২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল, দেশের বড় অংশ যখন তাপপ্রবাহে পুড়ছিল, তখন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের লাইফস্টাইল ডেস্ক ঘরে বসে কাঁচা আমের স্পাইসি ললি বানানোর একটি রেসিপি প্রকাশ করে। কাঁচা আম, পুদিনা পাতা, চিনি আর পরিচিত কয়েকটি মসলা দিয়ে ঘন পিউরি রান্না করে, ঠান্ডা করে, আইসক্রিমের ছাঁচে জমিয়ে তৈরি হয় এই ললি। রেসিপিতে উপকরণ আটটি; ব্লেন্ডার, একটি পাত্র আর ছাঁচ ছাড়া বিশেষ কোনো সরঞ্জাম লাগে না, তবে ডিপ ফ্রিজে রাখতে হয় ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। এই প্রতিবেদনে ডেস্কের প্রকাশিত রেসিপিটি হুবহু তুলে ধরা হলো, প্রতিটি উপকরণের পরিচয় দেওয়া হলো, আর সেই সপ্তাহে একজন রাঁধুনির কাজে লাগে এমন পটভূমি যোগ করা হলো: দেশের আম কোথা থেকে আসে এবং এপ্রিলের শেষে বাজারে কেন কাঁচা আম, কাঁচা আম নিয়ে গবেষকেরা কী পেয়েছেন, চিনি, লবণ ও গরম আবহাওয়া নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কী বলে, আর ঘরে বানানো হিমায়িত খাবারে খাদ্য নিরাপত্তার মৌলিক নিয়মগুলো কী।
ডেস্ক খাবারটিকে গ্রীষ্মের খাবার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল; তাদের ভাষায় এটি সুস্বাদু, সহজে বানানো যায় এবং শিশু থেকে বড় সবারই পছন্দ হবে। মূল লেখার ভূমিকায় আরও বলা হয়েছিল যে কাঁচা আম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং পানিশূন্যতা, ক্লান্তি ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। এই প্রতিবেদনের জন্য যেসব স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নথি দেখা হয়েছে, তার কোনোটি এসব দাবি সমর্থন করে না, তাই এখানে সেগুলো রাখা হয়নি; গবেষণা ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো আসলে কী বলে, তা নিচের অংশগুলোতে দেওয়া হলো।
উপকরণ
জাগো নিউজের রেসিপিতে উপকরণের পরিমাণ এমন। এই মিশ্রণে কয়টি ললি হবে তা রেসিপিতে বলা নেই; সেটি ছাঁচের আকারের ওপর নির্ভর করে।
- কাঁচা আম: ২টি
- চিনি: আধা কাপ
- বিট লবণ: আধা চা চামচ
- লাল মরিচ গুঁড়া: আধা চা চামচ
- ভাজা জিরা গুঁড়া: আধা চা চামচ
- পুদিনা পাতা: ১ টেবিল চামচ
- চাট মসলা: আধা চা চামচ
- পানি: আধা কাপ
ব্লেন্ড করার আগে আমের খোসা ছাড়াতে হবে কি না, রেসিপিতে তা বলা নেই। অনেক কাঁচা আম একসঙ্গে কাটাকুটি করার আগে নিচের খাদ্য নিরাপত্তা অংশে আমের খোসা নিয়ে দেওয়া তথ্যটি পড়ে নেওয়া ভালো।
যেভাবে বানাবেন
ডেস্কের দেওয়া প্রস্তুত প্রণালি ছয়টি ধাপে:
- কাঁচা আম ও পুদিনা পাতা একসঙ্গে ব্লেন্ড করে মসৃণ পিউরি তৈরি করে নিন।
- একটি পাত্রে আমের পিউরি, পানি ও চিনি একসঙ্গে দিয়ে জ্বাল দিন। চিনি পুরোপুরি গলে মিশ্রণটি একসঙ্গে মিশে না যাওয়া পর্যন্ত ধীরে ধীরে নাড়তে থাকুন।
- চিনি গলে গেলে বিট লবণ, মরিচ গুঁড়া, জিরা গুঁড়া ও চাট মসলা দিয়ে আরও কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিন। মাঝে মাঝে নেড়ে দিন, যাতে পাত্রের নিচে লেগে না যায়।
- মিশ্রণটি ধীরে ধীরে ঘন হয়ে এলে চুলা থেকে নামিয়ে সম্পূর্ণ ঠান্ডা হতে দিন।
