২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে সিরাজগঞ্জে দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ ছেয়ে গিয়েছিল সরিষার হলুদ ফুলে; পৌষের কনকনে হিমেল বাতাসে দোল খাচ্ছিল সেই ফুল। এই ফুল থেকে ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৪০৪ টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল জেলা কৃষি বিভাগ। জাগো নিউজের সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এ খবর জানান। লক্ষ্য পূরণে জেলার ৯টি উপজেলায় সরিষাখেতের পাশে পাঁচ শতাধিক চাষি তাঁদের খামারের মৌবাক্স বসিয়েছিলেন। মধু সংগ্রহের সময় মৌমাছির পরাগায়নে সরিষার ফলনও বাড়বে বলে আশা করেছিল কৃষি বিভাগ।
জেলা কৃষি বিভাগ জানায়, সেই মৌসুমে জেলায় ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছিল, আর এই আবাদ থেকেই ৪০৪ টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। মৌচাষিরা প্রতিবেদককে বলেন, মধু উৎপাদন অব্যাহত রাখতে ও মৌমাছি বাঁচাতে সরিষা ফুলে অযাচিত কীটনাশক ব্যবহার বন্ধে কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তাড়াশ ও উল্লাপাড়া: মাঠের পাশে হাজার হাজার মৌবাক্স
চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, সেবার এ উপজেলায় ১০ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছিল এবং হলুদ ফুলে ছেয়ে গিয়েছিল পুরো মাঠ। মধু সংগ্রহের জন্য প্রায় ৫ হাজার মৌবাক্স বসানো হয়েছিল, আরও বাক্স বসানোর প্রস্তুতি চলছিল বলে জানান তিনি।
উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্না ইয়াসমিন সুমী বলেন, সে বছর এ উপজেলায় ২৪ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছিল। এই সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহে স্থানীয় মৌচাষি ছাড়াও অন্য জায়গা থেকে অনেকে এসেছিলেন বলে জানান তিনি।
উপজেলা দুটি জেলার পশ্চিম অংশে পাশাপাশি অবস্থিত। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া উল্লাপাড়ার প্রধান ফসল এবং প্রধান রপ্তানিপণ্যের তালিকায় সরিষার নাম রেখেছে, সঙ্গে পাট, তিল, পেঁয়াজ, মরিচ ও সবজি। উল্লাপাড়ার আয়তন ৪০৯.০৬ বর্গকিলোমিটার; এর উত্তরে রায়গঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণে শাহজাদপুর, পূর্বে কামারখন্দ ও বেলকুচি এবং পশ্চিমে ভাঙ্গুড়া ও তাড়াশ। এখানকার নদীর মধ্যে আছে করতোয়া, আর পরিচিত হাটের মধ্যে উল্লাপাড়া হাট, সলঙ্গা হাট, গয়হাট্টা হাট ও মোহনপুর হাট। জ্ঞানকোষে উদ্ধৃত আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী উল্লাপাড়ার ৫৯.০৩ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
তাড়াশের আয়তন ৩০০.০৭ বর্গকিলোমিটার। একই আদমশুমারির তথ্যে এ উপজেলার ৮৪.৭৫ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যেখানে পুরো সিরাজগঞ্জ জেলায় এ হার ৫১.১৪ শতাংশ। বাংলাপিডিয়ায় তাড়াশে ২২টি হাটবাজারের কথা আছে, যার মধ্যে তাড়াশ হাট, বারুহাস হাট ও গুলটা বাজার উল্লেখযোগ্য। জ্ঞানকোষ আরও জানায়, পুরো চলনবিলের আয়তনের প্রায় ১০ শতাংশ এই উপজেলার মধ্যে পড়ে।
জেলার কৃষি কর্মকর্তারা যা বলেছিলেন
