কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি কমে আসায় ২০২৬ সালের ৭ মে বৃহস্পতিবার কিশোরগঞ্জ জেলার নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করে, আর জেলার সবকটি নদীর পানি তখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সেদিন সকালে জাগো নিউজের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি এ খবর দেন। সকাল থেকে রোদ উঠেছিল, তবে মাঝে মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টিতে বিড়ম্বনায় পড়ছিলেন হাওরের কৃষকেরা। জেলার পূর্বাংশের এই নিচু জলাভূমিতেই কিশোরগঞ্জের বেশির ভাগ বোরো ধান হয়।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সেদিন সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানি কমে ৩.২৭ মিটারে নেমেছিল, যা আগের ২৪ ঘণ্টার চেয়ে ১ সেন্টিমিটার কম। চামড়াঘাটে পানি ছিল ২.৯৩ মিটার, কমেছিল ২ সেন্টিমিটার। অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি ৮ সেন্টিমিটার কমে ২.৫৭ মিটারে দাঁড়িয়েছিল, আর ভৈরব বাজারে মেঘনা নদীর পানি ছিল ১.৬২ মিটার, কমেছিল ২ সেন্টিমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, জেলার নদীগুলোর পানি তখনো বিপৎসীমার অনেক নিচে, বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮৮ থেকে ৪১৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছিল।
টানা কয়েক দিনের বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে রোদ ওঠায় হাওরাঞ্চলে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছিল। কৃষকেরা ডুবে যাওয়া খেত থেকে ধান উদ্ধার এবং খলায়, অর্থাৎ খেতের পাশের ধান মাড়াই ও শুকানোর উঠানে রাখা ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তবে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছিলেন, উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টি আবার শুরু হলে নদ-নদীর পানি ফের বাড়তে পারে, আর তাতে হাওরাঞ্চলের কৃষি ও জনজীবনে নতুন করে প্রভাব পড়তে পারে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, ৪ মে পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জেলার ১৩টি উপজেলায় ১১ হাজার ১২২ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে ছিল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন প্রায় ৫০ হাজার কৃষক, আর ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা। এরপরও প্রায় দেড় হাজার হেক্টর বোরো ধান নতুন করে পানিতে তলিয়েছিল। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছিল।
চার পয়েন্টে নদীর পানি
জাগো নিউজ যে চারটি পাঠ জানিয়েছিল, সেগুলো কিশোরগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নজরে থাকা চারটি পয়েন্টের: হাওরের উত্তর-পূর্বে ইটনা, করিমগঞ্জ উপজেলার চামড়াঘাট, দক্ষিণ-পূর্বে অষ্টগ্রাম এবং জেলার দক্ষিণ প্রান্তে ভৈরব বাজার, যেখান দিয়ে মেঘনা জেলা ছেড়ে যায়। জাগো নিউজ চামড়াঘাটের নদীটিকে মেঘনা বলেছিল। একই পয়েন্টগুলো নিয়ে ২ মে-র প্রতিবেদনে ঢাকা ট্রিবিউন করিমগঞ্জের চামড়াবন্দর এলাকার নদীটিকে মগরা বলেছিল, আর বাকিগুলোকে ইটনায় ধনু-বৌলাই, অষ্টগ্রামে কালনী ও ভৈরবে মেঘনা হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
পানি কমার পাঁচ দিন আগে চিত্র ছিল ভিন্ন। ২ মে সাজ্জাদ হোসেন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, আগের কয়েক দিনে এসব নদীর পানি কয়েক সেন্টিমিটার বেড়েছে, যদিও তা বিপৎসীমার নিচে। তিনি জানান, কোনো কোনো এলাকায় কৃষকেরা খেতের অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সরাতে নিজেরাই বাঁধ কেটে দিচ্ছেন। দুই তারিখেই কিশোরগঞ্জের নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচে ছিল; প্রতিবেদনগুলোতে ক্ষতির কারণ হিসেবে বলা হয় টানা বৃষ্টি, উজানের পানির ঢল এবং খেতে জমে থাকা বৃষ্টির পানি।