- ঠান্ডা মিশ্রণটি আইসক্রিমের ছাঁচে ঢালুন। প্রতিটি ছাঁচে কাঠি বসিয়ে দিন অথবা ফয়েল পেপার দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে দিন, যাতে জমার সময় কোনো সমস্যা না হয়। এরপর ছাঁচগুলো ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা ডিপ ফ্রিজে রেখে দিন।
- পুরোপুরি জমে গেলে ছাঁচ বের করে কয়েক সেকেন্ড হালকা প্রবাহিত পানির নিচে ধরুন; তাহলে ললিগুলো সহজেই ছাঁচ থেকে বেরিয়ে আসবে।

ললি বা আইস পপ আসলে কী
কাঠিতে গাঁথা হিমায়িত মিষ্টান্নকে ব্রিটিশ ইংরেজিতে বলা হয় আইস ললি; কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে একই জিনিস সাধারণত পপসিকল নামে পরিচিত, যে নামটি শুরুতে ছিল একটি ট্রেডমার্ক। অনলাইন বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া আইস পপকে বর্ণনা করেছে তরল বা ক্রিমভিত্তিক কাঠিওয়ালা হিমায়িত মিষ্টান্ন হিসেবে, যা আইসক্রিম বা সরবের মতো জমানোর সময় ফেটানো হয় না, বরং স্থির অবস্থায় জমানো হয়। এ কারণেই জাগো নিউজের রেসিপিতে ছাঁচ আর ফ্রিজ ছাড়া কিছু লাগে না: মিশ্রণ ঢেলে রেখে দিলেই চলে।
আধুনিক আইস পপের সূচনা সাধারণত ফ্র্যাংক এপারসন নামের এক মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তিনি দাবি করেছিলেন, ১৯০৫ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি প্রথম আইস পপ বানান; ১৯২৩ সালে তাঁর "এপসিকল" আইস পপের পেটেন্ট পান এবং ১৯২৪ সালের মধ্যে কাঠিওয়ালা হিমায়িত মিষ্টান্নের সাধারণ পেটেন্টও নেন। ভারতে এ ধরনের রাস্তার মিষ্টি খাবার আইস গোলা ও আইস ক্যান্ডি নামে পরিচিত বলে বিশ্বকোষটি উল্লেখ করেছে। কাঁচা আমের এই ললি অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার নিজস্ব একটি ধারার: শুধু ফলের রস নয়, এর স্বাদ এসেছে কাঁচা আমের টক-ঝাল-মিষ্টি নানা পদ থেকে।
এর সবচেয়ে কাছের আত্মীয় আম পান্না। উইকিপিডিয়া একে বর্ণনা করেছে কাঁচা আম দিয়ে তৈরি একটি ভারতীয় পানীয় হিসেবে, যা কাঁচা আম, জিরা ও আরও নানা মসলা দিয়ে বানানো হয় এবং এতে প্রায়ই পুদিনা পাতা যোগ করা হয়। পানীয়টি মূলত পশ্চিম ভারতে বেশি চলে। এই রেসিপির ললিতেও মূল স্বাদ একই: কাঁচা আম, পুদিনা, জিরা ও লবণ; পার্থক্য হলো পিউরিটিকে পাতলা পানীয় না বানিয়ে ঘন করে রান্না করে জমানো হয়।

মসলা ও লবণের পরিচয়
বিট লবণ, হিন্দি ও উর্দুতে যাকে কালা নমক বলে, সাধারণ খাবার লবণ নয়। উইকিপিডিয়ার কালা নমক নিবন্ধ অনুযায়ী, এটি চুল্লিতে পোড়ানো এক ধরনের শিলা লবণ, যার গন্ধ গন্ধকের মতো ঝাঁঝালো। এর বেশির ভাগই স্ফটিক আকারের সোডিয়াম ক্লোরাইড, সঙ্গে থাকে সোডিয়াম সালফেট ও আয়রন সালফাইডের মতো গন্ধকযুক্ত যৌগের সামান্য অংশ; এর গন্ধের প্রধান উৎস হাইড্রোজেন সালফাইড। আস্ত দলা অবস্থায় এটি বাদামি ও কালো, আর গুঁড়া করলে রং হয় গোলাপি থেকে গাঢ় বাদামি বা কালো। প্রচলিত পদ্ধতিতে কাঁচা লবণ কাঠকয়লা এবং হরীতকী বীজ, আমলকী ও বহেড়ার মতো উদ্ভিজ্জ উপাদানের সঙ্গে মুখবন্ধ মাটির পাত্রে প্রায় ২৪ ঘণ্টা পোড়ানো হতো; এখন প্রস্তুতকারকেরা প্রায়ই বিশুদ্ধ লবণে রাসায়নিক মিশিয়ে তারপর পোড়ান। কাঁচামাল আসে হিমালয় অঞ্চলের খনি ও উত্তর ভারতের লবণ হ্রদ থেকে, আর উৎপাদন কেন্দ্রীভূত ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের হিসার জেলায়। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে রাঁধুনিরা এটি চাট, চাটনি, সালাদ, ফল ও রায়তায় ব্যবহার করেন।
