মুন্সিগঞ্জে ২০২৬ সালের আলু মৌসুমে ফলন ভালো হলেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি চাষিরা। এপ্রিলের মাঝামাঝি সিরাজদিখান ও সদর উপজেলার গ্রামে গ্রামে তখন জমি থেকে আলু তোলা, বস্তায় ভরা আর হিমাগারে পাঠানোর ব্যস্ততা। কিন্তু তোলা শুরুর পর কয়েক দফা দরপতনে চাষিরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। জাগো নিউজ ২১ এপ্রিল ২০২৬ এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
আবাদ ও ফলনের চিত্র
মুন্সিগঞ্জ ঢাকা বিভাগের একটি জেলা, ইতিহাসে বিক্রমপুর নামে পরিচিত; পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদী এ জেলা ঘিরে আছে। জেলার ছয়টি উপজেলা হলো সদর, টঙ্গীবাড়ী, শ্রীনগর, সিরাজদিখান, লৌহজং ও গজারিয়া। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ২০২৬ সালের ৯ মার্চের প্রতিবেদনে মুন্সিগঞ্জকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ আলু উৎপাদনকারী জেলা বলা হয়, আর আলু এ জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, এ মৌসুমে ৩৪ হাজার ৬৫৫ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়। জাগো নিউজকে দেওয়া ডিএইর তথ্যে ১০ লাখ ৯৭ হাজার ১৪৭ টন ফলনের আশা করা হয়; এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত আবাদি জমির ৮০ শতাংশের আলু তোলা শেষ হয়েছিল এবং হেক্টরে ৪২ থেকে ৪৩ টন ফলন পাওয়া যাচ্ছিল।
মহাকালী ও রণছ এলাকার কৃষকেরা জানান, অনুকূল আবহাওয়া, গাছে পোকার আক্রমণ না থাকা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় ফলন বেড়েছে। মহাকালী ইউনিয়নের কৃষক মোহাম্মদ আলীর মতে, সানসাই জাতের আলু দেখতে সুন্দর এবং ফলনও ভালো হওয়ায় অনেকে ডায়মন্ড ও ভ্যানিলা জাত থেকে সরে এসেছেন।

খরচ ও দাম নিয়ে চাষিদের অভিযোগ
চাষিদের অভিযোগ, সার, কীটনাশক ও বীজের দাম এবং শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে এ বছর আলু উৎপাদনে তাদের মণপ্রতি খরচ হয়েছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। তাদের হিসাবে তখন পাইকারি বাজারে সর্বোচ্চ দাম ছিল মণপ্রতি ৪৫০ টাকা, ফলে জমি থেকে আলু বিক্রি করে মণে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছিল। চাষিরা আরও জানান, মাঠে পাইকারের দেখা মিলছিল না।
সদর উপজেলার চম্পাতলা গ্রামের আলুচাষি জামাল মন্ডল জাগো নিউজকে বলেন, ৪৯ শতাংশ জমিতে তার ৪ হাজার ৫০০ কেজি আলু হয়েছে; মানসম্মত আলু তখন মণপ্রতি ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, অথচ তার উৎপাদন খরচ ছিল মণপ্রতি সাড়ে ৫০০ টাকা। পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচ কমাতে এ মৌসুমে সড়কের চেয়ে নৌপথে আলু পাঠানোর চাপ বেড়েছিল।

চাষিদের দাবি
টানা কয়েক বছরের লোকসানে ঋণের বোঝা বেড়েছে বলে জানান চাষিরা। তাদের দাবি ছিল তিনটি: ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্যের তালিকায় আলু যুক্ত করা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বিদেশে আলু রপ্তানি বাড়ানো। টিসিবি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা, যা নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী দামে নিত্যপণ্য বিক্রি করে। চাষিরা জেলার পটেটো ফ্লেক্স কারখানাগুলো সচল করা এবং আলুভিত্তিক খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ ও সুপারশপে সরবরাহের মাধ্যমে আলুর বহুমুখী ব্যবহারের উদ্যোগও চান। তাদের অভিযোগ, আগের মৌসুমে হিমাগারে রাখা আলুর বিপরীতে সরকারি প্রণোদনা তারা পাননি।
রপ্তানির পথে একটি অগ্রগতি তখন সদ্য ঘটেছিল: ২০২৬ সালের মার্চের শেষ দিকে ভিয়েতনামের কৃষি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানির অনুমোদন দেয়। হ্যানয়ের বাংলাদেশ দূতাবাস ২০২৫ সালের মে মাসে এর নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করেছিল।

কৃষি বিভাগের বক্তব্য
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রয়োজনমতো সার দিয়ে চাষ করলে উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব। তিনি জানান, জয়পুরহাট, বগুড়া ও রাজশাহী অঞ্চলে অতিবৃষ্টিতে আলুর ফলনের বেশ ক্ষতি হয়েছে, তাই মুন্সিগঞ্জের চাষিরা এবার কাঙ্ক্ষিত দাম পাবেন বলে তিনি আশা করেন। পাইলট প্রকল্পের আওতায় টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় আলুভিত্তিক খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে, অন্য উপজেলায়ও হবে বলে জানান তিনি।
বিএডিসি, ব্র্যাক ও এসিআইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বীজে কিছু কৃষকের ফলন ভালো না হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব বীজ রোপণে সুনির্দিষ্ট কারিগরি নির্দেশনা থাকে, তা না মানলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। প্রণোদনার বিষয়ে তিনি জানান, তা প্রদানের প্রক্রিয়া চলছে। জেলা কৃষি বিভাগ আলুর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো এবং পরের মৌসুমের জন্য বিকল্প কিছু নিয়ে ভাবছিল।
ছবি: কুউ পুলক / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)