ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই, সোমবার, মাদ্রাজ হাইকোর্টের একটি আদেশ স্থগিত করেন। ওই আদেশে তামিলনাড়ু সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, বকরি ঈদ (ঈদুল আজহা) বা অন্য যে কোনো দিনে রাজ্যের কোথাও যেন কোনো গরু বা বাছুর জবাই না হয়। রাজ্য সরকারের করা একটি বিশেষ অনুমতির আবেদনে (স্পেশাল লিভ পিটিশন) নোটিশ জারি করে বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ এই অন্তর্বর্তী আদেশ দেন। লাইভ ল, বার অ্যান্ড বেঞ্চ, দ্য নিউজ মিনিট ও আউটলুকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ দেন যে হাইকোর্টের রায়ের শেষ অনুচ্ছেদ, অর্থাৎ যে অংশে রাজ্যজুড়ে নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ ছিল, প্রাথমিকভাবে ‘সংশোধন’ প্রয়োজন।
হাইকোর্টের আদেশটি এসেছিল ২০২৬ সালের ২৭ মে, বকরি ঈদের আগের দিন। অথচ যে আবেদনের ভিত্তিতে আদেশ, তার দাবি ছিল আরও সীমিত: কোয়েম্বাটুরে প্রকাশ্য স্থানে গরু ও বাছুর জবাই বন্ধ করা এবং জবাই কেবল নির্ধারিত কসাইখানায় সীমিত রাখা। তামিলনাড়ু সরকার সুপ্রিম কোর্টে যুক্তি দেয়, হাইকোর্ট আবেদনের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন এবং জবাই নিয়ন্ত্রণকারী একটি আইনের জায়গায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা বসিয়ে দিয়েছেন। ১৩ জুলাইয়ের স্থগিতাদেশ ছিল অন্তর্বর্তী প্রতিকার; সেদিন সুপ্রিম কোর্ট বিরোধের মূল প্রশ্নে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।
১৩ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট যা করেছেন
বিচারপতি নাথ ও বিচারপতি মেহতার বেঞ্চ রাজ্যের আবেদন শোনেন, প্রতিপক্ষদের প্রতি নোটিশ জারি করেন এবং আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের নির্দেশগুলো স্থগিত রাখেন। ইটিভি ভারত জানায়, হাইকোর্টের শেষ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রয়োজন নিয়ে পর্যবেক্ষণটি বেঞ্চ আদালতে মৌখিকভাবে দেন। ১৩ জুলাইয়ের কোনো প্রতিবেদনে পরবর্তী শুনানির তারিখ উল্লেখ ছিল না।
আবেদনটি করা হয়েছিল রাজ্যের পশুপালন, দুগ্ধ উন্নয়ন, মৎস্য ও জেলে কল্যাণ বিভাগের সচিবের নামে। ফ্রি প্রেস জার্নাল ১ জুলাই লাইভ ল ও বার অ্যান্ড বেঞ্চের বরাতে জানায়, সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট অনুযায়ী আবেদনটি ৯ জুন দাখিল হয় এবং দাখিলের ত্রুটি সংশোধনের জন্য তা ত্রুটি তালিকায় রাখা হয়। রাজ্য সরকার যে সুপ্রিম কোর্টে গেছে, সে খবর ১ জুলাই বার অ্যান্ড বেঞ্চ, দ্য উইক ও ফ্রি প্রেস জার্নালে প্রকাশিত হয়।
আউটলুক জানায়, হাইকোর্টের আবেদনকারী পক্ষ সুপ্রিম কোর্টে একটি ক্যাভিয়েট দাখিল করেছিলেন, অর্থাৎ মামলায় কোনো আদেশ দেওয়ার আগে তাদের বক্তব্য শোনার আবেদন।
সুপ্রিম কোর্ট ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার চূড়ান্ত আপিল আদালত। সংবিধান কার্যকর হওয়ার দুই দিন পর, ১৯৫০ সালের ২৮ জানুয়ারি এর বিচারপতিরা প্রথম আসন গ্রহণ করেন; ১৯৫৮ সাল থেকে আদালতটি নয়াদিল্লির নিজস্ব ভবনে কাজ করছে। বিশেষ অনুমতির আবেদন হলো নিম্নতর আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চাওয়া, যা এ মামলায় তামিলনাড়ু সরকার করেছে।