যে বিপৎসীমার কথা বলা হয়, তা প্রতিটি পয়েন্টের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্ধারিত মাপ। এপ্রিল ও মে মাসে হাওরের নদীগুলোর জন্য বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) আলাদা একটি প্রাক-বর্ষা বিপৎসীমার সঙ্গে পানির উচ্চতা মিলিয়ে দেখায়। নিউ এজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৯ এপ্রিলের বুলেটিনে কেন্দ্রটি জানিয়েছিল, পরের তিন দিনে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জে ধনু ও বৌলাই নদীর পানি বাড়তে পারে; একই সঙ্গে সিলেট ও সুনামগঞ্জে সুরমা ও কুশিয়ারা এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে মনু, খোয়াই ও জুড়ি নদীর পানিও বাড়তে পারে।

ক্ষতির হিসাব যেভাবে বেড়েছে
সপ্তাহজুড়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব বেড়েছে। ১ মে ঢাকা ট্রিবিউন ও নিউ এজ জানায়, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে, আর ওই সময়ে জেলায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান তখন বলেছিলেন, হাওরের কিছু অংশ টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। তাঁর কথায়, "আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছি এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও কৃষকের তালিকা তৈরি করছি। তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে, আমরা আশা করি সব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে সরকারি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।"
২ মে ঢাকা ট্রিবিউন চারটি হাওর উপজেলার জন্য অধিদপ্তরের আলাদা হিসাব দেয়: ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীতে নদীর পানি বৃদ্ধি ও আকস্মিক বন্যায় ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর বোরো খেত তলিয়েছিল, আর ধান কাটার ভরা মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন প্রায় ২১ হাজার কৃষক। ৭ মে জাগো নিউজকে দেওয়া কর্মকর্তার হিসাবে ৪ মে পর্যন্ত ১৩টি উপজেলায় তলিয়ে যাওয়া জমি দাঁড়ায় ১১ হাজার ১২২ হেক্টরে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক প্রায় ৫০ হাজার, আর এর পরে আরও প্রায় দেড় হাজার হেক্টর তলিয়েছিল।
এই সংখ্যাগুলোকে দেখতে হয় জেলার বিশাল ফসলের প্রেক্ষাপটে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছিল, ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর হাওর এলাকায়, যেখানে বর্ষার আগের সময়ে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি থাকে। কিশোরগঞ্জ দেশের প্রধান বোরো উৎপাদনকারী জেলাগুলোর একটি।
বৃষ্টি আর রোদের মাঝে আটকে পড়া ধান কাটা
বৃষ্টি এসেছিল কৃষিবছরের সবচেয়ে নাজুক সময়ে। এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের শুরু হাওরে বোরো কাটার ভরা মৌসুম, যখন ধান কেটে মাড়াই করে রোদে শুকিয়ে তারপর ঘরে তোলা বা বিক্রি করা হয়। নিউ এজ ১ মে জানায়, টানা বৃষ্টিতে ধান মাড়াইয়ের খলাও তলিয়ে গিয়েছিল; ফলে কাটা ধান না শুকিয়ে অঙ্কুরিত হচ্ছিল, আর কৃষকেরা নষ্ট ধান কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। অনেকে বছরের একমাত্র ফসল ফলাতে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। কয়েকজন কৃষক পত্রিকাটিকে বলেন, "এ বছর ফলন ভালো হয়েছিল, কিন্তু টানা বৃষ্টিতে সব পানির নিচে চলে গেছে। এখন ঋণ কীভাবে শোধ করব, সেই চিন্তায় আছি।"
