চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলের আম কম খরচে ঢাকায় পৌঁছে দিতে ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে আমের মৌসুমে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন চালিয়ে আসছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের কর্মকর্তারা জাগো নিউজকে জানান, আগের বছরগুলোর লোকসান এবং চাষি ও ব্যবসায়ীদের কম আগ্রহের কারণে সে বছর ম্যাংগো ও ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন চলাচল অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে রাজশাহীর চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, ম্যাংগো ও ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন এবার চলাচল না করার সম্ভাবনা বেশি। তাঁর ভাষ্য, রেলওয়ের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবসায়ী ও চাষিদের আম বুকিংয়ে আগ্রহ না থাকায় এ ট্রেন চালানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
রেল কর্মকর্তারা যা বলেছিলেন
পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা হাসিনা খাতুন জাগো নিউজকে জানান, ম্যাংগো ও ক্যাটল স্পেশাল ট্রেনের বিষয়ে একটি সভায় আলোচনা হয়েছিল, তবে পশ্চিমাঞ্চল রেলের পক্ষ থেকে পরে আর কিছু জানানো হয়নি। ট্রেন চালু হবে কি না, তা তিনি বলতে পারছিলেন না।
আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া বিকল্প হিসেবে লাগেজ ভ্যানের কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকাগামী প্রতিটি আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনে লাগেজ ভ্যান রয়েছে; চাষি ও ব্যবসায়ীরা চাইলে কম খরচে এসব ভ্যানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে ঢাকায় আম পাঠাতে পারেন।
এর দুই দিন আগে, ২৩ মে রাইজিংবিডি ডটকমকে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেছিলেন, ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন নিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা খুব ভালো নয়, চাষিরা আম পাঠাতে আগ্রহী হন না। তিনি জানান, তখনো ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি; মাঠপর্যায়ে সমীক্ষা চলছিল এবং চাষি ও ব্যবসায়ীদের আগ্রহ থাকলে ট্রেন চালু হতে পারে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, স্টেশনে যাতায়াতের ভোগান্তির কথা ভেবে চাষি ও ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কম থাকে।

কম ভাড়া, কিন্তু আয় কম
২০২৪ সালের মে মাসে রাজশাহীতে আম পরিবহন নিয়ে এক সেমিনারে জানানো হয়েছিল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি আম পরিবহনে ভাড়া এক টাকা ৪৭ পয়সা এবং রাজশাহী থেকে এক টাকা ৪৩ পয়সা। সেবার ট্রেনটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় যাওয়ার কথা ছিল।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেনে আয় হয়েছে ৪৮ লাখ ২৯ হাজার ১৪০ টাকা, আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ-ঢাকা রুটে ট্রেনটি চালাতে তেল খরচ হয়েছে ৯২ লাখ ৯১ হাজার টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ মৌসুমে লোকসান হয়েছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে বাংলা ট্রিবিউন রেলওয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চার বছরে এই ট্রেনে তিন হাজার ৯৯৫ টন আম পরিবহন করে আয় হয়েছিল ৪৬ লাখ ২৯ হাজার ১৪০ টাকা এবং লোকসান হয়েছিল ৪৬ লাখ ৬১ হাজার ৮৬০ টাকা।
বাংলা ট্রিবিউনের সেই প্রতিবেদনে বছরভিত্তিক হিসাবও ছিল: ২০২০ সালে ট্রেনটি ৪৬ দিন চলে এক হাজার ২০০ মেট্রিক টন আম পরিবহন করে, ২০২১ সালে ৫০ দিনে দুই হাজার ২৩৫ মেট্রিক টন, ২০২২ সালে সাত দিনে ১৭৯ মেট্রিক টন এবং ২০২৩ সালে ১৮ দিনে ৩৮২ মেট্রিক টন। আম ব্যবসায়ী ও খামারিরা তখন বলেছিলেন, ট্রেনে খরচ কম হলেও বারবার ওঠানামার ঝামেলার কারণে তাঁরা সড়কপথ ও কুরিয়ার বেছে নেন।

কোরবানির পশু পরিবহন
ঈদুল আজহায় কম খরচে কোরবানির পশু ঢাকায় নেওয়ার জন্যও রেলওয়ে বিশেষ ট্রেন চালু করেছিল। বাংলা ট্রিবিউনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে এই পথে ১৭৯ মেট্রিক টন আমের পাশাপাশি ৩৬টি গরু ও ১৬০টি ছাগল পরিবহন করা হয়, আর ২০২৩ সালে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেনের সঙ্গে দুটি অতিরিক্ত ওয়াগন যুক্ত করে পশু পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়। জাগো নিউজ জানায়, ২০২৪ সালে আলাদা ক্যাটল ট্রেন চালু হয়নি; ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেনের দুটি ওয়াগনে কোরবানির পশু পরিবহন করা হয়।

রাজশাহীতে আমের মৌসুম
ট্রেন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই রাজশাহীতে আমের মৌসুম শুরু হয়ে গিয়েছিল। রাইজিংবিডির ২৩ মে ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর রাজশাহীতে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয় এবং উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয় ২ লাখ ৬০ হাজার ৬ মেট্রিক টন। জেলা প্রশাসনের ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী ১৫ মে থেকে গুটি আম, ২২ মে থেকে গোপালভোগ এবং ৩০ মে থেকে হিমসাগর ও খিরসাপাত নামানোর সময় নির্ধারিত ছিল। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক উম্মে ছালমা জানান, আগের বছরের তুলনায় সে বছর আমের উৎপাদন বেশি।

ছবি: Tanweer Morshed / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, রাইজিংবিডি ডটকম, বাংলা ট্রিবিউন




মন্তব্য
(০)