২৭ মে হাইকোর্টের আদেশ
ভার্ডিক্টাম জানায়, হাইকোর্টে মামলাটির নাম ছিল কে. সূর্য বনাম সচিব, পশুপালন, দুগ্ধ উন্নয়ন, মৎস্য ও জেলে কল্যাণ বিভাগ (রিট পিটিশন নম্বর ২০২২৫/২০২৬)। গ্রীষ্মকালীন ছুটির বেঞ্চে বিচারপতি জি. আর. স্বামীনাথন ও বিচারপতি ভি. লক্ষ্মীনারায়ণন মামলাটি শোনেন।
মামলার শিরোনামে কে. সূর্য নামে উল্লেখিত আবেদনকারীর অভিযোগ ছিল, বকরি ঈদে কোরবানির জন্য নির্ধারিত কসাইখানার বাইরের জায়গায় গরু ও বাছুর জবাইয়ের আয়োজন চলছে, আর কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো তার আবেদন বিবেচনা করা হয়নি। তিনি প্রকাশ্য স্থানে এমন জবাই বন্ধের নির্দেশনা চান। ফ্রি প্রেস জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, আবেদনটি কোয়েম্বাটুর নিয়ে ছিল এবং তাতে জবাই অনুমোদিত কসাইখানায় সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছিল।
বেঞ্চ আবেদনটি মঞ্জুর করেন এবং আবেদনের দাবির চেয়েও এগিয়ে যান। তামিলনাড়ু রাজ্যকে নির্দেশ দেওয়া হয়, ‘বকরি ঈদের আগের দিন বা অন্য যে কোনো দিনে কোনো গরু বা বাছুর যেন জবাই না হয়’ তা নিশ্চিত করতে। মুখ্য সচিব এবং অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিচালককে (আইনশৃঙ্খলা) সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে বলা হয়, যাতে আদেশ লঙ্ঘিত না হয়; কোনো কোনো প্রতিবেদনে এর বদলে পুলিশ মহাপরিচালকের নাম এসেছে। আদালত আরও বলেন, ছাগল ও ভেড়াসহ কোনো পশুই নির্ধারিত কসাইখানার বাইরে জবাইয়ের অনুমতি কর্তৃপক্ষ দিতে পারবে না। মনোরমা নিউজ জানায়, অস্থায়ী জবাইয়ের ছাউনির বিকল্পও আদালত গ্রহণ করেননি। দ্য কুইন্ট জানায়, আদেশ পালনের বিষয়ে সরকারের প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য মামলাটি ২৯ মে আবার তালিকায় রাখা হয়।
আদেশদাতা মাদ্রাজ হাইকোর্টের এখতিয়ার তামিলনাড়ু রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরি জুড়ে। ১৮৬২ সালের ২৬ জুন জারি করা লেটার্স প্যাটেন্টে প্রতিষ্ঠিত ভারতের তিনটি চার্টার্ড হাইকোর্টের এটি একটি। আদালতটি চেন্নাইয়ে অবস্থিত এবং ২০০৪ সালের ২৪ জুলাই থেকে মাদুরাইয়ে এর একটি বেঞ্চ রয়েছে।

হাইকোর্টের যুক্তি
বেঞ্চ তাদের আদেশের ভিত্তি করেন ১৯৭৬ সালের আগস্টে জারি করা তামিলনাড়ুর কৃষি বিভাগের সরকারি আদেশ নম্বর ১৭১৫-কে; প্রতিবেদনে এর তারিখ ১৯৭৬ সালের ৩০ আগস্ট বলা হয়েছে। ওই আদেশে রাজ্যের সব কসাইখানায় গাভী ও বকনা জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল দুধ উৎপাদন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের স্বার্থ। দ্য কুইন্ট জানায়, রায়ের লেখক বিচারপতি স্বামীনাথন লেখেন, নির্বাহী ক্ষমতা আইন প্রণয়নের ক্ষমতার সমান পরিসরের বলে গরু জবাই নিষিদ্ধ করার সরকারি আদেশ টেকসই এবং তার আইনের শক্তি রয়েছে।
