সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরে ২০২৬ সালের ঈদুল আজহার আগে কোরবানির পশুর হাট জমে উঠেছিল। ২৬ মে, মঙ্গলবার জেলার বিভিন্ন হাট ঘুরে জাগো নিউজের শেরপুর প্রতিনিধি জানান, ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেনাবেচাও বাড়ছিল, তবে হাটে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল মাঝারি আকারের গরুর। একই সময়ে হাটে অনিয়ম, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও জাল টাকার ব্যবহার ঠেকাতে মাঠে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আর ভারতীয় গরুর প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছিল জেলা পুলিশ।
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ মে সন্ধ্যায় জানায়, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে, তাই বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে ২৮ মে, বৃহস্পতিবার। অর্থাৎ শেরপুরের হাটের এই চিত্র ঈদের মাত্র দুই দিন আগের।
হাটে প্রাণচাঞ্চল্য, তবে দাম নিয়ে দুই পক্ষের দুই কথা
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে জেলার পশুর হাটগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য বাড়ছিল। শুধু শেরপুরের খামার ও গৃহস্থের পশুই নয়, পাশের জামালপুর জেলার ইসলামপুর ও বকশীগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলা থেকেও প্রতিদিন পশু আসছিল এসব হাটে।
হাটে পর্যাপ্ত পশু থাকলেও ক্রেতাদের দাবি ছিল, দাম তুঙ্গে। সামর্থ্যের মধ্যে অনেকে পছন্দের পশু কিনে নিচ্ছিলেন, আবার কেউ কেউ বাড়তি দামের কারণে এক হাট থেকে আরেক হাটে ঘুরছিলেন। বিক্রেতাদের ভাষ্য ছিল উল্টো: হাট পুরোপুরি জমে উঠলেও ক্রেতারা তখনো বেশির ভাগ সময় শুধু দেখাদেখি আর দরদাম করছিলেন।
শেরপুরের নৌহাটা পৌর গরু, মহিষ ও ছাগলের হাটে পশু নিয়ে আসা বিক্রেতা ছাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, খুদি, কুড়া, ভুসি, খড় সবকিছুর দাম চড়া, আর ক্রেতারা গরুর যে দাম বলছেন তা একেবারেই হিসাবের বাইরে; লোকসান দিয়ে তো গরু বিক্রি করা যাবে না। অন্য বিক্রেতারাও একই কথা জানান। তাঁদের ভাষায়, এবার হিসাব মেলানো বড় কঠিন, এর মধ্যে ভারতীয় গরু ঢুকলে সর্বনাশ হবে। তাই সীমান্তে কড়া নজর রাখতে তাঁরা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান।
মাঝারি গরুর প্রতি ক্রেতাদের ঝোঁক সে বছর শুধু শেরপুরে দেখা যায়নি। ২০ মে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন (আইটিভি) জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলায় হাট জমে উঠছে এবং এবারও ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি; সীমান্ত জেলা চুয়াডাঙ্গার হাটে বড় গরুর চেয়ে মাঝারি গরুর চাহিদাই বেশি ছিল, আর বিক্রেতারা বলছিলেন, লালন-পালনের খরচ বাড়ায় লাভ তুলনামূলক কম।

গোখাদ্যের দাম আর খামারিদের হিসাব
বিক্রেতাদের অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল গোখাদ্যের দাম। জাগো নিউজের প্রতিবেদনের তিন দিন আগে, ২৩ মে, ঢাকা পোস্ট ও দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস শেরপুরের নৌহাটা পৌর গরু-মহিষের হাট, আব্দুস সামাদ গরু হাটি, নালিতাবাড়ী বাইপাস মোড় হাট ও ঝিনাইগাতী সদর বাজার হাট ঘুরে খামারিদের কথা তুলে ধরে। খামারিরা জানান, ভালো দামের আশায় তাঁরা সারা বছর গরু লালন-পালন করেছেন, কিন্তু তাঁদের ভাষায় এবার বাজারদর আগের তুলনায় কম।
ওই প্রতিবেদনগুলোতে খামারিরা জানান, ধানের কুড়া, খেসারি, ধান, ভুট্টা ও ভুসিমিশ্রিত দানাদার খাবারের দাম অনেক বেড়েছে। শেরপুরে কলার ব্যাপক আবাদ হওয়ায় কাঁচা ঘাস সহজে পাওয়া যায় না, খড়ের দামও চড়া। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ বিল ও চিকিৎসার খরচ যোগ হয়ে সব মিলিয়ে ব্যয় অনেক বেড়েছে বলে তাঁদের দাবি।