২ মে ঢাকা ট্রিবিউনও একই ওঠানামার কথা লেখে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর আগের বৃহস্পতিবার হালকা রোদ উঠে কৃষকদের মনে আশা জাগিয়েছিল, কিন্তু শুক্রবার সকালে আবার আকাশ মেঘে ঢেকে যায় এবং রাতভর বৃষ্টি হয়; জেলার বিভিন্ন জায়গায় শনিবার সকাল পর্যন্ত মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি চলে। আগের কয়েক দিনে কাটা ধান খেতে, খলায় ও উঠানে স্তূপ হয়ে পড়ে ছিল, শুকানো যাচ্ছিল না, দানা বিবর্ণ হয়ে পচে যাচ্ছিল। নিকলী উপজেলার মজলিশপুরের এক কৃষক পত্রিকাটিকে জানান, বন্যার পানিতে তাঁর প্রায় ১০ কানি জমি তলিয়ে গেছে; প্রায় ছয় কানির আধাপাকা ধান তিনি শ্রমিক দিয়ে কাটিয়েছিলেন, কিন্তু টানা বৃষ্টিতে তা শুকাতে পারেননি। তাঁর কথায়, "এখন ধান কালো হয়ে গেছে।"
শ্রমিকেরও সংকট ছিল। কৃষকেরা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, দিনে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিয়েও জলাবদ্ধ খেতে দাঁড়িয়ে থাকা ধান কাটার মতো যথেষ্ট শ্রমিক মিলছিল না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ক্ষতি কমাতে অন্তত ৮০ শতাংশ পেকে যাওয়া ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, "এটা আদর্শ পরিস্থিতি নয়, কিন্তু দেরিতে কাটলে আরও বড় ক্ষতি হতে পারে।" হাওরের কৃষকদের জন্য অধিদপ্তরের এই নিয়ম আগেও দেওয়া হয়েছিল: ২০২৪ সালের এপ্রিলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নেত্রকোনায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়ে অধিদপ্তর কৃষকদের বলেছিল, বোরো ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই কেটে ফেলতে, খেতের আইল উঁচু করে জমে থাকা পানি সরাতে এবং বৃষ্টির আগে কীটনাশক বা সার প্রয়োগ না করতে।
প্রতিবেশী সিলেট বিভাগে ৫ মে রোদ ওঠার পর সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নিচু এলাকার কৃষকেরা ভোর থেকেই হাওর থেকে আনা ভেজা ধান উঠানে, উঁচু জায়গায় ও রাস্তার পাশে শুকাতে শুরু করেন বলে নিউ এজ জানায়। ৭ মে কিশোরগঞ্জে জাগো নিউজের বর্ণনা করা রোদও একই কাজ নিয়ে এসেছিল, আর হঠাৎ বৃষ্টি সেই কাজে বাধা দিচ্ছিল।

উত্তর-পূর্বের হাওরজুড়ে বৃষ্টি
কিশোরগঞ্জের পরিস্থিতি ছিল উত্তর-পূর্ব হাওর অববাহিকাজুড়ে চলা বৃষ্টির একটি অংশ। নিউ এজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার থেকে চলা ভারী বৃষ্টি এবং সীমান্তের ওপারের নদী থেকে নেমে আসা পানিতে ২৮ এপ্রিল সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওর ও মধ্যনগর উপজেলার এরানবিল হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যায়। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সেই মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করে। নলুয়ার হাওরের অনেক কৃষকের অভিযোগ ছিল, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের ফসল তলিয়েছে।
পরদিন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় গোগালিছড়া নামের একটি পাহাড়ি ছড়ার বাঁধ ভেঙে প্রায় ১৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন, আর নেত্রকোনার নিচু এলাকায় বন্যা চলতে থাকে বলে নিউ এজ ৩০ এপ্রিল জানায়। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের নিচু এলাকার জন্য ৭২ ঘণ্টার বন্যা সতর্কবার্তা দেয়।
