২০২৩ সালের জুনে, ঈদুল আজহার কয়েক দিন আগে, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে কোরবানির পশুর হাটগুলো জমে উঠছিল, আর সেখানে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছিল একটি ষাঁড়। ঢাকেশ্বরী ইব্রাহিম টেক্সটাইলের বালুর মাঠের হাটে কালো-সাদা রঙের একটি অস্ট্রেলিয়ান ক্রস জাতের ষাঁড়, যার নাম মালিক কাউসার রহমান রেখেছেন ‘হিরো আলম’, সেটির দাম হাঁকা হচ্ছিল ২৫ লাখ টাকা। মালিকের ভাষ্যে গরুটির ওজন প্রায় ৩০ মণ, আর সেটিকে দেখতে প্রতিদিন ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা হাটে আসছিলেন। ২০২৩ সালের জুনের শেষ দিকে জাগো নিউজ ২৪ এই খবর প্রকাশ করে।
ইব্রাহিম টেক্সটাইলের বালুর মাঠের আলোচিত ষাঁড়
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকেশ্বরী ইব্রাহিম টেক্সটাইল বালুর মাঠসহ এলাকার বিভিন্ন হাটে খামারিরা কোরবানির পশু নিয়ে আসছিলেন। ইব্রাহিম টেক্সটাইলের মাঠে ৩০ মণের গরুটিকে ঘিরে নিয়মিত হইচই চলছিল। একপলক দেখতে প্রতিদিন মানুষ সেখানে ভিড় করছিলেন, কেউ কেউ ছবি ও ভিডিও তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার করছিলেন।
প্রতিবেদনে গরুটির যে বিবরণ দেওয়া হয়েছিল তা এমন: জাত অস্ট্রেলিয়ান ক্রস, রং কালো-সাদা, লম্বায় সাড়ে ১০ ফুট এবং উচ্চতায় ৬ ফুট। এর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ছিল খৈল, ভুসি ও সবুজ ঘাস। মালিক চার বছর ধরে গরুটি লালনপালন করেছেন এবং তাঁর হিসাবে এটি দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার খাবার খায়।
নামকরণের বিষয়ে কাউসার রহমান বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হিরো আলমের ভক্ত, তাই প্রিয় গরুটির নাম রেখেছেন হিরো আলম। দ্য অ্যাগ্রো নিউজ নামটি মালিকের দেওয়া নাম হিসেবেই উল্লেখ করছে; নামের মানুষটি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করছে না।
মালিক জানান, শুরু থেকেই ক্রেতাদের ভালো সাড়া পাচ্ছেন এবং ভালো দামে গরুটি বিক্রির আশা করছেন। তাঁর কথায়, এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দাম উঠেছে ১৩ লাখ টাকা, আরেকটু বেশি পেলেই তিনি বিক্রি করে দেবেন। ২৫ লাখ টাকার চাওয়া দাম এবং ১৩ লাখ টাকার প্রস্তাব, দুটিই মালিকের দেওয়া তথ্য; গরুটির কোনো স্বাধীন মূল্যায়নের খবর পাওয়া যায়নি, আর ৩০ মণ ওজনও হাটে জানানো হিসাব, কোনো সরকারি ওজনযন্ত্রে মাপা ফল নয়।
একই সপ্তাহে অন্য পত্রিকাতেও এই ষাঁড়ের খবর এসেছিল। ২০২৩ সালের ২২ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশের শিরোনাম ছিল ‘সিদ্ধিরগঞ্জের ‘হিরো আলম’, দাম ১৬ লাখ’, আর ২৩ জুন সংবাদ সারাবেলার শিরোনাম ছিল ‘৩০ মণ ওজনের হিরো আলমের দাম ১৬ লাখ টাকা’। একই দিন দেশেবিদেশে জানায়, ‘হিরো আলম’ নামের গরুটি দেখতে ভিড় জমছে। জাগো নিউজে প্রকাশিত ২৫ লাখ টাকার চাওয়া দামের সঙ্গে ওই শিরোনামের ১৬ লাখ টাকার পার্থক্যের কারণ শিরোনামগুলো থেকে জানা যায় না।
হাট, ইজারাদার ও জেলার প্রস্তুতি
হাটের ইজারাদার বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলম জাগো নিউজকে জানান, দূর-দূরান্ত থেকে তাঁদের হাটে প্রায় ৪ হাজার কোরবানির পশু এসেছে। তিনি বলেন, এবার হাটের ইজারাদার পেতে দেরি হওয়ায় পশুর সংখ্যা কিছুটা কম। তাঁর আশা, নির্ধারিত সময়ের আগেই সব গরু বিক্রি হয়ে যাবে। ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে বিক্রেতারা তাঁদের পালিত গরুর নানা আকর্ষণীয় নাম দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বাসনা আক্তার পত্রিকাটিকে জানান, এবার জেলায় প্রায় এক লাখ পশু কোরবানির সম্ভাবনা রয়েছে এবং চাহিদার তুলনায় বেশি গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত আছে। তিনি বলেন, এবার উপজেলায় ৯টি পশুর হাটের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের পক্ষ থেকে প্রতিটি হাটেরই খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।
