ্যায় এই তারিখ ঘোষণা করেছিল।

বড় পশুর টান: হাটের সামাজিক সংস্কৃতি


জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে কোরবানিকে ঘিরে ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সামাজিক সংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে, যার কেন্দ্রে আছে 'বড় পশু' কেনার প্রবণতা। অনেকের কাছে কোরবানির পশু কেবল ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ নয়; এটি সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও পারিবারিক মর্যাদারও প্রতীক।

রাজধানীর একটি পশুর হাটে আসা ব্যবসায়ী মো. সালাউদ্দিন প্রতিবেদককে বলেন, 'মানুষ এখনো মনে করেন বড় গরু মানেই বড় কোরবানি। ভেড়া দিলে অনেকে ভাবতে পারে সামর্থ্য কম। গ্রামাঞ্চলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। ফলে সামর্থ্য থাকলে মানুষ গরুই বেছে নেয়, ভেড়া নয়।' তিনি আরও বলেন, 'বড় গরু নিয়ে বাড়ি ফেরা, প্রতিবেশীদের দেখানো কিংবা আত্মীয়স্বজনের আলোচনা সব মিলিয়ে কোরবানিকে ঘিরে অনেক সময় সামাজিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে সামর্থ্য থাকলে অধিকাংশ পরিবার গরুকেই বেছে নেয়। আর সামর্থ্য কম হলে ছাগল। ভেড়া মাঝখানে পড়ে যায় প্রায় অদৃশ্য এক অবস্থানে।'

সেই সপ্তাহের অন্য প্রতিবেদনেও বড় পশুর এই আকর্ষণ স্পষ্ট ছিল। প্রথম আলো ২৪ মে গাবতলী হাট থেকে জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থেকে আনা 'কালো জামাই' নামের একটি ষাঁড়ের ওজন ১ হাজার ৫০০ কেজি, দাম হাঁকা হচ্ছিল ৫৫ লাখ টাকা; চুয়াডাঙ্গা থেকে আনা 'লাল বাদশাহ'-র দাম চাওয়া হচ্ছিল ৫০ লাখ টাকা, আর কুষ্টিয়ার 'নবাব'-এর ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, গাবতলী হাটে সারা বছরই পশু কেনাবেচা হয় এবং এটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একমাত্র স্থায়ী হাট; কোরবানি উপলক্ষে সেদিন থেকে রাজধানীতে আরও ২১টি অস্থায়ী হাট বসার কথা ছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ২১ মে জানায়, হাট জমে ওঠার আগেই বেপারিরা প্রবেশমুখ বা সামনের সারিতে জায়গা নিতে আগেভাগে ঢাকায় আসছিলেন, কারণ সেখানে ক্রেতার নজর আগে পড়ে।

২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশে ঈদুল আজহার একটি পশুর হাট; ছবিটি পটভূমি হিসেবে দেওয়া, প্রতিবেদনের হাটের নয়। ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশে ঈদুল আজহার একটি পশুর হাট; ছবিটি পটভূমি হিসেবে দেওয়া, প্রতিবেদনের হাটের নয়। ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ইসলামী বিধানে ভেড়া কোরবানি


জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামী বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়স পূর্ণ করা ভেড়া কোরবানির জন্য সম্পূর্ণ বৈধ, একটি ভেড়া একজন ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করা যায় এবং ধর্মীয়ভাবে এর গুরুত্ব গরু বা ছাগলের চেয়ে কম নয়। ঈদের আগে দৈনিক ইত্তেফাকের ধর্ম পাতায় প্রকাশিত দুটি লেখায় এ বিষয়ের প্রচলিত মাসআলা তুলে ধরা হয়। ২৫ মে প্রকাশিত লেখায় বলা হয়, কোরবানির পশু হতে হবে গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু; সুরা হজের ৩৪ নম্বর আয়াতে 'বাহিমাতুল আনআম' বা গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুর কথা আছে, আর সেই অনুযায়ী উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কোরবানির জন্য বৈধ। হাঁস, মুরগি, হরিণ বা অন্য কোনো বন্য প্রাণী কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