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মোহাম্মদ রেজাউল হক দুই ফসলের যোগসূত্রটি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, মধু সংগ্রহের সময় মৌমাছি ফুলে ফুলে উড়ে পরাগায়ন ঘটায়, এতে শস্যের উৎপাদন ১৫ শতাংশ বাড়ে; ফলে মৌচাষি ও কৃষক উভয়ই লাভবান হন। উৎপাদিত মধু মাঠ থেকেই দেশের বড় বড় কোম্পানি কিনে বাজারজাত করে, আর প্রতি কেজি মধু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল বলে জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক একেএম মঞ্জুরে মওলা বলেন, সেবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে সরিষা চাষ হয়েছিল, আর কৃষকেরা উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করায় ভালো ফলনের আশা করা হচ্ছিল। একই সঙ্গে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে মৌচাষিরা যেন স্থানীয়ভাবে কোনো সমস্যায় না পড়েন, সে জন্য উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছিলেন তাঁরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ; প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এর কার্যালয় আছে। বাংলাপিডিয়ার মৌমাছি পালন বিষয়ক ভুক্তি জানায়, ডিএই সময় সময় উপজেলা পর্যায়ে মৌচাষের প্রশিক্ষণ দেয়; এসব কর্মসূচিতে মৌমাছি ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণার্থীদের মৌবাক্সও দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা লাভজনকভাবে মধু উৎপাদন করতে পারেন।
সিরাজগঞ্জ ও চলনবিল
রাজশাহী বিভাগের সিরাজগঞ্জ জেলার আয়তন ২ হাজার ৪০২.০৫ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে বগুড়া জেলা, দক্ষিণে পাবনা ও মানিকগঞ্জ, পূর্বে টাঙ্গাইল ও জামালপুর এবং পশ্চিমে পাবনা, নাটোর ও বগুড়া। প্রধান নদী যমুনা, ইছামতি, বড়াল ও হুড়াসাগর। ১৮৮৫ সালে পাবনা জেলার অধীনে সিরাজগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে এটি জেলা হয়; জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে উল্লাপাড়া সবচেয়ে বড়, কামারখন্দ সবচেয়ে ছোট। বাংলাপিডিয়ার সরিষা বিষয়ক ভুক্তিতে তুলনামূলক বেশি সরিষা আবাদের জেলা হিসেবে সিরাজগঞ্জের নাম আছে, সঙ্গে চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, টাঙ্গাইল, যশোর, বগুড়া ও পাবনা।

মূল প্রতিবেদনে তাড়াশের পরিচয়ে যে চলনবিলের কথা এসেছে, সেটি একটি বড় জলাভূমি। বাংলাপিডিয়া একে বর্ণনা করেছে খাল দিয়ে পরস্পর যুক্ত কতগুলো নিচু জমির সমষ্টি হিসেবে, যা বর্ষায় মোটামুটি একটানা জলরাশিতে পরিণত হয়। বিলটি রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর এই চার জেলায় বিস্তৃত; এর বড় অংশ সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলা ও পাবনার চাটমোহর উপজেলায়। ১৯০৯ সালে গণপূর্ত বিভাগের এক জরিপে দেখা যায়, সৃষ্টির সময় প্রায় ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটারের বিলটি সংকুচিত হয়ে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছিল; বাকি অংশ চাষাবাদ বা বসতির জন্য উদ্ধার করা হয়েছিল।
শুষ্ক মৌসুমে বিলের বেশির ভাগ অংশ শুকিয়ে যায়, থাকে কেবল অগভীর একটি কেন্দ্রভাগ। জ্ঞানকোষ জানায়, সেই কেন্দ্রের চারপাশের দুটি বলয় ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে পুরোপুরি শুকিয়ে যায়, আর শুষ্ক মৌসুমে প্রান্তের জমিতে বোরো ও উচ্চফলনশীল ধানের চাষ হয়। বিলের জমি এখনো উদ্ধার হচ্ছে এবং পাশে নতুন নতুন গ্রাম গড়ে উঠছে।
আগের মৌসুমগুলো: ৩০০ টন থেকে ৪০০ টন
সিরাজগঞ্জের সরিষা মৌসুমে মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কয়েক বছর ধরেই ঠিক করা হচ্ছে, আর আগের প্রতিবেদনগুলো দেখায় কীভাবে আবাদ ও লক্ষ্যমাত্রা দুটিই বেড়েছে। ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক জানায়, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে সিরাজগঞ্জ সদর, কামারখন্দ, চৌহালী, বেলকুচি, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, কাজীপুর, রায়গঞ্জ ও তাড়াশ এই ৯ উপজেলায় ৫৪ হাজার ৬৫৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল, এবং ২০২২ সালের ১৭ জানুয়ারি সোমবার পর্যন্ত এসব খেত থেকে মৌচাষিরা ২৮৮ টন মধু সংগ্রহ করেছিলেন। নাটোর ও পাবনার অংশসহ বৃহত্তর চলনবিল এলাকায় সেই মৌসুমে সংগৃহীত মধুর পরিমাণ পত্রিকাটি জানায় ৩৬৯ টন। সাতক্ষীরা থেকে আসা মৌচাষিরা পত্রিকাটিকে বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে ছিল এবং খেত থেকেই প্রতি কেজি মধু ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয় পত্রিকাটিকে জানায়, মধু উৎপাদনের মাধ্যমে আয় বাড়ানো ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে তারা ১৮ হাজার মৌচাষিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
পরের মৌসুমে, ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর, একই পত্রিকা জানায় মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল ৩০০ টন; সরিষা চাষ হয়েছিল ৬১ হাজার ৩৫০ হেক্টরে এবং তিন শতাধিক চাষি এর মধ্যেই খেতের পাশে মৌবাক্স বসিয়েছিলেন। তখন প্রতি কেজি মধু বিক্রি হচ্ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেছিলেন, তিন বছরে জেলায় তেল উৎপাদন ৪০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাঁরা সরিষা চাষে জোর দিয়েছেন। উল্লাপাড়ার কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ হেক্টর বেশি জমিতে সরিষা আবাদ হচ্ছে এবং প্রণোদনা হিসেবে বহু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল সরিষার বীজ ও রাসায়নিক সার দেওয়া হয়েছে। জেলার মৌচাষি সমিতির একজন সাবেক সভাপতি তখন অভিযোগ করেছিলেন, আগের মৌসুমে বেশি ফলনের আশায় কৃষকেরা সরিষা ফুলে হরমোনজাতীয় কীটনাশক ছিটিয়েছিলেন, এতে অনেক মৌমাছি মারা যায় এবং অনেক মৌচাষি লোকসানে পড়েন; এমন স্প্রে বন্ধে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারের বাংলা সংস্করণ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের বরাতে জানায়, সেই মৌসুমে সিরাজগঞ্জে সরিষার আবাদ আগের বছরের ৮৫ হাজার ১৭০ হেক্টর থেকে বেড়ে ৮৭ হাজার ১২৫ হেক্টর হয়েছিল, আর প্রায় ৪০০ টন মধু পাওয়ার আশা করা হচ্ছিল; আগের মৌসুমে পাওয়া গিয়েছিল ৩৮২ টনের একটু বেশি। তিনি বলেছিলেন, উচ্চফলনশীল জাত বারি সরিষা-১৪ কৃষকদের সবচেয়ে পছন্দের, কারণ এখানকার মাটিতে এই জাত ভালো হয়। জেলার একজন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, পরাগায়নের সুফল সত্ত্বেও অনেক কৃষক এখনো মৌমাছিকে ফসলের জন্য হুমকি মনে করেন, অথচ মৌমাছির পরাগায়নে ফলন ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
এসব আগের হিসাবের পাশে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে মৌসুমটির চিত্র ছিল ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর সরিষা ও ৪০৪ টন মধুর লক্ষ্যমাত্রা; উপপরিচালকের ভাষ্যে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
মৌমাছি কীভাবে সরিষার ফলন বাড়ায়
