২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল বিভাগ ঘরে রান্নার উপযোগী একটি রেসিপি প্রকাশ করে: শোল মাছের দোপেঁয়াজা। বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ আর বাংলাদেশের রান্নাঘরের চেনা মসলায় রাঁধা এই পদ খাওয়া হয় ভাতের সঙ্গে। রেসিপিটি আধা কেজি শোল মাছের টুকরা আর এক কাপ মোটা করে কাটা পেঁয়াজের হিসাবে লেখা। প্রতিবেদনে বলা হয়, শোল মাছের স্বাদে আলাদা এক গভীরতা আছে। রান্নার পদ্ধতিও সহজ: প্রথমে মাছ মসলা মাখিয়ে ভেজে নেওয়া হয়, তারপর বাকি তেলে পেঁয়াজ ও মসলা কষানো হয়, শেষে ভাজা মাছ সেই ঘন মসলায় অল্প পানি দিয়ে রান্না করে নামানো হয়।
নিচে রেসিপির উপকরণ ও ধাপগুলো দেওয়া হলো ঠিক যেভাবে মূল রেসিপিতে আছে। তার পরে আছে পদটির নামের অর্থ, এতে ব্যবহৃত পেঁয়াজ ও মসলা, শোল মাছের পরিচয় ও পুষ্টিমান, দেশের শোলজাতীয় মাছ কোথা থেকে আসে ও কীভাবে কমেছে, আর নিরাপদে মাছ কেনা ও রান্নার পরামর্শ। এসব তথ্য নেওয়া হয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বাংলাপিডিয়া, ফিশবেস এবং খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রকাশনা থেকে।
আধা কেজি শোল মাছের দোপেঁয়াজার উপকরণ
পরিমাণগুলো জাগো নিউজ ২৪-এর রেসিপি অনুযায়ী। লবণ, তেল ও পানি রাঁধুনির বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কাঁচা মরিচ রান্নায় দুবার যায়: একবার পেঁয়াজের সঙ্গে, আরেকবার একেবারে শেষে।
- শোল মাছের টুকরা: আধা কেজি
- পেঁয়াজ, মোটা করে কাটা: ১ কাপ
- তেজপাতা: ১টি
- লবণ: স্বাদমতো
- আদা বাটা: আধা চা চামচ
- রসুন বাটা: ১ চা চামচ
- হলুদ গুঁড়ো: ২ চা চামচ
- মরিচ গুঁড়ো: ১ চা চামচ
- কাঁচা মরিচ, ফালি করা: ৭ থেকে ৮টি
- তেল ও পানি: পরিমাণমতো
- ধনেপাতা কুচি: ২ টেবিল চামচ
রান্নার ধাপ
রান্না হয় দুই পর্বে। প্রথম পর্বে মাছে মসলা মাখিয়ে ভাজা হয়; দ্বিতীয় পর্বে ভাজা পেঁয়াজের ওপর মসলা কষিয়ে তাতে মাছ দিয়ে এমনভাবে রান্না করা হয় যাতে মসলা মাছের গায়ে লেগে থাকে।
- মাছ কুটে ধুয়ে পরিষ্কার করে পানি ঝরিয়ে নিন।
- মাছে অর্ধেক আদা ও রসুন বাটা, অর্ধেক গুঁড়ো মসলা এবং স্বাদমতো লবণ মাখিয়ে মিনিট দশেক রেখে দিন।
- তেল গরম করে মাছের টুকরাগুলো ভেজে নিন।
- কড়াইয়ে বাকি তেল গরম করে পেঁয়াজ, তেজপাতা ও কাঁচা মরিচ দিয়ে ভাজতে থাকুন।
- পেঁয়াজ ভাজা হলে বাকি সব বাটা ও গুঁড়ো মসলা, স্বাদমতো লবণ এবং পরিমাণমতো পানি দিয়ে মসলা ভালো করে কষিয়ে নিন।
- পানি শুকিয়ে তেল ওপরে উঠে এলে ভাজা মাছ দিন।
- অল্প পানি, কাঁচা মরিচ ও ধনেপাতা কুচি দিয়ে ঢেকে রান্না করুন।
- মাছ মসলায় বেশ ভাজা ভাজা হয়ে এলে নামিয়ে পরিবেশন করুন।
মাছ মাখিয়ে রাখার দশ মিনিট ছাড়া রেসিপিতে রান্নার কোনো সময় বলা নেই; তার বদলে আছে চোখে দেখার কয়েকটি সংকেত: পেঁয়াজ ভাজা হওয়া, পানি শুকিয়ে মসলার ওপর তেল ভেসে ওঠা, আর শেষে মসলার ভেতরে মাছ ভাজা ভাজা দেখানো।
