২০২৬ সালের ২৫ মে রাতে, ঈদুল আজহার তিন দিন আগে, জাগো নিউজ ২৪-এর মতামত বিভাগে কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে একটি কলাম প্রকাশিত হয়। লেখক সাংবাদিক, কলামিস্ট ও আমার দিন পত্রিকার সম্পাদক আহসান হাবিব বরুন। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল, কোরবানির পর চামড়া ঠিকমতো ছাড়ানো ও সময়মতো লবণ দিয়ে সংরক্ষণ না করায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয় বা মান হারায়, আর এর ক্ষতি গিয়ে পড়ে কোরবানিদাতা, মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা-এতিমখানা এবং দেশের চামড়া শিল্পের ওপর।
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ মে জানিয়েছিল, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ায় ২৮ মে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। কলামটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন সরকার কোরবানির চামড়ার দাম ঘোষণা করেছে, চামড়া সংরক্ষণে বিনামূল্যে লবণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী ও চামড়া সংরক্ষণকারীদের প্রশিক্ষণ চলছে। এই প্রতিবেদনে কলামের যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি সে সময়ের সরকারি সিদ্ধান্ত, পশু ও চামড়ার পরিসংখ্যান, চামড়া সংরক্ষণের প্রামাণ্য নিয়ম এবং দেশের চামড়া শিল্পের পটভূমি একসঙ্গে দেওয়া হলো।
কলামে লেখকের যুক্তি
আহসান হাবিব বরুন লিখেছেন, ঈদুল আজহার সময় দেশে লাখ লাখ পশু জবাই হয় এবং এ থেকে আসা কাঁচা চামড়া দেশের চামড়া শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। তাঁর মতে, অসচেতনতা, সঠিক সংরক্ষণের অভাব, পরিবহন জটিলতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এই চামড়ার বড় একটি অংশ প্রতিবছর নষ্ট হয়। তিনি চামড়াকে শুধু উপজাত হিসেবে না দেখে জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।
লেখকের পর্যবেক্ষণ, চামড়া নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা শুরু হয় জবাইয়ের পরপরই। পর্যাপ্ত লবণ না দেওয়া, ভেজা জায়গায় ফেলে রাখা, রোদে অতিরিক্ত শুকানো বা দীর্ঘ সময় অযত্নে রাখার ফলে চামড়ার মান কমে যায়। তিনি সরকারের বিনামূল্যে লবণ বিতরণের সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন এবং সাধারণ মানুষকে জবাইয়ের পরপরই চামড়া পরিষ্কার করে লবণ লাগানো, বাতাস চলাচলের সুযোগ রেখে রাখা এবং দ্রুত সংগ্রহ কেন্দ্র বা আড়তে পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ দেন।
কলামে বাজারের প্রসঙ্গও এসেছে। লেখকের অভিযোগ, সরকার প্রতিবছর চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে সেই দাম কার্যকর হয় না, ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে দাম কমান এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এর সমাধান হিসেবে তিনি কঠোর নজরদারি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও স্বচ্ছ নিলাম ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন। এই অভিযোগগুলো লেখকের নিজস্ব মত; কলামে নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের নাম নেই।
লেখক আরও যুক্তি দেন যে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, মসজিদ কমিটি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও গণমাধ্যম ঈদের আগে প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে চামড়া সংরক্ষণের নিয়ম শেখাতে পারে। পরিবেশের দিক থেকে তিনি ট্যানারির বর্জ্য শোধন ও পরিবেশসম্মত প্রযুক্তির ওপর জোর দেন, আর অর্থনীতির দিক থেকে কাঁচা চামড়ার বদলে দেশে উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলেন। ধর্মীয় দিক নিয়ে তাঁর বক্তব্য, ইসলাম অপচয়কে নিরুৎসাহিত করে এবং কোরবানির প্রতিটি অংশের যথাযথ ব্যবহার একটি দায়িত্ব।

২০২৬ সালের ঈদের আগে সরকারের সিদ্ধান্ত
