শীতের মৌসুমে আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ মহামারি আকার নিতে পারে, এমন আশঙ্কায় ২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে কৃষকদের আগাম সতর্কবার্তা দেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি জাগো নিউজে প্রকাশিত এক লেখায় ডিপ্লোমা কৃষিবিদ ও চাষী সেবার উদ্যোক্তা জিয়াউল হক রোগটির লক্ষণ ও দমনের উপায় তুলে ধরেন। তাঁর লেখা, ডিএইর সতর্কবার্তা এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সুপারিশ মিলিয়ে চাষিদের করণীয় নিচে দেওয়া হলো।
কেন এ রোগ এত ক্ষতিকর
লেইট ব্লাইট বিশ্বজুড়ে আলুর অন্যতম ক্ষতিকর রোগ। এর জীবাণু ফাইটোফথোরা ইনফেস্টানস (Phytophthora infestans), যা প্রকৃত ছত্রাক নয়, ছত্রাকসদৃশ একটি ওমাইসিট বা ওয়াটার মোল্ড। ১৮৪৫ থেকে ১৮৫২ সালে আয়ারল্যান্ডের মহাদুর্ভিক্ষের পেছনে ছিল এই জীবাণু। কৃষি তথ্য সার্ভিসে (এআইএস) প্রকাশিত বারির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের পর আলু চাষের বিস্তারের সঙ্গে এ রোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়তে থাকে এবং প্রতিবছর এ রোগে আলুর ফলন গড়ে শতকরা ৩০ ভাগ কমে যায়। ব্যবস্থা না নিলে পুরো ফলন নষ্ট হতে পারে।
ডিএইর সতর্কবার্তা ও বারির তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এ রোগের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। রাতে ১০ থেকে ১৬ ডিগ্রি এবং দিনে ১৬ থেকে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর ৯০ শতাংশের বেশি আর্দ্রতার কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া রোগ বিস্তারের অনুকূল। কুয়াশার সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে রোগ মহামারি আকার নিতে পারে। বাতাস, বৃষ্টি ও সেচের পানির মাধ্যমে জীবাণু আক্রান্ত গাছ থেকে সুস্থ গাছে দ্রুত ছড়ায়।
রোগ চেনার লক্ষণ
প্রথমে গাছের গোড়ার দিকের পাতায় ছোপ ছোপ ভেজা, হালকা সবুজ, গোলাকার বা নানা আকারের দাগ দেখা যায়, যা দ্রুত কালো হয়ে পাতা পচিয়ে দেয়। সকালে মাঠে গেলে আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো জীবাণু চোখে পড়ে। ঠান্ডা ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় আক্রান্ত গাছ দ্রুত পচে যায় এবং দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে খেতের সব গাছ মরে যেতে পারে। জিয়াউল হক লিখেছেন, আক্রান্ত খেতে পোড়া পোড়া গন্ধ পাওয়া যায় এবং মনে হয় যেন ফসল পুড়ে গেছে। আক্রান্ত আলুর গায়ে বাদামি থেকে কালচে দাগ পড়ে, আলু খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়।

রোগ ঠেকাতে আগাম ব্যবস্থা
বারির সুপারিশ অনুযায়ী, চাষের সময় থেকেই কিছু ব্যবস্থা নিলে রোগের মাত্রা অনেকটা কমে:
- ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আলু রোপণ বা আগাম জাতের চাষ।
- রোগ সহনশীল জাত, যেমন বারি আলু-৪৬, বারি আলু-৫৩ ও বারি আলু-৭৭ এবং রোগমুক্ত প্রত্যায়িত বীজ ব্যবহার।
- মৌসুমজুড়ে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন।
- সারি থেকে সারির দূরত্ব ৬০ সেন্টিমিটার; আস্ত বীজ আলুতে গাছ থেকে গাছ ২৫ সেন্টিমিটার, কাটা আলুতে ১৫ সেন্টিমিটার; সারিতে ভালোভাবে মাটি তুলে দেওয়া এবং সেচের পর গোড়ার মাটি সরে গেলে আবার ঢেকে দেওয়া।
ডিএইর সতর্কবার্তায় বলা হয়, রোগের অনুকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া মাত্র অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর স্প্রে করে গাছ ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। বারি এই প্রতিরোধমূলক স্প্রের জন্য ম্যানকোজেব গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রতি লিটারে ২ গ্রাম হারে ৭ থেকে ১০ দিন অন্তর দেওয়ার কথা বলেছে।
রোগ দেখা দিলে করণীয়
ফসল আক্রান্ত হলে রোগ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত জমিতে সেচ বন্ধ রাখতে হবে; ডিএই এ অবস্থায় ৪ থেকে ৫ দিন পর পর সঠিক মাত্রায় অনুমোদিত ছত্রাকনাশক স্প্রের পরামর্শ দিয়েছে। বারির সুপারিশ অনুযায়ী, নিজের বা পাশের খেতে রোগ দেখা মাত্রই ৭ দিন অন্তর নিচের যেকোনো একটি গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক পর্যায়ক্রমে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে গাছ ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে:
- ম্যানকোজেব ৬০% + ডাইমেথোমর্ফ ৯%: ২ গ্রাম
- ম্যানকোজেব ৫০% + ফেনামিডন ১০%: ২ গ্রাম
- প্রোপিনেব ৭০% + ইপ্রোভেলিকার্ব: ২ গ্রাম
- এমেটোকট্রাডিন ৩০% + ডাইমেথোমর্ফ ২২.৫%: ২ মিলি
- ম্যানকোজেব ৬৪% + সাইমোক্সানিল ৮%: ২ গ্রাম
- ফ্লুমর্ফ ১০% + ম্যানকোজেব ৫০%: ২ গ্রাম
দীর্ঘ সময় কুয়াশা থাকলে ও রোগ ব্যাপক হলে বারি দুটি ছত্রাকনাশকের মিশ্রণ স্প্রের কথা বলেছে; প্রাদুর্ভাব খুব বেশি হলে মিশ্রণ ৩ থেকে ৪ দিন অন্তর দিতে হবে। কোন মিশ্রণ কী মাত্রায় দেবেন, তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো। পাতার ওপরে ও নিচে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে; সাধারণ স্প্রেয়ারের বদলে পাওয়ার স্প্রেয়ারে ভালো ফল মেলে। গাছ ভেজা থাকলে স্প্রে না করাই ভালো, করতেই হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম সাবানের গুঁড়া মেশাতে হবে।

স্প্রের সময় নিরাপত্তা
ছত্রাকনাশক স্প্রের সময় হাতমোজা, সানগ্লাস, মাস্ক ও অ্যাপ্রোন পরতে হবে এবং সব সময় বাতাসের অনুকূলে স্প্রে করতে হবে। জিয়াউল হক স্প্রের পর সরঞ্জাম পরিষ্কার করা এবং সাবান দিয়ে শরীর, হাত ও পা ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

ছবি: কুউ পুলক / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কৃষি তথ্য সার্ভিস (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য), বাংলা এডিশন, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)