সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

সবুজ মাঠে লেখা হচ্ছে সোনালি ভবিষ্যৎ

ঢাকা থেকে কুমিল্লা কিংবা চট্টগ্রামের পথে এগোলে মহাসড়কের দুই পাশে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা নিছক গ্রামীণ সৌন্দর্য নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। কোথাও দিগন্তজোড়া সবুজ সবজিখেত, কোথাও আউশ, আমন কিংবা বোরো ধানের ঢেউ, আবার কোথাও সোনালি ভুট্টা কিংবা তরমুজের সমারোহ।

ঢাকা থেকে কুমিল্লা কিংবা চট্টগ্রামের পথে এগোলে মহাসড়কের দুই পাশে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা নিছক গ্রামীণ সৌন্দর্য নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। কোথাও দিগন্তজোড়া সবুজ সবজিখেত, কোথাও আউশ, আমন কিংবা বোরো ধানের ঢেউ, আবার কোথাও সোনালি ভুট্টা কিংবা তরমুজের সমারোহ। আর দেশে মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয় কুমিল্লা। কুমিল্লায় বর্তমানে বাণিজ্যিক বাগান, উদ্ভিদ উদ্যান ও ছাদবাগান গড়ে তোলার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। লালমাই পাহাড়ের বুকে গড়ে উঠেছে কুমিল্লার প্রথম চা-বাগান, যা কুমিল্লার কৃষি বৈচিত্র্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

কুমিল্লা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর এলাকায় এই চা-বাগানটি অবস্থিত। কুমিল্লা-নোয়াখালী সড়কের রতনপুর বাজার থেকে পশ্চিম দিকে পাকা সড়ক ধরে পাহাড়ি টিলা ও মেঠোপথ পেরিয়ে এখানে পৌঁছাতে হয়। বাগানের উদ্যোক্তা মো. তারিকুল ইসলাম মজুমদার শ্রীমঙ্গলের এক খাসিয়া রাজার সহযোগিতায় ২০২১ সালে এখানে চা চাষ শুরু করেন। এটি কুমিল্লার প্রথম চা-বাগান হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে এবং আগামী দিনে এটি কৃষি-পর্যটনের সম্ভাবনাও বহন করছে।

শুধু চা-বাগান নয়, লালমাই পাহাড়ে দেশের তৃতীয় উদ্ভিদ উদ্যান স্থাপিত হয়েছে, যেখানে নানা বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এটি কেবল একটি সংরক্ষণ প্রকল্প নয়, বরং গবেষণা ও শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া ভেষজ ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গড়ে তোলা হয়েছে একটি সমৃদ্ধ ঔষধি বাগান, যা আধুনিক প্রজন্মকে দেশীয় ভেষজ সম্পদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। কালিয়াজুড়ি এলাকায় প্রায় ১০ একর জমির ওপর কুমিল্লা চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেন অবস্থিত, যা একই সঙ্গে বিনোদন ও উদ্ভিদ সংরক্ষণের কেন্দ্র। শহর ও বিভিন্ন উপজেলায়, যেমন নাঙ্গলকোটে, বাসাবাড়ির ছাদে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় ছাদবাগান ও নতুন ফসলের বাগান জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যা নগরবাসীকেও কৃষির সঙ্গে যুক্ত করছে।

কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় এখন বাণিজ্যিকভাবে নানা ধরনের ফলের বাগান গড়ে উঠেছে এবং চাষিরা বেশ সফলতা পাচ্ছেন। বরুড়া উপজেলার মুগুজি গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় তিন শতাধিক চাষি মাল্টা চাষ করছেন এবং স্থানীয় বাজারে এসব মাল্টার বেশ চাহিদা রয়েছে, যা কৃষকদের জন্য লাভজনক নগদ ফসল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়ি রূপবান মূড়া এলাকায় ৪০ একর জায়গাজুড়ে এবং বিজয়পুর ইউনিয়নের রাজারখলা পাহাড়ি অনাবাদি জমিতে মিশ্র ফলের বড় বাগান গড়ে উঠেছে, যেখানে লেবু, পেয়ারা, আম, ড্রাগন ও কলা চাষ হচ্ছে।