২০২৬ সালের ১৩ মে সচিবালয়ে কোরবানি সম্পর্কিত বিষয়াদির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ কমিটির সভা শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চামড়ার নতুন দাম ঘোষণা করেন। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সারা দেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা ঠিক করা হয়।
একই ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী জানান, কোরবানির চামড়া যেন নষ্ট না হয় সে জন্য সরকারি অর্থায়নে সারা দেশে বিনামূল্যে লবণ পৌঁছানো হবে এবং এ জন্য ইতোমধ্যে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ কেনা হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) মাধ্যমে জেলা-উপজেলায় এই লবণ পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়। তিনি আরও জানান, প্রতিটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন মসজিদ-মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের ডেকে চামড়া সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেবে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ ও লবণ সরবরাহ মিলিয়ে সরকারের প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন এবং চামড়া পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়।
এর আগে ৪ মে জেলা প্রশাসক সম্মেলনের এক কার্য-অধিবেশন শেষে একই মন্ত্রী বলেছিলেন, চামড়া সংরক্ষণে সরকারিভাবে লবণ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও প্রচার কার্যক্রম চালানো হবে এবং ঈদের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চামড়া পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ৭ মে বাসসের প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য আসে: গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে চামড়া সাত দিন পর্যন্ত লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে এবং এই সময়ের মধ্যে কোনো চামড়া ঢাকায় আনা যাবে না। তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, এতে ঢাকার বর্জ্য শোধনাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং চামড়া নষ্ট হওয়া রোধ করা যাবে। ঈদের পরের সাত দিন রাজধানীর বাইরের চামড়া ঢাকায় না ঢোকার নিয়ম আগের বছরগুলোতেও ছিল বলে ২০২৪ সালে কোরবানির আগে বিডিনিউজ২৪ জানিয়েছিল।
চামড়া শিল্পখাতের উন্নয়নে গঠিত টাস্কফোর্সের বরাত দিয়ে ১৯ মে বাসস জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ মে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে পুনঃতফসিল বা খেলাপি ঋণ থাকা চামড়া ব্যবসায়ীরাও ৩০ জুন পর্যন্ত নতুন মূলধনী ঋণ নিতে পারবেন, আর ব্যাংকগুলোকে চামড়া খাতে চলতি বছরের ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫ সালের চেয়ে কম না রাখতে বলা হয়েছে। টাস্কফোর্স দেশব্যাপী চামড়া আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের একটি খসড়া ডাটাবেজ তৈরি করেছে, যাদের ভবিষ্যতে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা বলা হয়। মাংস শ্রমিক ও মসজিদের ইমামদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার কথাও টাস্কফোর্স জানায়।
কত পশু, কত চামড়া
২০২৬ সালের ৩ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, এ বছর কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, বিপরীতে প্রাপ্যতা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। ফলে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা। প্রাপ্য পশুর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু-মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল-ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী। মন্ত্রী জানান, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে, যার ২৭টি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে। চামড়া যেন নষ্ট না হয় সে জন্য পেশাদার ও অপেশাদার কসাই এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার কথাও তিনি বলেন।