কর্মকর্তারা যে ১৫ শতাংশের কথা বলেছেন, বাংলাদেশের মাঠ গবেষণার ফলও তার কাছাকাছি। টাঙ্গাইলের নাগরপুরে ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চালানো এক গবেষণায়, যা জার্নাল অব বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন অ্যান্ড বায়োরিসোর্স ম্যানেজমেন্টে প্রকাশিত, গবেষকেরা টরি-৭ জাতের সরিষা তিনভাবে চাষ করেন: খোলা প্লট, ভেতরে মৌমাছিসহ জালে ঘেরা প্লট এবং মৌমাছি ছাড়া জালে ঘেরা প্লট। তাঁরা দেখেন, ফুল ফোটার মৌসুমে প্রধান পরাগায়নকারী পতঙ্গ ছিল মৌমাছি এপিস মেলিফেরা। মৌমাছির কারণে গাছপ্রতি শুঁটির সংখ্যা ১৪ শতাংশ এবং শুঁটিপ্রতি বীজের সংখ্যা ১১ শতাংশ বাড়ে; মৌমাছিসহ জালে ঘেরা প্লটে গাছপ্রতি গড় বীজের ফলন ১৫ শতাংশ বেশি হয়, যদিও ফুল ফোটার সময়কাল ৬ দিন কমে যায়।

একই শীতে ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খামারে আরেকটি পরীক্ষা চালানো হয়, যা ২০১৮ সালে জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল রিসার্চে প্রকাশিত হয়। এতে ব্যবহার করা হয় বারি সরিষা-৮ জাত। মাঠে পরাগায়নকারী হাইমেনোপটেরা বর্গের পতঙ্গের মধ্যে মৌমাছিই ছিল সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। ভেতরে মৌবাক্সসহ জালে ঘেরা প্লটে বীজের ফলন হয় সবচেয়ে বেশি, হেক্টরে ২.৪৫ টন; আর মৌমাছি ছাড়া জালে ঘেরা প্লটে সবচেয়ে কম, হেক্টরে ১.৬৭ টন। হাজার বীজের ওজনও মৌমাছিসহ প্লটে সর্বোচ্চ ৩.৫০ গ্রাম এবং মৌমাছি ছাড়া প্লটে সর্বনিম্ন ২.৬৮ গ্রাম হয়। গবেষকদের উপসংহার ছিল, ফুল ফোটা সরিষাখেতে মৌমাছির কলোনি রাখলে তা ফলন বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৯ সালের ২০ মে বিশ্ব মৌমাছি দিবসে বৃহত্তর চিত্রটি তুলে ধরে। সংস্থাটি জানায়, মৌমাছি এবং পাখি ও বাদুড়ের মতো অন্যান্য পরাগায়নকারী বিশ্বের ফসল উৎপাদনের ৩৫ শতাংশকে প্রভাবিত করে, বিশ্বের প্রধান ৮৭টি খাদ্যফসলের উৎপাদন বাড়ায়; আর বিশ্বকে খাওয়ানো ফসলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সুস্থ ফল ও বীজ উৎপাদনের জন্য পতঙ্গ বা অন্য প্রাণীর পরাগায়নের ওপর নির্ভর করে। এফএও সতর্ক করে, বিশ্বের অনেক অঞ্চলে মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী কমে যাচ্ছে, যার প্রধান কারণ নিবিড় চাষপদ্ধতি, একফসলি চাষ, কৃষি রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উচ্চ তাপমাত্রা।
সরিষা ফুলে কীটনাশক
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে মৌচাষিরা সরিষা ফুলে অযাচিত কীটনাশক বন্ধের যে দাবি জানান, তা সিরাজগঞ্জে আগের মৌসুমেও উঠেছিল; ২০২২ সালে মৌচাষি সমিতির নেতার মৌমাছি মৃত্যুর অভিযোগ তার উদাহরণ। কখন স্প্রে করা হচ্ছে, সেটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, গবেষণা তা ব্যাখ্যা করে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন সাময়িকীতে প্রকাশিত ফরাসি মৌমাছি বিজ্ঞানীদের এক পর্যালোচনা খতিয়ে দেখে, ফুল ফোটা ফসলে স্প্রে করার আগে কৃষক কীভাবে বুঝবেন যে সেখানে মৌমাছি নেই। পর্যালোচনার উপসংহার, সাধারণত যে মানদণ্ডগুলো ধরা হয়, যেমন বাতাসের তাপমাত্রা, ফসলটি মৌমাছির কাছে কতটা আকর্ষণীয় বা খেতের কিনারা থেকে দূরত্ব, সেগুলো দিয়ে খাদ্য সংগ্রহে বের হওয়া মৌমাছির সংস্পর্শ এড়ানো নিশ্চিত করা যায় না; অনিচ্ছাকৃত বিষক্রিয়া এড়াতে রাতে স্প্রে করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