টানা সাত দিন মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির পর ৫ মে সিলেট অঞ্চলে রোদ ফেরে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, সিলেট বিভাগের চার জেলায় এই মৌসুমে প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর জমির পাকা ও আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে; অধিদপ্তরের সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, বিভাগের মোট আবাদ করা বোরোর প্রায় ২৫ শতাংশ পানির নিচে চলে গেছে। নিউ এজ ৬ মে এ খবর দেয়। কেন্দ্রটি জানায়, সেদিনও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৯টি নদীর পানি ১১টি পয়েন্টে প্রাক-বর্ষা বিপৎসীমার ওপরে ছিল, যার কোনোটিই কিশোরগঞ্জে নয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর পরের ২৪ ঘণ্টায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয়। ৭ মে কিশোরগঞ্জের কর্মকর্তারা এই আশঙ্কার কথাই বলছিলেন।
সরকার যা ঘোষণা করেছিল
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে বলেন, তিন হাওর জেলা ও ময়মনসিংহের কিছু অংশে ভারী বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকার পরের তিন মাস সহায়তা দেবে। তিনি জানান, ফসল হারানো কৃষকদের চিহ্নিত করে সহায়তা দিতে তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন, আর তিন দিন আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে হাওর জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন।
১ মে সরকার হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল কেনার সময়ও এগিয়ে আনে। নিউ এজে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের কৃষকদের কাছ থেকে ধান ও চাল সংগ্রহ শুরু হওয়ার কথা ছিল ৩ মে থেকে; চাল সংগ্রহের আগের নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৫ মে। বোরো মৌসুমে সরকার দেশের বাজার থেকে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল কেনার পরিকল্পনা করেছিল: ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল। সংগ্রহমূল্য ঠিক করা হয়েছিল প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা, সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা ও আতপ চাল ৪৮ টাকা।
কিশোরগঞ্জ ও তার হাওর উপজেলা
ঢাকা বিভাগের কিশোরগঞ্জ জেলার আয়তন ২ হাজার ৬৮৮.৫৯ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ১৩টি। জেলার উত্তরে নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ, দক্ষিণে নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পূর্বে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ এবং পশ্চিমে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ। প্রধান নদী পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, কালনী, ঘোড়াউত্রা ও ধনু। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ১১ হাজার ৯০৭, আর ৬০.১৮ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি।
হাওরের বেশির ভাগ পড়েছে পূর্বের চারটি উপজেলায়, অধিদপ্তরের ২ মে-র হিসাবে যে চারটির নাম এসেছিল। বাংলাপিডিয়ায় দেওয়া ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, সেখানে জীবিকায় কৃষির ভাগ জেলার বাকি অংশের চেয়েও বেশি:
- ইটনা (৪০১.৯৩ বর্গকিলোমিটার): প্রধান নদী সুরমা, ধনু, বৌলাই ও কালনী; হাউলার হাওর এবং মাওরা, চাপরা, সোনাবান্ধাসহ কয়েকটি বিল উল্লেখযোগ্য; ৭৭.৮৪ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয় কৃষি।
- মিঠামইন (২২২.৯১ বর্গকিলোমিটার): নদী ধনু ও কালাই, বড়গোপ, গজারিয়াসহ কয়েকটি বিল; কৃষি ৮২.৪৮ শতাংশ।
- অষ্টগ্রাম (৩৫৫.৫৩ বর্গকিলোমিটার): নদী মেঘনা, বরাক, কালনী ও ঘোড়াউত্রা; পদ্মা, টপা, মনখোলাসহ কয়েকটি বিল; কৃষি ৮২.৪০ শতাংশ।
- নিকলী (২১৪.৩৯ বর্গকিলোমিটার): নদী বৌলাই, ধনু, সিংগুয়া ও ঘোড়াউত্রা; তেগুলিয়া ও বড় বিল; কৃষি ৭২.০৬ শতাংশ।
চারটি উপজেলাতেই প্রধান ফসল ধান। বাংলাপিডিয়া কিশোরগঞ্জের প্রধান হাওর হিসেবে হুমাইপুর, বড় দিঘা, ঢাকির, গোপদিঘি, বাদলা, সোনাবান্ধা ও ধনপুর হাওরের নাম দিয়েছে। ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলা হাওরের ওপর দিয়ে তৈরি একটি অলওয়েদার সড়কে যুক্ত।