ঈদুল আজহার আগে ইব্রাহিম টেক্সটাইলের বালুর মাঠের মতো খোলা জায়গায় অস্থায়ী পশুর হাট বসে এবং সেগুলো ইজারা দেওয়া হয়; ইজারাদার হাট পরিচালনা করেন ও রাজস্ব আদায় করেন। সিদ্ধিরগঞ্জের এই প্রতিবেদনের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে, ২০২৩ সালের ১৪ জুন, সরকার জানিয়ে দেয় যে হাটে পশু নিয়ে যাওয়া মানুষের কাছ থেকে ইজারাদারেরা জোর করে টাকা বা রাজস্ব আদায় করতে পারবেন না, ইউএনবি এ খবর দেয়।
সিদ্ধিরগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ: শীতলক্ষ্যার তীরের শিল্পাঞ্চল
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জ শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে, নারায়ণগঞ্জ শহরের পাশেই। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে সিদ্ধিরগঞ্জ ছিল ২২ দশমিক ৭১ বর্গকিলোমিটারের একটি পৌরসভা, যেখানে ৯টি ওয়ার্ড ও ৩৬টি মহল্লা, জনসংখ্যা ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৬০ এবং সাক্ষরতার হার ৬৬ দশমিক ০ শতাংশ। ২০১১ সালের ৫ মে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠিত হয়; নারায়ণগঞ্জ শহর, সিদ্ধিরগঞ্জ পৌর এলাকা ও কদম রসুল পৌরসভা নিয়ে এটি গড়ে ওঠে।
ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার আয়তন ৬৮৪ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার, আর ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ৪৮ হাজার ২১৭। জেলার প্রধান নদী শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, বুড়িগঙ্গা, বালু ও ধলেশ্বরী। নারায়ণগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয় ১৮৮২ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে; জেলার পাঁচ উপজেলার মধ্যে আড়াইহাজার সবচেয়ে বড়, বন্দর সবচেয়ে ছোট। আদমশুমারির হিসাবে পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস বাণিজ্য (২৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ) ও চাকরি (২৩ দশমিক ১৩ শতাংশ), কৃষির অংশ ১৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ শীতলক্ষ্যা নারায়ণগঞ্জের কাছে প্রায় ৩০০ মিটার চওড়া, আর বহুকাল ধরেই এটি শিল্পের নদী। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, একসময় এর তীরে বিখ্যাত মসলিন শিল্প গড়ে উঠেছিল; এখন আদমজী জুট মিলসহ নানা ভারী শিল্প এর তীরে, সিদ্ধিরগঞ্জে রয়েছে একটি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরও এই নদীর তীরে। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় বাংলাপিডিয়া ৭০টি হাটবাজারের কথা বলেছে, যার মধ্যে ফতুল্লা গরুর হাট ও সিদ্ধিরগঞ্জ বাজার উল্লেখযোগ্য; কারখানার তালিকায় আছে টেক্সটাইল, পাট, কাগজ ও স্টিল মিল। উপজেলায় বেশ কিছু মৎস্য খামার, ডেইরি ও পোলট্রি খামার আছে, আর প্রধান ফসল ধান, আলু, পাট, আখ, মসুর ও সরিষা।

পরিচিত মানুষের নামে ষাঁড়ের নাম
কোরবানির বড় ষাঁড়ের চমকপ্রদ নাম রেখে ক্রেতা টানার চল ২০২৩ সালের আগেও দেখা গেছে। এক বছর আগে, ২০২২ সালের ২৮ জুন ঢাকা টাইমস বগুড়া সদর উপজেলার ফুলবাড়ী মধ্যপাড়ার একটি হোলস্টাইন ফ্রিজিয়ান ষাঁড়ের খবর দেয়, যার নামও মালিক রেখেছিলেন ‘হিরো আলম’। কালো-সাদা রঙের সেই গরুর বয়স ছিল প্রায় চার বছর, দৈর্ঘ্য ৮ ফুট, উচ্চতা সাড়ে ৫ ফুট এবং ওজন ৯০০ কেজি; মালিক দাম চেয়েছিলেন ৮ লাখ টাকা এবং ৭ লাখ টাকার বেশিতে বিক্রির আশা করেছিলেন। তিনি পত্রিকাটিকে জানান, গরুটিকে খড়, তাজা ঘাস, খৈল, ভুসি, চালের কুঁড়া, ভুট্টা ও ভাত খাওয়ানো হয়েছে, কোনো ক্ষতিকর ট্যাবলেট বা ইনজেকশন দেওয়া হয়নি, দিনে দুবার গোসল করানো ও নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।