জেলা পর্যায়ের হিসাবেও একই চিত্র ছিল। উদাহরণ হিসেবে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের বরাত দিয়ে ১২ মে বাসস জানায়, জেলার পাঁচ উপজেলায় ২ লাখ ২৬ হাজার ৫০টি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত, বিপরীতে চাহিদা ১ লাখ ৬৭ হাজার ২০২টি। প্রস্তুত পশুর মধ্যে ছাগল ছিল ৮৪ হাজার ৮০১টি ও ভেড়া ১২ হাজার ৯২২টি, অর্থাৎ ছোট পশুর চামড়াও এই মৌসুমে বড় পরিমাণে আসে।
আগের বছরগুলোর তুলনায় সংখ্যা কাছাকাছি। প্রথম আলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, ২০২৪ সালে কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ১ কোটি ৭ লাখ এবং প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ পশু। ২০২৫ সালে চাহিদা ছিল প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ৮০ হাজার, প্রস্তুত প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে ট্যানারির মালিকেরা ৮০ থেকে ৮৫ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছিলেন এবং সারা বছর যত চামড়া সংগ্রহ হয়, তার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই আসে কোরবানির মৌসুমে।

দামের ধারা ও লবণযুক্ত চামড়ার হিসাব
সরকার প্রতিবছর যে দাম ঘোষণা করে, তা লবণযুক্ত চামড়ার দাম, প্রতি বর্গফুট হিসেবে। প্রথম আলোর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা। ২০২৪ সালে তা বাড়িয়ে ঢাকায় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা করা হয়; সে বছর খাসির চামড়া ২০ থেকে ২৫ টাকা ও বকরির চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা ছিল। ২০২৫ সালে ঢাকায় দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। ২০২৬ সালে ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে গরুর চামড়ায় প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা এবং খাসির চামড়ায় ৩ টাকা বাড়ানো হয়।
তবে কোরবানির পরপর যে চামড়া হাতবদল হয়, তার বেশির ভাগই লবণ ছাড়া কাঁচা চামড়া। প্রথম আলো ২০২৫ সালে লিখেছিল, এ ধরনের চামড়ার দাম সরকার নির্ধারণ করে না; ক্রেতা-বিক্রেতারা দর-কষাকষি করে দাম ঠিক করেন। সাধারণত মাদ্রাসা, এতিমখানার লোকজন বা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে অস্থায়ী হাটে নিয়ে যান, সেখান থেকে ট্যানারি, আড়তদার ও ব্যাপারীরা অনুমাননির্ভর দামে কিনে লবণজাত করেন এবং পরে তা সরকার নির্ধারিত দামে ট্যানারিতে বিক্রি হয়।
ঢাকার পোস্তার আড়তদারেরা প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, পরিবহন খরচ ও কারিগরের মজুরিসহ প্রতিটি চামড়ায় লবণ যুক্ত করতে তাঁদের ২৯০ থেকে ৩২০ টাকা লাগে এবং এই খরচ হিসাব করেই তাঁরা ঈদের সময় কাঁচা চামড়া কেনেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, চামড়ায় সাধারণত মোটা দানার লবণ দেওয়া হয়; ২০২৫ সালে ৭৪ কেজির এক বস্তা মোটা দানার লবণের দাম ছিল ১ হাজার ৫০ টাকা, আগের বছর যা ছিল ১ হাজার ৩৫০ টাকা। অর্থাৎ যিনি নিজে লবণ দিয়ে চামড়া কয়েক দিন রাখতে পারেন, তিনি দর-কষাকষিতে কিছুটা সুবিধা পান।
কেন কয়েক ঘণ্টায় চামড়া নষ্ট হতে শুরু করে
জাতিসংঘ শিল্পোন্নয়ন সংস্থার (ইউনিডো) চামড়া বিষয়ক পরামর্শক টি. জে. দেবাসির কাজের ভিত্তিতে তৈরি সংস্থাটির কারিগরি নোট 'সল্টিং অব হাইডস অ্যান্ড স্কিনস' অনুযায়ী, সদ্য ছাড়ানো কাঁচা চামড়ায় প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ পানি থাকে। এই আর্দ্রতায় ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব দ্রুত বাড়ে, ফলে চামড়া পচে। লবণ চামড়া থেকে পানি টেনে বের করে আনে এবং এমন অবস্থা তৈরি করে যেখানে অণুজীব বাড়তে পারে না। ভেজা লবণ পদ্ধতিতে চামড়ার আর্দ্রতা নেমে আসে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশে, আর লবণ দিয়ে শুকানো পদ্ধতিতে প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশে।
ইউনিডোর নোটে আরও বলা হয়েছে, সামুদ্রিক লবণ ব্যবহারে একটি অসুবিধা হলো লবণসহিষ্ণু ব্যাকটেরিয়ার কারণে চামড়ার মাংসের দিকে লালচে দাগ পড়া, যা 'রেড হিট' নামে পরিচিত। লবণের দানা খুব মিহি হলে তা দ্রবণ হয়ে গড়িয়ে যায় এবং চামড়া প্রয়োজনমতো লবণ শোষণ করে না; নোটে প্রস্তাবিত দানার আকার ২ থেকে ৩ মিলিমিটার। একবার ব্যবহৃত লবণ ঝেড়ে আবার ব্যবহার না করার পরামর্শও সেখানে আছে, কারণ রক্ত, গোবর ও ময়লায় দূষিত লবণে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে।