হাওরে বোরোই কেন একমাত্র ফসল, আর এপ্রিলের বৃষ্টি কেন বিপদ
হাওর হলো ভূগাঠনিক কারণে তৈরি গামলা আকৃতির নিচু ভূমি। বর্ষায় নদী ও খাল দিয়ে আসা পানিতে তা ভরে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়, শুকনো মৌসুমে পানি নেমে যায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকায় প্রায় ৪৭টি বড় হাওর এবং প্রায় ৬ হাজার ৩০০টি বিল রয়েছে, যার প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি স্থায়ী ও ২ হাজার ৮০০টি মৌসুমি। বছরে প্রায় সাত-আট মাস এই সমভূমি পানিতে ডুবে থাকে, তখন গ্রামগুলোকে দ্বীপের মতো দেখায়; পানি নেমে গেলে উর্বর পলিমাটি বেরিয়ে আসে, যেখানে ধান চাষ হয়।
বছরের বেশির ভাগ সময় জমি পানির নিচে থাকায় এখানে একটিমাত্র ধানের ফসল হয়: বোরো, যা শুকনো শীতে রোপণ করে এপ্রিল-মে মাসে কাটা হয়। বাংলাপিডিয়ার ধানবিষয়ক ভুক্তিতে স্থানীয় বোরো কাটার সময় এপ্রিল-মে এবং উচ্চফলনশীল বোরোর সময় মে-জুন বলা হয়েছে। হাওর ও জলাভূমিবিষয়ক ভুক্তি ঝুঁকিটা ব্যাখ্যা করে: এপ্রিলে বজ্রঝড় শুরু হলে নিচু জমি আবার ভরতে থাকে, আর টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি উত্তর-পূর্বের নদীগুলোতে আকস্মিক বন্যা আনতে পারে। হাওরের জমি খুব নিচু বলে বাঁধহীন নিচু জমি আকস্মিক বন্যায় ভরে যায়, আর নদীর পানি আরও উঁচু হলে তা ডুবন্ত বাঁধ উপচে বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো খেত তলিয়ে দেয়। দেরিতে রোপণ করলে ফসল এই বন্যার মুখে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে।
একই কারণে জাত বাছাইও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, বিআর-১৭ (হাসি), বিআর-১৮ (শাহজালাল) ও বিআর-১৯ (মঙ্গল) জাতের মতো স্বল্পমেয়াদি বোরো হাওরের জন্য উপযোগী, কারণ আকস্মিক বন্যা আসার আগেই এগুলো কাটা যায়; অন্যদিকে বেশি ফলনের জন্য আনা দীর্ঘমেয়াদি উচ্চফলনশীল বিআর-১৪, বিআর-২৬ ও বিআর-২৯ জাতে বন্যার ঝুঁকি বেশি।
ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড হাওরের চারপাশে নিচু ডুবন্ত বাঁধ তৈরি করেছে। বাংলাপিডিয়ার পানি উন্নয়ন বোর্ডবিষয়ক ভুক্তি অনুযায়ী, বোর্ড উত্তর-পূর্বের হাওরে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমি বোরো চাষের উপযোগী করেছে এবং আকস্মিক বন্যা থেকে ফসল বাঁচাতে ১ হাজার ৮২৬ কিলোমিটার এমন বাঁধ নির্মাণ করেছে। প্রতিবছর বন্যার মৌসুমের আগেই এসব বাঁধের কাজ শেষ করার কথা; যেমন ২০২১ সালে ঢাকা ট্রিবিউন জানিয়েছিল, সিলেট বিভাগে হাওরের বাঁধ প্রকল্পের সময়সীমা ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বাড়িয়ে ১৫ মার্চ করা হয়েছিল, আর স্থানীয় সংগঠনগুলো বলছিল কাজের বড় অংশ তখনো বাকি।

মেঘনা, ধনু ও যারা এই নদীগুলোর ওপর নজর রাখে
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাঠে যে নদীগুলোর নাম এসেছে, সেগুলো দিয়েই পুরো উত্তর-পূর্ব অববাহিকার পানি নামে। বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করেছে, সিলেট ও সুনামগঞ্জ থেকে আসা সুরমার সঙ্গে কুলিয়ারচরের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে এবং ভৈরব বাজারের উত্তরে ধনু মিলিত হয়েছে, আর এই সংগমের ভাটি থেকে নদীটির নাম মেঘনা। ভৈরব বাজারে মেঘনার ডান তীরে এসে মিশেছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র; সংগমের একটু ওপরে নদীর ওপর রয়েছে ভৈরব রেলসেতু ও বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য মৈত্রী সড়কসেতু, আর সেখানে নদীর প্রস্থ প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার। তাই ভৈরবের পাঠ থেকে বোঝা যায়, পুরো হাওর অববাহিকার পানি কত দ্রুত নামছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয় ১৯৭২ সালে, যখন সাবেক পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পানি শাখা আলাদা সংস্থায় রূপ নেয়; বোর্ড এখন চলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০০০ অনুযায়ী। সব নদী, জলপথ ও ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ ব্যবস্থাপনা তার এখতিয়ারে, আর তার কাজের মধ্যে আছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, নিষ্কাশন ও সেচ এবং বন্যা ও খরার পূর্বাভাস। কিশোরগঞ্জে ৭ মে-র পাঠগুলো এসেছিল জেলায় বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে।
বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার দায়িত্ব বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের, যা ১৯৭২ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অংশ। কেন্দ্রের ২০২৩ সালের একটি বুলেটিনে সারা দেশে ১০৯টি পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ স্টেশন ও ৬১টি পূর্বাভাস স্টেশনের কথা বলা হয়েছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসে কেন্দ্রের দৈনিক বুলেটিনে হাওরের নদীগুলোর পানি প্রাক-বর্ষা বিপৎসীমার সঙ্গে মিলিয়ে জানানো হচ্ছিল।
ক্ষতির হিসাব দেওয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন। ১৯৮২ সালে কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা), পাট পরিদপ্তর, উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট একীভূত করে অধিদপ্তরটি গঠিত হয়, আর ১৯৯৬ সাল থেকে এটি নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতির আওতায় কাজ করছে। ২০২৬ সালের মে মাসে উপপরিচালকের নেতৃত্বে এর কিশোরগঞ্জ কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছিল।
হাওরে বারবার ফিরে আসা ঝুঁকি
ধান কাটার সময় বৃষ্টি আর উজানের পানি হাওরে নতুন নয়, আগের প্রতিবেদনেও একই দৃশ্যের বর্ণনা আছে। ২০২০ সালের এপ্রিলে ঢাকা ট্রিবিউন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর থেকে জানিয়েছিল, বৃষ্টি ও উজানের পানিতে খেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা কোমরপানিতে নেমে আধাপাকা ধান কাটছেন, আর সারা দিন পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করার মতো শ্রমিক পাচ্ছেন না। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ৩ মে থেকে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় হাওর জেলাগুলোর জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ধান কাটার আগাম সতর্কবার্তা দেয়, তাতেও ৮০ শতাংশ পাকলে ধান কাটার পরামর্শ ছিল।
২০২৬ সালের বৃষ্টির আগেই হাওরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েও পর্যালোচনা চলছিল। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের তৈরি হাওর মহাপরিকল্পনা হালনাগাদের খসড়ার ওপর সরকার জনমত চায়, আর জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটি টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর রক্ষায় পানি আইন ২০১৩-এর অধীনে প্রথমবারের মতো হাওর পরিবেশ সংরক্ষণ আদেশ জারির সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাপিডিয়ার হাওরবিষয়ক বিবরণে এর পেছনের টানাপোড়েনের কথা আছে: হাওরের কিনারার জমিতে বোরো চাষ ছড়িয়ে পড়ায় এবং জলাভূমি শুকিয়ে ফেলায় হাওরের মাছ, পাখি ও জলাবন চাপের মুখে পড়েছে।
ছবি: Hanif raaz / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, নিউ এজ, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)