২০২১ সালের জুলাইয়ে বাংলা ট্রিবিউন একই নামের আরেকটি ষাঁড় নিয়ে শিরোনাম করেছিল ‘‘হিরো আলমের’ ওজন ৩১ মণ’। সিদ্ধিরগঞ্জের খবরের সপ্তাহেই, ২০২৩ সালের ১৯ জুন জাগো নিউজের শিরোনামে ছিল নেইমার ও মেসি নামের দুটি গরুর কথা, যাদের দাম ১০ লাখ ও ১২ লাখ টাকা, আর ২৩ জুন আরটিভির শিরোনাম ছিল ‘গরুর নাম ‘জায়েদ খান’’। বিক্রেতারা ক্রেতা টানতে গরুর আকর্ষণীয় নাম দিচ্ছেন বলে সিদ্ধিরগঞ্জের ইজারাদার যে কথা বলেছিলেন, তা এই একই চলের কথা।
৩০ মণ মানে কত
বাংলাদেশের পশুর হাটে বড় গরুর ওজন এখনো সাধারণত মণের হিসাবে বলা হয়। মণ উপমহাদেশের একটি প্রচলিত একক। ১৮৩৩ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে প্রথম মণের মান ঠিক করা হয় ১০০ ট্রয় পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় ৮২ দশমিক ২৮ অ্যাভোয়ারডুপোয়া পাউন্ড, আর এক মণে ধরা হয় ৪০ সের। স্বাধীনতার পর ভারত ও পাকিস্তান মণকে ঠিক ৩৭ দশমিক ৩২৪২ কেজি নির্ধারণ করে; অন্যদিকে এককটির বিশ্বকোষীয় বিবরণ অনুযায়ী বাংলাদেশে দৈনন্দিন ব্যবহারে এক মণ ধরা হয় ৪০ কেজি।
হাটে জীবিত পশুর ওজন সাধারণত বিক্রেতার আন্দাজ। কোরবানির পশুর দামও মণপ্রতি কোনো প্রকাশিত দরে ঠিক হয় না, ক্রেতা ও বিক্রেতার দর-কষাকষিতে ঠিক হয়; তাই ২৫ লাখ টাকার মতো অঙ্ককে মালিকের শুরুর চাওয়া দাম হিসেবেই পড়া ভালো।
অস্ট্রেলিয়ান ক্রস ও দেশের সংকর জাতের গরু
বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে দুই প্রজাতির গরু পালন হয়: বস ইন্ডিকাস, অর্থাৎ উপমহাদেশের কুঁজওয়ালা জেবু, যা আকারে ছোট ও ধীরে বাড়ে কিন্তু কিছু সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করতে পারে; আর বস টরাস, অর্থাৎ শীতপ্রধান অঞ্চলের গরু, যা মাঝারি থেকে ভারী, তাড়াতাড়ি প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং অনেক বেশি মাংস ও দুধ দিতে পারে। ষাটের দশক থেকে দেশের মানুষ তিন ধরনের গরু পালন করছেন: বিশুদ্ধ জাত, সংকর জাত ও দেশি। দেশি গরুর উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন সময় বিদেশি জাত এনে সংকরায়ণ করা হয়েছে; বাংলাপিডিয়ার তালিকায় আছে হোলস্টাইন-ফ্রিজিয়ান, জার্সি, শাহিওয়াল, হরিয়ানা, সিন্ধি, অস্ট্রেলিয়ান ও শাহিওয়াল-ফ্রিজিয়ান।
দেশের উন্নত স্থানীয় ধরনগুলো হলো পাবনা গরু, রেড চিটাগং, মুন্সীগঞ্জের গরু ও নর্থ বেঙ্গল গ্রে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, দেশি গরু গরম সহ্য করতে পারে এবং রোগে কম ভোগে; অন্যদিকে বিশুদ্ধ ও সংকর জাতের গরুর পুষ্টির চাহিদা বেশি, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা কম এবং পরজীবী ও রোগের ঝুঁকি বেশি। কঠিন পরিবেশ, সবুজ ঘাসের অভাব, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কারণে দেশে সংকর গরু প্রায়ই তার পুরো সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে না।

পশুর হাটে বড় আকারের কালো-সাদা সংকর গরু সাধারণত ‘অস্ট্রেলিয়ান’ বা ‘অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান’ নামে বিক্রি হয়। হোলস্টাইন ফ্রিজিয়ান কালো-সাদা রঙের একটি জাত, যার উৎপত্তি নেদারল্যান্ডস ও জার্মানিতে; এখন এটি মূলত দুধের জাত, যদিও শুরুতে দুধ ও মাংস দুই কাজেই পালন করা হতো। এই জাতের প্রাপ্তবয়স্ক পশুর ওজন ৬৮০ থেকে ৭৭০ কেজি এবং উচ্চতা ১৪৫ থেকে ১৬৫ সেন্টিমিটার বলে উল্লেখ আছে। ২০২২ সালের বগুড়ার ষাঁড়টিকে হোলস্টাইন ফ্রিজিয়ান বলা হয়েছিল, আর সিদ্ধিরগঞ্জের ষাঁড়টিকে অস্ট্রেলিয়ান ক্রস।