বয়সের নিয়মে ভেড়া ও দুম্বার জন্য একটি বিশেষ ছাড় আছে। ইত্তেফাকের ১৯ মে প্রকাশিত লেখা অনুযায়ী, উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর, গরু ও মহিষের দুই বছর এবং ছাগলের এক বছর পূর্ণ হতে হয়। ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রেও সাধারণ নিয়মে এক বছর লাগে, তবে ছয় মাস বয়সী ভেড়া বা দুম্বা দেখতে যদি এক বছরের মতো হৃষ্টপুষ্ট হয়, তা দিয়েও কোরবানি জায়েজ। ছয় মাসের কম বয়সী ভেড়া বা দুম্বা দিয়ে কোরবানি বৈধ হবে না, আর ছাগলের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। লেখাটিতে এর ভিত্তি হিসেবে সহিহ মুসলিমের ১৯৬৩ নম্বর হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দিষ্ট বয়সের পশু ছাড়া কোরবানি না করতে বলেছেন, তবে তা পাওয়া কঠিন হলে ছয় মাস বয়সের ভেড়া জবাই করা যায়।

জাগো নিউজের প্রতিবেদন যে হাদিসগুলোর কথা বলে, সেগুলোর কয়েকটি হাদিস সংকলনে স্পষ্টভাবে আছে। সহিহ বুখারির ৫৫৬৫ নম্বর হাদিসে আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) সাদা-কালো রঙের শিংওয়ালা দুটি ভেড়া কোরবানি করেছিলেন, নিজ হাতে জবাই করেছিলেন এবং আল্লাহর নাম ও তাকবির উচ্চারণ করেছিলেন। সহিহ মুসলিমের ১৯৬৬ নম্বর হাদিসেও একই বর্ণনা আছে। সহিহ বুখারির ৫৫৫৩ নম্বর হাদিসে আনাস (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) দুটি ভেড়া কোরবানি করতেন, আর তিনিও দুটি ভেড়া কোরবানি করতেন। অন্যদিকে গরু ও উটে একাধিক ব্যক্তি শরিক হতে পারেন: সহিহ মুসলিমের ১৩১৮ নম্বর হাদিসে জাবির (রা.) জানান, হুদায়বিয়ার বছর তাঁরা সাতজনের পক্ষ থেকে একটি উট এবং সাতজনের পক্ষ থেকে একটি গরু কোরবানি করেছিলেন। ইত্তেফাকের ২৫ মে-র লেখাতেও বলা হয়, গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন। একই লেখায় বলা হয়, জামে তিরমিজির ১৪৯৭ ও ১৪৯৮ নম্বর হাদিস অনুযায়ী এমন দুর্বল পশু, যা হাঁটতে পারে না, কিংবা যার কান বা লেজ অর্ধেকের বেশি কাটা, তা দিয়ে কোরবানি সহিহ হবে না।

এসব বিধানের পরও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা কাজ করে বলে জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কেউ কেউ মনে করেন, ভেড়া কোরবানি 'কম গুরুত্বপূর্ণ' বা 'কম সওয়াবের', যার কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্মীয় আলোচকরা বলছেন, ইসলামে পশুর আকার নয়, নিয়ত, তাকওয়া ও সামর্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই বার্তা সমাজের বড় অংশে এখনো যথেষ্টভাবে পৌঁছায়নি। ঢাকার একটি মসজিদের খতিব মাওলানা রাশেদুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেন, 'ইসলামে কোরবানির মূল বিষয় হলো তাকওয়া ও সামর্থ্য। পশুর আকার বা বাজারমূল্য নয়। কিন্তু সমাজে একধরনের প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বড় পশুকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।'

