সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

গরমের ডেজার্ট তরমুজের পুডিং: আগার আগারে জমানো সহজ রেসিপি

২০২৬ সালের এপ্রিলে গরমের মৌসুমে জাগো নিউজ ২৪ প্রকাশ করে তরমুজের পুডিংয়ের রেসিপি: ছেঁকে নেওয়া তিন কাপ তরমুজের রস, চিনি, আগার আগার ও লেবুর রস জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করে ফ্রিজে ৩০ মিনিট রাখলেই তৈরি এই ঠান্ডা ডেজার্ট।

গরমের ডেজার্ট তরমুজের পুডিং: আগার আগারে জমানো সহজ রেসিপি
রান্নাবান্না

২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল, গরম যখন বাড়ছিল আর দেশের বাজারজুড়ে উঠেছিল লাল-রসালো তরমুজ, তখন জাগো নিউজ ২৪ প্রকাশ করে তরমুজের পুডিংয়ের একটি সহজ রেসিপি। ছেঁকে নেওয়া তরমুজের রস, চিনি, আগার আগার আর লেবুর রস দিয়ে তৈরি এই ঠান্ডা ডেজার্ট ফ্রিজে জমে পরিবেশনের উপযোগী হয় মোটামুটি আধা ঘণ্টায়। এর জন্য ওভেন, ডিম বা দুধ কিছুই লাগে না। যে ফল বেশির ভাগ পরিবার কেটে সরাসরি খায়, তা থেকেই একটি ব্লেন্ডার, একটি পাত্র আর কয়েকটি বাটি দিয়ে ঘরে বানানো যায় চামচে খাওয়ার মতো ঠান্ডা মিষ্টি।

এশিয়াজুড়ে ফলের জেলির পেছনের ভাবনাও একই: ফলের রস মিষ্টি করে জমাট বাঁধানোর উপাদানের সঙ্গে জ্বাল দেওয়া হয়, তারপর ঠান্ডা হলে তা জমে যায়। এই রেসিপির মূল কৌশল আগার আগার, যা লাল সামুদ্রিক শৈবাল থেকে তৈরি একটি জমাট বাঁধানোর উপাদান। এটি সাধারণ তাপমাত্রাতেই শক্ত হয়ে জমে এবং গরমে আবার গলে যায় না। নিচে জাগো নিউজ ২৪-এর দেওয়া রেসিপিটি তুলে ধরা হলো, সঙ্গে রয়েছে উপকরণগুলো আসলে কী, মৌসুমের তরমুজ কোথা থেকে আসে এবং ফলটি নিরাপদে কীভাবে কেনা, ধোয়া ও রাখা যায়।

রেসিপিটি যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল


জাগো নিউজ ২৪ চারটি উপকরণের কথা বলেছিল। পরিমাণ দেওয়া হয়েছিল শুধু রসের, তিন কাপ ছেঁকে নেওয়া তরমুজের রস; চিনি, আগার আগার আর লেবুর রসের পরিমাণ রাঁধুনির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলের মিষ্টতা বুঝে চিনি কমবেশি করা যায়। আর আগার আগার মাপা ভালো এর প্যাকেটের নির্দেশনা দেখে, কারণ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাউডার ও কাঠি ভিন্ন ভিন্ন শক্তিতে জমে।

  • তরমুজ, যতটুকু থেকে তিন কাপ ছেঁকে নেওয়া রস পাওয়া যায়
  • চিনি, স্বাদমতো
  • আগার আগার
  • লেবুর রস

মূল প্রতিবেদনে দেওয়া প্রণালি, ধাপে ধাপে:

  • তরমুজ কেটে বিচি ফেলে দিন এবং কোনো পানি না মিশিয়ে শাঁস ব্লেন্ড করুন।
  • ব্লেন্ড করা ফল ছেঁকে রস আলাদা করে নিন।
  • ছেঁকে নেওয়া তিন কাপ রস একটি পাত্রে নিয়ে তাতে চিনি, আগার আগার ও লেবুর রস দিয়ে চুলায় জ্বাল দিন।
  • মিশ্রণে বলক এলে চুলা থেকে নামিয়ে নিন। নামানোর আগে খেয়াল রাখুন, চিনি যেন পুরোপুরি গলে যায় এবং চিনির পানিটুকু কিছুটা শুকিয়ে আসে।
  • গরম মিশ্রণটি একটি বোল বা ছোট পেয়ালায় ঢেলে ঠান্ডা হতে দিন।
  • ঠান্ডা হয়ে গেলে ফ্রিজে রেখে দিন।
  • ৩০ মিনিট পর ফ্রিজ থেকে বের করে পরিবেশন করুন।

পানি ছাড়া ব্লেন্ড করলে ফলের স্বাদ গাঢ় থাকে, কারণ তরমুজের শাঁসের নয়-দশমাংশেরও বেশি এমনিতেই পানি। ছেঁকে নিলে আঁশ আর বিচির ভাঙা টুকরো সরে যায়, ফলে পুডিং স্বচ্ছ ও মসৃণ হয়ে জমে। জ্বাল দেওয়ার ধাপটি জরুরি: আগার আগার ফুটন্ত তরলে গলে, শুধু হালকা গরম করা মিশ্রণ ঠিকমতো জমে না।

শি গুয়া লাও, বেইজিংয়ের রান্নার একটি তরমুজের জেলি, যা সাধারণত গ্রীষ্মে খাওয়া হয়; চীনের এ রকম একটি ডেজার্ট, দৃষ্টান্ত হিসেবে। ছবি: Zheng Zhou / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
শি গুয়া লাও, বেইজিংয়ের রান্নার একটি তরমুজের জেলি, যা সাধারণত গ্রীষ্মে খাওয়া হয়; চীনের এ রকম একটি ডেজার্ট, দৃষ্টান্ত হিসেবে। ছবি: Zheng Zhou / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আগার আগার কেন পুডিং জমায়


আগার আগার, যাকে প্রায়ই শুধু আগার বলা হয়, সেই উপাদান যা রসকে পুডিংয়ে পরিণত করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তাদের সামুদ্রিক শৈবাল শিল্পবিষয়ক নির্দেশিকায় জানিয়েছে, আগারের ব্যবহার মূলত এর জেল বা জমাট তৈরির ক্ষমতা এবং সেই জেলের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যকে ঘিরে। আগার ফুটন্ত পানিতে গলে যায়, আর ঠান্ডা হলে ৩২ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে জেল তৈরি করে; কোন শৈবাল থেকে আগার তৈরি, তার ওপর এই তাপমাত্রা নির্ভর করে।

জেলাটিনের সঙ্গে মূল পার্থক্য গলনাঙ্কে। জেলাটিনের জেল গলে প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, অর্থাৎ মোটামুটি শরীরের তাপমাত্রায়। এফএওর নির্দেশিকা বলছে, আগারের জেল ৮৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপে না তোলা পর্যন্ত গলে না। খাবারের ক্ষেত্রে এর মানে, গরম আবহাওয়াতেও আকার ধরে রাখতে আগারের ডেজার্ট ফ্রিজে রাখার প্রয়োজন পড়ে না, যা এপ্রিলের বাংলাদেশি রান্নাঘরের জন্য সুবিধাজনক। এফএও উল্লেখ করেছে, আগার যে তাপমাত্রায় জমে আর যে তাপমাত্রায় গলে, তার মধ্যকার এই বড় ব্যবধান অস্বাভাবিক এবং কেবল আগারেরই বৈশিষ্ট্য।

একই বৈশিষ্ট্যের কারণে মুখে আগারের অনুভূতিও আলাদা। জেলাটিন জিভে গলে যায়; আগার মুখে সেভাবে গলে বা দ্রবীভূত হয় না, তাই আগারের পুডিং বেশি দৃঢ় হয় এবং চামচের নিচে পরিষ্কারভাবে ভাঙে। এফএও বলছে, আগারের নিজস্ব কোনো স্বাদ নেই, তাই যে খাবার এটি জমায় তার স্বাদে এটি হস্তক্ষেপ করে না। এই রেসিপিতে তাই তরমুজ আর লেবুর স্বাদই প্রধান হয়ে থাকে।

