২০২৬ সালের ঈদুল আজহার আগের দিন, ২৭ মে বুধবার, কোরবানির জন্য বিক্রি হওয়া অ্যালবিনো জাতের আলোচিত মহিষ 'ডোনাল্ড ট্রাম্প'-কে আর কোরবানি না করার সিদ্ধান্ত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপে ক্রেতাকে টাকা ফেরত দিয়ে মহিষটিকে সেদিন বিকেলে ঢাকার কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় নেওয়া হয়। জাগো নিউজ সেদিন রাতে জানায়, থানা থেকে মহিষটিকে মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় নিয়ে সেখানে লালন-পালন করা হবে।
প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের মহিষটি বড় হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে। এর মাথার সামনের সোনালি চুল আর চোখ দেখতে অনেকটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বলে মনে করেছিলেন অনেকে। সে কারণে খামারের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধার ছোট ভাই আদর করে এর নাম রাখেন 'ট্রাম্প'। মে মাসের শুরুতে দেশের সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর মহিষটি দ্রুত আলোচনায় আসে, পরে রয়টার্স ও এএফপিসহ বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হওয়ার কথা ছিল পরদিন, ২৮ মে বৃহস্পতিবার।
বুধবার বিকেলে যা ঘটেছিল
সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত দেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ঘটনার ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায়। দৈনিক ইত্তেফাক সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে জানায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে বলেছেন, মহিষটিকে ঘিরে অতিরিক্ত জনসমাগম ও সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকায় কেরানীগঞ্জের ক্রেতাকে টাকা ফেরত দিয়ে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে। বাংলা ট্রিবিউন লেখে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এই প্রথম প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছিল, আপাতত মহিষটিকে আগের মতোই নারায়ণগঞ্জের খামারে লালন-পালন করা হবে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিকেল চারটার দিকে কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকায় ক্রেতার বাড়িতে পুলিশের এক কর্মকর্তা উপস্থিত হন এবং মহিষটির মালিকের সঙ্গে কথা বলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, 'ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে, মহিষটি কোরবানি করা যাবে না। এটিকে আপাতত থানায় নিয়ে যেতে বলেছে।' বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মহিষটিকে ট্রাকে তুলে থানায় নিয়ে যেতে দেখা যায়।
ক্রেতা প্রথম আলোকে জানান, তিন দিন আগে তিনি মহিষটিকে খামার থেকে বাড়িতে এনেছিলেন। থানা থেকে লোক এসে মহিষটি সরকারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলার পর তিনি বলেন, 'আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা চাই না। সরকার চেয়েছে, আমরা দিয়ে দিলাম।' বিনিময়ে কী পাবেন, এমন প্রশ্নে তিনি জানান, সরকার দাম ফেরত দেবে, নয়তো কোরবানির জন্য একটি গরু দেবে বলে তাঁদের জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, মহিষটি বাড়িতে আনার পর থেকে দর্শনার্থীদের ভিড় এত বেড়েছিল যে পরিবারটি সেটিকে ঘরের ভেতরে বেঁধে রাখতে বাধ্য হয়। মহিষটি থানায় নিয়ে যাওয়ার পরও অনেক দর্শনার্থী দেখতে এসে ফিরে যান।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রথম আলোকে বলেন, মহিষটিকে মালিকের বাসা থেকে ফেরত আনা হয়েছে এবং এটি বিরল প্রজাতির প্রাণী বলে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হবে। ইত্তেফাকের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, মহিষটি থানায় আছে, এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে শিশু-কিশোর ও যুবকসহ নানা বয়সী মানুষ থানায় ভিড় করেন; জনসমাগম ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় ওসি থানার প্রধান ফটক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। রাত পৌনে নয়টায় জাগো নিউজ জানায়, থানা থেকে মহিষটিকে মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় নেওয়া হবে।
রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের 'ডোনাল্ড ট্রাম্প'
মহিষটিকে নিয়ে প্রথম আলো প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে ২০২৬ সালের ১২ মে। তাতে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া এলাকার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে নানা জাতের গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার মধ্যে গোলাপি রঙের এই মহিষটি সবার নজর কাড়ছে। খামার কর্তৃপক্ষের বরাতে পত্রিকাটি জানায়, আগের বছরের কোরবানির ঈদের এক মাস পর রাজশাহী সিটি পশুর হাট থেকে মহিষটি কেনা হয় এবং তখন থেকে বিশেষ যত্নে লালন-পালন করা হচ্ছে। সেই প্রতিবেদনে মহিষটির বয়স সাড়ে তিন বছর বলা হয়েছিল; বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বয়স লেখা হয় চার বছর।
খামারের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, 'মহিষটির মাথার সামনের চুল অনেকটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো হওয়ায় আমরা ওর নাম রেখেছি ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, স্বভাবও তেমন শান্ত। এটি এলবিনো জাতের মহিষ। এ জাতের মহিষ সাধারণত শান্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে। উত্যক্ত না করলে সহজে আক্রমণাত্মক আচরণ করে না।' দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলাকে তিনি জানান, প্রায় ১০ মাস আগে রাজশাহীর একটি হাট থেকে মহিষটি কিনে আনা হয় এবং মাথার চুল দেখে তাঁর ছোট ভাই রসিকতা করে নামটি রাখেন।
পরিচর্যাকারীদের বরাতে প্রতিবেদনগুলোতে মহিষটির খাবারের তালিকাও এসেছে: ভুট্টা, সয়াবিন, খইল, গমের ভুসি, তিলের খইল, ধানের কুঁড়া, খড় ও সবুজ ঘাস। খামারের একজন পরিচর্যাকারী প্রথম আলোকে জানান, দিনে দুই বেলা সময় মেনে খাবার দেওয়া হয় এবং স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলাকে বলা হয়, মহিষটিকে দিনে চারবার গোসল করানো হয়। রয়টার্সকে খামারের মালিক বলেন, ঈদের আগে মহিষটিকে সুস্থ ও ভালো অবস্থায় রাখতে দিনে চারবার গোসল ও চার বেলা খাবার দিতে হয়েছে, প্রতিদিন বাড়তি মনোযোগ ও যত্ন লেগেছে।
খামার কর্তৃপক্ষ জানায়, সে বছর কোরবানির জন্য খামারে প্রায় ২০০টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল। দেশ রূপান্তরকে খামারের এক কর্মচারী জানান, খামারে মজার নামের আরও পশু ছিল, যেমন 'তুফান'। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাজিলের ফুটবলার নেইমারের চুলের ছাঁটের সঙ্গে মিল থাকায় খামারের একটি পশুর নাম রাখা হয়েছিল 'নেইমার'। 'ডোনাল্ড ট্রাম্প' অবশ্য আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল: খামার কর্তৃপক্ষের হিসাবে লাইভ ওয়েট বা জীবন্ত অবস্থার ওজন ধরে প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা দরে ঢাকার এক ক্রেতার কাছে।
সামাজিক মাধ্যম থেকে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে
১২ মে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহিষটি ভাইরাল হওয়ার পর খামারে ভিড় কয়েকগুণ বেড়েছে; দর্শনার্থীরা ছবি তুলছেন, কেউ কেউ সাহস করে ছুঁয়েও দেখছেন। পরদিন দেশ রূপান্তর লেখে, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ সামাজিক মাধ্যমে লাইভে এসে 'নারায়ণগঞ্জের ট্রাম্প'-এর সঙ্গে অন্যদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, আর প্রতিদিন শত শত মানুষ খামারে আসছেন। পত্রিকাটির ভাষায়, ঈদকে ঘিরে পশু দেখার পুরোনো রীতির সঙ্গে সে বছর যোগ হয়েছিল ভাইরাল এই মহিষটিকে এক নজর দেখার আগ্রহ।
২১ মে এএফপির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ও আফ্রিকানিউজেও ছাপা হয়। তাতে বলা হয়, পরিচর্যাকারীরা দর্শনার্থী আসার আগে মহিষটির সোনালি চুল আঁচড়ে দেন। মালিক জানান, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে মহিষটি কিছুটা মানসিক চাপে পড়ে এবং ওজনও কিছুটা কমে যায়; তাই সাধারণের দেখার ওপর কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। তবু আশপাশের জেলা থেকে মানুষ আসছিলেন, কেউ কেউ নৌকায় চড়ে। এক দর্শনার্থী এএফপিকে জানান, তাঁর ভাগনে শুধু মহিষটিকে দেখতে এক ঘণ্টা নৌকা চালিয়ে এসেছে। মালিক বলেছিলেন, মহিষটিকে তিনি খুব মিস করবেন, তবে ত্যাগই ঈদুল আজহার মূল চেতনা।