বেঞ্চ সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ওপর নির্ভর করেন, যা রাষ্ট্রকে গরু, বাছুর এবং অন্যান্য দুগ্ধবতী ও ভারবাহী গবাদিপশুর জবাই নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নিতে বলে। ১৯৫৮ সালের তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইনের ৪ ধারা সীমিত কিছু ক্ষেত্রে গরু জবাইয়ের অনুমতি দেয়; বেঞ্চের মতে এই ধারা ৪৮ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাই একে কঠোরভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। দ্য কুইন্ট আরও জানায়, রায়ে গোরক্ষায় মহাত্মা গান্ধীর অবস্থান এবং স্বাধীনতার পর রাজ্যগুলোর প্রণীত আইনের কথা উল্লেখ করা হয়।
দ্য নিউজ মিনিটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্মীয় রীতির প্রশ্নে বেঞ্চ সুপ্রিম কোর্টের তিনটি রায় উদ্ধৃত করেন: মোহাম্মদ হানিফ কুরেশি বনাম বিহার রাজ্য (১৯৫৮), পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বনাম আশুতোষ লাহিড়ী (১৯৯৫) এবং গুজরাট রাজ্য বনাম মির্জাপুর মোতি কুরেশি কাসাব জামাত (২০০৫)। আশুতোষ লাহিড়ী মামলা উদ্ধৃত করে আদালত বলেন, বকরি ঈদে গরু জবাই ‘ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অপরিহার্য অংশ নয়, আবশ্যকও নয়’। ভার্ডিক্টাম জানায়, হানিফ কুরেশি মামলা থেকে বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ নেন যে অনেক মুসলিম বকরি ঈদে গরু কোরবানি দেন না এবং এমন কোরবানি বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কাজ নয়।
বেঞ্চ পৌর আইনও উদ্ধৃত করেন। তামিলনাড়ু নগর স্থানীয় সংস্থা আইনের ১১৩ ধারা অনুযায়ী পশু জবাই কেবল নির্ধারিত স্থানে করা যায়, আর ২০২৩ সালের তামিলনাড়ু নগর স্থানীয় সংস্থা বিধিমালার ২৯৭ ও ২৯৮ বিধি নির্ধারিত কসাইখানার বাইরে জবাইয়ের অনুমতি দিতে কর্তৃপক্ষকে নিষেধ করে।
রাজ্য সরকারের আপিলের যুক্তি
ফ্রি প্রেস জার্নাল, দ্য উইক, বার অ্যান্ড বেঞ্চ ও দ্য নিউজ মিনিটের প্রতিবেদনে রাজ্যের প্রধান যুক্তিগুলো এভাবে এসেছে:
- হাইকোর্ট সামনে থাকা আবেদনের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন এবং এমন প্রতিকার দিয়েছেন, যা আবেদনে উত্থাপিত হয়নি, চাওয়াও হয়নি।
- আদেশটি ১৯৫৮ সালের তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইনের পরিপন্থী; এই আইন গরু জবাই নিষিদ্ধ করে না, নিয়ন্ত্রণ করে, এবং দশ বছরের বেশি বয়সী, কাজ ও প্রজননের অযোগ্য গাভী উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সনদ নিয়ে জবাইয়ের অনুমতি দেয়।
- ১৯৬০ সালের প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইন, ২০০১ সালের প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ (কসাইখানা) বিধিমালা, ১৯৯৮ সালের তামিলনাড়ু নগর স্থানীয় সংস্থা আইন এবং ২০২৩ সালের তামিলনাড়ু নগর স্থানীয় সংস্থা বিধিমালা কোথায় ও কীভাবে পশু জবাই হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে না।
- পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট আইনি কাঠামোর জায়গায় আদালতের নির্দেশ বসিয়েছেন; রাজ্য একে ‘বিচারিক আইন প্রণয়ন’ বলে বর্ণনা করে।
- রায়টি ১৯৭৬ সালের ১৭১৫ নম্বর সরকারি আদেশের ওপর নির্ভর করেছে, অথচ ওই আদেশের বৈধতা আদালতের বিবেচ্য বিষয় ছিল না, আর নির্বাহী নির্দেশনা আইনের বিধানকে ছাপিয়ে যেতে পারে না।