ঝিনাইগাতীর হাটে আসা কাংশা এলাকার এক খামারি দাম নিয়ে নির্দিষ্ট হিসাবও দেন। তাঁর কথায়, ভুসি তখন কেজিপ্রতি ৬৫ টাকা, কুড়ার বস্তা ১৫০০ টাকা আর খড়ের আঁটি সাড়ে সাত থেকে আট টাকা; এর সঙ্গে আছে শ্রমিকের খরচ, অথচ হাটে ক্রেতারা খুব কম দাম বলছেন। আরেক খামারি বলেন, খাবার থেকে পোশাক সবকিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তু গরুর ন্যায্য দাম চাইলেই আপত্তি ওঠে; ভারতীয় গরু এলে খামারিদের বড় ক্ষতি হবে।
গোখাদ্যের দাম বাড়ার অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালের মে মাসে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ গবাদিপশুর দানাদার খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং তখনো খামারিদের বাড়তি দামেই দানাদার খাদ্য খাওয়াতে হচ্ছিল; বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের খরচসহ আনুষঙ্গিক ব্যয়ও বেড়েছিল। ওই প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তখনকার মহাপরিচালক জানান, দানাদার খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক হওয়ায় অধিদপ্তর খামারিদের ঘাস খাওয়াতে উৎসাহ দিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের ১৫ মে আইটিভির আরেক প্রতিবেদনেও বলা হয়, পশুখাদ্যের দাম বাড়ায় সে বছর লাভ কম হওয়ার শঙ্কায় ছিলেন খামারিরা এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে সীমান্তপথে ভারত থেকে গরু আসা বন্ধে কঠোর নজরদারি চাইছিলেন তাঁরা।
শেরপুরের পাহাড়ি এলাকার খামারিদের একটি সুবিধার কথাও আগের প্রতিবেদনে এসেছে। ২০২৫ সালের ২৮ মে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানায়, জেলার সীমান্তঘেঁষা তিন উপজেলায় ক্ষেতের ঘাস ও পাহাড়ি লতাপাতা খাইয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে দেশি গরু বড় করা হয় এবং প্রতিবছরের মতো ক্রেতাদের মধ্যে এসব দেশি গরুর চাহিদা বেশি। আইটিভিও ২০২৬ সালের মে মাসে জানায়, শেরপুর সীমান্তের গারো পাহাড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে দেশি গরু পালন করা হচ্ছে এবং সেগুলোর ক্রেতাও আছে।
জেলায় চাহিদা ৬২ হাজার, জোগান প্রায় ৯৩ হাজার
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রধান ডা. রেজুয়ানুল হক ভুঁইয়া জাগো নিউজকে জানান, ২০২৬ সালে জেলায় ২০টি স্থায়ী হাট বসেছে এবং প্রতিটি হাটেই প্রাণিসম্পদ বিভাগের মেডিকেল টিম কাজ করছে। তাঁর হিসাবে জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ৬২ হাজার, আর জোগান রয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার পশু। অর্থাৎ বিভাগের হিসাবে জেলার নিজের চাহিদার চেয়ে প্রস্তুত পশু বেশি ছিল।
এর আগে, ১৫ মে আইটিভির প্রতিবেদনে একই কর্মকর্তা বলেন, খামারিরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সেই চেষ্টাই থাকবে প্রাণিসম্পদ বিভাগের। ওই প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, শেরপুরের তিন উপজেলায় সে বছর প্রায় ১৫ হাজার গরু প্রস্তুত করা হয়েছে, আর প্রাণিসম্পদ বিভাগ ক্রেতাদের দেশি গরুর ওপর আস্থা রাখার পরামর্শ দিচ্ছে।
আগের বছরের হিসাবও তুলনার জন্য কাজে আসে। বাসসের ২০২৫ সালের ২৮ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ তখন জানিয়েছিল, শেরপুরের পাঁচ উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩ হাজার ৭৬২ জন খামারি রয়েছেন। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহা উপলক্ষে জেলায় কোরবানির উপযোগী ১ লাখ ১১ হাজার পশু ছিল, বিপরীতে চাহিদা ছিল ৮৫ হাজার ৭৬৩টি; প্রতিবেদনের শুরুতে খামারিদের প্রস্তুত করা পশু ১ লাখ ১০ হাজার এবং স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ২৪ হাজার ৫২৩টি বলে উল্লেখ করা হয়। দুই বছরের সংখ্যা দুটি আলাদা সূত্রে দুই সময়ে দেওয়া, তাই এগুলো হুবহু তুলনীয় কি না, সূত্রগুলো তা বলেনি।
২০২৫ সালের ওই প্রতিবেদনে জেলার অতিরিক্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ঈদের আগে খামারিদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে ভেটেরিনারি সার্জনরা কাজ করছেন এবং কৃত্রিম উপায়ে কেউ যেন গরু মোটাতাজা না করেন, সেদিকে তাঁরা নজর রাখছেন।
দেশজুড়ে কোরবানির পশুর হিসাব ও সরকারের প্রস্তুতি