ভেড়া আর দুম্বা: পার্থক্য কোথায়


প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে কোরবানিতে ভেড়া ও দুম্বার জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে সৌদি আরবে, ভেড়া কোরবানির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে এবং সেখানে অনেক পরিবার গরুর বদলে ভেড়া বা দুম্বাকেই অগ্রাধিকার দেয়। পাকিস্তানেও কোরবানির সময় দুম্বার বিশেষ কদর দেখা যায়, আর বড় আকৃতির, আকর্ষণীয় গড়নের দুম্বা অনেক সময় সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশে অনেকে ভেড়া ও দুম্বাকে একই প্রাণী মনে করলেও দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। দুম্বা মূলত ভেড়ারই একটি ধরন, যা ইংরেজিতে 'ফ্যাট-টেইলড শিপ' বা চর্বিলেজি ভেড়া নামে পরিচিত। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের ভেড়ার লেজ ও পেছনের অংশ বড় হয়, বিশ্বের মোট ভেড়ার প্রায় ২৫ শতাংশ এই ধরনের, আর এদের বেশি দেখা যায় উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়া থেকে চীন পর্যন্ত অঞ্চলে। লেজের চর্বি শুষ্ক অঞ্চলের কঠিন পরিবেশে এদের খাদ্যের মজুত হিসেবে কাজ করে, আর সেই চর্বি অনেক আঞ্চলিক রান্নার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) বিজ্ঞানীদের ২০২২ সালে প্রকাশিত এক পর্যালোচনাতেও বলা হয়, বিশ্বের ভেড়ার প্রায় ২৫ শতাংশ চর্বিলেজি জাতের এবং চরম পরিবেশে এই লেজ প্রাণীর অভিযোজনে সাহায্য করে।

জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুম্বার পেছনের অংশে চর্বিযুক্ত বড় লেজ থাকে এবং আকারেও এটি তুলনামূলক বড় ও দৃষ্টিনন্দন, অন্যদিকে দেশি ভেড়া সাধারণত ছোট আকারের ও কম আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত হয়। ফলে কোরবানির বাজারে দুম্বা কিছুটা আগ্রহ তৈরি করতে পারলেও সাধারণ দেশি ভেড়া এখনো সেই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। প্রতিবেদনের সঙ্গে রাজধানীর পশুর হাট থেকে দুম্বার ছবিও তুলেছিলেন জাগো নিউজের আলোকচিত্রী সাইফুল হক মিঠু।

উজবেকিস্তানের চিরোকচির কাছে একটি পশুর হাটে চর্বিলেজি ভেড়া (দুম্বা জাতীয়), ২০০৮। ছবি: Man77 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
উজবেকিস্তানের চিরোকচির কাছে একটি পশুর হাটে চর্বিলেজি ভেড়া (দুম্বা জাতীয়), ২০০৮। ছবি: Man77 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

দেশে ভেড়া কত, কোথায় পালন হয়


প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স (২০২৩-২০২৪)' অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ভেড়া ছিল ৩৯ দশমিক ০৩ লাখ। দশ বছর আগে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৩২ দশমিক ৭০ লাখ, আর প্রতিবছর তা অল্প অল্প করে বেড়েছে: ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৬ দশমিক ০৭ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৮ দশমিক ২৭ লাখ। একই সারণিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গরু ২৫০ দশমিক ১৩ লাখ, ছাগল ২৭১ দশমিক ১৭ লাখ এবং মহিষ ১৫ দশমিক ২৪ লাখ দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ সংখ্যায় ভেড়া ছাগল ও গরুর অনেক পেছনে, যদিও মহিষের চেয়ে বেশি। বাংলাপিডিয়াও দেশি ভেড়াকে জাবর কাটা প্রাণীর মধ্যে তৃতীয় স্থানে রেখেছে এবং লিখেছে, এ দেশে ভেড়া পালন হয় মূলত মাংসের জন্য।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশি ভেড়া নিম্নমানের খড় ও আঁশজাতীয় খাবার খুব দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারে, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভালোভাবে খাপ খায়, বছরে দুবার বাচ্চা দিতে পারে, একসঙ্গে একাধিক বাচ্চা দেয় এবং দেশে প্রচলিত অনেক সাধারণ রোগ সহ্য করতে পারে। দেশি ভেড়ার তিনটি ধরন আছে: যমুনা অববাহিকা, বরেন্দ্র ও উপকূলীয়।

যমুনা অববাহিকার ভেড়া আকারে ছোট; পূর্ণবয়স্ক পুরুষের ওজন ১৮ থেকে ২৫ কেজি, স্ত্রীর ১৫ থেকে ২২ কেজি। এদের দেখা যায় টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকায়, বিশেষ করে যমুনা নদীর অববাহিকায়; একবারে ১ থেকে ৪টি বাচ্চা দেয়। বরেন্দ্র ভেড়া কিছুটা বড়, পুরুষের ওজন ২২ থেকে ৩০ কেজি, স্ত্রীর ১৫ থেকে ২৫ কেজি; এদের পাওয়া যায় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও নওগাঁয়। উপকূলীয় ভেড়া তিনটির মধ্যে সবচেয়ে বড়, পুরুষের ওজন ২৫ থেকে ৩২ কেজি, স্ত্রীর ১৮ থেকে ২৬ কেজি; এদের দেখা যায় পটুয়াখালী, ভোলা, হাতিয়া, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও লক্ষ্মীপুরে। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, ভারতীয় মুজাফফরাবাদী বা নাগপুরি জাতের ভেড়াও দেশে পাওয়া যায়, যাকে ভুলভাবে গাড়ল বলা হয়।