বাংলাদেশের চামড়ার ক্ষতির কারণ নিয়ে পুরোনো গবেষণাও আছে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে প্রকাশিত এ. এস. দে, এম. নূরুদ্দীন ও এম. এফ. মিয়ার একটি জরিপে ১৪টি জেলার ৬৩টি জবাইস্থল এবং চামড়া সংরক্ষণ ও গুদামজাতকরণের ১০৮টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়। জরিপে জবাইয়ের পর্যায়ে ক্ষতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয় ভুল নকশার সূচালো ছুরি, অসতর্ক ও তাড়াহুড়া করে চামড়া ছাড়ানো, বিশেষ করে ঈদুল আজহার সময় অনভিজ্ঞ লোকের হাতে চামড়া ছাড়ানো, এবং ছাগলের চামড়া কৃত্রিমভাবে বেশি টেনে লম্বা করা। সংরক্ষণের পর্যায়ে কারণ ছিল ঈদুল আজহার সময় লবণ দিতে দেরি, আর গ্রামাঞ্চলে কম লবণ দেওয়া, শুকনো লবণ দেওয়া ও মাটিতে ফেলে চামড়া শুকানো।
এই ক্ষতির মাত্রা কত বড় হতে পারে, তার একটি হিসাব দিয়েছিল ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বিটিএর বরাতে বলা হয়, ২০২৪ সালে কোরবানি ঈদের প্রথম দুই দিনে সংরক্ষণের অভাবে সারা দেশে প্রায় ৫ লাখ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়েছিল, যার বেশির ভাগ খাসি ও বকরির চামড়া।
চামড়া ছাড়ানো ও লবণ দেওয়ার প্রামাণ্য নিয়ম
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ২০১৮ সালের ঈদুল আজহার আগে এক বিবৃতিতে কোরবানির পশুর চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণের করণীয় জানিয়েছিল, যা জাগো নিউজ ২৪ সে বছরের ১৮ আগস্ট প্রকাশ করে। অধিদপ্তরের তালিকার মূল কথাগুলো ছিল:
- জবাইয়ের আগে পশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পানি দেওয়া; জবাইয়ের ১২ ঘণ্টা আগে থেকে খাবার না দেওয়া উত্তম।
- জবাইয়ের আগে জায়গাটি ভালো করে পরিষ্কার করা, ধারালো ছুরি ব্যবহার করা এবং রক্ত জমার জন্য উপযুক্ত গর্ত করে নেওয়া; পরে রক্তভর্তি গর্ত মাটি দিয়ে বন্ধ করা।
- জবাইয়ের পর সব রক্ত বের হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া।
- চামড়া ছাড়ানোর সময় খেয়াল রাখা, যেন চামড়ার সঙ্গে মাংস ও চর্বি না থাকে, কোথাও কেটে না যায় এবং ময়লা না লাগে।
- চামড়া ছাড়ানোর ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মধ্যে লবণ লাগানো; জবাই ও মাংস কাটা শেষে সব বর্জ্য সরিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা।
- চামড়ার ভেতরের দিক ওপরে রেখে টান টান করে বিছিয়ে পর্যাপ্ত লবণ ছিটিয়ে পানি শুষে নেওয়ার ব্যবস্থা করা; বিক্রির আগে প্রয়োজনে কাজটি বারবার করা।
ইউনিডোর নোটে ভেজা লবণ পদ্ধতির বিবরণ আরও বিস্তারিত। কাঠের মাচার ওপর চামড়া বিছিয়ে মাংসের দিকে সমানভাবে লবণ দিতে হয়; গরু-মহিষের বড় চামড়ার জন্য কাঁচা ওজনের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ এবং ছাগল-ভেড়ার ছোট চামড়ার জন্য প্রায় ৫০ শতাংশ লবণ লাগে। এরপর একটির ওপর আরেকটি চামড়া একইভাবে লবণ দিয়ে স্তূপ করা হয়, যাতে লবণে বের হওয়া পানি রক্ত ও অন্যান্য দ্রবণীয় উপাদানসহ ঝরে যেতে পারে। স্তূপ প্রায় পাঁচ দিন রেখে উল্টে নতুন স্তূপ করা হয় এবং দরকার হলে আরও লবণ দেওয়া হয়। মাচা মাটি থেকে প্রায় ছয় ইঞ্চি উঁচু রাখার কথা বলা হয়েছে, যাতে লবণপানি ঝরে যায় এবং নিচে বাতাস চলাচল করে গরম হয়ে পচন না ধরে।
যাঁরা অল্প কয়েকটি চামড়া সামলান, যেমন কসাই বা কৃষক, তাঁদের জন্য নোটে 'কুইক ড্রাই সল্টিং' নামের একটি সহজ পদ্ধতির কথা আছে: লবণ দেওয়ার পর মাংসের দিক ভেতরে রেখে চার পাশ ভাঁজ করে চামড়া দুই দিন রাখা, তারপর খুলে লবণপানি ঝরিয়ে আগে মাংসের দিক এবং পরে লোমের দিক শুকানো। নোট অনুযায়ী, লবণ দেওয়া চামড়া বৃষ্টি ও রোদ থেকে সুরক্ষিত, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাসহ ঘরে রাখতে হয়।