দোপেঁয়াজা নামের অর্থ
দোপেঁয়াজা, ইংরেজি রান্নার বইয়ে যাকে লেখা হয় dopiaza, এক ধরনের তরকারির নাম, যার নামকরণ হয়েছে পেঁয়াজ থেকে। ইংরেজি শব্দটি আংশিকভাবে এসেছে ফারসি দুপিয়াজা থেকে; ফারসিতে দু মানে দুই, আর পিয়াজ মানে পেঁয়াজ। পদটিতে পেঁয়াজ দুইভাবে ব্যবহৃত হয় বলে এই নাম: একবার ঝোল বা মসলার সঙ্গে রান্না করে, আরেকবার কাঁচা বা ভাজা অবস্থায় ওপরে ছড়িয়ে। বিশ্বকোষে এই পদের প্রচলিত অঞ্চল হিসেবে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ইরান, ভারত ও পাকিস্তানের নাম আছে। ভারতে দোপেঁয়াজা হায়দরাবাদ শহরের সঙ্গে যুক্ত, আর ইরানে দোপিয়াজে রাঁধা হয় টুকরা বা কিমা করা ভেড়ার মাংস কিংবা মুরগি, আলু আর প্রচুর কুচানো পেঁয়াজ দিয়ে।
একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি অনুযায়ী মোগল সম্রাট আকবরের দিল্লির দরবারের মোল্লা দো-পিয়াজা নামের এক কাল্পনিক চরিত্র ভুল করে দুবার পেঁয়াজ দিয়ে ফেলায় পদটির জন্ম। তবে দোপেঁয়াজার একটি প্রকৃত রন্ধনপ্রণালী লিখে গেছেন আকবরের সত্যিকারের সভাসদ আবুল ফজল, ষোড়শ শতকের এক গ্রন্থে। জাগো নিউজ ২৪-এর রেসিপিটি এই পরিবারেরই ঘরোয়া এক রূপ: আধা কেজি মাছের জন্য পুরো এক কাপ মোটা করে কাটা পেঁয়াজ, যা তেজপাতা ও কাঁচা মরিচের সঙ্গে ভেজে মসলার ভিত তৈরি করা হয়।
পেঁয়াজ নিজে একটি কন্দজাতীয় বীরুৎ, বৈজ্ঞানিক নাম Allium cepa, গোত্র Alliaceae। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, এর আদি নিবাস সম্ভবত পশ্চিম এশিয়া, আর পেঁয়াজের ঝাঁঝ, যা জাতভেদে কমবেশি হয়, আসে অ্যালাইল-প্রোপাইল ডাইসালফাইড নামের এক উদ্বায়ী তেল থেকে। সব ধরনের মাটিতেই পেঁয়াজ চাষ করা যায়; বাংলাদেশে চারা রোপণের উপযুক্ত সময় ডিসেম্বর বা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ, আর গাছ নতুন পাতা ছাড়া বন্ধ করলে বোঝা যায় কন্দ পরিপক্ব হয়েছে। দেশের সব জেলাতেই পেঁয়াজ হয়, তবে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় ফরিদপুরে। তাহিরপুরী ও ফরিদপুরী দুটি গুরুত্বপূর্ণ জাত, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি পেঁয়াজ-১ নামে একটি জাত অবমুক্ত করেছে। জ্ঞানকোষটি জানায়, টাটকা খাওয়ার পাশাপাশি পেঁয়াজ মসলা হিসেবে এবং তরকারি, সস, স্যুপ, আচার ও খাবারের স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত হয়; দোপেঁয়াজায় পেঁয়াজের ভূমিকা ঠিক এটাই।

হাঁড়ির মসলাগুলো
পেঁয়াজ ছাড়া রেসিপিতে আছে আদা ও রসুন বাটা, হলুদ ও মরিচ গুঁড়ো, একটি তেজপাতা, কাঁচা মরিচ আর ধনেপাতা। বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায় মসলা হলো এমন যেকোনো সুগন্ধি উদ্ভিদ, উদ্ভিদের অংশ বা উদ্ভিদজাত দ্রব্য, যা খাবারের অনুষঙ্গ বা স্বাদ-গন্ধের জন্য ব্যবহৃত হয়। মসলার মূল্য তার সুগন্ধে, অর্থাৎ উদ্বায়ী তেলে; প্রয়োজনীয় পুষ্টিমান না থাকায় মসলাকে খাদ্য হিসেবে ধরা হয় না।