চাট মসলা ভারতীয় উপমহাদেশের একটি গুঁড়া মসলার মিশ্রণ। উইকিপিডিয়ার তালিকা অনুযায়ী এর সাধারণ উপকরণ আমচুর (শুকনো আমের গুঁড়া), জিরা, ধনে, শুকনো আদা, লবণ (প্রায়ই বিট লবণ), গোলমরিচ, হিং ও মরিচ গুঁড়া। রাস্তার বিক্রেতারা কাটা ফল ও কাঁচা সবজির ওপর যে মসলা ছিটিয়ে দেন, সেটিই চাট মসলা; এর আমচুরের কারণে এই রেসিপিতে আম আসে দ্বিতীয়বার। চাট মসলায় সাধারণত লবণ থাকে বলে ললিতে লবণ আসে দুই জায়গা থেকে: বিট লবণ ও মসলার মিশ্রণ।
জিরা হলো Cuminum cyminum নামের উদ্ভিদের শুকনো বীজ। গাছটি ধনে-পার্সলে পরিবারের (Apiaceae) এবং এর আদি নিবাস ইরানো-তুরানীয় অঞ্চল। জিরার উষ্ণ সুগন্ধ আসে মূলত এর উদ্বায়ী তেল থেকে, যার প্রধান সুগন্ধি যৌগ কিউমিনালডিহাইড। জিরা আস্ত বা গুঁড়া দুইভাবেই ব্যবহার করা যায়; এই রেসিপিতে লাগে ভাজা জিরার গুঁড়া। উইকিপিডিয়ার তথ্যে, বিশ্বের জিরার প্রায় ৭০ শতাংশ উৎপাদন করে ভারত, যা এই মসলার সবচেয়ে বড় উৎপাদক দেশ।
মরিচ দক্ষিণ এশিয়ায় এসেছে আমেরিকা মহাদেশ থেকে। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া মরিচকে Capsicum frutescens নামে Solanaceae পরিবারের উদ্ভিদ হিসেবে উল্লেখ করেছে, যার আদি নিবাস মেক্সিকো। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, বিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত বাংলা থেকে বিপুল পরিমাণ মরিচ রপ্তানি হতো, এবং যে মসলাগুলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পূর্ব ভারতের দিকে টেনেছিল, মরিচ ছিল তার একটি। দেশের রান্নাঘরে শুকনো মরিচ গুঁড়া করে কারি পাউডার, সস ও আচারে ব্যবহার করা হয়; এখানে আধা চা চামচ মরিচ গুঁড়াই ললিকে ঝাল করে। আর রেসিপির একমাত্র তাজা ভেষজ পুদিনা Mentha গণের উদ্ভিদ, পরিবার Lamiaceae।

কাঁচা আম নিয়ে গবেষণা যা বলে
আমগাছ (Mangifera indica) বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ। উইকিপিডিয়ার আম নিবন্ধ অনুযায়ী, ফলটির উৎপত্তি দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, যে এলাকায় আজকের বাংলাদেশ, উত্তর-পূর্ব ভারত ও মিয়ানমারের অংশ পড়ে, এবং প্রাচীনকাল থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর চাষ হয়ে আসছে। ইংরেজি ম্যাঙ্গো শব্দটি ষোড়শ শতকে এসেছে পর্তুগিজ মাঙ্গা থেকে, যার শিকড় মালয়ালম হয়ে তামিল ভাষায়।
২০১৯ সালের অক্টোবরে ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স সাময়িকীতে এম. ই. মালদোনাদো-সেলিস ও সহকর্মীদের একটি পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়, যাতে আমের বিভিন্ন পর্যায়ে রাসায়নিক গঠন নিয়ে গবেষণাগারের ফলাফল একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, পাকার সময় ভিটামিন সি-এর পরিমাণ বদলায় এবং পুরো পাকা আমের তুলনায় কম পাকা আমে ভিটামিন সি বেশি থাকে। আমের অম্লতার মূল কারণ সাইট্রিক ও ম্যালিক অ্যাসিড, এবং আম পাকতে থাকলে জৈব অ্যাসিডের পরিমাণ কমে; এ কারণেই কাঁচা আম এত টক। একই পর্যালোচনা জানায়, সবুজ থেকে পাকা পর্যায়ে যেতে যেতে আমে ক্যারোটিনয়েড, অর্থাৎ হলুদ ও কমলা রঞ্জক পদার্থ বাড়ে। পর্যালোচিত গবেষণাগুলোতে প্রতি ১০০ গ্রাম আমের শাঁসে ভিটামিন সি পাওয়া গেছে ৯.৭৯ থেকে ১৮৬ মিলিগ্রাম পর্যন্ত; জাত ও পাকার পর্যায় ভেদে এই পার্থক্য।