- রায়টি স্ববিরোধী: একদিকে বলা হয়েছে জবাই কেবল নির্ধারিত কসাইখানায় হতে পারে, অন্যদিকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কসাইখানাতেও গরু ও বাছুর জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- হাইকোর্ট ভুলভাবে ধরে নিয়েছেন যে কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্য স্থানে গরু জবাই হচ্ছে বা হবে বলে স্বীকার করেছে। রাজ্যের পাল্টা হলফনামায় বলা হয়েছিল, পুলিশ নজরদারি বাড়িয়েছে, নির্ধারিত কসাইখানা চিহ্নিত করা হয়েছে, পরিদর্শনের জন্য কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে এবং যে কোনো ধর্মীয় কোরবানি ঘেরা, অপ্রকাশ্য স্থানে সীমিত রাখা হয়েছে।
- হাইকোর্ট পরীক্ষা করেছেন গরু কোরবানি ইসলামে অপরিহার্য ধর্মীয় রীতি কি না, অথচ কোনো পক্ষ এ প্রশ্ন তোলেনি এবং মামলা নিষ্পত্তির জন্য তার প্রয়োজনও ছিল না।
১৯৫৮ সালের তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইনে যা আছে
বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে রাজ্যের এই ১৯৫৮ সালের আইন। প্রকাশিত আইনের পাঠ অনুযায়ী, এর ২(ক) ধারায় ‘পশু’ বলতে বোঝানো হয়েছে ষাঁড়, বলদ, গাভী, বাছুর, পুরুষ মহিষ, মাদি মহিষ বা মহিষের বাছুর; অর্থাৎ আইনটি গরুর পাশাপাশি মহিষকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
৩ ধারা অনুযায়ী সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিটি এলাকার জন্য একজন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করে। ৪(১) ধারা বলে, ওই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পশুটি জবাইয়ের উপযুক্ত বলে সনদ না নিয়ে কেউ কোনো পশু জবাই করতে বা করাতে পারবে না। ৪(৩) ধারা অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে কারণ উল্লেখ করে সনদ দিতে পারে কেবল দুই ক্ষেত্রে: পশুটির বয়স দশ বছরের বেশি এবং তা কাজ ও প্রজননের অযোগ্য; অথবা আঘাত, বিকৃতি বা দুরারোগ্য রোগে পশুটি কাজ বা প্রজননের জন্য স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে।
৫ ধারা অনুযায়ী সনদ না পেলে প্রত্যাখ্যানের কথা জানানোর পনেরো দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করা যায়, আর সরকার নিজ উদ্যোগেও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে পারে। ৬ ধারা জবাইকে নির্ধারিত কসাইখানা বা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের ঠিক করে দেওয়া স্থানে সীমিত রাখে।
৮ ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে। জবাইয়ের উপযুক্ত সনদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো পশুকে বিষ দেওয়া, পঙ্গু করা বা অন্যভাবে অকেজো করে তোলার শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ এক হাজার রুপি জরিমানা বা উভয় দণ্ড। আইন বা এর বিধিমালার অন্য যে কোনো লঙ্ঘনের শাস্তি সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ এক হাজার রুপি জরিমানা বা উভয় দণ্ড।
জবাই নিয়ে জাতীয় বিধিবিধান
রাজ্যের আইনের পাশাপাশি সারা ভারতে প্রযোজ্য কেন্দ্রীয় আইন হলো ১৯৬০ সালের প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইন। এর ২৮ ধারার শিরোনাম ‘ধর্মে নির্ধারিত হত্যার পদ্ধতি সম্পর্কিত ব্যতিক্রম’; এতে বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মে নির্ধারিত পদ্ধতিতে কোনো পশু হত্যা এই আইনের কোনো বিধানে অপরাধ বলে গণ্য হবে না। এই আইনের অধীনে ১৯৬২ সালে ভারতের অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার বোর্ড গঠিত হয়।