বিএলআরআইয়ের বিজ্ঞানীদের পর্যালোচনায় বলা হয়, দেশের বেশির ভাগ ভেড়া নির্দিষ্ট জাতবিহীন দেশি ধরনের, সামান্য কিছু বিদেশি ও সংকর জাতের। দেশি ভেড়ার মান উন্নয়নে আগেও চেষ্টা হয়েছে: ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের লোহি, ১৯৭৬ সালে নিউজিল্যান্ডের রমনি মার্শ এবং ১৯৮৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাফোক ও পেরেনডেল জাত আনা হয়েছিল উপকূলীয় ভেড়ার সংকরায়ণের জন্য, কিন্তু সেসব কর্মসূচি বেশিদিন টেকেনি। ২০১৬ সালে বিএলআরআই অস্ট্রেলিয়া থেকে সাফোক, পেরেনডেল ও ডরপার জাত এনেছিল দেশি ভেড়ার উৎপাদন বাড়াতে সংকর জাত তৈরির জন্য। পর্যালোচনাটি সতর্ক করে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আসা বিদেশি ও সংকর ভেড়া মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো সীমান্ত জেলায় পরিকল্পিত প্রজননব্যবস্থা ব্যাহত করছে এবং দেশি ভেড়ার মূল্যবান জিনসম্পদ ক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে।

চরের খামারির প্রতীক্ষা


জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেড়ার কম চাহিদার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে দেশের প্রান্তিক ভেড়া পালনকারীদের ওপর, বিশেষ করে চরাঞ্চল, খোলা মাঠ ও উপকূলীয় অঞ্চলের সেই মানুষদের ওপর, যাঁরা বছরের পর বছর ভেড়া পালন করে জীবিকা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও ভোলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট কৃষক ও প্রান্তিক পরিবারগুলো উন্মুক্তভাবে ভেড়া পালন করে। চরের ঘাস, খোলা মাঠ কিংবা ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করে কম খরচে ভেড়া পালন করা যায় বলে এটি দরিদ্র পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস।

প্রতিবেদক ঈদের আগে ঢাকার গাবতলী পশুর হাটে এমন একজন খামারির দেখা পান। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, গরুর সারির সামনে ভিড়, মাইকে ডাক আর দরদামের উত্তেজনা। একটু দূরে দড়ি হাতে বসে আছেন ভোলার চরফ্যাশনের খামারি আব্দুল হালিম, পাশে চারটি ভেড়া। সকাল থেকে অনেক মানুষ সেগুলো দেখেছেন, কিন্তু দাম বলেছেন মাত্র দুজন। আব্দুল হালিম বলেন, 'সারা বছর মাঠে চরিয়ে ভেড়া বড় করি। ভাবি ঈদের সময় ভালো দাম পাব। কিন্তু হাটে এসে দেখি মানুষ আগে গরু দেখে, পরে ছাগল। ভেড়ার দিকে অনেকেই তাকায় না।' তাঁর অভিযোগ, অনেক ক্রেতা ভেড়ার দাম খুব কম বলতে চান। তিনি বলেন, 'অনেকে এমন দাম বলেন, মনে হয় এটা কোনো কোরবানির পশুই না।'

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা প্রতিবেদককে জানান চরাঞ্চলের খামারি হোসনে আরা বেগম। তাঁর ভাষায়, একটি ভালো মানের ভেড়া পালনে সময় ও শ্রম কম লাগে না, কিন্তু বাজারে চাহিদা কম থাকায় অনেক সময় খরচ তুলতেই কষ্ট হয়। কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় অনেকে ধীরে ধীরে এই খাত থেকে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