শেরপুরের চিত্রটি জাতীয় হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। ২০২৬ সালের ৩ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ঈদুল আজহার পশুর চাহিদা, সরবরাহ ও পরিবহন নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী জানান, সে বছর কোরবানির জন্য দেশে পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, বিপরীতে প্রাপ্যতা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এই হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে জানানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাবে কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ছিল:
- গরু ও মহিষ: ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি
- ছাগল ও ভেড়া: ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি
- অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী: ৫ হাজার ৬৫৫টি
একই ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে; এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি মিলিয়ে রাজধানীতে ২৭টি হাট, যেখানে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বন্ধে সরকার কঠোর থাকবে, হাট ও ক্রেতা-বিক্রেতার নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবে এবং প্রয়োজনে সাদা পোশাকেও নিরাপত্তা সদস্যরা কাজ করবেন বলে জানানো হয়। অনলাইনে পশু কেনায় কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না এবং চামড়া নষ্ট না হওয়ার জন্য পেশাদার ও অপেশাদার কসাইদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
আগের বছরগুলোর হিসাবেও প্রস্তুত পশু চাহিদার চেয়ে বেশি ছিল। প্রথম আলো ২০২৪ সালের ২২ মে জানায়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে সে বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি, যার সবই দেশীয় খামারিদের উৎপাদিত। তবে ওই প্রতিবেদনেই অধিদপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, উপজেলা পর্যায় থেকে পাঠানো তথ্য সব সময় সঠিক হয় না, কারণ অল্প জনবল দিয়ে এত বড় তথ্য সংগ্রহ করতে হয়।
দেশের প্রাণিসম্পদের আকারও এই প্রেক্ষাপট বোঝায়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২৫' অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫১.৭১ লাখ, মহিষ ১৫.৩২ লাখ, ছাগল ২৭২.৯১ লাখ এবং ভেড়া ৩৯.৮১ লাখ। একই প্রকাশনায় বলা হয়, স্থির মূল্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদের অবদান ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে এর অংশ ১৬.৫৪ শতাংশ; দেশের মোট কর্মসংস্থানের ২০ শতাংশ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ আংশিকভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ওই বছর মাংসের চাহিদা ছিল ৭৭.৯২ লাখ মেট্রিক টন, আর উৎপাদন ৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন।

সীমান্তে ভারতীয় গরু ঠেকাতে পুলিশ ও বিজিবি
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ভুঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, সীমান্তে গরুসহ অন্যান্য পণ্যের চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবির সঙ্গে জেলা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সমন্বয় করে কাজ করছেন। তাঁর ভাষায়, "সীমান্তে গরুর চোরাচালান শূন্য রাখা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বদ্ধপরিকর।"
বিষয়টি শেরপুরের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঢাকা পোস্টের ২৩ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলার নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা। আগের বছর, ২০২৫ সালের মে মাসে বাসসের প্রতিবেদনে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানিয়েছিলেন, ভারতীয় গরু যেন শেরপুরের কোনো সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ঢুকতে না পারে, সে জন্য সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং হাটে জাল টাকা ঠেকাতে সাদা পোশাকে পুলিশ নজর রাখবে।