১৯৬০ সালের আইনের অধীনে প্রণীত ২০০১ সালের প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ (কসাইখানা) বিধিমালায় জবাইয়ের নিয়ম নির্ধারিত আছে। এতে কসাইখানা বলতে বোঝানো হয়েছে এমন স্থান, যেখানে দিনে দশ বা তার বেশি পশু জবাই হয় এবং যা কেন্দ্রীয়, রাজ্য বা প্রাদেশিক আইনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বা স্বীকৃত। প্রধান বিধিগুলো হলো:
- বিধি ৩(১): আইনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের স্বীকৃত বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত কসাইখানা ছাড়া পৌর এলাকার ভেতরে কেউ কোনো পশু জবাই করতে পারবে না।
- বিধি ৩(২): গর্ভবতী পশু, তিন মাসের কম বয়সী বাচ্চা আছে এমন পশু, নিজেই তিন মাসের কম বয়সী পশু, কিংবা ভেটেরিনারি চিকিৎসক জবাইয়ের উপযুক্ত বলে সনদ দেননি এমন পশু জবাই করা যাবে না।
- বিধি ৩(৩): দিনে সর্বোচ্চ কতটি পশু জবাই করা যাবে, তা পৌর বা অন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে।
- বিধি ৪: একজন ভেটেরিনারি চিকিৎসক ঘণ্টায় ১২টির বেশি এবং দিনে ৯৬টির বেশি পশু পরীক্ষা করবেন না, এবং পরীক্ষার পর উপযুক্ততার সনদ দেবেন।
- বিধি ৫: ভেটেরিনারি পরিদর্শন শেষে প্রতিটি পশুকে জবাইয়ের আগে ২৪ ঘণ্টা বিশ্রামাগারে রাখতে হবে।
- বিধি ৬: কসাইখানায় অন্য পশুর চোখের সামনে কোনো পশু জবাই করা যাবে না।
রাজ্যে পশু জবাই আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত কসাইখানায় গরু জবাইয়ের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা এসব বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, এই যুক্তি দিতে গিয়ে তামিলনাড়ু সরকার এসব বিধির কথাই উল্লেখ করে।
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ ও সুপ্রিম কোর্টের আগের রায়
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্র কৃষি ও পশুপালনকে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংগঠিত করার চেষ্টা করবে এবং বিশেষ করে গরু, বাছুর ও অন্যান্য দুগ্ধবতী ও ভারবাহী গবাদিপশুর জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন এবং এদের জবাই নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নেবে। ১৯৪৮ সালের খসড়া সংবিধানে এটি ছিল না। খসড়া অনুচ্ছেদ ৩৮-ক হিসেবে এটি আনা হয়, গণপরিষদে ১৯৪৮ সালের ২৪ নভেম্বর এ নিয়ে বিতর্ক হয়, এবং ১৯৪৯ সালের ১৪ নভেম্বর আবার আলোচনায় একটি সংশোধনীর মাধ্যমে পরিষদের প্রথমে গৃহীত ভাষ্য ফিরিয়ে আনা হয়। গণপরিষদ একে আদালতে বলবৎযোগ্য মৌলিক অধিকারের মধ্যে না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতির মধ্যে রাখে, যা আইন প্রণয়নে দিকনির্দেশনা দেয়।