চিনিরও ভূমিকা আছে। এফএওর নির্দেশিকা অনুযায়ী, কিছু আগার, বিশেষ করে জেলিডিয়াম শৈবাল থেকে আহরিত আগারকে "চিনি-সংবেদী" বলা হয়, কারণ সুক্রোজ বা চিনি এদের জেলের শক্তি বাড়ায়; অত্যন্ত বেশি চিনিযুক্ত ফলের ক্যান্ডিতে এগুলো ব্যবহার হয়। স্টার্চের মতো আগার সহজে হজম হয় না, তাই খাবারে এটি সামান্যই ক্যালরি যোগ করে। এফএও আরও জানিয়েছে, নিরামিষ খাবারে আগার ব্যবহৃত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) একে সাধারণভাবে নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত (জিআরএএস) শ্রেণিতে রেখেছে, বিভিন্ন ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ মাত্রাও বেঁধে দিয়েছে।

আগারে জমানো ফলের জেলির ইতিহাস এশিয়ায় দীর্ঘ। এফএওর নির্দেশিকা এর উৎস খুঁজেছে সেই পুরোনো রীতিতে, যেখানে শৈবাল সেদ্ধ করে ছেঁকে নেওয়া তরলে স্বাদ মেশানো হতো, তারপর ঠান্ডা হলে তা জেলি হয়ে যেত। উদাহরণ হিসেবে এতে জাপানের মিষ্টি খাবার মিৎসুমামের কথা বলা হয়েছে: ফল আর রং মেশানো আগার জেলের ছোট ছোট টুকরা, যা টুকরাগুলো না গলিয়েই টিনজাত ও জীবাণুমুক্ত করা যায়। এফএও বলছে, উৎপাদিত আগারের প্রায় ৯০ শতাংশ খাবারে ব্যবহৃত হয়, বাকি ১০ শতাংশ ব্যাকটেরিয়াবিদ্যা ও অন্যান্য জৈবপ্রযুক্তির কাজে।

প্রক্রিয়াজাত পাউডার আকারে আগার আগার। ছবি: Unkky / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
প্রক্রিয়াজাত পাউডার আকারে আগার আগার। ছবি: Unkky / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

লাল শৈবাল থেকে রান্নাঘরের পাউডার


আগার আসে লাল সামুদ্রিক শৈবাল থেকে। এফএওর নির্দেশিকা অনুযায়ী, বেশির ভাগ আগার আহরণ করা হয় জেলিডিয়াম ও গ্রাসিলারিয়া প্রজাতির শৈবাল থেকে। জেলিডিয়ামের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় টেরোক্লাডিয়া অল্প পরিমাণে সংগ্রহ করা হয়, মূলত আজোরস ও নিউজিল্যান্ডে। ভারতে আগারের প্রধান উৎস জেলিডিয়েলা অ্যাসেরোসা, আর রাশিয়া ও জাপানে আনফেল্টিয়া প্রজাতির শৈবাল ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রধান দুই শৈবালের বাসস্থান ভিন্ন। জেলিডিয়াম খাড়া ঢালের পাথুরে এলাকায়, ২ থেকে ২০ মিটার গভীর পানিতে থাকতে পছন্দ করে এবং সাধারণত ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সবচেয়ে ভালো বাড়ে। গ্রাসিলারিয়া জন্মায় ঢেউ থেকে সুরক্ষিত বালু বা কাদাময় তলদেশে, কখনো লোনা বা আধা-লোনা পানির জোয়ারভাটার হ্রদে ভেসেও থাকে; বছরে অন্তত তিন মাস এর জন্য ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার সমুদ্রের পানি দরকার। গ্রাসিলারিয়া নানা ধরনের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে এবং কয়েকটি দেশে এর চাষ হয়, যেমন দক্ষিণ চীনের পুকুর ও মোহনায়।