বাংলাপিডিয়া যে জেলাগুলোতে উপকূলীয় ভেড়ার কথা বলে, আব্দুল হালিমের জেলা ভোলা তার একটি। ঈদের আগে ভোলার হাটের খবরেও অবশ্য ভেড়ার চেয়ে অন্য পশুর কথাই বেশি এসেছিল। বিডিনিউজ২৪ ডটকম ২৫ মে জানায়, ভোলা সদর, চরফ্যাশন, লালমোহন ও বোরহানউদ্দিনের পশুর হাটগুলোতে ছোট, মাঝারি ও বড় গরুর পাশাপাশি দেশি জাতের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি ছিল, আর দেশে লালন-পালন করা গরু, মহিষ ও ছাগলের চাহিদা ছিল তুলনামূলক বেশি। খামারিরা সেখানে জানান, সেবার পশুর খাবার ও পরিচর্যার খরচ বেড়েছিল। দৈনিক যুগান্তর ২০ মে জানায়, চরফ্যাশন উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে উপজেলায় ১৮৬টি গরুর খামার, ৮২টি মহিষের খামার ও ২৪টি ছাগলের খামার থেকে ২৫ হাজার ৯১টি গবাদিপশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল, আর গৃহস্থ ও খামারিদের পরামর্শ দিতে প্রতিদিন সাতটি মেডিকেল দল গ্রামে যাচ্ছিল। সেই হিসাবের খামারের তালিকায় ভেড়ার আলাদা কোনো উল্লেখ ছিল না।

বাংলাদেশের একটি গ্রামে মাঠে চরছে সাদা ছোপওয়ালা কালচে বাদামি একটি ভেড়ার বাচ্চা, পেছনে পালের অন্য ভেড়া, ২০২৬। ছবি: A S M Jobaer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি গ্রামে মাঠে চরছে সাদা ছোপওয়ালা কালচে বাদামি একটি ভেড়ার বাচ্চা, পেছনে পালের অন্য ভেড়া, ২০২৬। ছবি: A S M Jobaer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আগের প্রতিবেদনে ভেড়া পালনের চিত্র


কোরবানির বাজারে চাহিদা কম হলেও সারা বছরের আয়ের উৎস হিসেবে ভেড়া কীভাবে কিছু পরিবারের অবস্থা বদলেছে, তা আগের কয়েকটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। প্রথম আলো ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়ন থেকে জানায়, প্রামাণিকপাড়া গ্রামের এক নারী খামারি ২০১৩ সালের মার্চে ১ হাজার টাকায় একটি ভেড়া কিনে পালন শুরু করেছিলেন। আগের বছর তিনি ২১টি ভেড়া বিক্রি করে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা আয় করেন, আর প্রতিবেদনের সময় তাঁর খামারে ছিল ২৫টি ভেড়া। তাঁর দেখাদেখি ওই গ্রামসহ আশপাশের পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৩০০ নারী ভেড়া পালন শুরু করেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ফজলুল করিম তখন প্রথম আলোকে বলেন, ইকরচালী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে সবচেয়ে বেশি ভেড়া পালন হচ্ছে এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগ ভেড়া পালনকারীদের পরামর্শ দিচ্ছে।

প্রথম আলো ২০২৩ সালের ১০ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার শাখাহাতীর চর থেকে জানায়, সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া এক খামারি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সেখানে স্থানীয়ভাবে 'গাড়ল' নামে পরিচিত ভেড়ার খামার গড়েছিলেন; প্রতিবেদনের সময় খামারে ছিল ১৪২টি প্রাণী। প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ মাস বয়সী একটি বাচ্চার দাম ছিল ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোনাক্কা আলী তখন বলেন, গাড়ল মূলত ভেড়ার জাত, দেশে প্রথম রাজশাহী অঞ্চলে এর পালন শুরু হয় এবং কুড়িগ্রামের ভূপ্রকৃতি এর জন্য উপযোগী। চরাঞ্চলের এই উদাহরণগুলো দেখায়, পালনের খরচ কম হলেও লাভ নির্ভর করে বিক্রির বাজারের ওপর, আর কোরবানির মৌসুমে সেই বাজারই ভেড়ার জন্য সবচেয়ে সংকুচিত।