মসলা আসে উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ থেকে। একই ভুক্তি অনুযায়ী আদা ও হলুদ পাওয়া যায় রাইজোম বা মাটির নিচের কাণ্ড থেকে; ধনে ও মরিচ ফল থেকে; আর ধনেপাতা, ইন্ডিয়ান ক্যাসিয়া, তুলসী ও পুদিনা পাতা থেকে। বাংলাদেশে সাধারণত চাষ হয় আদা, রসুন, হলুদ, পেঁয়াজ, মরিচ, ধনে, ইন্ডিয়ান ক্যাসিয়া ও পুদিনা; তবু বিপুল পরিমাণ মসলা এখনো ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করতে হয়। জ্ঞানকোষটি আরও জানায়, কচি ধনেগাছ সবজি ও মাছের তরকারির স্বাদ বাড়াতে বহুল ব্যবহৃত; এই রেসিপিতেও শেষ ধাপে দুই টেবিল চামচ ধনেপাতা কুচি সেভাবেই দেওয়া হয়।
বাংলাপিডিয়া এটাও উল্লেখ করেছে যে আদাসহ কিছু মসলা প্রথাগত ও লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এসব ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা পরামর্শ নয়। স্বাস্থ্যগত কারণে যাঁদের লবণ, তেল বা ঝাল কম খেতে হয়, খাদ্যাভ্যাস নিয়ে তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শোল মাছের পরিচয়
শোল মাছ শোলজাতীয় মাছের দলভুক্ত, যা Channiformes বর্গের মিঠাপানির মাছের গোত্র Channidae; ইংরেজিতে এদের প্রায়ই মারেল বলা হয়। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, সাপের মাথার মতো মাথা দেখে এদের চেনা যায়। দেহ লম্বাটে, কমবেশি নলাকার; পৃষ্ঠপাখনা ও পায়ুপাখনা লম্বা এবং নরম কাঁটাযুক্ত; মুখ বড়, চোয়াল ও তালুতে দাঁত; মাথা চাপা, তার ওপরে বড় ঢালের মতো আঁশ। গলবিলে এদের দুটি বাড়তি বায়ুশ্বসন প্রকোষ্ঠ আছে, যার সাহায্যে এরা পানির ওপর থেকে বাতাস নিতে পারে।
বাংলাদেশে শোলজাতীয় মাছের পাঁচটি প্রজাতি জানা আছে। স্থানীয় নামসহ সেগুলো হলো Channa punctatus (টাকি), Channa striatus (শোল), Channa marulius (গজার), Channa barca (তিলা শোল) এবং Channa orientalis (চেং)। বাংলাপিডিয়ার মাছ বিষয়ক ভুক্তিতে এদের তিনটিকে বিপন্ন বলা হয়েছে: পিপলা শোল বা বারকা স্নেকহেড মহাবিপন্ন, গজার বিপন্ন এবং তেলো টাকি সংকটাপন্ন। শোল ও টাকি সেই তালিকায় নেই।
বিশ্বের মাছের প্রজাতির তথ্যভান্ডার ফিশবেস জানায়, ডোরাকাটা শোল বা Channa striata পাওয়া যায় পাকিস্তান থেকে থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ চীন পর্যন্ত। এটি সর্বোচ্চ ১০০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, সাধারণত দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ৬১ সেন্টিমিটার, আর প্রকাশিত সর্বোচ্চ ওজন ৩ কেজি। শোল বাধ্যতামূলকভাবে বাতাস থেকে শ্বাস নেয়। প্রাপ্তবয়স্ক মাছ থাকে পুকুর, খাল-নালা ও নদীতে, তবে সমভূমির বদ্ধ ও কাদাময় পানি এদের বেশি পছন্দ, এবং এক থেকে দুই মিটার গভীর স্থির পানিতে এদের বেশি দেখা যায়। শুকনো মৌসুমে হ্রদ, খাল ও জলাভূমির তলার কাদায় গর্ত করে ঢুকে থাকে, যতক্ষণ চামড়া ও শ্বাসযন্ত্র ভেজা থাকে, আর তখন জমানো চর্বির ওপর বেঁচে থাকে। এরা খায় মাছ, ব্যাঙ, সাপ, পোকামাকড়, কেঁচো, ব্যাঙাচি ও কাঁকড়া-চিংড়িজাতীয় প্রাণী; ধানখেতে এর চাষের নজিরও ফিশবেসে নথিভুক্ত।