গরু জবাই সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করে রাজ্যগুলো; উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান ও মধ্য প্রদেশের মতো রাজ্য ১৯৫০-এর দশকে নিজস্ব আইন করে। ১৯৫৮ সালে হানিফ কুরেশি মামলায় এসব আইনকে ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন বলে চ্যালেঞ্জ করা হয়, যার মধ্যে বকরি ঈদে গরু কোরবানির প্রশ্নও ছিল। সুপ্রিম কোর্ট দেখতে পান, কোরআন বা হিদায়া কোনোটিতেই গরু কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়, কারণ এর বদলে ছাগল বা উট কোরবানি দেওয়া যায়; তাই আদালত রায় দেন, গরু জবাইয়ের নিষেধাজ্ঞা মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন করে না।
পশ্চিমবঙ্গ সংক্রান্ত ১৯৯৫ সালের আশুতোষ লাহিড়ী রায়ে আবারও বলা হয়, বকরি ঈদে গরু জবাই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অপরিহার্য অংশ নয়। ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর গুজরাটের মির্জাপুর মোতি কুরেশি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট গরু জবাইবিরোধী রাজ্য আইনগুলোর সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রাখেন। ২০২৬ সালের ২৭ মে মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়ে এই তিনটি রায়ই উদ্ধৃত হয়।
২০২৬ সালের বকরি ঈদের আগে প্রশ্নটি অন্য পথেও সুপ্রিম কোর্টে উঠেছিল। দ্য কুইন্ট ২৮ মে জানায়, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন একটি বেঞ্চ উৎসবের আগে সারা দেশে গরু জবাই নিষিদ্ধের দাবিতে করা একটি আবেদনের জরুরি শুনানি করতে অস্বীকৃতি জানান, সময়ের স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে।
বকরি ঈদ ও কোরবানির রীতি
ঈদুল আজহা, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক জায়গায় যা বকরি ঈদ নামে পরিচিত, ইসলামের দুই প্রধান উৎসবের দ্বিতীয়টি। এটি পালিত হয় ইসলামি বর্ষপঞ্জির শেষ মাস জিলহজের ১০ তারিখে, আর এর আচার চলে পরের তিন দিন পর্যন্ত। ঈদের নামাজের পর সামর্থ্যবান মুসলিমরা আল্লাহর নির্দেশে নিজ পুত্রকে কোরবানি করতে হজরত ইবরাহিমের প্রস্তুতির স্মরণে হালাল গবাদিপশু কোরবানি করেন, সাধারণত ছাগল, ভেড়া, দুম্বা বা উট। পশুটিকে বয়স ও স্বাস্থ্যের নির্ধারিত মান পূরণ করতে হয়, আর মাংস সাধারণত তিন ভাগ করা হয়: এক ভাগ পরিবারের, এক ভাগ বন্ধু ও আত্মীয়দের এবং এক ভাগ দরিদ্রদের।
দ্য উইক জানায়, ২০২৬ সালে ভারতে বকরি ঈদ ছিল ২৮ মে; এ কারণেই ২৭ মের হাইকোর্ট আদেশকে উৎসবের আগের দিনের আদেশ বলা হয়েছে। গরু কোরবানি উৎসবের জন্য অপরিহার্য কি না, হাইকোর্টের এই আলোচনাকেও রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে বাতিল করার আবেদন জানায়, কারণ তাদের যুক্তিতে প্রশ্নটি আবেদনের বিষয়বস্তু থেকে ওঠেনি।
কোরবানিতে যে পশুগুলোর দিকে মানুষ ঝোঁকে, সেগুলোও তামিলনাড়ুর প্রাণিসম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১৯ সালের বিংশ প্রাণিসম্পদ শুমারিতে রাজ্যে ৯.৮৯ মিলিয়ন ছাগল ও ৪.৫ মিলিয়ন ভেড়া গণনা করা হয়, যেখানে ২০১২ সালে ছাগল ছিল ৮.১৪ মিলিয়ন ও ভেড়া ৪.৮ মিলিয়ন।
ভারত ও তামিলনাড়ুর গবাদিপশু ও দুগ্ধ খাত