কোরবানির বাজারের হিসাবে ছাগল-ভেড়া


২০২৬ সালের ঈদুল আজহার আগে সরকারের দেওয়া হিসাবে ভেড়াকে ছাগলের সঙ্গে একসঙ্গে গোনা হয়েছিল। জাগো নিউজ ২৪ ৩ মে জানায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সেবার কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার, আর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ছিল ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু-মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল-ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী। আগের বছর, ২০২৫ সালে, কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি এবং কোরবানির পরে ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত ছিল।

সেই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি পশু থাকায় কোরবানির জন্য পশু আমদানি করা হবে না, উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিশেষ ট্রেনে প্রাণী পরিবহন করা হবে, সারা দেশে ৩ হাজার ৬৭৮টি হাট বসবে এবং সেগুলোতে ভেটেরিনারি দল থাকবে। অনলাইনে পশু বিক্রিতে কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়।

বিভাগীয় পর্যায়েও একই চিত্র ছিল। বাসস ৭ মে রংপুর থেকে জানায়, বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে রংপুর বিভাগে কোরবানির পশুর চাহিদা ১৪ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭টি, বিপরীতে পশু ছিল ২০ লাখ ২৩ হাজার ৬৭টি, উদ্বৃত্ত ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৪১০টি। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রস্তুত পশুর মধ্যে ছাগল ও ভেড়া ছিল ৩ লাখের ওপর। জেলাভিত্তিক হিসাবে কুড়িগ্রামে পশু ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯১৯টি, চাহিদা ২ লাখ ৬১ হাজার ২৪৬টি; গাইবান্ধায় পশু ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯০০টি, চাহিদা ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০টি। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, কোরবানিতে দেশি ও শংকর জাতের গরুর চাহিদা বেশি থাকায় খামারিরা কয়েক মাস আগে থেকেই এ ধরনের গরু মোটাতাজা করা শুরু করেছিলেন। ছাগল আর ভেড়াকে এক ঘরে রাখা এই হিসাব থেকে কোরবানির বাজারে ভেড়ার আলাদা জোগান বা বিক্রি বোঝা যায় না।

খাদ্যাভ্যাস, কসাই ও মাংস ভাগের বাস্তবতা


জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার মতো শহরে কিছু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার ভেড়ার প্রতি আগ্রহ দেখালেও তা এখনো সীমিত। এর একটি কারণ ভেড়ার মাংসের সঙ্গে মানুষের পরিচিতি কম, রান্নার অভ্যাসও তেমন গড়ে ওঠেনি। বড় পরিবারে একটি ভেড়ার মাংস যথেষ্ট হয় না বলেও অনেকে মনে করেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আফসানা রহমান প্রতিবেদককে বলেন, 'ঈদের সকাল মানেই গরুর কলিজা ভুনা, নেহারি, রেজালা কিংবা কাচ্চির আয়োজন এই ধারণা বহু পরিবারে গভীরভাবে গেঁথে গেছে। ভেড়ার মাংস আমরা নিয়মিত খাই না। তাই কোরবানির জন্য গরুই বেশি স্বস্তির মনে হয়।'

অনেকের ধারণা, ভেড়ার মাংসে গন্ধ বেশি। প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়, এটি অনেকাংশে পালন পদ্ধতি ও রান্নার ওপর নির্ভর করে। বিএলআরআইয়ের বিজ্ঞানীদের পর্যালোচনাতেও বলা হয়, মাংসের স্বাদ ও মান নিয়ে নেতিবাচক প্রচারের কারণে সাংস্কৃতিকভাবে ভেড়া ছাগলের চেয়ে কম জনপ্রিয়, যদিও ভেড়া ও ছাগলের মাংস বৈশিষ্ট্য ও মানে প্রায় কাছাকাছি, এবং কয়েকটি গবেষণায় ভেড়ার মাংসের রসালো ভাব ও কোমলতা ছাগলের মাংসের চেয়ে ভালো পাওয়া গেছে। পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, প্রচলিত পদ্ধতিতে ভেড়া সাধারণত এক থেকে তিন বছর বয়সে ৮ থেকে ২২ কেজি জীবন্ত ওজনে জবাই হয়, তবে লাভজনক হিসেবে দেশি ভেড়া ৬ থেকে ৯ মাস বয়সে ১৮ দশমিক ৬ থেকে ২৩ দশমিক ৪ কেজি ওজনে জবাই করা উপযুক্ত।