বাংলাপিডিয়া বলছে, খাদ্য হিসেবে শোলজাতীয় মাছ অত্যন্ত সমাদৃত, তবে এরা প্রধানত অন্য দেশি মাছ খেয়ে বাঁচে বলে এদের ক্ষতিকর মাছও মনে করা হয়। এরা জোড় বেঁধে থাকে এবং সন্তানের প্রতি এদের যত্ন অত্যন্ত উন্নত: প্রজনন মৌসুমে, অর্থাৎ বর্ষার আগে ও বর্ষায়, তীরের কাছে পানির নিচের ঘাসে এরা বাসা বানায়, ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়া পর্যন্ত বাবা-মা বাসা পাহারা দেয়, তারপর পোনার ঝাঁককে আগলে নিয়ে চলে। ফিশবেস জানায়, শোলের মাংস শক্ত, সাদা ও প্রায় কাঁটাহীন, এর পুরু কালচে চামড়া স্যুপের জন্য ভালো, আর থাইল্যান্ড, ইন্দোচীন ও মালয়েশিয়ায় ডোরাকাটা শোল সম্ভবত প্রধান খাদ্য-মাছ।

১০০ গ্রাম শোল মাছে কী থাকে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ২০১৩ সালের জুনে খাদ্য মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ও অন্য সহযোগীদের সহায়তায় ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ প্রকাশ করে। খাদ্যের তথ্যব্যবস্থার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ইনফুডসের মানদণ্ড মেনে তৈরি এই তালিকায় কাঁটা ছাড়ানো কাঁচা শোল মাছের (শোল, কাটা ছাড়া) পুষ্টিমান দেওয়া আছে। তালিকার সব মান খাওয়ার উপযোগী অংশের প্রতি ১০০ গ্রামের হিসাবে।
তালিকা অনুযায়ী ১০০ গ্রাম কাঁচা শোল মাছে আছে ১০১ কিলোক্যালরি শক্তি, ৭৮.৪ গ্রাম পানি, ১৭.৭ গ্রাম আমিষ, ৩.৩ গ্রাম চর্বি, শর্করা শূন্য এবং ১.৪ গ্রাম ছাই বা খনিজ অবশেষ। খনিজের মধ্যে আছে ১০৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১.০ মিলিগ্রাম আয়রন, ৪৩ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম, ১৩০ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ৩৬২ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ৫০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ০.৩১ মিলিগ্রাম জিংক এবং ০.২০ মিলিগ্রাম তামা। কেনা মাছের কতটা অংশ খাওয়া যায়, তার হিসাব বা খাদ্যোপযোগী অংশের সহগ শোলের ক্ষেত্রে ০.৭৭।
তুলনার জন্য, একই তালিকায় কাঁটা ছাড়ানো কাঁচা রুই মাছের প্রতি ১০০ গ্রামে ১০৫ কিলোক্যালরি, ২০.৬ গ্রাম আমিষ ও ২.৬ গ্রাম চর্বি দেওয়া আছে। এই হিসাবগুলো কাঁচা মাছের। মাছ ভাজা ও মসলা কষানোর তেল এবং এই রেসিপিতে দুবার দেওয়া লবণ এতে ধরা নেই, তাই এক প্লেট দোপেঁয়াজায় শুধু মাছের চেয়ে বেশি চর্বি, শক্তি ও সোডিয়াম থাকে।
দেশের শোলজাতীয় মাছ কোথা থেকে আসে