২২ মে বার্তা সংস্থা রয়টার্স লেখে, ঈদুল আজহার আগে লম্বা সোনালি চুলের এক বিরল অ্যালবিনো মহিষ বাংলাদেশে অপ্রত্যাশিত তারকা হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের বর্ণনায়, বাংলাদেশে বেশির ভাগ মহিষের গায়ের রং কালচে, তাই ক্রিম রঙের দেহ, গোলাপি নাক আর লম্বা সোনালি চুল মহিষটিকে ঈদের জন্য প্রস্তুত হাজারো গবাদিপশুর মধ্যে আলাদা করে তুলেছিল। সংস্থাটি আরও লেখে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে অস্বাভাবিক বড় বা ব্যতিক্রমী কোরবানির পশু প্রায়ই ঈদের আগে ভাইরাল হয় এবং ক্রেতা ও দর্শনার্থী টানতে সেগুলোর নাম রাখা হয় পরিচিত মানুষের নামে।
রয়টার্সকে খামারের মালিক বলেন, চেহারা চোখে পড়ার মতো হলেও মহিষটি স্বভাবে খুব শান্ত, আর মহিষটি ইতিমধ্যে কোরবানির জন্য এক ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর ২৬ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রয়টার্স ছাড়াও দ্য টেলিগ্রাফ ও নিউইয়র্ক পোস্টসহ বিভিন্ন বিদেশি সংবাদমাধ্যমে মহিষটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
লাল গালিচায় বিদায়
২৫ মে সোমবার বিকেলে ক্রেতা মহিষটি নিতে এলে রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্ম ব্যতিক্রমী এক বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দুপুর থেকেই খামারের কর্মীরা মহিষটিকে গোসল করিয়ে সাজানোর প্রস্তুতি নেন। পরে মাথায় বিশেষ সাজসজ্জা ও গায়ে রাজকীয় পোশাক পরিয়ে, হরেক রঙের ধোঁয়া উড়িয়ে লাল গালিচার ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে মহিষটিকে গাড়িতে তোলা হয়। এ সময় খামারের মালিকপক্ষ ও উপস্থিত লোকজন বিদায় জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে ক্রেতা ও তাঁর লোকজন মহিষটিকে ঢাকায় নিয়ে যান।
খামারের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, 'মহিষটিকে আমরা লালন-পালন করেছি। এটি ভাইরাল হয়েছে, রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্ম সারা বিশ্বে প্রচার পেয়েছে। ওকে বিদায় দিতে কষ্ট লাগছে। তবে কোরবানির পশু তো ত্যাগের জন্যই। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমরা আজীবন মনে রাখব।' খামারের এক কর্মচারী পত্রিকাটিকে বলেন, বাংলাদেশে এর আগে কোনো কোরবানির পশু এভাবে ভাইরাল হয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।
খামার সূত্রের বরাতে প্রথম আলো জানায়, ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিদিন শত শত মানুষ মহিষটি দেখতে খামারে আসেন; শুধু নারায়ণগঞ্জ বা ঢাকা নয়, বরিশাল ও কুমিল্লার মতো দূরের জেলা থেকেও দর্শনার্থীরা এসেছিলেন, অনেকে কিনতে না পেরে হতাশাও প্রকাশ করেন। এর দুই দিন পর, ঈদের আগের দিন বিকেলে, সরকারের হস্তক্ষেপে মহিষটির কোরবানি বাতিল হয়।
অ্যালবিনো মহিষ কী
সংবাদমাধ্যমে মহিষটিকে 'অ্যালবিনো জাতের' বলা হলেও অ্যালবিনিজম আলাদা কোনো জাত নয়, এটি একটি বংশগত অবস্থা। ২০১২ সালে বিএমসি জেনেটিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে অকুলোকিউটেনিয়াস অ্যালবিনিজমকে মানুষ ও প্রাণীর এমন এক বংশগত রঞ্জক-ব্যাধি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে লোম, ত্বক ও চোখে মেলানিন আংশিক বা পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকে। মেলানিন তৈরির প্রথম দুটি ধাপ চালায় টাইরোসিনেজ নামের একটি এনজাইম; এই এনজাইম তৈরি না হলে মেলানিনও তৈরি হয় না।
ব্রাজিলের ওই গবেষণায় দেশটির দক্ষিণের রিও গ্রান্দে দো সুল রাজ্যের একটি মুররাহ জাতের মহিষের পালে অ্যালবিনিজম পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা দেখেন, আক্রান্ত মহিষের লোম, ত্বক, শিং, খুর, মিউকোসা ও চোখের আইরিসে রঞ্জক থাকে না এবং এরা আলোতে অস্বস্তি বা ফটোফোবিয়ায় ভোগে। টাইরোসিনেজ জিনের একটি মাত্র বেসের পরিবর্তনে প্রোটিনটি অকার্যকর হয়ে যায়, আর বংশানুক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায় বৈশিষ্ট্যটি প্রচ্ছন্ন (রিসেসিভ) ধারায় সন্তানে যায়। গবেষণাপত্রে আরও উল্লেখ আছে, এর আগে তুরস্কে একটি আনাতোলীয় মহিষ বাছুরে অ্যালবিনিজম পাওয়া গিয়েছিল এবং ১৯২৫ সালে একটি সাদা জলমহিষ বাছুরের বর্ণনা প্রকাশিত হয়েছিল।