এফএওর নির্দেশিকা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছে, শৈবাল প্রথমে ধুয়ে বালু, লবণ ও ঝিনুকের খোসা সরানো হয়, তারপর কয়েক ঘণ্টা পানিতে জ্বাল দেওয়া হয়। আগার পানিতে গলে যায়, মিশ্রণ ছেঁকে শৈবাল সরানো হয়, আর গরম তরল ঠান্ডা করে এমন জেল তৈরি হয় যাতে প্রায় ১ শতাংশ আগার থাকে। গ্রাসিলারিয়াকে আগে ক্ষার দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়, এতে এর আগারের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে এবং জেলের শক্তি বাড়ে; এই ধাপ ছাড়া বেশির ভাগ গ্রাসিলারিয়া প্রজাতির আগার বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য অতি দুর্বল হয়। এরপর জেলকে জমিয়ে ও গলিয়ে বা চাপ দিয়ে পানি বের করা হয়, অবশিষ্ট আগার গরম বাতাসের চুল্লিতে শুকিয়ে গুঁড়া করা হয়।

খাবারের আগার দুই রূপে বিক্রি হয়: কাঠি বা ফালি এবং পাউডার। কাঠি আগার, যাকে কখনো প্রাকৃতিক আগার বলা হয়, এখনো চীন, জাপান ও কোরিয়া প্রজাতন্ত্রে ছোট পরিসরে পুরোনো পদ্ধতিতে তৈরি হয়: জেলিডিয়াম সামান্য অম্লীয় পানিতে কয়েক ঘণ্টা সেদ্ধ করা হয়, নির্যাস সুতি কাপড়ে ছেঁকে কাঠের ট্রেতে জমানো হয়, তারপর জেল চেপে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা কাঠি বানানো হয়। কাঠিগুলো রাতে বাইরে রেখে জমানো হয় আর দিনে গলতে দেওয়া হয়, এতে পানি ঝরে যায়; পরে রোদে শুকানো হয়। এফএও উল্লেখ করেছে, কাঠি আগার আগে ভিজিয়ে রাখলে ফুটন্ত পানিতে সহজে গলে; আপনার আগার পাউডার না হয়ে কাঠি হলে এই রেসিপিতে কথাটি মনে রাখা কাজে দেবে। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, ভারত বছরে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টন শুকনো শৈবাল থেকে ১০০ থেকে ১৬০ টন আগার উৎপাদন করে।

গ্রাসিলারিয়া, যে লাল শৈবালগুলো থেকে বেশির ভাগ আগার আহরণ করা হয় তার একটি। ছবি: Emoody26 at English Wikipedia / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
গ্রাসিলারিয়া, যে লাল শৈবালগুলো থেকে বেশির ভাগ আগার আহরণ করা হয় তার একটি। ছবি: Emoody26 at English Wikipedia / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

তরমুজ: ডেজার্টের পেছনের ফল


তরমুজ (Citrullus lanatus) লাউ-কুমড়া গোত্রের (কিউকারবিটেসি) একটি লতানো, মাটিতে ছড়িয়ে থাকা একবর্ষজীবী উদ্ভিদ, যা বড় আকারের ফলের জন্য গ্রীষ্মমণ্ডল থেকে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল পর্যন্ত চাষ হয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর ফল একধরনের বেরি, যাকে পেপো বলা হয়; এর খোসা শক্ত এবং ভেতরে কোনো খোপ বা ভাগ থাকে না। শাঁস সাধারণত গাঢ় লাল থেকে গোলাপি, আর এর অসংখ্য বিচি পরিপক্ব হলে কালো, অপরিপক্ব অবস্থায় সাদা; বিচিহীন জাতও আছে। ফলটি কাঁচা বা আচার করে খাওয়া যায়, রস হিসেবে পান করা যায় বা মিশ্র পানীয়তে ব্যবহার করা যায়, আর খোসা রান্না করে খাওয়া যায়।