পর্যালোচনায় ম্যাঙ্গিফেরিন নামের একটি যৌগের কথাও আছে। জ্যান্থোন শ্রেণির এই যৌগ উচ্চতর উদ্ভিদে ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় এবং গবেষণায় এর ঔষধগুণ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা দেখা গেছে; যে জাতগুলো পরীক্ষা করা হয়েছিল, সেগুলোতে শাঁসের চেয়ে খোসায় ম্যাঙ্গিফেরিন বেশি ছিল। তবে গবেষণাগারের এসব ফলাফল ফলের ভেতরে কী আছে তা বলে; চিনি মেশানো একটি হিমায়িত ললি স্বাস্থ্য রক্ষা করে, এমন প্রমাণ এগুলো নয়। স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
পাকা আমের ক্ষেত্রে উইকিপিডিয়ার পুষ্টি সারণি অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা (রান্না না করা) আমে প্রায় ৬০ কিলোক্যালরি শক্তি থাকে, এবং ওই পরিমাণে দৈনিক প্রয়োজনের (ডেইলি ভ্যালু) ৪০ শতাংশ ভিটামিন সি মেলে বলে আমকে ভিটামিন সি-এর সমৃদ্ধ উৎস বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে আম এবং কাঁচা আমের মৌসুম
বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ১০০টি আমের জাত আছে। উন্নত কলমের জাতগুলো চাষ হয় মূলত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ (নবাবগঞ্জ) ও দিনাজপুরে; এর মধ্যে আছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাত, আশ্বিনা, কিষানভোগ, লতা বোম্বাই, মোহনভোগ ও লক্ষ্মণভোগসহ আরও অনেক জাত। বীজ থেকে জন্মানো, স্বীকৃত জাতহীন গাছগুলো দেশি বা গুটি আম নামে পরিচিত। কলমের গাছে চার বছর বয়স থেকে ফল ধরে এবং প্রায় ৪৫ বছর পর্যন্ত ফলন দেয়। আমগাছে মুকুল আসে জানুয়ারি থেকে মার্চে; এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়ায় ফল ধরায় ক্ষতি হয়, আর শিলাবৃষ্টিতে কচি ফল ঝরে পড়ে। বাংলাপিডিয়া জানায়, কাঁচা আম তরকারি ও ডালে দেওয়া হয়, আর কাঁচা ও পাকা দুই রকম আম দিয়েই জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ, চাটনি ও আচার তৈরি হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) যে হিসাব রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস প্রকাশ করেছিল এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল ছেপেছিল, তাতে ফসলটির পরিসর বোঝা যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ ২ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি থেকে ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৪৯৯ টন আম উৎপাদিত হয়, আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৫ হাজার ৩৪ হেক্টর থেকে ২৫ লাখ ৮ হাজার ৯৭৩ টন। ২০২৫ মৌসুমের জন্য অধিদপ্তর ২৭ লাখ টনের রেকর্ড উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে, এবং একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে বিশ্বে আম উৎপাদনে সপ্তম বলা হয়। রপ্তানি অবশ্য ছিল সামান্য: ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ হাজার ১০০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৩২১ টন, যা গেছে প্রায় ৩৮টি দেশে।
