দ্য এগ্রো নিউজের কাছে একটি প্রশ্ন বারবার আসে: হাতে অল্প টাকা থাকলে কীভাবে একটি ডেইরি খামার শুরু করা যায়? পকেটে টাকা থাকলে গরু কেনা সহজ কাজ। কঠিন কাজ হলো গরুর চারপাশের সবকিছু, যা নিউজরুমের নিজস্ব প্রতিবেদক ২০২৫ সালের ২ মে লিখেছিলেন: খামারের জায়গাটা কোথায়, কাছাকাছি পশু চিকিৎসক আছেন কি না, গরুর খাবার হাতের কাছে কেনা যায় কি না, সেখানে দুধের দাম কত এবং প্রতিদিন সহজে দুধ বিক্রি করা যায় কি না।
এই লেখায় সেই প্রতিবেদকের দুই গাভীর পরীক্ষামূলক খামারের পরিকল্পনা ও বাজেট অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, আর তা মিলিয়ে দেখা হয়েছে যাঁদের কাজই দুগ্ধ খাত, তাঁদের তথ্যের সঙ্গে: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং দেশের গবেষকেরা। এখানে জানবেন পরিকল্পনাটি কোন অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে, লেখার সময় দেশের দুধ খাতের অবস্থা কেমন ছিল, কম খরচে মজবুত গোয়ালঘর কীভাবে বানাবেন, গাভীকে কীভাবে খাওয়াবেন, প্রজনন করাবেন ও দোহন করবেন, হিসাব কীভাবে রাখবেন এবং সাহায্য কোথায় পাবেন।
দুই গাভীর পরিকল্পনা: বাজেট, আয় ও খরচ
প্রতিবেদক পরিকল্পনাটি সাজিয়েছিলেন তাঁদের জন্য, যাঁরা একেবারে ছোট আকারে, সবচেয়ে কম খরচে পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু করে ব্যবসাটা বুঝতে চান, অথবা যাঁদের বাজেট কম। তাঁর শুরু ৩,৮০,০০০ টাকার বাজেট এবং বাছুরসহ দুটি গাভী দিয়ে, যাদের প্রতিটি সেরা সময়ে দিনে অন্তত ১৫ লিটার দুধ দেয়। তাঁর গোয়ালঘরের মাপ ৩০ ফুট বাই ১৫ ফুট, এবং সেখানে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা থাকতেই হবে।
তিনি টাকাকে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন: এককালীন খরচ আর মাসিক খরচ। তাঁর উদাহরণে এককালীন খরচ ছিল:
- দুটি দুধের গাভী: ৩,০০,০০০ টাকা
- গোয়ালঘর: ৬০,০০০ টাকা
- বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ: ২০,০০০ টাকা
আয়ের দিকে তিনি ধরেছিলেন দিনে ২০ লিটার দুধ, প্রতি লিটার ৫০ টাকা দরে, অর্থাৎ দিনে ১,০০০ টাকা এবং মাসে ৩০,০০০ টাকা। ৩০ লিটার না ধরার কারণও তিনি বলেছিলেন: যে গাভী সেরা সময়ে ১৫ লিটার দেয়, সে আট মাসের দোহনকালের পুরোটা জুড়ে ১৫ লিটার দেবে না, দুধ ধীরে ধীরে কমবে; তাই তিনি প্রতিটি গাভীর গড় দিনে ১০ লিটার ধরেছিলেন।
তাঁর মাসিক খরচ ছিল:
- একজন কর্মচারীর বেতন: ৭,০০০ টাকা
- খাবার: প্রতি গাভীর দিনে ১৫০ টাকা, দুটির জন্য মাসে ৯,০০০ টাকা
- ওষুধ ও অন্যান্য: ২,০০০ টাকা
- মোট: ১৮,০০০ টাকা
তাঁর হিসাবে এতে মাসে ১২,০০০ টাকা লাভ থাকে, এবং শুরুতে খরচ করা ৩,৮০,০০০ টাকা উঠে আসতে ৩১ মাস, অর্থাৎ দুই বছর সাত মাস লাগবে বলে তিনি ধরেছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, খামারে গরু যত বেশি হবে, একজন কর্মচারীর বেতনের ভার প্রতি গরুতে তত কম পড়বে।