জাতীয় পর্যায়েও সীমান্তের হাট নিয়ে সিদ্ধান্ত ছিল। ৩ মের ব্রিফিংয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী জানান, দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সে বছর সীমান্তবর্তী পশুর হাট বন্ধের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, অতীতে সীমান্তঘেঁষা কিছু হাটের মাধ্যমে বিদেশি পশু প্রবেশ করায় দেশীয় খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তাই সীমান্ত এলাকায় হাট না বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের কোরবানির বাজার একসময় ভারতীয় গরুর ওপর অনেকটা নির্ভরশীল ছিল। ২০১৯ সালের আগস্টে ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তখনকার পরিচালক (উৎপাদন) বলেন, ২০১৪ সালে ভারত গরু রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর কোরবানির সময় গরু বিক্রি করে দেশের খামারিরা বড় লাভ করেন, যা তাঁদের বড় পরিসরে এই ব্যবসায় নামতে উৎসাহ দেয়। ওই প্রতিবেদনে বিজিবির তথ্যের বরাতে বলা হয়, ২০১৩ সালে প্রায় ২৩ লাখ গরু বাংলাদেশে ঢুকেছিল, আর ২০১৯ সালে মে মাস পর্যন্ত করিডর দিয়ে ঢোকে মাত্র ৭৫ হাজার ৬৯৬টি। তখন থেকেই দেশীয় খামারিরা কোরবানির চাহিদার বড় অংশ মেটাচ্ছেন, আর সীমান্ত দিয়ে গরু ঢোকার আশঙ্কা তাঁদের কাছে লোকসানের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেয়।

জাল টাকা ঠেকাতে হাটে ব্যাংকের বুথ
কোরবানির হাটে বিপুল নগদ লেনদেন হয় বলে জাল নোটের ঝুঁকিও বাড়ে। বাংলা ট্রিবিউন ১১ মে জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ মে এক সার্কুলারে দেশের পশুর হাটগুলোতে জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ বসানোর নির্দেশ দেয়। প্রতিটি ব্যাংককে একজন সমন্বয়কারী কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে তাঁর তথ্য ১৭ মের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাতে বলা হয়।
সার্কুলারে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত হাটে কোন ব্যাংক দায়িত্ব পালন করবে, তা ঠিক করে দেওয়া হয়; ঢাকার বাইরের হাটের দায়িত্ব ঠিক করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অফিস, আর যেসব জেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা নেই, সেখানে বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার কথা বলা হয়। স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে বুথ চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয় এবং জাল নোট শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
শেরপুরের নৌহাটা হাটে এ ধরনের ব্যবস্থা আগেও দেখা গেছে। ২০১৯ সালের আগস্টে বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে হাটের ইজারাদার জানিয়েছিলেন, ক্রেতা-বিক্রেতার নিরাপত্তায় হাটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল আছে এবং জাল টাকা শনাক্তের মেশিন ও ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু আছে।
শেরপুর জেলা ও যেসব এলাকা থেকে পশু আসে
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের অধীনে থাকা শেরপুর জেলার আয়তন ১৩৬৪.৬৭ বর্গকিলোমিটার। জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে ময়মনসিংহ ও জামালপুর জেলা, পূর্বে ময়মনসিংহ এবং পশ্চিমে জামালপুর জেলা। শেরপুর পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৬৯ সালে এবং শেরপুর মহকুমা জেলায় উন্নীত হয় ১৯৮৪ সালে। জেলার পাঁচ উপজেলার মধ্যে শেরপুর সদর সবচেয়ে বড় (৩৫৬.১২ বর্গকিলোমিটার) এবং নকলা সবচেয়ে ছোট (১৭৪.৮০ বর্গকিলোমিটার)।
২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য উদ্ধৃত করে বাংলাপিডিয়া জানায়, তখন জেলার জনসংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৫৮ হাজার ৩২৫ জন, আর জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি (৬৫.৭১ শতাংশ)। জেলার প্রধান নদীর মধ্যে আছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ্বরী, চিলাখালী, ভোগাই, কংস ও দিগনা। শেরপুর সদর উপজেলার প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, ডাল, সরিষা, আলু ও শাকসবজি।