ঘরোয়া পর্যায়ে কতটা লবণ লাগে, সে হিসাব দিয়েছিলেন পোস্তার কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা। প্রথম আলোর ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে তাঁদের বরাতে বলা হয়, ৩৫ থেকে ৫০ বর্গফুটের বড় চামড়ায় ৮ থেকে ৯ কেজি, ৫৫ থেকে ৬০ বর্গফুটের চামড়ায় প্রায় ১০ কেজি, ২০ থেকে ২৫ বর্গফুটের মাঝারি চামড়ায় ৫ থেকে ৬ কেজি এবং ১৫ থেকে ১৬ বর্গফুটের ছোট চামড়ায় ৩ থেকে ৪ কেজি লবণ লাগে। এক কেজি লবণে দুটির বেশি ছাগল বা ভেড়ার চামড়া সংরক্ষণ করা যায়। ব্যবসায়ীরা গাছতলা, গ্যারেজ বা প্যান্ডেলের মতো ছায়াযুক্ত জায়গায় লবণ দেওয়ার কথা বলেন, কারণ বৃষ্টি বা অতিরিক্ত গরম কোনোটিই চামড়ার জন্য ভালো নয়। যিনি নিজে লবণ দিতে পারবেন না, তাঁর জন্য তাঁদের পরামর্শ ছিল দ্রুততম সময়ে কাছের কোনো আড়তে কাঁচা চামড়া বিক্রি করে দেওয়া।
মাদ্রাসা, এতিমখানা ও চামড়া দান
বাংলাদেশে কোরবানির চামড়ার বড় অংশ দান হিসেবে মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে যায়, আর তাদের আয়ের একটি অংশ আসে এই চামড়া বিক্রি থেকে। ২১ মে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী, চামড়া সংরক্ষণকারী ও ভেটেরিনারি মেডিকেল টিমের জন্য 'কোরবানি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা-২০২৬' আয়োজন করে। সেখানে মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, কোরবানির চামড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাদ্রাসায় দান করা হয় এবং সঠিকভাবে চর্বি পরিষ্কার, লবণ প্রয়োগ ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে চামড়ার মান বাড়বে। তিনি বলেন, চামড়া ছাড়ানোর মতো কাজে প্রশিক্ষিত জনবল না থাকলে চামড়ার মান ও বাজারমূল্য কমে যায়, এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কোরবানির সময়ের জন্য দক্ষ জনবল তৈরির প্রস্তাব দেন।
আগের বছরের লবণ বিতরণের হিসাব টাস্কফোর্সের বরাতে বাসস দিয়েছিল। ২০২৫ সালে ৯ হাজার ৩৩০টি মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের জন্য বরাদ্দ ২০ কোটি টাকায় ১১ হাজার ৫৭১ মেট্রিক টন লবণ কেনার পরিকল্পনা ছিল; জেলা পর্যায়ের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত ৮ হাজার ৯৬ মেট্রিক টন লবণ বিতরণ করা হয় এবং এতে প্রায় ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২৩টি চামড়া সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। টাস্কফোর্সের প্রাথমিক হিসাবে ২০২৬ সালে চামড়া সংরক্ষণে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ লাগতে পারে, যেখানে ২০২৫ সালে এ খাতে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণ ব্যবহৃত হয়েছিল। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, পশুর হাট ও স্থানীয় দোকানে পর্যাপ্ত লবণ রাখা এবং লবণ ডিলার ও মিল মালিকদের তালিকা সরবরাহের কথাও বলা হয়।
২০২৪ সালে কোরবানির আগে শিল্প মন্ত্রণালয়ে চামড়া শিল্পখাতের টাস্কফোর্সের সপ্তম সভার খবরে বিডিনিউজ২৪ জানিয়েছিল, এতিমখানাগুলোতে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের কাজ বিসিক তদারকি করবে এবং স্থানীয়ভাবে চামড়া সংগ্রহ ও লবণ দিয়ে সংরক্ষণের জন্য কৌশলগত স্থানে অস্থায়ী সংরক্ষণাগার তৈরিতে জেলা প্রশাসকদের আধা সরকারি পত্র দেওয়া হবে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের বিনামূল্যে লবণ বিতরণ ছিল আগের বছরগুলোর একটি ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, যার পরিসর ও অর্থ এ বছর নতুন করে ঠিক করা হয়।

হাজারীবাগ থেকে সাভার: চামড়া শিল্পের পটভূমি
বাংলাপিডিয়ার 'ট্যানারি' ভুক্তি অনুযায়ী, এখনকার বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রথম ট্যানারি স্থাপন করেন রণদা প্রসাদ সাহা, গত শতকের চল্লিশের দশকে নারায়ণগঞ্জে। পরে তা ঢাকার হাজারীবাগে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং এলাকাটি ধীরে ধীরে ট্যানারির কেন্দ্রে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত প্রায় ৩০টি ট্যানারি সরকারি ব্যবস্থাপনায় নেওয়া হয় এবং ১৯৮২ সালে সেগুলো বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। বেশি মূল্য সংযোজনের লক্ষ্যে সরকার ১৯৯১ সালে ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানি নিষিদ্ধ করে, যার পর ক্রাস্ট, ফিনিশড ও স্প্লিট চামড়া তৈরি ও রপ্তানি শুরু হয়।