আয় ধরে রাখতে তাঁর কৌশল ছিল আট মাস পর দ্বিতীয় ধাপে আরও দুটি দুধের গাভী কেনা। তাঁর যুক্তি, এভাবে খামার একটি চক্রে ঢুকে যাবে এবং খাবার ও বেতনের টাকা কখনো পকেট থেকে দিতে হবে না। বড় দুর্ঘটনা বা অসুখবিসুখ, যা কারও নিয়ন্ত্রণে নেই, তা তাঁর হিসাবে ধরা হয়নি। এগুলো একজন লেখকের উদাহরণ, সরকারি কোনো খরচের মানদণ্ড নয়; গরু, খাবার ও দুধের দাম জেলা ও বছরভেদে আলাদা, তাই প্রতিটি লাইনে নিজের এলাকার দাম বসিয়ে তবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
হিসাব কীভাবে পড়বেন: দুধের দাম, খাবার ও সম্পদের খাতা
যেকোনো ডেইরি বাজেটে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঙ্ক হলো দুধের দাম। ২০২২ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, সে মাসের শুরুতে ৪ শতাংশ চর্বিযুক্ত কাঁচা দুধের খামার-পর্যায়ের দাম লিটারপ্রতি ৪১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজেলের দাম বাড়ার পর পশুখাদ্যের খরচ ১০ শতাংশ বেড়েছে, আর সয়াবিন মিল ও ভুট্টার দাম বেড়েছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। তাই লিটারপ্রতি ৫০ টাকার ওপর দাঁড়ানো পরিকল্পনার জন্য এমন ক্রেতা লাগবে যিনি সেই দাম দেবেন; এ কারণেই প্রতিবেদক আগে স্থানীয় দুধের দাম যাচাই করতে বলেছিলেন।
খাবার হলো আরেকটি বড় খরচ। এফএওর এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দুগ্ধ দলের তৈরি এবং ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত 'স্মল-স্কেল ডেইরি ফার্মিং ম্যানুয়াল' বলছে, সাধারণভাবে স্বীকৃত যে ১ কেজি ভালো দানাদার খাদ্যের মিশ্রণ ২ কেজি দুধ উৎপাদনে সহায়তা করে। তবে দানাদার যত বাড়ানো হয়, প্রতি বাড়তি কেজি থেকে দুধ তত কমে আসে, যাকে ক্রমহ্রাসমান প্রাপ্তির নিয়ম বলে; দানাদারের দাম যখন দুধের দামের কাছাকাছি বা তার বেশি, তখন এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদক তাঁর লেখা শেষ করেছিলেন পাঠকদের একটি অনুরোধে: আড়াই বছর পর খামারের সম্পদের পরিমাণ কত হবে, অর্থাৎ কয়টি গরু থাকবে এবং সেগুলোর দাম কত, তা হিসাব করে দেখুন। এফএওর ম্যানুয়াল ঠিক এই কাজের একটি সহজ পদ্ধতি দেয়। সেখানে প্রতিটি খরচ ও আয়কে তিন ভাগে রাখতে বলা হয়েছে:
- মূলধনী জিনিস, যা দীর্ঘদিন টেকে ও দাম বেশি: জমি, ঘর, দুধের ক্যানের মতো সরঞ্জাম এবং পশু নিজে।
- চলতি জিনিস, যা ব্যবহারে শেষ হয়: আঁশজাতীয় ও দানাদার খাবার, খনিজ মিশ্রণ, ওষুধ, জীবাণুনাশক ও সাবান, এবং শ্রমিক, কৃত্রিম প্রজনন ও পশু চিকিৎসকের মতো সেবার খরচ।
- ঋণ, কিস্তি ও সুদ, যা আলাদা রাখতে হয় যাতে লাভ আর নগদ টাকার প্রবাহ দুটোই বোঝা যায়।
আয়ের দিকে ম্যানুয়াল ধরে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, গোবর ও কম্পোস্ট বিক্রি। এটি পরামর্শ দেয় একটিমাত্র হিসাবের খাতা রাখতে, যা প্রতিদিন বা অন্তত প্রতি সপ্তাহে লেখা হবে, সঙ্গে রসিদগুলো আলাদা ফাইলে রাখা হবে; আর একটি মূলধনী হিসাব রাখতে, যেখানে প্রতি বছরের শুরু ও শেষে গোটা পালের দাম ধরা হবে। ম্যানুয়াল মনে করিয়ে দেয়, ঘর একসময় নতুন করে বানাতে হয়, মোটামুটি ২০ বছরে, আর সরঞ্জাম ৩ থেকে ৫ বছরে; তাই এই অবচয়ের জন্য টাকা আলাদা রাখা সৎ লাভ-ক্ষতির হিসাবের অংশ।