২০২৬ সালের মৌসুমের শুরুটা ভালো ছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ডিএইর বরাতে জানায়, রাজশাহী জেলার প্রায় ৭২ শতাংশ আমগাছে মুকুল এসেছে, এবং রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এই চার জেলায় আমবাগান রয়েছে ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে। পত্রিকাটি আগের মৌসুমের উৎপাদন জানায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৬৪০ টন, নওগাঁয় ৪ লাখ ২১ হাজার ৪২৯ টন, রাজশাহীতে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫৩ টন এবং নাটোরে ৭২ হাজার ৭৩ টন। ২০২৬ সালের ১১ মার্চ বাসস জানায়, রাজশাহীতে আমের গুটি দেখা দিতে শুরু করেছে; চার জেলায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৪টি গাছ থেকে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, মুকুল ও গুটি পর্যায়ে আদর্শ তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এপ্রিলের শেষে কাঁচা আমের রেসিপি কেন, তা এই সময়সূচি থেকেই বোঝা যায়। ২০২৫ সালে রাজশাহীতে পাকা আম পাড়া হয়েছিল নির্ধারিত সূচি মেনে, যা বাসস সে বছরের ২০ মে জানিয়েছিল: গোপালভোগ ২২ মে থেকে, হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাত ৩০ মে থেকে, ল্যাংড়া ১০ জুন থেকে, আম্রপালি ও ফজলি ১৫ জুন থেকে এবং আশ্বিনা ১০ জুলাই থেকে। এসব তারিখের আগে গাছের আম থাকে কাঁচা, আর এই কাঁচা আম দিয়েই রান্নাঘরে তৈরি হয় বাংলাপিডিয়ার বর্ণনার তরকারি, ডাল, চাটনি ও আচার, এবং এই ললির মতো নানা পানীয় ও খাবার।

২০২৬ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহ ও ডব্লিউএইচওর পরামর্শ
রেসিপিটি প্রকাশিত হয় সে বছরের তখন পর্যন্ত দীর্ঘতম তাপপ্রবাহের মাঝখানে। ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, তাপপ্রবাহ আরও চার থেকে পাঁচ দিন চলবে। আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম বাসসকে বলেন, এটি ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত থাকবে, ২৬ এপ্রিলের পর কিছুটা কমবে এবং ২৮ বা ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত চলতে পারে; মার্চ থেকে মে মাসে যেমনটা স্বাভাবিক, মে মাসে আরও এক বা দুটি তাপপ্রবাহ আসতে পারে। সবচেয়ে তীব্র তাপ ছিল রাজশাহী জেলায়, যেখানে ২২ এপ্রিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের বাকি অংশ এবং ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, দিনাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ।
হিমায়িত ললি একটি মজার খাবার, চিকিৎসা নয়। ২০২৪ সালের ২৮ মে তারিখের ডব্লিউএইচওর তাপ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যপত্রে হিটস্ট্রোককে উচ্চ মৃত্যুহারের একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি বলা হয়েছে, এবং আবহাওয়াজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে তাপজনিত চাপকে চিহ্নিত করা হয়েছে। গরম আবহাওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য সংস্থাটির পরামর্শের মধ্যে আছে:
- নিয়মিত পানি পান করুন: ঘণ্টায় এক কাপ এবং দিনে অন্তত ২ থেকে ৩ লিটার।
- দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে যাওয়া ও পরিশ্রমের কাজ এড়িয়ে চলুন, ছায়ায় থাকুন।
- হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন, ঠান্ডা পানিতে গোসল করুন এবং ভেজা কাপড় বা পানির স্প্রে দিয়ে ত্বক ভিজিয়ে রাখুন।