পারিবারিক উদ্যোগেও ফলের বাগান বিস্তার লাভ করছে। নাঙ্গলকোট উপজেলার বাঙ্গড্ডা এলাকায় বাবা-ছেলের উদ্যোগে লিচু, আম ও অন্যান্য ফলের বাগান তৈরি হয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কৃষি উদ্যোগের ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে। অন্যদিকে চান্দিনায় সফল নারী উদ্যোক্তাদের ড্রাগন বাগান বেশ লাভজনক হয়ে উঠেছে, যা প্রমাণ করে নারীরাও কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে অসামান্য সাফল্য অর্জন করতে পারেন।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কুমিল্লার কৃষি আরও গতিশীল হয়েছে। ইউটিউব দেখে আঙুর চাষের কলাকৌশল রপ্ত করেছেন কুমিল্লার দেবিদ্বারের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন। ডিজিটাল বিশ্বের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এমন একটি ফলের চাষে সফল হয়েছেন, যা আগে এ অঞ্চলে অকল্পনীয় ছিল। তাঁর এই অবিশ্বাস্য সাফল্যগাথা এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে এবং এটি প্রমাণ করে যে ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যম আজ কৃষকের সবচেয়ে বড় শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

এই সমৃদ্ধ রূপান্তরের চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমার নিজস্ব স্মৃতির আবেগ। কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শিদলাই গ্রামে আমার বেড়ে ওঠা। এই গ্রামেই কেটেছে শৈশব-কৈশোরের অনেকটা সময়। ফলে কুমিল্লার কৃষির এই পরিবর্তনকে আমি কেবল পরিসংখ্যান কিংবা গবেষণার তথ্য দিয়ে দেখি না, দেখি স্মৃতির চোখেও। যে মাঠে একসময় বলদ ও কাঠের লাঙল ছিল কৃষকের প্রধান অবলম্বন, সেখানে আজ আধুনিক কৃষিযন্ত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যে জমিতে আগে কেবল ধান কিংবা প্রচলিত ফসলের কথা ভাবা হতো, সেখানে আজ ভুট্টা, তরমুজ, হরেক রকমের সবজি এবং নতুন ফলের চাষ হচ্ছে; এমনকি লালমাইয়ের পাহাড়ি ঢালেও বসেছে চা-বাগান।

কৃষির আসল সাফল্য কেবল অধিক ফলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং কম খরচে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পণ্যের ন্যায্য দাম, দক্ষ বাজারজাতকরণ, নারী-পুরুষের যৌথ অংশীদারিত্ব ও কৃষকের একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। শৈশবে যে মাঠে কৃষকের ঘামে মাটির গন্ধ মিশে থাকতে দেখেছি, আজ সেখানে তাকালে আমি এক নতুন ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশের চিত্র দেখতে পাই।

কুমিল্লার কৃষির এই বর্তমান রূপান্তরকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে এর ইতিহাসের দিকে তাকানো প্রয়োজন। ১৯৫০-এর দশকে পল্লি উন্নয়ন গবেষক ড. আখতার হামিদ খানের উদ্যোগে কুমিল্লায় যে বিখ্যাত 'কুমিল্লা মডেল'-এর বিকাশ ঘটেছিল, তার মূল শিক্ষা ছিল কৃষককে সংগঠিত করা, সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন ও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা এবং উৎপাদককে সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। সময় বদলেছে, কৃষির প্রযুক্তি ও বাজারের ধরন বদলেছে, তবে বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আজও ফুরিয়ে যায়নি। বরং আজকের স্মার্ট কৃষির যুগে সেই দর্শনের আধুনিক প্রয়োগ আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে, যেখানে কৃষক কেবল একজন প্রথাগত উৎপাদক নন, বরং একজন সম্ভাবনাময় কৃষি উদ্যোক্তা। তাঁর হাতে এখন মুঠোফোন, ইন্টারনেট, আবহাওয়ার তথ্য, বাজারদর ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার সুযোগ রয়েছে, যাকে উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা সময়ের দাবি। আনোয়ার হোসেনের ইউটিউব দেখে আঙুর চাষ তারই আধুনিক উদাহরণ।

এই পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের নেপথ্যে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে কুমিল্লা অঞ্চলের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। কুমিল্লা জেলা প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম শীর্ষ অঞ্চল হওয়ায় প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন গ্রামীণ কৃষিতে বিনিয়োগ হচ্ছে। প্রবাস থেকে অর্জিত মূলধন ব্যবহার করে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা আধুনিক ডেইরি ফার্ম, বাণিজ্যিক মৎস্য খামার ও আধুনিক ফল-সবজির বাগান গড়ে তুলছেন, যা প্রথাগত কৃষিকে সরাসরি কৃষি-ব্যবসায়ে (Agribusiness) রূপান্তর করতে সহায়তা করছে। মাল্টা, ড্রাগন ও মিশ্র ফলের বাগানগুলোতে এই প্রবাসী অর্থের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য।