পরিকল্পনা লেখার সময় দেশের দুধের ঘাটতি
প্রতিবেদকের পরিকল্পনা এসেছিল এমন সময়ে, যখন দেশ তখনো প্রয়োজনের সব দুধ উৎপাদন করতে পারছিল না। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪' প্রকাশনাটি তৈরি করে। সেখানে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন হয়েছিল ১৫০.৪৪ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে চাহিদা ছিল ১৫৮.৭৮ লাখ মেট্রিক টন। চাহিদার এই হিসাব জনপ্রতি দিনে ২৫০ মিলিলিটার দুধ ধরে করা; প্রাপ্যতা ছিল জনপ্রতি দিনে ২৩৪.৪৫ মিলিলিটার।
উৎপাদন প্রতি বছরই বাড়ছিল। ডিএলএসের একই সারণিতে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১৯.৮৫ লাখ মেট্রিক টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৩০.৭৪ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪০.৬৮ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদনের কথা আছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০.১৩ লাখ, মহিষ ১৫.২৪ লাখ।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে (সাময়িক হিসাব) স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৮০ শতাংশ, কৃষিজ জিডিপিতে ১৬.৩৩ শতাংশ, আর খাতটির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.১৫ শতাংশ। ডিএলএসের হিসাবে প্রাণিসম্পদ খাত ২০ শতাংশ মানুষের প্রত্যক্ষ এবং ৫০ শতাংশ মানুষের আংশিক কর্মসংস্থান দেয়।
জায়গা বাছাই ও কম খরচে গোয়ালঘর
এফএওর ম্যানুয়াল ভালো গোয়ালঘরের কাজগুলো বলে দেয়: গরমে ও কড়া শীতে পশুকে রক্ষা করা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কম রাখা, খাবার নষ্ট হওয়া ঠেকানো, আঘাত থেকে রক্ষা করা, গোবর ও প্রস্রাব সহজে সরানো এবং খাওয়ানো, দোহন ও পরিষ্কারের কাজ সহজ করা। এতে ভালো বাতাস চলাচল এবং বাঁশের মতো সস্তা অথচ মজবুত স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের পরামর্শ আছে, যাতে মেরামতের খরচও কম থাকে। ঘর বানাতে হবে পানি সহজে নেমে যায় এমন জায়গায়, চারপাশে একটি অগভীর নালা রেখে।
প্রতিটি গাভী যেখানে দাঁড়ায় ও শোয়, সেই জায়গার জন্য ম্যানুয়ালের নির্দেশনা হলো:
- একটি সংকর জাতের দুধের গাভীর জন্য মোটামুটি ১.৬০ মিটার বাই ১.১০ মিটার জায়গা লাগে: যাতে সহজে শুতে ও উঠতে পারে, আবার এত বেশি নয় যে দাঁড়ানোর জায়গাতেই গোবর ও প্রস্রাব ফেলে।
- পেটানো মাটি ও নুড়ির মেঝে বানানো সবচেয়ে সস্তা; এটি নালার দিকে মোটামুটি ৩০-এ ১ (৩ শতাংশ) ঢালু রাখতে হয় এবং সমান রাখতে হয়, যাতে কাদা ও প্রস্রাব জমে না থাকে।
- ইটের খোয়া ও সিমেন্টের মেঝে বা কংক্রিটের মেঝেতে ঢাল কম, অন্তত ৬০-এ ১ (১.৫ শতাংশ) হলেই চলে; কংক্রিটের জন্য ম্যানুয়াল ১ ভাগ সিমেন্ট, ৩ ভাগ বালু ও ৩ ভাগ নুড়ির ৭.৫ সেন্টিমিটার পুরু স্তরের কথা বলে, যা জমাট বাঁধার সময় ২ থেকে ৩ দিন পানি ছিটিয়ে ভেজা রাখতে হয়।