কোরবানির বাজারে ভেড়ার কম চাহিদার আরেকটি কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে কসাইদের অনাগ্রহের কথা বলা হয়। অনেক কসাই গরু বা ছাগল জবাইয়ে অভ্যস্ত হলেও ভেড়া কাটার অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম, ফলে কোরবানির সময় ভেড়া জবাইয়ের জন্য সহজে কসাই পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ আছে। অনেক পরিবার তাই ঝামেলা এড়াতে গরু বা ছাগলের দিকে ঝোঁকে। মাংস বণ্টনের সামাজিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ: বড় পরিবার বা সামাজিক পরিসরে একটি গরুর মাংস সহজে ভাগ করে দেওয়া যায়, কিন্তু একটি ভেড়ার মাংস কম হওয়ায় অনেকে এটিকে যথেষ্ট মনে করেন না, বিশেষ করে যৌথ পরিবার বা গ্রামীণ সমাজে, যেখানে অনেক মানুষের কাছে মাংস পৌঁছে দেওয়ার চাপ থাকে।

প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার কথাও আসে। ঈদ এলেই ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে বিশাল আকৃতির গরুর ভিডিও, বিশেষ নামধারী ষাঁড়ের ছবি আর লাখ টাকার পশুর আলোচনায় টাইমলাইন ভরে যায়। অনলাইনভিত্তিক খামার ও ব্যবসায়ীরাও মূলত গরুকেন্দ্রিক প্রচারে জোর দেন, সেখানে ভেড়া প্রায় অনুপস্থিত। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছেও কোরবানির 'আকর্ষণীয়' পশু হিসেবে গরুর আলাদা অবস্থান তৈরি হয়েছে।

সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বাজার নেই


জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোরবানির বাজার এখন একটি বিশাল অর্থনৈতিক খাত; গরুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পরিবহন, অনলাইন বিপণন, ফিড ব্যবসা, অস্থায়ী হাট, ডিজিটাল প্রচারণা ও খামারভিত্তিক ব্র্যান্ডিং, কিন্তু ভেড়ার ক্ষেত্রে সেই সংগঠিত বাজারব্যবস্থা তৈরি হয়নি। খামারিরা বলছেন, ব্যাংক ঋণ, সরকারি সহায়তা, বাজার ব্যবস্থাপনা ও বিপণন সব জায়গাতেই ভেড়া খাত এখনো প্রান্তিক অবস্থায় আছে।

গবেষণাও একই বাধার কথা বলে। বিএলআরআইয়ের বিজ্ঞানী মো. রেজাউল হাই রাকিবসহ কয়েকজনের লেখা এবং 'জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল রিসার্চ'-এ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত পর্যালোচনায় বলা হয়, দেশে ভেড়া উৎপাদনের প্রধান বাধা হলো খাদ্য ও ঘাসের ঘাটতি ও উচ্চমূল্য, রোগের প্রকোপ, বাচ্চার মৃত্যু এবং দুর্বল বিপণনব্যবস্থা, সঙ্গে ছাগলের তুলনায় ভেড়ার মাংসের কম জনপ্রিয়তা। পর্যালোচনা অনুযায়ী, বেশির ভাগ খামারি ছোট আকারের হওয়ায় এবং বন্ধক দেওয়ার মতো সম্পদ না থাকায় সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাননি; বাজারের তথ্যের অভাব, কম দাম এবং মাংস ও পশমের সংগঠিত বাজার না থাকাও বড় সমস্যা।

রোগের দিক থেকে পর্যালোচনায় পিপিআর (পেস্টি দেস পেটিটস রুমিন্যান্টস) রোগকে ছোট জাবর কাটা প্রাণীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ বলা হয়েছে; দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভেড়ায় এর প্রকোপ ৯ দশমিক ১৭ থেকে ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ পাওয়া গেছে। দেশি ভেড়ার বাচ্চার মৃত্যুহার ১২ দশমিক ৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, আর মুক্তভাবে চরে বেড়ানো ভেড়ায় কৃমির সংক্রমণ বেশি পাওয়া গেছে। এসব রোগের চিকিৎসা ও টিকার জন্য খামারিদের উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ আছে।