খৈল, ভুসি ও ঘাস: মোটাতাজাকরণ ও পশুখাদ্যের আইন
সিদ্ধিরগঞ্জের মালিক যে খাবারের কথা বলেছেন, খৈল, ভুসি ও সবুজ ঘাস, সেটিই দেশের গরু পালনের প্রচলিত খাদ্য। বাংলাপিডিয়া দেশের গোখাদ্যকে কয়েক ভাগে ভাগ করেছে: খড়ের মতো ফসলের অবশিষ্ট; চিটাগুড় ও খৈলের মতো কৃষিশিল্পের উপজাত; ভুসির মতো মিলের উপজাত; আর রাস্তার ধার ও বাঁধের ঘাস, গাছের পাতা এবং নেপিয়ার, পারা ঘাস ও ভুট্টার মতো চাষ করা সবুজ খাদ্য। এক বছর বয়সী ষাঁড় বাছুর মোটাতাজা করতে খামারিরা সবুজ ঘাস, গমের ভুসি, চালের কুঁড়া, ভাতের মাড় এবং ইউরিয়া-মোলাসেস ব্লক বা ইউরিয়া-মোলাসেস খড় যোগ করেন।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, প্রচলিত ও অপ্রচলিত খাদ্য উপাদানে এক বছর বয়সী ষাঁড় বাছুরের দৈনিক ওজন বাড়ে প্রায় ১ কেজি, আর বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) উদ্ভাবিত ইউরিয়া-মোলাসেস খড় পদ্ধতিতে প্রায় ৯৮ কেজি ওজনের দেশি এক বছর বয়সী গরু দিনে প্রায় ৪৫০ গ্রাম করে বেড়েছে। ঈদুল আজহায় মৌসুমি চাহিদার কারণে অনেক খামারি উন্নত জাতের এঁড়ে বাছুরের পরিকল্পিত মোটাতাজাকরণ শুরু করেছেন, তবে গরু মোটাতাজাকরণের খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি তখনো ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেও বাংলাপিডিয়া উল্লেখ করেছে।
খাবারে কী দেওয়া যাবে, তা আইনে নির্ধারিত। মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ২ নং আইন, ২৮ জানুয়ারি ২০১০)-এর ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড ও কীটনাশকসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা যাবে না, এবং এই বিধান লঙ্ঘন আইনের অধীনে অপরাধ। ২০ ধারায় এই আইনের অধীন অপরাধের দণ্ড অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ১৫ ধারা অনুযায়ী মহাপরিচালক বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খাদ্যের কারখানা, মজুতের স্থান, পরিবহনের যান ও বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করতে পারেন।
২০২৩ সালের কোরবানি: জোগান, চাহিদা ও সরকারের নির্দেশনা
২০২৩ সালের ১৯ জুন জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি জানায়, বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে ২৯ জুন; দ্য ডেইলি স্টার, বাসস ও নিউ এজ সেদিন এ খবর প্রকাশ করে। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানি করা যায়; পশুকে সুস্থ ও অন্ধত্বের মতো ত্রুটিমুক্ত হতে হয়; গরু কয়েকজন মিলে শরিকানায় কোরবানি দেওয়া যায়; আর মাংস সাধারণত তিন ভাগ করা হয়, নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্রদের জন্য।
ইউএনবির খবরে বলা হয়, ২০২৩ সালের ১৪ জুন এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী জানান, সে বছর কোরবানির জন্য পশু আছে ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি, যা আগের বছরের চেয়ে ৪ লাখ ১১ হাজার ৯৪৪টি বেশি; সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯টি, ফলে উদ্বৃত্ত ২১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯৪টি। মৌসুমটির জন্য মন্ত্রণালয় এই ব্যবস্থাগুলোর কথাও জানায়:
- আগের বছরের মতো সারা দেশের পশুর হাটে ভেটেরিনারি দল থাকবে এবং কোনো রোগাক্রান্ত বা অসুস্থ পশু বিক্রি করতে দেওয়া হবে না।
