বাংলাদেশের খাবারের তালিকায় মাছের জায়গা অনেক বড়। অনেকে মলার মতো ছোট মাছ কাঁটাসহ চিবিয়ে খান, আবার কখনো অসাবধানে বড় মাছের কাঁটা গিলে ফেলেন। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ১ জুলাই এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে: মাছের কাঁটা পেটে গেলে উপকার হয়, না ক্ষতি? পুষ্টি ও চিকিৎসা গবেষণা বলছে, দুটোই সত্য। ছোট মাছের নরম কাঁটা ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস, কিন্তু বড় ও ধারালো কাঁটা গলায় বা খাদ্যনালিতে আটকে গুরুতর বিপদ ঘটাতে পারে।
মাছের কাঁটায় কী থাকে
মাছের কাঁটায় ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যতথ্য সেবা মেডলাইনপ্লাস জানায়, ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁত মজবুত করে এবং রক্ত জমাট বাঁধা, স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান, পেশির সংকোচন-প্রসারণ ও স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দনে কাজ করে। সংস্থাটি ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে নরম কাঁটাসহ টিনজাত স্যামন ও সার্ডিন মাছের কথাও বলে।
কাঁটার ক্যালসিয়াম শরীর কতটা নিতে পারে, তা নিয়ে নরওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড সিফুড রিসার্চের গবেষকেরা ২০১০ সালে নিউট্রিশন অ্যান্ড মেটাবলিজম সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। ১০ জন সুস্থ তরুণকে ৮০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়ামযুক্ত তিন ধরনের খাবার দেওয়া হয়: কড মাছের কাঁটা, স্যামন মাছের কাঁটা এবং তুলনার জন্য ক্যালসিয়াম কার্বনেট। গড়ে কডের কাঁটা থেকে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ, স্যামনের কাঁটা থেকে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ক্যালসিয়াম কার্বনেট থেকে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ ক্যালসিয়াম শোষিত হয়। গবেষকদের সিদ্ধান্ত, এই দুই মাছের কাঁটা খাদ্য বা সম্পূরক (সাপ্লিমেন্ট) তৈরিতে প্রাকৃতিক ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী।

ছোট মাছ কাঁটাসহ খাওয়ার পুষ্টিগুণ
বাংলাদেশে ছোট মাছ সাধারণত মাথা ও কাঁটাসহ পুরোটা খাওয়া হয়। ২০০৭ সালে জার্নাল অব নিউট্রিশনে প্রকাশিত রুস ও সহকর্মীদের এক পর্যালোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার গ্রামে মাছের মৌসুমে মোট খাওয়া মাছের ৫০ থেকে ৮০ শতাংশই ছোট মাছ। অনেক ছোট মাছ পুরোটা খাওয়া হয় বলে সেগুলো ক্যালসিয়ামের সমৃদ্ধ উৎস; কিছু ছোট মাছে ভিটামিন এ, আয়রন ও জিংকও প্রচুর। মলা মাছকে গবেষকেরা ভিটামিন এ সমৃদ্ধ মাছ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এর আগে ২০০০ সালে ব্রিটিশ জার্নাল অব নিউট্রিশনে প্রকাশিত ইঁদুরের ওপর এক গবেষণায় বাংলাদেশের মলা মাছ কাঁটাসহ খাওয়ানো হয় এবং তুলনা করা হয় ননিতোলা দুধের সঙ্গে। ফলাফলে দেখা যায়, কাঁটাসহ ছোট মাছের ক্যালসিয়াম শরীর গ্রহণ করতে পারে, যদিও তা দুধের ক্যালসিয়ামের মতো সহজে না-ও মিলতে পারে। গবেষকেরা বলেন, যাঁরা দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার কম খান, তাঁদের মধ্যে ছোট মাছের উৎপাদন ও খাওয়া বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া উচিত।


বড় ও ধারালো কাঁটার ঝুঁকি
চিকিৎসা গবেষণা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের গলা ও খাদ্যনালিতে খাবারজনিত যত বস্তু আটকায়, তার মধ্যে মাছের কাঁটাই সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে এশিয়ায়। দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের চিকিৎসক কিম হিউন-উ ২০১৬ সালে ক্লিনিক্যাল এন্ডোস্কপি সাময়িকীতে এক পর্যালোচনায় লেখেন, গিলে ফেলা বাইরের বস্তুর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কোনো জটিলতা ছাড়াই নিজে থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু অন্য বস্তুর তুলনায় মাছের কাঁটায় রক্তক্ষরণ ও খাদ্যনালি ফুটো হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে। কাঁটা খাদ্যনালির দেয়াল ভেদ করলে মহাধমনির (অ্যাওর্টা) সঙ্গে প্রাণঘাতী সংযোগ তৈরি হতে পারে।
ওই পর্যালোচনা অনুযায়ী, কাঁটা যত বেশি সময় আটকে থাকে, ঝুঁকি তত বাড়ে; কাঁটার ধরন এবং ৩ সেন্টিমিটারের বেশি লম্বা কাঁটাও ঝুঁকি বাড়ায়। খাদ্যনালিতে কাঁটা আটকানোর ঘটনা মূলত ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে দেখা যায়; গবেষকদের ধারণা, বয়সের সঙ্গে গেলার ক্ষমতা কমে যাওয়া এর একটি কারণ।
কাঁটা আটকে গেলে কী করবেন
কাঁটা গলায় আটকে গেলে ঘরোয়া উপায়ে জোর করে নামানোর চেষ্টা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে যেতে হবে। ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল এন্ডোস্কপির (ইএসজিই) ২০১৬ সালের চিকিৎসা নির্দেশিকা বলছে, খাদ্যনালিতে ধারালো বস্তু আটকালে জরুরি ভিত্তিতে এন্ডোস্কপি করে তা বের করতে হবে, সম্ভব হলে ২ ঘণ্টার মধ্যে, দেরি হলেও ৬ ঘণ্টার মধ্যে। কিমের পর্যালোচনায় জটিলতার লক্ষণ হিসেবে যা উল্লেখ করা হয়েছে:
- রক্তবমি
- খাবার গিলতে কষ্ট
- শ্বাসকষ্ট
- জ্বর
- বুকে ও পিঠে ব্যথা
কাঁটা নেমে যাওয়ার বা বের করার পরও কয়েক ঘণ্টা আটকে থাকার অনুভূতি থেকে যেতে পারে; কাঁটা রয়ে গেছে কিনা, তা চিকিৎসক পরীক্ষা করে নিশ্চিত করতে পারেন। ছোট মাছের কাঁটা খেতে চাইলে তা নরম কিনা দেখে ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়াই নিরাপদ।

ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মেডলাইনপ্লাস (যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন), নিউট্রিশন অ্যান্ড মেটাবলিজম (মালদে ও সহকর্মী, ২০১০), জার্নাল অব নিউট্রিশন (রুস ও সহকর্মী, ২০০৭), ব্রিটিশ জার্নাল অব নিউট্রিশন (লারসেন ও সহকর্মী, ২০০০), ক্লিনিক্যাল এন্ডোস্কপি (কিম, ২০১৬), ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল এন্ডোস্কপি (ইএসজিই) নির্দেশিকা, ২০১৬



মন্তব্য
(০)