একই পর্যালোচনা জানায়, ইউরোপে কীটনাশকের টেকসই ব্যবহার সংক্রান্ত বিধিতে ফসলে ফুল ফোটার সময় বা মৌমাছির খাদ্য সংগ্রহের সময় স্প্রে না করার কথা বলা আছে। পর্যালোচনাটি এ-ও সতর্ক করে যে রাতে স্প্রে করলেও ফুলের রস ও পরাগরেণু দূষিত হওয়া ঠেকানো যায় না; মৌমাছি সেগুলো চাকে বয়ে নিয়ে গেলে ঝুঁকি থেকেই যায় এবং মৌচাকের পণ্যের মান কমতে পারে। তা ছাড়া প্রায় ৮০ শতাংশ প্রজাতির মৌমাছি মাটিতে বাসা বাঁধে, রাতের স্প্রেতেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সিরাজগঞ্জে মূল প্রতিবেদনে উপপরিচালক জানিয়েছিলেন, মৌচাষিরা যেন স্থানীয়ভাবে সমস্যায় না পড়েন, সে জন্য ডিএই উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। ফুল ফোটা অবস্থায় সরিষায় কীটনাশক লাগবে বলে মনে হলে কৃষকের উচিত উপজেলা কৃষি অফিসের কাছ থেকে জেনে নেওয়া কোন ওষুধ, কী মাত্রায় এবং দিনের কোন সময়ে প্রয়োগ করতে হবে।
মৌবাক্স, মৌমাছির প্রজাতি ও প্রশিক্ষণ
সরিষা ফুলের বাণিজ্যিক মধু আসে কাঠের মৌবাক্সে পালিত মৌমাছি থেকে, যে বাক্স এক খেত থেকে আরেক খেতে নেওয়া হয়। বাংলাপিডিয়ার মৌমাছি পালন বিষয়ক ভুক্তি ব্যাখ্যা করে, এমন বাক্সে কয়েকটি খোলা যায় এমন ফ্রেম প্রায় ১ সেন্টিমিটার ফাঁক রেখে বসানো থাকে; এই ফাঁক বা "বি স্পেস" দিয়ে মৌমাছি চলাচল করে, কিন্তু দুই তলের মধ্যে মোমের সেতু গড়ে না। খোলা যায় এমন ফ্রেমের কারণে চাষি কলোনি পরীক্ষা করতে পারেন এবং চাক নষ্ট না করেই মধু তুলতে পারেন। চাক মধুতে ভরে মুখ বন্ধ হয়ে গেলে ফ্রেম তুলে মৌমাছি সরানো হয়, ধারালো ছুরি দিয়ে মোমের পাতলা আবরণ চেঁছে ফেলা হয়, তারপর ফ্রেমগুলো মধু নিষ্কাশন যন্ত্রে দ্রুতগতিতে ঘোরানো হয়, যাতে কেন্দ্রাতিগ বলে মধু বেরিয়ে আসে। খালি চাক আবার বাক্সে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, মৌমাছি তা আবার ভরে তোলে।

জ্ঞানকোষটি জানায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত মধু সরিষা ফুলের মধু, আর কিছু সফল মৌচাষি যেসব এলাকায় মধুদায়ী গাছপালা বেশি, সেখানে চলে যান; ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে উল্লাপাড়ায় অন্য জেলা থেকে আসা মৌচাষিরাও তেমনটিই করেছিলেন। বাংলাপিডিয়ার ভাষ্যে, বাণিজ্যিক দিক থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌমাছি এপিস সেরানা ইন্ডিকা; আর বুনো বড় মৌমাছি এপিস ডরসাটা বন, বসতবাড়ির আশপাশের বড় গাছ, এমনকি দালানের কার্নিশেও খোলা চাক বাঁধে, এবং পেশাদার মৌয়ালরা, বিশেষ করে সুন্দরবন ও মধুপুরে, মধুর জন্য এই চাক সংগ্রহ করেন। ২০১৬-১৭ সালের টাঙ্গাইলের সরিষা গবেষণায় সরিষাখেতের প্রধান পরাগায়নকারী ছিল পশ্চিমা মৌমাছি এপিস মেলিফেরা।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে মৌচাষের প্রশিক্ষণ দেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব এপিকালচার; বিসিক ও এপিকালচার ইনস্টিটিউট শীতকালে প্রধান সরিষা উৎপাদন এলাকায় পরাগায়ন ও মধু উৎপাদন দুই উদ্দেশ্যেই হাতে-কলমে ভ্রাম্যমাণ মৌচাষের আয়োজন করে। ভুক্তিতে ব্যবস্থাপনার কয়েকটি সমস্যার কথাও আছে: গাদাগাদি ও অতিরিক্ত গরম বাক্সে মৌমাছি দল ছেড়ে চলে যেতে চায়, যা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, বাক্সে বাড়তি জায়গা ও নতুন রানি দিয়ে ঠেকানো যায়; আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান ফাউলব্রুড বাংলাদেশে মৌমাছির গুরুতর রোগ; আর পিঁপড়া, মোম-মথ, পাখি ও ইঁদুর চাকের ক্ষতি করে। অসুস্থ কলোনির বিষয়ে পরামর্শের জন্য মৌচাষিরা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায় মধু হলো মিষ্টি, ঘন তরল, যা মৌমাছি ফুলের রস থেকে তৈরি করে খাবার হিসেবে চাকে জমিয়ে রাখে। মধুর রং, স্বাদ ও গন্ধ নির্ভর করে মৌমাছি কোন ফুলের রস সংগ্রহ করেছে তার ওপর; এর প্রধান উপাদান ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ নামের শর্করা। সুন্দরবনের মধুর পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ একফুলের মধুর তালিকায় জ্ঞানকোষটি সরিষার মধুর নাম রেখেছে, সঙ্গে আম ও কুলের মধু।