এএফপির প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, মেলানিন কম তৈরি হওয়ার কারণে অ্যালবিনো মহিষ অত্যন্ত বিরল। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ১৩ মে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি বিরল কোনো বিদেশি জাত নয়, এটি দেশি এলবিনো প্রকৃতির মহিষ; শরীরে রঞ্জক পদার্থের স্বল্পতার কারণে এ ধরনের ভিন্ন রং দেখা যায়।
উইকিপিডিয়ার জলমহিষ নিবন্ধ অনুযায়ী, নদী-মহিষের চামড়া সাধারণত কালো, কারও কারও গাঢ় স্লেট রঙের; জলাভূমির মহিষ জন্মের সময় ধূসর থাকে, পরে স্লেট-নীল হয়। কিছু মহিষের পালে অ্যালবিনয়েড বা সাদাটে প্রাণীও দেখা যায়। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের তোরাজা জনগোষ্ঠী সাদা-কালো ছোপের 'তেদং বোঙ্গা' নামের মহিষকে বিশেষভাবে পছন্দ করে।

বাংলাদেশে মহিষের অবস্থান
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স (২০২৩-২০২৪)' অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মহিষ ছিল ১৫ লাখ ২৪ হাজার; ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সংখ্যাটি ছিল ১৪ লাখ ৬৪ হাজার। একই বছরে দেশে গরু ছিল ২ কোটি ৫০ লাখ ১৩ হাজার, ছাগল ২ কোটি ৭১ লাখ ১৭ হাজার এবং ভেড়া ৩৯ লাখ ৩ হাজার। অধিদপ্তরের ওই হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে দুধ উৎপাদন হয়েছিল ১৫০ দশমিক ৪৪ লাখ মেট্রিক টন এবং মাংস ৯২ দশমিক ২৫ লাখ মেট্রিক টন। স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদের অবদান ছিল ১ দশমিক ৮০ শতাংশ (সাময়িক হিসাব), কৃষি জিডিপিতে ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৫ সালের আগস্টে 'ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় দেশের মহিষ সম্পর্কে বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়, দেশে মহিষের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ ৮ হাজার, যার বেশির ভাগ দেশি। দেশে দুই ধরনের মহিষ আছে: নদী-মহিষ, যাদের ক্রোমোজোম ৫০টি, এবং জলাভূমির মহিষ, যাদের ক্রোমোজোম ৪৮টি। নদী-মহিষের জাতগুলোর মধ্যে মুররাহ, নিলি-রাভি, সুরতি ও জাফরাবাদি বেশি দুধের জন্য পরিচিত।
পর্যালোচনাটি অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মহিষ উপকূলীয় এলাকায়, বাকিগুলো মেঘনা-গঙ্গা এবং যমুনা-ব্রহ্মপুত্র প্লাবনভূমিতে। ৫৬ শতাংশ মহিষ পালিত হয় মুক্তভাবে চরিয়ে, ৪২ শতাংশ আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে এবং মাত্র ২ শতাংশ নিবিড় খামারে। তবু দেশের মোট দুধ উৎপাদনে মহিষের অবদান মাত্র ১ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং মাংসে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ, যা ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় অনেক কম। দেশের মহিষ দিনে গড়ে আড়াই থেকে চার লিটার দুধ দেয়। মুররাহ ও নিলি-রাভির মতো বেশি উৎপাদনশীল জাতের সঙ্গে সংকরায়ণ শুরু হলেও রেকর্ড রাখার ঘাটতি ও কর্মদক্ষতা পর্যবেক্ষণের অভাবে অগ্রগতি সীমিত ছিল বলে গবেষকেরা লেখেন।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশে মহিষের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব জাত নেই; কয়েকটি জেলায় মহিষকে মূলত হালচাষ ও গাড়ি টানার কাজে ব্যবহার করা হয়। একটি মহিষের দিনে অন্তত ৩০ কেজি ঘাস লাগে, আর সবুজ ঘাসের অভাবই দেশে মহিষ পালনের প্রধান বাধা। স্ত্রী মহিষ প্রায় ১০ মাস গর্ভধারণের পর একটি বাচ্চা দেয়।

২০২৬ সালের কোরবানির পশুর হিসাব