এই উদ্ভিদের ইতিহাস দীর্ঘ। বিশ্বকোষীয় সূত্রে সংকলিত উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রত্নতত্ত্বের গবেষণা আধুনিক তরমুজের উৎস খুঁজে পেয়েছে সুদানে, যেখানে এটি প্রথম গৃহপালিত বা চাষের আওতায় আসে; সুদানের কর্ডোফান তরমুজকে এর নিকটতম আত্মীয় এবং সম্ভাব্য পূর্বপুরুষ মনে করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালের মধ্যে মিসরে তরমুজের চাষ হতো, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে ভারতে এর চাষ হচ্ছিল এবং দশম শতকের মধ্যে এটি চীনে পৌঁছায়। প্রথম দিকের তরমুজ ছিল তেতো, শাঁস ছিল হলদেটে-সাদা; আজকের মিষ্টি ফলটি শতাব্দীর পর শতাব্দী বাছাই প্রজননের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। ১৯৩৯ সালে জাপানি বিজ্ঞানীরা প্রথম বিচিহীন, ট্রিপ্লয়েড তরমুজ উদ্ভাবন করেন।

তরমুজের ১ হাজার ২০০টির বেশি জাত রয়েছে, যেগুলোর ওজন এক কেজির কম থেকে ৯০ কেজির বেশি পর্যন্ত হয়, আর শাঁস লাল, গোলাপি, কমলা, হলুদ বা সাদা হতে পারে। ফসলটির উষ্ণতা প্রয়োজন: ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় তরমুজ ভালো জন্মায়, আর আদর্শ মাটি হলো পানি সহজে নেমে যায় এমন বেলে দোআঁশ, যার পিএইচ ৫.৭ থেকে ৭.২-এর মধ্যে। এর প্রধান শত্রুপোকার মধ্যে রয়েছে জাবপোকা, ফলের মাছি ও শিকড়ে গিঁট সৃষ্টিকারী কৃমি (রুট-নট নেমাটোড); বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে গাছ পাউডারি মিলডিউ ও মোজাইক ভাইরাসের মতো রোগে আক্রান্ত হয়। বিশ্বে তরমুজের সবচেয়ে বড় উৎপাদক দেশ চীন, অন্য দেশগুলোর চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে।

১০০ গ্রাম তরমুজে যা থাকে


যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য উপাদান তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রাল কাঁচা তরমুজের শাঁসের উপাদান জানিয়েছে। ১০০ গ্রাম শাঁসে থাকে:

  • পানি: ৯১.৪৫ গ্রাম
  • শক্তি: ১২৭ কিলোজুল (৩০ কিলোক্যালরি)
  • শর্করা: ৭.৫৫ গ্রাম, যার মধ্যে চিনি ৬.২ গ্রাম
  • খাদ্য আঁশ: ০.৪ গ্রাম
  • আমিষ: ০.৬১ গ্রাম; চর্বি: ০.১৫ গ্রাম
  • পটাশিয়াম: ১১২ মিলিগ্রাম
  • ভিটামিন সি: ৮.১ মিলিগ্রাম
  • ভিটামিন এ: ২৮ মাইক্রোগ্রাম, সঙ্গে ৩০৩ মাইক্রোগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন
  • শাঁসের লাল রঞ্জক লাইকোপিন: ৪ হাজার ৫৩২ মাইক্রোগ্রাম

অর্থাৎ তরমুজের বেশির ভাগই পানি, সঙ্গে কিছু প্রাকৃতিক চিনি, চর্বি ও আমিষ সামান্য; এর লাল রং আসে ক্যারোটিনয়েড রঞ্জক থেকে, প্রধানত লাইকোপিন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুডিং তাজা ফল থেকে আলাদা: এতে বাড়তি চিনি থাকে। ডায়াবেটিস আছে এমন কেউ, চিকিৎসকের দেওয়া খাদ্যতালিকা মেনে চলা কেউ, কিংবা ছোট শিশুর জন্য বানালে বিষয়টি বিবেচনায় রাখুন এবং কতটুকু খাওয়া উপযুক্ত, তা চিকিৎসক বা যোগ্য পুষ্টিবিদের কাছে জেনে নিন।

দুই ভাগ করে কাটা একটি তরমুজ, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ছবি। ছবি: Scott Bauer, USDA / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
দুই ভাগ করে কাটা একটি তরমুজ, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ছবি। ছবি: Scott Bauer, USDA / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