জাতীয় চিত্রে সরিষা ও মধু
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জাতীয় পর্যায়েও মধু সংগ্রহের পরিকল্পনা করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টারের বাংলা সংস্করণে প্রকাশিত কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৬ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, এর মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার ১৭১ হেক্টরে মধু সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সেই মৌসুমে ৯৩ হাজার ৪৭৮টি মৌবাক্স বসানো হয়েছিল, আর বিশেষজ্ঞরা আশা করছিলেন এ থেকে ১৫ লাখ কেজি মধু পাওয়া যেতে পারে। একই প্রতিবেদন কয়েকটি প্রতিবেদন ও কৃষি জরিপের বরাতে জানায়, দেশে বছরে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টন মধু উৎপাদিত হয় এবং ব্যবহার হয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন; মাথাপিছু বছরে প্রায় ১০০ গ্রাম। সরাসরি মধু উৎপাদনে যুক্ত কৃষক ও মৌচাষির আনুমানিক সংখ্যা ১০ থেকে ২০ হাজার, আর সরবরাহের পুরো শৃঙ্খলে যুক্তদের ধরলে তা প্রায় ৯০ হাজার।
সরিষার গুরুত্ব কেবল মধুতে নয়। বাংলাপিডিয়া মনে করিয়ে দেয়, মাত্র কয়েক দশক আগেও সরিষার তেলই ছিল বাংলাদেশে রান্নার একমাত্র তেল, যা ঘানি নামের প্রথাগত কলে, প্রায়ই গরু দিয়ে ঘুরিয়ে, বীজ পিষে বের করা হতো। জ্ঞানকোষটি জানায়, দেশে উৎপাদিত সরিষার তেল রান্নার তেলের চাহিদার সামান্য অংশ মেটায়, তাই বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল আমদানি করতে হয়। সরিষা রবি বা শীতকালীন ফসল, প্রায় সব জেলাতেই এর চাষ হয়।
আমন ধান কাটার পর থেকে বোরো রোপণের আগ পর্যন্ত যে জমি পতিত থাকত, সেখানে সরিষা আনার বিষয়েও গবেষণা হয়েছে। কুষ্টিয়ায় ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৫-১৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মাঠ পরীক্ষায়, যা ২০১৯ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চে প্রকাশিত, বারি সরিষা-১৪ দিয়ে সরিষা-বোরো-আমন শস্যবিন্যাসে বছরে হেক্টরপ্রতি ধানসমতুল্য ফলন হয় ১৩.৯৮ টন, যা প্রচলিত পতিত-বোরো-আমন বিন্যাসের ১০.৪৭ টনের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। রংপুরের পীরগঞ্জ ও নীলফামারীর ডোমারে ২০১৫-১৭ সালে চালানো এবং প্রোগ্রেসিভ অ্যাগ্রিকালচার সাময়িকীতে প্রকাশিত একই ধরনের পরীক্ষায় পতিত সময়ে বারি সরিষা-১৪ যুক্ত করে সরিষাসহ বিন্যাসে বেশি ফলন ও বেশি মোট আয় পাওয়া যায়।
ছবি: Hopeoflight / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য ডেইলি স্টার (বাংলা), বাংলাপিডিয়া, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), জার্নাল অব বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন অ্যান্ড বায়োরিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল রিসার্চ, ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন, বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ, প্রোগ্রেসিভ অ্যাগ্রিকালচার




মন্তব্য
(০)