হাইকোর্ট যে ১৯৭৬ সালের সরকারি আদেশের ওপর নির্ভর করেছেন, তাতে গরু জবাই নিষেধাজ্ঞাকে দুধ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। ভারতের পশুপালন ও দুগ্ধ উন্নয়ন বিভাগ ২০১৯ সালে যে বিংশ প্রাণিসম্পদ শুমারির মূল ফল প্রকাশ করে, তাতে দেশে প্রাণিসম্পদের সংখ্যা ছিল ৫৩৫.৭৮ মিলিয়ন, যা ২০১২ সালের চেয়ে ৪.৬ শতাংশ বেশি। গরু, মহিষ, মিঠুন ও ইয়াক মিলিয়ে গোজাতীয় পশু ছিল ৩০২.৭৯ মিলিয়ন। গরু ছিল ১৯২.৪৯ মিলিয়ন, যা ০.৮ শতাংশ বেশি; এর মধ্যে স্ত্রী গরু ১৪৫.১২ মিলিয়ন। বিদেশি ও সংকর জাতের গরু ছিল ৫০.৪২ মিলিয়ন, দেশি ও অনির্দিষ্ট জাতের গরু ১৪২.১১ মিলিয়ন; ২০১২ সালের তুলনায় দেশি গরুর মোট সংখ্যা ৬ শতাংশ কমেছিল। দুধ দিচ্ছে বা শুকনো অবস্থায় আছে এমন গাভী ও মাদি মহিষ মিলিয়ে দুগ্ধবতী পশু ছিল ১২৫.৩৪ মিলিয়ন।
২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর জাতীয় দুগ্ধ দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ভারত সরকারের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৪ সালে ভারতের দুধ উৎপাদন ছিল ২৩৯.৩০ মিলিয়ন টন, যা ২০১৪-১৫ সালে ছিল ১৪৬.৩০ মিলিয়ন টন, এবং বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ দুধ ভারতে উৎপাদিত হয়। ১৯৬৫ সালে ভার্গিস কুরিয়েনকে প্রথম চেয়ারম্যান করে ন্যাশনাল ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠিত হয়, যা ১৯৭০ সালে ‘অপারেশন ফ্লাড’ শুরু করে। ২০১৪ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় গোকুল মিশন দেশি গরু ও মহিষের জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কাজ করছে।
তামিলনাড়ুর নিজস্ব গরুর জাতের মধ্যে আছে কাঙ্গায়াম, একটি ভারবাহী জাত, যার নাম এসেছে তিরুপুর জেলার কাঙ্গেয়াম শহর থেকে। এর আদি এলাকা কোয়েম্বাটুরের আশপাশের কোঙ্গু অঞ্চল, যেখান থেকে এই মামলার শুরু। ১৯৯৬ সালে কাঙ্গায়াম গরু ছিল ৪ লাখ ৭৯ হাজার; ২০২২ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ডিএডি-আইএস তথ্যভান্ডারে এর সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ থেকে ১ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ বলে জানানো হয়। এই জাতের গাভী কম দুধ দেয়, আর ষাঁড়গুলো ষাঁড়দৌড় ও জাল্লিকাট্টুতে ব্যবহৃত হয়।
ছবি: তামিঝপ্পারিথি মারি / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৩ জুলাই ২০২৬), বার অ্যান্ড বেঞ্চ (১ ও ১৩ জুলাই ২০২৬), দ্য নিউজ মিনিট (২৮ মে, ২ জুলাই ও ১৩ জুলাই ২০২৬), আউটলুক (১৩ জুলাই ২০২৬), ইটিভি ভারত (১৩ জুলাই ২০২৬), ডিটি নেক্সট (১৩ জুলাই ২০২৬), ভার্ডিক্টাম (২৮ মে ২০২৬), দ্য কুইন্ট (২৮ মে ২০২৬), মনোরমা নিউজ (২৮ মে ২০২৬), ফ্রি প্রেস জার্নাল (১ জুলাই ২০২৬), দ্য উইক (১ জুলাই ২০২৬), ভারতের সংবিধান (constitutionofindia.net), ১৯৫৮ সালের তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইন ও ২০০১ সালের কসাইখানা বিধিমালার পাঠ (অ্যানিমেল লিগ্যাল অ্যান্ড হিস্টোরিক্যাল সেন্টার), ভারতের পশুপালন ও দুগ্ধ উন্নয়ন বিভাগ (বিংশ প্রাণিসম্পদ শুমারির মূল ফল, ২০১৯), প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (জাতীয় দুগ্ধ দিবসের প্রতিবেদন, ২৫ নভেম্বর ২০২৫), উইকিপিডিয়া (মাদ্রাজ হাইকোর্ট, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, ঈদুল আজহা, কাঙ্গায়াম গরু, ভারতে গরু জবাই, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইন)




মন্তব্য
(০)