দক্ষিণাঞ্চলে বাংলাদেশের তরমুজ মৌসুম


বাংলাদেশে তরমুজ মূলত দক্ষিণাঞ্চলের শুষ্ক মৌসুমের ফসল। উপকূলীয় বরিশাল বিভাগ, যার প্রধান উৎপাদক জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে পটুয়াখালী ও ভোলা, দেশের তরমুজের বড় অংশ জোগায়। এই রেসিপি প্রকাশের আগের মৌসুমগুলোতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো দেখায়, ফসলটির আবাদ কত দ্রুত বেড়েছে।

২০২৩ সালের মার্চে ডিএইর পটুয়াখালী কার্যালয় দ্য ডেইলি স্টারকে জানায়, সেই মৌসুমে জেলায় ২৮ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে, হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ৩৮ টন, মোট উৎপাদন ১০ লাখ ৯২ হাজার টন। কর্মকর্তারা বলেন, তরমুজ চাষের জন্য জেলার মাটি খুবই উপযোগী এবং আবহাওয়াও অনুকূলে ছিল। সবচেয়ে বেশি আবাদ হয় গলাচিপা উপজেলায়, ১১ হাজার ৭৫০ হেক্টরে; এরপর রাঙ্গাবালীতে ৮ হাজার ২৬২ হেক্টরে। পাইকাররা তখন পদ্মা সেতু পার হয়ে ট্রাকে করে তরমুজ নিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়।

২০২৪ সালের এপ্রিলে জেলা ডিএই বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, ২৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন হবে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টন। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে গলাচিপায় ৮ হাজার ৯৫০ হেক্টর, রাঙ্গাবালীতে ৬ হাজার ৩৫০, বাউফলে ৩ হাজার ৫২০, কলাপাড়ায় ১ হাজার ৭৫০, দশমিনায় ১ হাজার ৭২০, সদরে ৮০৫, দুমকিতে ৩৫০ এবং মির্জাগঞ্জে ১৫৫ হেক্টরে তরমুজ আবাদ হয়। ডিএইর প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম মল্লিক বলেন, প্রায় সবই অধিক ফলনশীল হাইব্রিড জাতের এবং এর বাজারমূল্য দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। কৃষকেরা জানান, তাঁরা এক মৌসুমের জন্য জমি ইজারা নেন, আর ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যাপারীরা মৌসুমের আগেই চাষিদের দাদন দিয়ে রাখেন এবং ট্রলার, ট্রাক ও লঞ্চে তরমুজ সংগ্রহ করে নিয়ে যান।

২০২৫ সালের মার্চে ডিএইর বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয় বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, বিভাগের ছয় জেলায় ৪৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টরে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তরমুজ আবাদ হয়েছে ৫৪ হাজার ৫৫১ হেক্টরে, হেক্টরপ্রতি ফলন ৩৯.১৫ টন, আর মৌসুম শেষে ১৮ লাখ ৮১ হাজার ১৭২ টন উৎপাদনের আশা করছেন কর্মকর্তারা। বরিশালের পোর্ট রোডের আড়তদারেরা জানান, প্রতিদিন শতাধিক ইঞ্জিনচালিত ট্রলার আসছে, প্রতিটিতে আড়াই থেকে তিন হাজার তরমুজ, আর বড় তরমুজ বিক্রি হচ্ছে শতপ্রতি ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায়। কৃষকেরা বলেন, সেবার বৃষ্টি না হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে, তবে একধরনের ভাইরাস কিছু খেতের তরমুজ নষ্ট করেছে।