সীমান্তের তিন উপজেলা নিয়ে বাংলাপিডিয়ার তথ্য হলো, নালিতাবাড়ী (৩২৭.৬০ বর্গকিলোমিটার), ঝিনাইগাতী (২৪২.০৭ বর্গকিলোমিটার) ও শ্রীবরদী (২৪৮.২৫ বর্গকিলোমিটার), তিনটিরই উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। নালিতাবাড়ীতে গারো, হাজং, হদি, মান্দাই ও কোচ জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে; এই উপজেলায় মধুটিলা ইকোপার্ক ও ভোগাই নদীর রাবার ড্যাম, আর ঝিনাইগাতীতে গজনী অবকাশ কেন্দ্র অবস্থিত।
যেসব এলাকা থেকে শেরপুরের হাটে পশু আসছিল, সেগুলোও জেলার লাগোয়া। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার উত্তরে মেঘালয় রাজ্য এবং পূর্বে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা, আর উপজেলার উত্তর-পূর্ব অংশে গারো পাহাড়। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার পূর্ব দিকে শেরপুর সদর ও শ্রীবরদী উপজেলা। ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার পশ্চিমে শেরপুরের নকলা উপজেলা; শেরপুর-নকলা-ফুলপুর-ময়মনসিংহ সড়ক (আর ৩৭১) দুই জেলাকে যুক্ত করেছে।

শেরপুরের হাটে আগের বছরগুলোর চিত্র
শেরপুরের হাটে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি থাকার কথা আগেও এসেছে। ২০১৯ সালের ১১ আগস্ট বাংলা ট্রিবিউন জানায়, শহরের সবচেয়ে বড় গরুর হাট নৌহাটা ও কুসুমহাটিতে ঈদের এক দিন আগে ক্রেতা-বিক্রেতার উপচে পড়া ভিড় ছিল। শ্রীবরদীর এক পাইকার তখন বলেছিলেন, মাঝারি ও ছোট গরুর চাহিদা বেশি। ক্রেতা-বিক্রেতাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, লাল রঙের গরু এবং শেরপুরের পাহাড়ি জনপদের খামারিদের গরুর প্রতি ক্রেতাদের আলাদা আগ্রহ ছিল। অনেক ক্রেতা জানিয়েছিলেন, বেশির ভাগ ক্রেতা ৩৫ থেকে ৬০ হাজার টাকায় গরু কিনতে চান, কিন্তু সে তুলনায় দাম কিছুটা বেশি।
একই প্রতিবেদনে ঝিনাইগাতীর এক বিক্রেতা বলেছিলেন, কেজি দরে মাংসের হিসাবে কোরবানির পশু বিক্রি করা যায় না, প্রতিটি গরুর পেছনে তাঁদের অনেক খরচ; তবে হাটে বড় গরুর তুলনায় ছোট গরুর দাম বেশি।
২০২৬ সালের মৌসুমে জেলায় বড় গরুও আলোচনায় এসেছিল। ১৭ মে প্রথম আলো জানায়, নালিতাবাড়ী উপজেলার কাপাশিয়া পশ্চিমপাড়া এলাকার একটি খামারে 'বাংলার ডন' নামের প্রায় ৩৩ মণ ওজনের একটি সাদা-কালো ষাঁড় দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছিলেন মানুষ। খামার কর্তৃপক্ষের হিসাবে ষাঁড়টির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ ফুট, উচ্চতা ছয় ফুট দুই ইঞ্চি; প্রতিদিন লাগে প্রায় ৪০ কেজি ঘাস ও ১৫ কেজি খৈলসহ নানা ধরনের ভুসি। খামারের ব্যবস্থাপক জানান, ওজন অনুযায়ী প্রতি কেজি এক হাজার টাকা ধরে গরুটির দাম ১৩ লাখ টাকার বেশি ধরা হচ্ছে। খামারটিতে কোরবানির জন্য ৭০টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছিল, যার ৬৬টি অনলাইনে ঢাকার বাজারে বিক্রি হয়ে গেছে বলে খামারের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন জানান।
ওই প্রতিবেদনে নালিতাবাড়ী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, মানুষ এখন নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মোটাতাজা করা পশুর প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে খামারিকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বড় গরুর এমন আলোচনার মধ্যেও ২৬ মের হাটে ক্রেতাদের বড় অংশের আগ্রহ ছিল মাঝারি আকারের গরুর দিকে।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা পোস্ট, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস, আইটিভি, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, বাংলা ট্রিবিউন, সমকাল, প্রথম আলো, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ঢাকা ট্রিবিউন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাপিডিয়া




মন্তব্য
(০)