মৎস্য অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ ২০২৩-২৪ (৪১তম খণ্ড) শোল, গজার ও টাকিকে একসঙ্গে শোলজাতীয় মাছ হিসেবে গণনা করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই দলের উৎপাদন ছিল ৮৩ হাজার ২৪২ টন, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের ১.৬৬ শতাংশ, যার পুরোটাই অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে। সবচেয়ে বেশি এসেছে প্লাবনভূমি থেকে, ৭৩ হাজার ৮৮০ টন। বিল থেকে এসেছে ৪ হাজার ৬৭ টন, পুকুর থেকে ৩ হাজার ১৮৯ টন, নদী থেকে ১ হাজার ২৭৪ টন, মৌসুমি চাষের জলাশয় থেকে ৩৯৫ টন, বাঁওড় থেকে ৩২৯ টন, পেন কালচার থেকে ৭৪ টন এবং কাপ্তাই হ্রদ থেকে ৩৪ টন।
একসময় এই মাছ অনেক সহজে পাওয়া যেত। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, শোলজাতীয় মাছ একসময় সারা দেশের ডোবা, বিল ও জলাভূমিতে প্রচুর পাওয়া যেত, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে, এবং ক্ষতরোগ বা এপিজুটিক আলসারেটিভ সিনড্রোমে (ইইউএস) সহজে আক্রান্ত হওয়াকে এদের কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ মনে করা হয়। ইইউএস একটি সংক্রামক রোগ, যাতে মাছের দেহে বড় ও গভীর ক্ষত হয় এবং মাছ মারা যায়। ১৯৮৮ সালে এই রোগে বাংলাদেশের নানা প্রজাতির মিঠাপানি ও মোহনার মাছ আক্রান্ত হয়; আক্রান্ত ২১টি জেলার একটিতেই ক্ষতি প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার ধরা হয়েছিল, আর শোলজাতীয় মাছের মতো বায়ুশ্বাসী প্রজাতিগুলোও ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল।
২০২২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে শোল মাছের পোনা উৎপাদনে সফল হন বলে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ও ইত্তেফাক জানায়। গবেষক দলের প্রধান ছিলেন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শাহা আলী। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, অন্য মাছের তুলনায় শোলের প্রজনন ও চাষ অপেক্ষাকৃত জটিল, কারণ এরা খৈল-কুঁড়াজাতীয় খাবার খেতে অভ্যস্ত নয়। তাই প্রথমে মাছগুলোকে প্রোটিনসমৃদ্ধ একটি দেশি খাবারে অভ্যস্ত করা হয়, তারপর ব্রুড মাছ তৈরি করে হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করা হয়। শোল স্বজাতিভোজী হওয়ায় পোনা বাঁচিয়ে রাখাও ছিল আরেকটি চ্যালেঞ্জ।
ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী নেত্রকোনা ও হাওরাঞ্চল থেকে সুস্থ-সবল দেশি শোল সংগ্রহ করে কেন্দ্রের পুকুরে প্রতি শতাংশে ১০ থেকে ১২টি হারে মজুত করা হয়। শোলের প্রজননকাল সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত, আর এপ্রিল থেকে আগস্ট সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম। স্ত্রী মাছ পুরুষের চেয়ে আকারে বড় হয়, এপ্রিল থেকে এদের ডিম্বাশয় পরিপক্ব হতে শুরু করে, এবং স্ত্রী মাছের দেহের প্রতি গ্রামে গড়ে ৮০ থেকে ৯০টি ডিম পাওয়া যায়। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে শোলের নিবিড় চাষ হয়, কিন্তু দেশি পোনা না থাকায় বাংলাদেশে মাছটিকে চাষের আওতায় আনা যাচ্ছিল না; ২০১১ সালে বেসরকারি খামারিরা ভিয়েতনাম থেকে শোলের পোনা আমদানি করে চাষ শুরু করলেও বিদেশি মাছটি তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। ২০২২ সালে ইনস্টিটিউট জানায়, এক-দুই বছরের মধ্যে দেশি শোলের পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে হস্তান্তর করা হবে। ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, শোলসহ ইনস্টিটিউট তখন পর্যন্ত ৩৪ প্রজাতির দেশীয় ও বিপন্ন মাছের প্রজনন ও চাষ কৌশল উদ্ভাবন করেছে।