২০২৫-২৬ মৌসুমে আবাদ আরও বাড়ে। ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, পটুয়াখালীতে আগের বছরের ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর থেকে তরমুজের আবাদ বেড়ে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৮০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে, মৌসুমের শেষ দিকে তা আরও বাড়তে পারে। উৎপাদন, পরিবহন ও বীজ মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনার কথা জানায় ডিএই। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞদের মতে, দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি তরমুজ চাষের উপযোগী, আর জোয়ার-ভাটার নদীর রেখে যাওয়া পলিমাটি উর্বরতা বাড়ায়, ফলে তুলনামূলক কম সারেও ভালো ফলন মেলে। সদর, গলাচিপা, দশমিনা, বাউফল, রাঙ্গাবালী ও মির্জাগঞ্জ উপজেলায় তরমুজের আবাদ সবচেয়ে বেশি, আর সেখানকার অনেক তরমুজের ওজন ২০ থেকে ২২ কেজি পর্যন্ত হয়। কয়েকজন কৃষক জানান, ধান কাটার পর ডাল বা মরিচের বদলে তাঁরা এখন তরমুজ চাষ করছেন। ডিএইর উপপরিচালক ড. মো. আমানুল ইসলাম পত্রিকাটিকে বলেন, কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং কুয়াশাজনিত পাতা পচা রোগ প্রতিরোধ ও অতিরিক্ত গরমে ফল ফেটে যাওয়া রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

নিরাপদে তরমুজ কেনা, ধোয়া ও রাখা


তাজা ফলের ডেজার্ট ততটাই নিরাপদ, যতটা নিরাপদ ফলটি আর রান্নাঘর। যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ তাজা ফল-সবজি বাছাই ও পরিবেশনবিষয়ক ভোক্তা নির্দেশনায় বলেছে, মাটি বা পানির ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মাঠে থাকতেই কিংবা ফসল তোলার পর সংরক্ষণ বা প্রস্তুতির সময় ফলকে দূষিত করতে পারে। এই রেসিপির জন্য কেনা তরমুজের ক্ষেত্রে এর পরামর্শগুলো সরাসরি প্রযোজ্য:

  • থেঁতলানো বা ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমন ফল বেছে নিন। কাটা ফল, যেমন অর্ধেক তরমুজ কিনলে কেবল ফ্রিজে রাখা বা বরফে ঘেরা টুকরাই নিন।
  • ফল-সবজি প্রস্তুতের আগে ও পরে সাবান আর কুসুম গরম পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুয়ে নিন।
  • খোসা না খেলেও কাটার আগে ফলটি প্রবহমান পানিতে ধুয়ে নিন, যাতে ছুরির সঙ্গে ওপরের ময়লা ও ব্যাকটেরিয়া শাঁসে না পৌঁছায়। তরমুজের মতো শক্ত খোসার ফল পরিষ্কার ব্রাশ দিয়ে ঘষে ধুয়ে পরিষ্কার কাপড় বা কাগজের তোয়ালে দিয়ে মুছে শুকিয়ে নিন।
  • সাবান, ডিটারজেন্ট বা বাণিজ্যিক ফল-সবজি ধোয়ার দ্রবণ দিয়ে ফল ধোবেন না; ফল-সবজি এসব শুষে নিতে পারে।
  • থেঁতলানো বা নষ্ট অংশ কেটে ফেলুন, আর পচা মনে হলে পুরো ফলটিই ফেলে দিন।
  • কাঁচা খাওয়ার ফল কাঁচা মাংস, মুরগি ও সামুদ্রিক খাবার থেকে এবং সেগুলোর জন্য ব্যবহৃত বোর্ড ও ছুরি থেকে আলাদা রাখুন।
  • কাটা ফল পরিষ্কার ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রায় রাখুন।

এফডিএ আরও বলেছে, ধোয়ার ফলে ব্যাকটেরিয়া কমে, কিন্তু সব দূর হয় না; আর ভালোভাবে রান্না করলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। এই রেসিপিতে রস আগারের সঙ্গে ফোটানো হয়; তবু পুডিং যেহেতু ঠান্ডা পরিবেশন করা হয়, জমে যাওয়ার পর তা ঢেকে ফ্রিজে রাখা উচিত। খাবার থেকে অসুস্থ হয়েছেন মনে হলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয় এফডিএ।

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও, "আ গাইড টু দ্য সিউইড ইন্ডাস্ট্রি", ২০০৩), যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ফুডডেটা সেন্ট্রাল), যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), দ্য ডেইলি স্টার, বাংলা ট্রিবিউন, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)