- দুটি বড় পশুর মাঝের পার্টিশন সাধারণত মোটামুটি ১.১০ মিটার দূরে দূরে বসানো হয়, যাতে দোহনের সময় প্রতিটি গাভীর কাছে যাওয়া যায়; এতে এক গাভী অন্যের ওলান মাড়ায় না। কাঁটাতার কখনো ব্যবহার করা যাবে না, কোনো পেরেক বা ধারালো কিনারা বেরিয়ে থাকা চলবে না।
- বাছুরের জন্য বড় পশু থেকে আলাদা জায়গা দরকার।
টাকার টান থাকলে সব একবারে বানানোর দরকার নেই। ম্যানুয়াল ধাপে ধাপে বানানোর পদ্ধতি দেখায়: প্রথমে গাভী, বকনা ও বাছুরের থাকার জায়গা; পরে দুধের আয় থেকে বাছুরের খোপ, সবুজ ঘাস রাখার জায়গা ও হাঁটাচলার জায়গা; আর শেষে দানাদার খাবার, সরঞ্জাম, পানি ও দুধের পাত্রের জন্য আলাদা জায়গা। গোবর দিয়ে কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাস করা যায়, এতে মাছির উপদ্রবও কমে।

গাভী বাছাই: সংকর জাত ও মিল্কশেড এলাকার অভিজ্ঞতা
প্রতিবেদকের পরিকল্পনা দাঁড়িয়ে আছে এমন দুটি গাভীর ওপর, যাদের প্রতিটি সেরা সময়ে অন্তত ১৫ লিটার দুধ দেয়; বাংলাদেশে এর মানে সাধারণত দেশি নয়, সংকর জাতের গাভী। লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীতে ২০১০ সালে প্রকাশিত কে এম এ ইসলাম ও সহকর্মীদের একটি গবেষণায় বাঘাবাড়িঘাট মিল্কশেড এলাকার ৩০টি গ্রামের ৩০০ জন খামারির ওপর জরিপ চালানো হয়। এলাকাটি পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার পাঁচটি উপজেলা নিয়ে, যেখানে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড, যার ব্র্যান্ড নাম মিল্ক ভিটা, দুধ সংগ্রহ করে। গবেষণায় দেখা যায়, সংকর জাতের দুধের গাভী, বিশেষ করে অর্ধেক শাহিওয়াল ও অর্ধেক পাবনা মিল্কিং জাতের গাভী, দেশি বা অনির্দিষ্ট জাতের গাভীর চেয়ে সংখ্যায় এগিয়ে ছিল।
একই গবেষণায় দেখা যায়, মিল্ক ভিটার কেন্দ্র থেকে দূরত্ব খামারিরা কোন গরু রাখবেন এবং কীভাবে পালবেন, তা প্রভাবিত করেছিল। এটি প্রতিবেদকের পরামর্শকেই সমর্থন করে: নির্ভরযোগ্য ক্রেতার কাছাকাছি খামার করা ভালো।
দুধের গাভী কেনা মানে তার প্রজননের ইতিহাসও কেনা। এফএওর ম্যানুয়াল লক্ষ্য ঠিক করে দেয় যে একটি দুধের গাভীর প্রতি ৩৬৫ দিনে একবার বাচ্চা দেওয়া উচিত, যাতে জীবনের বেশির ভাগ সময় সে দুধে থাকে। যে গাভীর দুই বাচ্চার মাঝে লম্বা বিরতি, সে মাসের পর মাস দুধ না দিয়েই খায়।
খাবার, পানি ও সবুজ ঘাস
গরুর শরীর আঁশজাতীয় খাবারের জন্যই তৈরি। এফএওর ম্যানুয়াল জানায়, গরুর শুধু রুমেনেই ১৫০ লিটার পর্যন্ত ধরে। পশু দিনে কতটা শুষ্ক পদার্থ খায়, অর্থাৎ খাবারের যে অংশে পুষ্টি থাকে, তার একটি সহজ হিসাবও এতে আছে: মোটামুটি দেহের ওজনের ৩ শতাংশ। এর সঙ্গে বলা হয়েছে, এই শুষ্ক পদার্থের আদর্শভাবে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ হওয়া উচিত অশোধিত আঁশ, যা রুমেনকে সচল রাখে।