একই ভুক্তিতে ২০২০ সালের হিসাবে বলা হয়েছে, দেশে বিভিন্ন সক্ষমতার প্রায় ২২০টি ট্যানারি ছিল, যার ১৯০টি ছিল হাজারীবাগের মাত্র ৬০ একর জমিতে। ভুক্তি অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ট্যানারিগুলো সাভারের হেমায়েতপুরে ২০০ একর জমিতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারসহ (সিইটিপি) নতুন শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করা হয় এবং ভুক্তি লেখার সময় পর্যন্ত ১৫৫টি ট্যানারি সেখানে গিয়েছিল। বিটিএর বরাতে বাংলাপিডিয়া জানায়, বিভিন্ন ট্যানারিতে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক ও ১৫০ জন প্রযুক্তিবিদ কাজ করেন এবং কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে ঢাকার পোস্তার পাইকারি কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার কাজে যুক্ত প্রায় দেড় হাজার ব্যবসায়ী। দেশে বছরে প্রায় ২০০ থেকে ২২০ মিলিয়ন বর্গফুট কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হয়, যার প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্রাস্ট, ফিনিশড ও স্প্লিট আকারে রপ্তানি হয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় ছিল ৫১৯ দশমিক ৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
হাজারীবাগে ট্যানারি থাকার সময়কার পরিবেশগত সমস্যার একটি বিবরণ পাওয়া যায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০১২ সালের অক্টোবরের প্রতিবেদনে। সংস্থাটি তখন সরকারি হিসাব উদ্ধৃত করে জানায়, হাজারীবাগে প্রতিদিন প্রায় ২১ হাজার ঘনমিটার অশোধিত বর্জ্যপানি নির্গত হতো, যার শেষ গন্তব্য ছিল ঢাকার প্রধান নদী। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ট্যানারির আনুমানিক ৯০ শতাংশ তখন হাজারীবাগে ছিল এবং সেগুলোতে ১৫ হাজার পর্যন্ত শ্রমিক কাজ করতেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও জানায়, ট্যানারিগুলো ঢাকার বাইরে সরাতে ২০০৯ সালে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছিল; বাংলাপিডিয়ার 'লেদার ইন্ডাস্ট্রি' ভুক্তিতেও পুরান ঢাকার ছোট এলাকায় কারখানা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় সৃষ্ট পরিবেশগত উদ্বেগ মোকাবিলায় স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
সাভারের শিল্পনগরীর সক্ষমতা কোরবানির মৌসুমের চামড়া ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাত দিন ঢাকায় চামড়া না আনার যে নিয়মের কথা বলেছিলেন, তার যুক্তি ছিল বর্জ্য শোধন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো। টাস্কফোর্সের বরাতে ১৯ মে বাসস জানায়, ঈদের পরের তিন মাস বিসিক চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকায় নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ধারিত ভোল্টেজে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে পবিস-৩, আরইবি ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশকে নির্দেশনা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সিইটিপিতে ডেডিকেটেড এক্সপ্রেস ফিডার লাইনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, শিল্পনগরী ও সিইটিপিতে জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এবং সাভার গ্রিড থেকে বিশেষ লোড বরাদ্দের ওপরও জোর দেওয়া হয়।
ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (আহসান হাবিব বরুনের কলাম), বাসস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, দেশ রূপান্তর, দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, জাতিসংঘ শিল্পোন্নয়ন সংস্থা (ইউনিডো), বাংলাদেশ জার্নাল অব ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এফএও অ্যাগ্রিস), বাংলাপিডিয়া, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ




মন্তব্য
(০)