ব্যবসায়িক রূপান্তরের পাশাপাশি কৃষির বৈচিত্র্যকরণে এক অনন্য সাফল্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাণিজ্যিক চারা উৎপাদন। বুড়িচং উপজেলার সামেশপুরসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা চারা উৎপাদনের উদ্যোগ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চারা সরবরাহ করছে। একটি মানসম্মত চারা যে কেবল একটি গাছের সূচনা নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ কৃষি-ভ্যালু চেইনের ভিত্তি—এখানকার উদ্যোক্তারা তা দারুণভাবে প্রমাণ করেছেন। চারা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই নতুন ব্যবসায়িক খাত যেমন নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, তেমনই ধানের পাশাপাশি শাকসবজি ও ভুট্টার উৎপাদনেও এনেছে নতুন গতি।

এই বাণিজ্যিক আবাদ ও গৃহস্থালি কৃষির এক বিশাল ও নীরব অংশজুড়ে রয়েছে নারী কৃষকদের অসামান্য ভূমিকা। বীজ সংরক্ষণ, নার্সারি পরিচর্যা, চারা রোপণ, গবাদিপশু-পাখি পালন এবং উঠানভিত্তিক সবজি চাষে গ্রামীণ নারীদের প্রত্যক্ষ শ্রম কৃষির পারিবারিক ও বাণিজ্যিক ভিত্তিকে মজবুত করছে। বিশেষ করে চান্দিনায় নারী উদ্যোক্তাদের ড্রাগন বাগান এর উজ্জ্বল উদাহরণ। নারীদের এই প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ কুমিল্লার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারী ক্ষমতায়ন ও পরিবারের আয় বৃদ্ধিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

নারী-পুরুষের যৌথ প্রচেষ্টায় চারা উৎপাদনের পর সেই ফসলের বিস্তার ঘটেছে জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায়। বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, চান্দিনা ও চৌদ্দগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় লাউ, শিম, বরবটি, করলা, শসা, ফুলকপি ও নানাবিধ শাকের বাণিজ্যিক আবাদ কৃষকের প্রধান নগদ আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে অনাবাদি জমি ও চরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে ভুট্টার সোনালি বিপ্লব। গবাদিপশু, পোলট্রি ও মৎস্যশিল্পের খাদ্য তৈরিতে ভুট্টার ব্যাপক চাহিদা থাকায় এটি এখন কৃষিভিত্তিক শিল্পের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। ধান ও সবজির পাশাপাশি ভুট্টার মতো উচ্চমূল্যের ফসল ও তরমুজ চাষ কৃষকের আয়ের ক্ষেত্র বাড়াতে ও চাষাবাদের ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা রাখছে।

উৎপাদনের এই বিশাল যজ্ঞের পর উৎপাদিত পণ্য সঠিক বাজারে পৌঁছানোর ওপরই নির্ভর করে কৃষকের প্রকৃত সাফল্য, যার জ্বলন্ত উদাহরণ কুমিল্লার বিখ্যাত নিমসার সবজির হাট। প্রতিদিন এই হাটে বিপুল পরিমাণ সবজি কেনাবেচা হয়, যা স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দ্রুত পরিবহন সুবিধায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়। নিমসার কেবল একটি কেনাবেচার স্থান নয়, বরং কৃষক, পাইকার, পরিবহন শ্রমিক ও আড়তদারসহ অসংখ্য মানুষের জীবিকার কেন্দ্রবিন্দু। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন নিমসার হাট থেকে নিরাপদ ও মানসম্মত কৃষিপণ্য সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাজারে রপ্তানি করারও এক বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সুবিশাল বাজারব্যবস্থার মধ্যেও একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়—দীর্ঘ এই সরবরাহ শৃঙ্খলে উৎপাদক হিসেবে কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের কতটুকু ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন?

মাঠের ফসল ও বাজারের এই হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি কুমিল্লার জলাশয় ও পুকুরগুলোতেও চলছে নীরব উৎপাদন বিপ্লব। দাউদকান্দি, মুরাদনগর ও চৌদ্দগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঙাশ ও তেলাপিয়াসহ নানা জাতের মাছের বাণিজ্যিক চাষ দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে বড় অবদান রাখছে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করলে গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষিযন্ত্রের আধুনিক ব্যবহার; জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে ফসল কাটা ও মাড়াই—কৃষির প্রায় প্রতিটি ধাপে যান্ত্রিকীকরণ কমিয়েছে উৎপাদন খরচ ও সময়, বাঁচিয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থেকেও। পাশাপাশি আইপিএম (IPM) প্রযুক্তির ব্যবহারে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার আড়ালেও কিছু কঠিন বাস্তবতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত রয়েছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সাম্প্রতিক সময়ে গোমতী নদীর বাঁধ ভাঙার মতো ঘটনা কৃষকের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে। এর পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, প্রসেসিং ও কোল্ড স্টোরেজের অভাবের কারণে কৃষক ফসল ফলিয়েও অনেক সময় সঠিক মূল্য পান না। অতিরিক্ত সেচের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর তৈরি হওয়া চাপ মোকাবিলায় সোলার সেচ ও ড্রিপ ইরিগেশনের মতো টেকসই প্রযুক্তির প্রসারও এখনো সীমিত।