পানির কথা অনেকে ভুলে যান। ম্যানুয়াল অনুযায়ী, গাভী যত কেজি শুষ্ক পদার্থ খায়, প্রতি কেজির জন্য তার ৪ থেকে ৬ লিটার পানি লাগে, এবং দুধের গরুর সারাক্ষণ খাওয়ার পানি পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত; তা সম্ভব না হলে অন্তত দিনে দুবার যত পানি খেতে চায়, ততটা দিতে হবে।
ঘাস যে ঘাটতি পূরণ করতে পারে না, দানাদার তা পূরণ করে। ১ কেজি দানাদারে ২ কেজি দুধের নিয়মের পাশাপাশি ম্যানুয়াল জোর দিয়ে বলে, দানাদারের সঙ্গে বা আলাদা চাটার উপকরণ হিসেবে উপযুক্ত খনিজ মিশ্রণ দিতে হবে। কম খাওয়ানো গাভী কম দুধ দেয় এবং নিয়মিত গর্ভধারণ নাও করতে পারে, তাতে দুই বাচ্চার মাঝের বিরতি লম্বা হয়।
নিজে সবুজ ঘাস চাষ করলে খাবারের খরচ কমে। ম্যানুয়াল প্রধান ঘাস ফসলের মধ্যে নেপিয়ার ঘাস, যার আরেক নাম হাতি ঘাস, এবং এর হাইব্রিড জাতের নাম উল্লেখ করেছে; বলেছে, ভালো ব্যবস্থাপনায় হাইব্রিড নেপিয়ার অনেক বেশি ফলন দিতে পারে। নেপিয়ার লাগানো হয় দুই বা তিনটি গিঁটওয়ালা কাণ্ডের কাটিং মাটিতে কাত করে পুঁতে। নিজের এলাকার উপযোগী জাত ও চারার জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যোগাযোগ করুন।

প্রজনন, বাছুর ও পরিষ্কারভাবে দোহন
দুই গাভীর খামার আয় করে কেবল তখনই, যখন গাভী দুধে থাকে; তাই প্রজনন বাজেটেরই অংশ। এফএওর ম্যানুয়াল ব্যাখ্যা করে, গাভী মোটামুটি প্রতি ২১ দিনে (১৮ থেকে ২৪ দিনের মধ্যে) গরম হয়, এবং গরম অবস্থা থাকে মোটামুটি ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা। ভোরে, বিকেলে দোহনের আগে এবং রাতে ঘুমানোর আগে নজর রাখুন, কারণ কিছু লক্ষণ সহজে চোখ এড়িয়ে যায়।
কৃত্রিম প্রজননের জন্য ম্যানুয়ালের সহজ নিয়ম: ভোরে গরমের লক্ষণ দেখা গেলে সেদিন বিকেলে প্রজনন করান; বিকেলে দেখা গেলে পরদিন ভোরে। প্রজননের ৬০ দিন পরও গরমের লক্ষণ না দেখা গেলে গাভী গর্ভবতী কি না পরীক্ষা করাতে টেকনিশিয়ানকে ডাকুন। সম্ভাব্য বাচ্চা দেওয়ার ৬০ দিন আগে গাভীর দোহন বন্ধ করতে হয়, যাতে গাভী ও বাছুর দুটোই প্রস্তুত থাকে।
নবজাতক বাছুরের জন্য ম্যানুয়াল বলছে, অন্তত ৪ দিন শালদুধ দরকার: পুষ্টির জন্য, রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য এবং প্রথম গোবর বের হতে সাহায্যের জন্য। বাছুর মায়ের সঙ্গে থাকলে জন্মের ৩ ঘণ্টার মধ্যে প্রথমবার দুধ খাওয়া উচিত।
পরিষ্কার দোহন দুধের দাম রক্ষা করে। ম্যানুয়ালের মূল কথাগুলো:
- দোহনের আগে জায়গাটি ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করুন এবং সরঞ্জাম পরিষ্কার রাখুন, কারণ নোংরা পাত্রে জীবাণু দ্রুত বাড়ে।
- গাভীকে চিৎকার করে, মেরে বা লাথি দিয়ে ভয় দেখাবেন না; শান্ত গাভী সহজে দুধ ছাড়ে।
- ওলান ধোয়ার পরপরই দোহন করুন, কারণ ধোয়ার পর ৫ থেকে ৭ মিনিট দুধ নামার প্রতিবর্ত ক্রিয়া সক্রিয় থাকে।
- প্রতিটি গাভীর জন্য আলাদা ওলান মোছার কাপড় ব্যবহার করুন, এতে ওলানফোলা রোগ (ম্যাসটাইটিস) ছড়ানোর ঝুঁকি অনেক কমে।
- দোহনের সময় খড় খাওয়াবেন না, ধুলা দুধে মিশতে পারে; দুধ ছেঁকে নিন এবং খোলা বালতিতে ফেলে রাখবেন না।