২০২৬ সালের ৩ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সে বছর ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার, আর চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী ৫ হাজার ৬৫৫টি। আগের বছর, ২০২৫ সালে, কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি এবং কোরবানির পর ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চাহিদার চেয়ে বেশি পশু থাকায় সে বছর কোরবানির জন্য পশু আমদানি করা হবে না। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৭টি এবং সারা দেশে ৩ হাজার ৬৭৮টি পশুর হাট বসার কথা ছিল; রাজধানীর হাটগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল দল ও ২টি বিশেষজ্ঞ দল রাখার কথা জানানো হয়। অনলাইনে পশু বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, সে বছর দেশজুড়ে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি পশু কোরবানি হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার হিসাবও সে সময় প্রকাশিত হয়। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ১২ মে প্রথম আলোকে বলেন, জেলায় সে বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ১ লাখ ৩ হাজার, আর ৬ হাজার ৫৩৫টি খামারে কোরবানির পশু প্রস্তুত আছে ১ লাখ ১৩ হাজার। একটি খামারে গোলাপি রঙের এলবিনো মহিষের নাম 'ডোনাল্ড ট্রাম্প' রাখা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন, এ কথাও জানান তিনি।
১৮ মে সন্ধ্যায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক শেষে জানানো হয়, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে এবং ২৮ মে বৃহস্পতিবার সারা দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। নবী ইবরাহীম (আ.)-এর ত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত এই উৎসবে মুসলিমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করেন। এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই উৎসবের মাধ্যমেই অনেক দরিদ্র পরিবার বছরে অন্তত একবার পেট ভরে মাংস খাওয়ার সুযোগ পায়।
নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও জাতীয় চিড়িয়াখানা
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেলার আয়তন ৬৮৪ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। ১৮৮২ সালে নারায়ণগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে এটি জেলায় রূপ নেয়। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ৪৮ হাজার ২১৭। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎসের মধ্যে ব্যবসা ২৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ, চাকরি ২৩ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং কৃষি ১৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। মহিষটি যেখানে বড় হয়েছিল, সেই পাইকপাড়া নারায়ণগঞ্জ শহরেরই একটি এলাকা।
যে কেরানীগঞ্জে মহিষটি শেষ কয়েক দিন ছিল, সেটি ঢাকা জেলার একটি উপজেলা, ঢাকা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ১৬৬ দশমিক ৮৭ বর্গকিলোমিটার; কেরানীগঞ্জ থানা গঠিত হয় ১৮১৭ সালে এবং উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এখানকার জনসংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩৬০। জিনজিরা এলাকার জিনজিরা প্রাসাদ মোগল সুবাদার দ্বিতীয় ইব্রাহিম খান তাঁর অবকাশকেন্দ্র হিসেবে নির্মাণ করেছিলেন। উপজেলার উল্লেখযোগ্য হাটবাজারের মধ্যে জিনজিরা বাজারও রয়েছে।
ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা দেশের সবচেয়ে বড় চিড়িয়াখানা। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬ একর আয়তনের চিড়িয়াখানাটি বর্তমান স্থানে চালু হয় ১৯৭৪ সালের ২৩ জুন, আর এটি পরিচালনা করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা চিড়িয়াখানার নাম বদলে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা রাখা হয়। বছরে প্রায় ৩০ লাখ দর্শনার্থী এখানে আসেন; ২০২৪ সালের হিসাবে চিড়িয়াখানায় ১৯১ প্রজাতির ২ হাজার ১৫০টি প্রাণী ছিল। ঢাকায় চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠার সরকারি ঘোষণা আসে ১৯৫০ সালের ২৬ ডিসেম্বর; শুরুতে হাইকোর্টের কাছে সেগুনবাগিচায় কয়েকটি চিত্রা হরিণ, ময়ূর, বানর ও হাতি নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়।

ছবি: Steve Jurvetson / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলা ট্রিবিউন, দেশ রূপান্তর, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা (এএফপি), রয়টার্স, আফ্রিকানিউজ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বিএমসি জেনেটিকস, ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)