এই বাস্তবতায় কুমিল্লার কৃষিকে টেকসই ও আরও শক্তিশালী করতে একটি পরিকল্পিত 'দ্বিতীয় কৃষি বিপ্লব' প্রয়োজন, যার লক্ষ্য হবে উৎপাদন থেকে শুরু করে মূল্য সংযোজন পর্যন্ত পুরো কৃষি-ভ্যালু চেইনকে আধুনিকায়ন করা। এজন্য দ্রুত জলবায়ু-সহিষ্ণু জাত কৃষকের হাতে পৌঁছানো, সহজ শর্তে কৃষিঋণ দেওয়া এবং মানসম্মত চারা ও বীজের সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্বে (PPP) আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং প্রবাসীদের জন্য কৃষিতথ্য ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এমনকি লালমাই পাহাড়ের চা-বাগান, উদ্ভিদ উদ্যান ও ফলের বাগানগুলোকে কাজে লাগিয়ে কৃষি ও প্রকৃতির সমন্বয়ে কৃষিজমি রক্ষা করে সুপরিকল্পিত কৃষি-পর্যটনের সুযোগও উন্মোচন করা যেতে পারে।

সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আশার কথা হলো, প্রযুক্তি ও নতুন ভাবনার ছোঁয়ায় কুমিল্লার কৃষিতে আজ এক আমূল পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। যে কৃষক একসময় প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তাঁর হাতে আজ স্মার্টফোন; তিনি মুহূর্তেই জেনে নিচ্ছেন বাজারদর ও আধুনিক চাষপদ্ধতি। ইউটিউবের শিক্ষায় আঙুর চাষ, নারী উদ্যোক্তাদের ড্রাগন বাগান, আর প্রবাসী বিনিয়োগে মাল্টা ও মিশ্র ফলের বাগান—এসব প্রমাণ করে কুমিল্লার কৃষি এক নতুন দিগন্তে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, তরুণ প্রজন্ম এখন আর কৃষিকে অবহেলার চোখে না দেখে এতে ব্যবসা, প্রযুক্তি ও স্টার্টআপের নতুন দিগন্ত খুঁজে পাচ্ছে।

পরিশেষে, কৃষির আসল সাফল্য কেবল অধিক ফলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং কম খরচে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পণ্যের ন্যায্য দাম, দক্ষ বাজারজাতকরণ, নারী-পুরুষের যৌথ অংশীদারিত্ব ও কৃষকের একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। শৈশবে যে মাঠে কৃষকের ঘামে মাটির গন্ধ মিশে থাকতে দেখেছি, আজ সেখানে তাকালে আমি এক নতুন ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশের চিত্র দেখতে পাই। কুমিল্লার মাঠে সেই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বীজ ইতোমধ্যেই বোনা হয়ে গেছে; এখন সঠিক নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের মাধ্যমে তাকে সমৃদ্ধ সোনালি ফসলে রূপান্তর করার দায়িত্ব আমাদের।

লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। [email protected]

জাগো নিউজ ২৪সূত্র

মৎস্য

সম্পর্কিত খবর

মৎস্য

কেরালার উপকূলীয় নারীদের ৮৪টি মাছের ব্যবসা, পারিবারিক আয় বেড়েছে ৩০-৩৫ শতাংশ

আইসিএআর-সিএমএফআরআইয়ের এক কর্মসূচির সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সালে কেরালার আট জেলায় ৮৪টি মৎস্যভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে উঠেছে; সরাসরি উপকৃত ৪৬৯ জন, যাঁদের বেশির ভাগ তফসিলি জাতিভুক্ত।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

সৌরশক্তির রিসার্কুলেটিং ট্যাংকে পাহাড়ে ট্রাউট চাষ, পানি লাগবে ৮০ শতাংশ কম

ভারতের উত্তরাখণ্ডের এক খামারে সৌরশক্তিচালিত হাইব্রিড রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম চালু করেছে আইসিএআর-সিআইসিএফআর; প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে পানি প্রায় ৮০ শতাংশ কম লাগে এবং একজন ট্রাউটচাষি বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি উদ্বৃত্ত পেতে পারেন।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

আট পদের পাঁচটিই শূন্য, তিনজনে চলছে শায়েস্তাগঞ্জের সরকারি মৎস্য বীজ খামার

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে ১২টি পুকুরে পোনা উৎপাদন চললেও আট পদের পাঁচটি শূন্য, নৈশপ্রহরী নেই, বরাদ্দ না থাকায় চাষি প্রশিক্ষণও বন্ধ।

মানবজমিন১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)