বিএফআরআই একটি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা দেশের মৎস্য গবেষণার পরিকল্পনা, সমন্বয় ও পরিচালনার জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৬ সালে কাজ শুরু করে। এর সদর দপ্তর ও স্বাদুপানি কেন্দ্র ময়মনসিংহে; এ ছাড়া নদীর মৎস্য গবেষণার জন্য চাঁদপুরে, লোনাপানির জন্য খুলনার পাইকগাছায় এবং সামুদ্রিক মৎস্যের জন্য কক্সবাজারে কেন্দ্র আছে, আর উপকেন্দ্র আছে রাঙামাটি ও সান্তাহারে; সান্তাহারের উপকেন্দ্রটি প্লাবনভূমির বাস্তুতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করে।
বাঙালির খাদ্যতালিকায় মাছ
শোল মাছের দোপেঁয়াজার মতো পদ মাছনির্ভর এক খাদ্যাভ্যাসের অংশ। মৎস্য অধিদপ্তরের একই ইয়ারবুক অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫০.১৮ লাখ টন, যার ৫৯.৩৪ শতাংশ এসেছে চাষ থেকে। অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে এসেছে ৪৩ লাখ ৮৯ হাজার ৮৬০ টন, মোটের ৮৭.৪৭ শতাংশ, আর সমুদ্র থেকে ৬ লাখ ২৮ হাজার ৬২৩ টন, ১২.৫৩ শতাংশ। ইয়ারবুক বলছে, দেশের মানুষের দৈনিক প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগায় মাছ, আর মাথাপিছু মাছ গ্রহণ দিনে ৬৭.৮০ গ্রাম, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ৬০ গ্রাম। ২০২৩-২৪ সালে প্রায় ৭৭ হাজার টন মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি করে দেশ আয় করেছে ৪ হাজার ৫৩১.৮৬ কোটি টাকা।
প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরণ আর চাষের ভারসাম্য কয়েক দশকে বদলে গেছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার এক সরকারি প্রতিবেদনের বরাতে জানায়, ২০১৬-১৭ সালে উৎপাদন ছিল ৪১.৩৪ লাখ টন, যার ২৮.১৪ শতাংশ এসেছিল অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের আহরণ থেকে এবং ৫৬.৪৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ের চাষ থেকে; অথচ ১৯৮৩-৮৪ সালে অভ্যন্তরীণ আহরণের অংশ ছিল ৬২.৫৯ শতাংশ আর চাষের ১৫.৫৩ শতাংশ। শোলজাতীয় মাছ এখনো মূলত মুক্ত জলাশয়ের মাছ: ২০২৩-২৪ সালের ইয়ারবুকে প্লাবনভূমি ও বিল থেকে এদের উৎপাদন পুকুরের চেয়ে অনেক বেশি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পত্রিকাটি জানায়, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৬৫ লাখ টন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৮৫ লাখ টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছে।