সম্ভাবনার কথাও পর্যালোচনায় আছে। দেশি ভেড়া কম খাবারে চলে, কঠোর আবহাওয়া সহ্য করে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভালো, আর গবেষণায় দেশি ভেড়ার গড়ে একবারে ১ দশমিক ৯২টি বাচ্চা দেওয়ার হিসাব পাওয়া গেছে। দেশের কিছু এলাকায় ভেড়াকে 'গরিবের ব্যাংক' বলা হয়, কারণ প্রয়োজনে সহজে বিক্রি করে নগদ টাকা পাওয়া যায়। পর্যালোচনায় বলা হয়, তাপের চাপে ভেড়া অন্য জাবর কাটা প্রাণীর চেয়ে ভালো টিকে থাকে, যদিও ঘূর্ণিঝড়, খরা, ভারী বৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়া ভেড়া পালনের ঝুঁকিও বাড়ায়। দেশে বছরে প্রায় আড়াই হাজার মেট্রিক টন কাঁচা পশম হয়, যার বেশির ভাগ প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হয়।

জাগো নিউজের প্রতিবেদনেও বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়, কম খাবারে টিকে থাকা, খোলা পরিবেশে সহজে মানিয়ে নেওয়া আর তুলনামূলক কম রোগবালাইয়ের কারণে চরাঞ্চল ও উপকূলে ভেড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে; নদীভাঙন ও খরাপ্রবণ এলাকায় ক্ষুদ্র কৃষক ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য এটি হতে পারে টেকসই জীবিকার মাধ্যম। প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা সেখানে বলেন, সঠিকভাবে পালন ও প্রক্রিয়াজাত করা হলে ভেড়ার মাংসের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ যথেষ্ট ভালো, কিন্তু ভেড়া নিয়ে গবেষণা, বাজার উন্নয়ন, জাত উন্নয়ন ও বিপণনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি আছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ধর্মীয়ভাবে বৈধ ও অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী পশু হিসেবে ভেড়াকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা গেলে প্রান্তিক খামারিরা লাভবান হবেন এবং কোরবানির বাজারেও বৈচিত্র্য আসবে।

ফরিদপুরের একটি গ্রামে ভেড়ার পাল, ২০১৪। ছবি: Baized hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ফরিদপুরের একটি গ্রামে ভেড়ার পাল, ২০১৪। ছবি: Baized hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ছবি: A S M Jobaer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (২৭ মে ও ৩ মে ২০২৬), প্রথম আলো (২৪ মে ২০২৬, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ও ১০ ডিসেম্বর ২০২৩), দৈনিক ইত্তেফাক (১৯ মে ও ২৫ মে ২০২৬), বাসস (৭ মে ২০২৬), বিডিনিউজ২৪ ডটকম (২৫ মে ২০২৬), দৈনিক যুগান্তর (২০ মে ২০২৬), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা (২১ মে ২০২৬), বাংলা ট্রিবিউন (১৮ মে ২০২৬), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪), জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল রিসার্চ (ডিসেম্বর ২০২২), বাংলাপিডিয়া, সুন্নাহ ডটকম (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম), উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

সৌরপ্যানেলের নিচে ভেড়া চরালে বাড়ে মৌমাছি, তবে সংখ্যা রাখতে হবে কম

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরখামারে হেক্টরপ্রতি দুটি ভেড়া চরালে ঘাস কাটার তুলনায় উপকারী পোকা ৩৮ শতাংশ বাড়ে। খামারিদের জন্য ভেড়ার পাল পরিকল্পনার একটি সহায়ক টুলও তৈরি করেছেন গবেষকেরা।

Farms.com১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

প্রোটিনের চাহিদায় বদলে গেল কানাডার দুধের বাজার, মাখনের উদ্বৃত্ত শেষ

দুগ্ধজাত প্রোটিনের চাহিদা বাড়ায় পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার দুধের বাজারে মাখনচর্বির কাঠামোগত উদ্বৃত্ত মিটে গেছে, দুধের দাম নির্ধারণেও এসেছে পরিবর্তন।

Manitoba Co-operator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সিকি হেক্টরে ওটের বীজ চাষ, ইথিওপিয়ার এক কৃষকের পারিবারিক ব্যবসা

ইথিওপিয়ার এক ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে বীজের জন্য ওট চাষ করে প্রথম ফসল ৪৫ হাজার বির্রে বিক্রি করেন এবং পরের বছর চাষ বাড়ান। আইএলআরআইয়ের পশুখাদ্যের বীজকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ এটি।

ILRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)