- ঝুঁকিতে থাকা মানুষের নিয়মিত খোঁজ নিন, বিশেষ করে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী এবং হৃদ্রোগ, ফুসফুস বা কিডনির রোগে আক্রান্ত, প্রতিবন্ধী ও একা থাকা মানুষের।
- শিশু বা প্রাণীকে কখনো অল্প সময়ের জন্যও পার্ক করা গাড়িতে রেখে যাবেন না।
ডব্লিউএইচও আরও উল্লেখ করেছে, বাইরে কাজ করা ও শারীরিক শ্রমের পেশার মানুষ কাজের কারণেই অতিরিক্ত তাপের মুখে পড়েন। গরমে কেউ অসুস্থ বোধ করলে, বিশেষ করে হিটস্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে, ঠান্ডা খাবার নয়, তাঁর দরকার চিকিৎসা সহায়তা।
চিনি ও লবণ: ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা
রেসিপির আধা কাপ চিনি ডব্লিউএইচওর ভাষায় ফ্রি সুগার বা মুক্ত চিনি। ২০১৫ সালের ৪ মার্চ প্রকাশিত নির্দেশনায় ডব্লিউএইচও প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের মোট শক্তি গ্রহণের ১০ শতাংশের কম মুক্ত চিনি খাওয়ার সুপারিশ করে, এবং বলে যে তা আরও কমিয়ে ৫ শতাংশের নিচে, অর্থাৎ দিনে মোটামুটি ২৫ গ্রাম (প্রায় ৬ চা চামচ) রাখলে বাড়তি স্বাস্থ্যসুবিধা মিলবে। মুক্ত চিনির মধ্যে পড়ে প্রস্তুতকারক, রাঁধুনি বা খাদক নিজে খাবার ও পানীয়ে যে গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ ও সুক্রোজ মেশান, এবং মধু, সিরাপ ও ফলের রসে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি। তাজা ফল ও সবজির চিনি এবং দুধে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি এই নির্দেশনার আওতায় পড়ে না। ডব্লিউএইচও এই সুপারিশের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে জানায়, কম চিনি খাওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরের ওজন কম থাকে এবং বেশি চিনি খাওয়ার সঙ্গে দাঁতের ক্ষয় বাড়ার সম্পর্ক আছে; লুকানো চিনি কত দ্রুত জমে যায়, তা বোঝাতে সংস্থাটি বলে, চিনিযুক্ত কোমল পানীয়ের এক ক্যানেই ৪০ গ্রাম পর্যন্ত মুক্ত চিনি থাকতে পারে।
লবণের বেলাতেও একই কথা। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তারিখের সোডিয়াম কমানো বিষয়ে ডব্লিউএইচওর তথ্যপত্র প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ২ হাজার মিলিগ্রামের কম সোডিয়াম, অর্থাৎ ৫ গ্রামের কম লবণ (এক চা চামচের সামান্য কম) খাওয়ার সুপারিশ করে; ২ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের শক্তির চাহিদা অনুযায়ী এই পরিমাণ আরও কমাতে বলা হয়েছে। তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রাপ্তবয়স্কদের গড় গ্রহণ দিনে ৪ হাজার ৩১০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম (১০.৭৮ গ্রাম লবণ), যা সুপারিশের দ্বিগুণেরও বেশি। বেশি সোডিয়ামযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগ; এর সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসার, স্থূলতা, অস্টিওপোরোসিস, মেনিয়ার্স রোগ ও কিডনি রোগের সম্পর্কও উল্লেখ করা হয়েছে। বিট লবণের বেশির ভাগই সোডিয়াম ক্লোরাইড এবং চাট মসলাতেও সাধারণত লবণ থাকে, তাই দুটিই দৈনিক এই সীমার হিসাবে ধরতে হবে। ডব্লিউএইচওর পরামর্শের একটি হলো, লবণের বদলে ভেষজ ও মসলা দিয়ে খাবারের স্বাদ বাড়ানো।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি রোগ থাকলে, কিংবা শিশুকে এমন মিষ্টি-নোনতা খাবার কতটা দেওয়া যায় তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ঘরে বানানো হিমায়িত খাবার নিরাপদ রাখতে