নিরাপদে মাছ কেনা ও রান্না
টাটকা মাছ চেনার কয়েকটি সহজ উপায় দিয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) সামুদ্রিক ও অন্যান্য মাছ বাছাই ও পরিবেশন বিষয়ক নির্দেশিকা, যা ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত হালনাগাদ, বলছে: মাছের গন্ধ হবে তাজা ও মৃদু, আঁশটে, টক বা অ্যামোনিয়ার মতো নয়; চোখ হবে স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল; গোটা মাছের মাংস হবে শক্ত, কানকো লাল এবং দুর্গন্ধহীন; আর চাপ দিলে মাংস আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। কেনার পর দ্রুত মাছ বরফে বা ফ্রিজে রাখতে হবে। দুই দিনের মধ্যে রান্না করলে পরিষ্কার ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রায় রাখা যায়; তা না হলে ভালো করে মুড়ে ফ্রিজারে রাখতে হবে।
কাঁচা মাছের জীবাণু যাতে রান্না করা খাবারে না ছড়ায়, সে জন্য এফডিএ কাঁচা মাছ কাটার পর রান্না করা বা সরাসরি খাওয়ার খাবার ধরার আগে কাটার বোর্ড, থালা, বাসন ও রান্নার জায়গা সাবান ও গরম পানিতে ধুয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। বেশির ভাগ মাছ এমনভাবে রান্না করা উচিত যাতে ভেতরের তাপমাত্রা ১৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছায়; থার্মোমিটার না থাকলে কাঁটাচামচে চাপ দিলে মাংস সহজে আলাদা হয়ে এলে বুঝতে হবে মাছ সেদ্ধ হয়েছে। নষ্ট মাছে টক, বাসি, আঁশটে বা অ্যামোনিয়ার গন্ধ থাকতে পারে এবং রান্নার পর সেই গন্ধ আরও বাড়ে; এমন গন্ধের মাছ খাওয়া উচিত নয়। পচনশীল খাবার দুই ঘণ্টার বেশি ফ্রিজের বাইরে রাখা ঠিক নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠিও একই কথা বলে: পরিচ্ছন্ন থাকুন, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন, এবং বিশেষ করে মাংস, মুরগি, ডিম ও সামুদ্রিক খাবার ভালোভাবে রান্না করুন; ডব্লিউএইচও জানায়, খাবার ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রান্না করলে তা খাওয়ার জন্য নিরাপদ হতে সাহায্য করে। ফিশবেস আরও নথিভুক্ত করেছে যে শীত ও শুকনো মৌসুমে ডোরাকাটা শোলের দেহগহ্বরের চারপাশের মাংসে একধরনের পরজীবী চ্যাপ্টা কৃমির (ট্রেমাটোড) লার্ভা ব্যাপক হারে থাকতে পারে, আর অন্ত্রে থাকে অন্য পরজীবী। এই রেসিপিতে মাছ কুটে ধুয়ে প্রথমে ভাজা হয়, তারপর আবার মসলায় রান্না করা হয়, যা মাছ ভালোভাবে রান্না করার ডব্লিউএইচওর পরামর্শের সঙ্গে মেলে।
ছবি: Bernard DUPONT / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মৎস্য অধিদপ্তর (ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ ২০২৩-২৪), পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ, ২০১৩), বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ও ইত্তেফাকের মাধ্যমে), দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাপিডিয়া, ফিশবেস, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)