- পছন্দের হাটে পশু নিয়ে যেতে সহায়তা পেতে এবং পথের হাটে জোর করে পশু নামানো ঠেকাতে খামারিরা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করতে পারবেন; স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
- খামার বা বাড়ি থেকে পশু বিক্রি করলে খামারির কাছ থেকে কোনো রাজস্ব নেওয়া হবে না।
- হাটে পশু নিয়ে যাওয়া মানুষের কাছ থেকে ইজারাদারেরা জোর করে টাকা বা রাজস্ব আদায় করতে পারবেন না।

আগের ঈদের অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায়, খুব বড় ষাঁড়ের মালিকেরা কেন বাজারের দিকে সতর্ক নজর রাখছিলেন। ২০২২ সালের জুলাইয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে জানায়, ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার গরু দ্রুত বিক্রি হচ্ছে এবং ছোট গরুর জন্য ক্রেতারা আগের বছরের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেশি দিচ্ছেন, অথচ বড় গরুর বিক্রেতারা বিপাকে। ময়মনসিংহ থেকে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠে আনা ২৩ মণের একটি অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান গরু তিন দিনেও বিক্রি হয়নি, আর গাবতলীতে ৪০ মণের একটি অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ানের জন্য ১২ লাখ টাকা চাওয়া এক বিক্রেতা সর্বোচ্চ ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম শুনেছিলেন।
২০২৩ সালের ঈদের আগে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত
ততদিনে দেশের পশুর সংখ্যা ঈদের চাহিদা দেশ থেকেই মেটানোর মতো বড় হয়ে উঠেছিল। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) ২০২১-২২ অর্থবছরের তথ্য উদ্ধৃত করে ইমার্জিং ক্রেডিট রেটিংয়ের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি খাতবিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে গরু ২৪৭ লাখ, মহিষ ১৫ দশমিক ০৮ লাখ, ভেড়া ৩৭ দশমিক ৫২ লাখ এবং ছাগল ২৬৭ দশমিক ৭৪ লাখ। পশুর সংখ্যা বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে দেশে মাংস ও দুধের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে গরু রপ্তানিতে ভারতের নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়; এই নিষেধাজ্ঞার পর অনেক খামারি ও ব্যবসায়ী গরু পালনে যুক্ত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
একই প্রতিবেদনে ২০২১-২২ অর্থবছরের ডিএলএস তথ্য দেওয়া হয়: মাংস উৎপাদন ৯২ দশমিক ৬৫ লাখ টন, চাহিদা ৭৫ দশমিক ২০ লাখ টন, অর্থাৎ মাংস দেশের পুরো চাহিদা মিটিয়েছে; দুধ উৎপাদন ১৩০ দশমিক ৭৪ লাখ টন, চাহিদা ১৫৬ দশমিক ৬৮ লাখ টন। সে বছর মোট জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অবদান ছিল ১ দশমিক ৯০ শতাংশ (৬৭ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা) এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ; বাংলাপিডিয়ার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি পালনের সঙ্গে যুক্ত।
ছবি: Frameofashik / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রতিদিনের বাংলাদেশ, সংবাদ সারাবেলা, দেশেবিদেশে, ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি), দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), নিউ এজ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা টাইমস, বাংলা ট্রিবিউন, আরটিভি, বাংলাপিডিয়া, ইমার্জিং ক্রেডিট রেটিং লিমিটেড (প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য), বাংলাদেশের আইন (মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০), উইকিপিডিয়া (মণ, হোলস্টাইন ফ্রিজিয়ান, কোরবানি, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন)




মন্তব্য
(০)