দেশে শাকসবজি, ফল ও ফুলের বাজার বড় হলেও রপ্তানিতে বাংলাদেশ চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। ২০২৫ সালের ২৫ মে রোববার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ কৃষি সম্মেলন ২০২৫: বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলকতা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশের কৃষি সম্ভাবনা’ শীর্ষক সম্মেলনে এ কথা তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, উৎপাদন কাঠামো ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাটিয়ে রপ্তানি বাড়াতে তরুণদের কৃষিতে যুক্ত করা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্স ও উন্নয়ন সংস্থা সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার ফাউন্ডেশন (এসএএফ) যৌথভাবে সম্মেলনটির আয়োজন করে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ১০০ জনের বেশি প্রতিনিধি এতে অংশ নেন।
রপ্তানির হিসাব: সবজি, ফল ও ফুল
সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ শাকসবজি রপ্তানি করে ৫৫.৬ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। একই সময়ে ফল ও ফুল রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৯.১ মিলিয়ন ডলার।
পুরো কৃষি খাত থেকে ওই নয় মাসে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৮২১.০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৭৭৩.০১ মিলিয়ন ডলারের চেয়ে ৬.২১ শতাংশ বেশি। দেশের মোট রপ্তানির ২.২১ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে। কৃষি বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত।

অপচয় ও পরিবহন খরচে পিছিয়ে রপ্তানি
‘বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে রপ্তানির সম্ভাবনা, সুযোগ, চ্যালেঞ্জ ও ব্র্যান্ডিং কৌশল’ শীর্ষক উপস্থাপনাটি তুলে ধরেন লাইটক্যাসল পার্টনার্সের গ্রোথ ও ইনোভেশন বিভাগের লিড শুভম রায়। উপস্থাপনায় বলা হয়, প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত শাকসবজির ২০ থেকে ৪৪ শতাংশ অপচয় হয়, এতে বছরে ২.৪ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। উৎপাদন কাঠামোর দুর্বলতায় রপ্তানির আগেই ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফল ও শাকসবজি নষ্ট হয়ে যায়।
অপচয় ছাড়া রপ্তানি কম হওয়ার যেসব কারণ উপস্থাপনায় উঠে আসে:
- মধ্যস্বত্বভোগীদের দীর্ঘ শিকল
- কম মুনাফা
- চালান পাঠাতে দেরি
- গুদামজাত করার মতো পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাব
- সনদ বা সার্টিফিকেশনকে গুরুত্ব না দেওয়া
- বিমানে পরিবহনের বাড়তি খরচ, যা সমুদ্রপথের চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি

সরকারের পরিকল্পনা ও বক্তাদের কথা
সম্মেলনের প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃষি ব্যবস্থার ওপর জোর দেন। তিনি জানান, ‘এগ্রিকালচার ফিউচার আউটলুক প্ল্যান ২০২৫’ তৈরি হচ্ছে, যা আধুনিক প্রযুক্তি তৃণমূলে পৌঁছে দেওয়ার একটি কৌশলগত পরিকল্পনা। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘খামারি অ্যাপ’, যেখানে কৃষকেরা শস্য ব্যবস্থাপনা ও তাৎক্ষণিক বাজারদরের তথ্য পাবেন।
আলোচক হিসেবে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মন্ডল বলেন, দেশের চ্যালেঞ্জ কাঁচির মতো দুই দিকে: একদিকে বাড়তি দেড় কোটি মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে, অন্যদিকে খণ্ড খণ্ড কৃষিজমি উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি উদ্ভাবনের মাধ্যমে এসব কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলার আহ্বান জানান।
আরও বক্তব্য দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক মো. সাইফুল আলম, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্টের উপসচিব ড. মো. রাজু আহমেদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ এবং বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুরসহ খাতসংশ্লিষ্টরা।
নারী, তরুণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সুপারিশ
আলোচনা হয় তিনটি পর্বে। প্রথমটি সঞ্চালনা করেন লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রধান নির্বাহী বিজন ইসলাম, দ্বিতীয়টি এসএএফের প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট পরিচালক মো. আব্দুর রউফ এবং তৃতীয়টি লাইটক্যাসল পার্টনার্সের পরিচালক জাহেদুল আমিন।
দ্বিতীয় পর্বে নারীর ক্ষমতায়ন ও কৃষি উন্নয়নে তরুণদের সম্পৃক্ততা নিয়ে আরেকটি উপস্থাপনা হয়। এতে নারী ও তরুণদের অর্থায়ন বাড়াতে উদ্ভাবনী মডেল, উদ্যোক্তা তৈরি ও বাজারে প্রবেশের জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ এবং তরুণদের সফলতার গল্প তুলে ধরার সুপারিশ করা হয়।
তৃতীয় পর্বে আলোচকেরা আমিষ ও দুধ উৎপাদনে খাদ্য নিরাপত্তা এবং কোল্ড চেইন বা শীতল সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কথা বলেন। সেই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা নীতি, বাজারজাতকরণের জন্য পরিবহনসহ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগানোর তাগিদ দেন তাঁরা।

ছবি: NahidSultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, উইকিপিডিয়া (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের কৃষি)





মন্তব্য
(০)