রান্না করা খাবারের মতো হিমায়িত খাবারেও রান্নাঘরের সাধারণ নিয়মগুলো খাটে। ২০০৬ সালে প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর ‘নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি’ এগুলোকে পাঁচ কথায় বলেছে: পরিষ্কার রাখুন; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন; ভালোভাবে রান্না করুন; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ফল ও সবজির ক্ষেত্রে আরও কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ দেয়:
- ফল-সবজি প্রস্তুতের আগে ও পরে সাবান ও কুসুম গরম পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুয়ে নিন।
- প্রস্তুতের আগে সব ফল-সবজি প্রবাহিত পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিন; সাবান, ডিটারজেন্ট বা বাণিজ্যিক প্রোডিউস ওয়াশ দিয়ে ফল ধোয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় না।
- শক্ত খোসার ফল-সবজি পরিষ্কার ব্রাশ দিয়ে ঘষে নিন, এবং থেঁতলানো বা নষ্ট অংশ কেটে ফেলে দিন।
- কাঁচা খাওয়া হবে এমন ফল-সবজি কাঁচা মাংস, মুরগি ও সামুদ্রিক খাবার থেকে আলাদা রাখুন।
- থার্মোমিটার দিয়ে দেখে নিন রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার নিচে এবং ফ্রিজারের তাপমাত্রা ০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার নিচে থাকছে কি না।
এই রেসিপিতে পানি ও আমের পিউরি একসঙ্গে ফোটানো হয় এবং জমানোর আগে মিশ্রণ ঠান্ডা করা হয়; এরপর ছাঁচ, কাঠি এবং যে হাত ললি স্পর্শ করবে, সেগুলোর জন্য ডব্লিউএইচওর প্রথম চাবিকাঠি, অর্থাৎ পরিষ্কার রাখা, প্রযোজ্য।
আরেকটি বিষয় আমকে ঘিরেই। ২০২১ সালে মেডিসিনা সাময়িকীতে প্রকাশিত রোমানিয়ার বুখারেস্টের ক্যারল দাভিলা ইউনিভার্সিটি অব মেডিসিন অ্যান্ড ফার্মেসির ই. সি. বেরগিয়া ও সহকর্মীদের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আমের কারণে হওয়া প্রধান অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস বা ত্বকে ফুসকুড়ি, তবে তা বিরল: চিকিৎসা সাহিত্যে গবেষকেরা ১২টি একক রোগীর প্রতিবেদন ও চারটি রোগীগুচ্ছের বিবরণ মিলিয়ে মোট ৩৭ জন রোগীর তথ্য পেয়েছেন। এর জন্য দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ করা হচ্ছে অ্যালকাইল বা অ্যালকেনাইল ক্যাটেকল ও রেসরসিনল জাতীয় যৌগকে। পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, পয়জন আইভির মতো ইউরুশিওলযুক্ত উদ্ভিদের সংস্পর্শে আগে সংবেদনশীল হয়ে থাকা মানুষের ক্ষেত্রে প্রথমবার আম ধরলেও এই ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। আম কাটাকুটির পর কারও ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ছবি: Roboture / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বাসস, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাপিডিয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স, মেডিসিনা, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)