- অসুস্থ মানুষ দোহন করবেন না, কারণ রোগ অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে।

রোগ প্রতিরোধ এবং সাহায্য কোথায় পাবেন
এফএওর ম্যানুয়াল এ অঞ্চলের দুধের গরুর গুরুত্বপূর্ণ রোগের তালিকায় রেখেছে তড়কা (অ্যানথ্রাক্স), বাদলা, ব্রুসেলোসিস, গলাফোলা (হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া), ওলানফোলা, যক্ষ্মা ও ক্ষুরারোগ, সঙ্গে পরজীবী এবং পেটফাঁপা ও দুধজ্বরের মতো বিপাকজনিত সমস্যা।
পরিকল্পনাটি লেখার আগেই বাংলাদেশে একটি নতুন হুমকি পৌঁছেছিল। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ফ্রন্টিয়ার্স ইন মাইক্রোবায়োলজি সাময়িকীতে মোহাম্মদ আসির উদ্দিন, মুহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন ও সহকর্মীদের প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে লাম্পি স্কিন ডিজিজের (এলএসডি) প্রাদুর্ভাবের প্রথম খবর আসে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে, কীটপতঙ্গবাহিত এই রোগ ২০১৯-২০ সালে প্রায় প্রতিটি জেলায় পৌঁছে যায়, এবং সন্দেহভাজন গরু থেকে নেওয়া ১৮০টি গুটির নমুনার ১৫১টিতে ভাইরাস শনাক্ত হয়।
এফএওর ম্যানুয়ালের প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো যেকোনো ছোট খামারে মানা যায়:
- নিজের এলাকায় যে রোগগুলো আছে, সেগুলোর টিকা দিন, স্থানীয় প্রাণিস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে তৈরি সময়সূচি মেনে।
- প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত কৃমিনাশক দিন এবং আঁটুলি ও অন্যান্য পরজীবী দমন করুন।
- অসুস্থ পশু বা সংক্রামক রোগ আছে এমন এলাকার পশু খামারে আনবেন না, আর অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশু থেকে আলাদা রাখুন।
- খাওয়া, আচরণ, শরীর থেকে নিঃসরণ বা প্রজননে পরিবর্তন দেখলে দ্রুত পরামর্শ নিন; কোনো পশু হঠাৎ মারা গেলে রোগ নির্ণয় করান।
এই লেখায় কোনো ওষুধের নাম বা মাত্রা দেওয়া হয়নি। টিকা, চিকিৎসা ও যেকোনো ওষুধের জন্য নিবন্ধিত পশু চিকিৎসক বা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যোগাযোগ করুন: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দপ্তর আছে। অধিদপ্তর প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পও (এলডিডিপি) বাস্তবায়ন করছে, যা বিশ্বব্যাংক ২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণসহ অনুমোদন করে; প্রকল্পের ঘোষিত লক্ষ্য নির্বাচিত প্রাণিসম্পদ ভ্যালু চেইনে ক্ষুদ্র খামারি ও কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎপাদনশীলতা, বাজারে প্রবেশাধিকার ও সহনশীলতা বাড়ানো।
ছবি: সৈয়দ সাজিদুল ইসলাম / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪), এফএও স্মল-স্কেল ডেইরি ফার্মিং ম্যানুয়াল (১৯৯৩), লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (ইসলাম ও সহকর্মী, ২০১০), ফ্রন্টিয়ার্স ইন মাইক্রোবায়োলজি (উদ্দিন, হোসেন ও সহকর্মী, ২০২৪), দ্য ডেইলি স্টার, বিশ্বব্যাংক




মন্তব্য
(০)