২০২৬ সালের ৩০ জুন, মঙ্গলবার ভোরে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় পদ্মা নদীতে পেতে রাখা এক জেলের জালে একটি জীবিত রাসেলস ভাইপার ধরা পড়ে। ঘটনাটি ঘটে পদ্মার চরাঞ্চলের হারুকান্দি এলাকায়। সুজন নামের ওই জেলে সাপটিকে না মেরে স্থানীয় আন্ধারমানিক খেয়াঘাটে নিয়ে আসেন। পরে খবর পেয়ে উপজেলা বন কর্মকর্তা সাপটিকে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেন বলে জাগো নিউজ জানায়। একই দিনে যুগান্তর, যমুনা টেলিভিশন ও এখন টিভিও ঘটনাটির খবর দেয়।
পদ্মায় পাতা জালে বিষধর সাপ
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জাগো নিউজ জানায়, উপজেলার আন্ধারমানিক এলাকার জেলে সুজন সোমবার রাতে মাছ ধরার জন্য পদ্মায় জাল পেতে রাখেন। মঙ্গলবার ভোরে জাল তুলতে গিয়ে তিনি জালে একটি জীবিত রাসেলস ভাইপার দেখতে পান। সাপটিকে না মেরে একটি নেটের ভেতরে রেখে তিনি সেটিকে খেয়াঘাটে নিয়ে আসেন।
সুজন বলেন, ‘সাপটি না মেরে ধরে এনেছি। যদি এটি দেশের কোনো গবেষণার কাজে লাগে, সেই চিন্তা থেকেই সংরক্ষণ করেছি।’ খবরটি দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উৎসুক মানুষ খেয়াঘাটে ভিড় করেন। পরে স্থানীয়রা উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানান।

বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া
হরিরামপুর উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ’-এর সহযোগিতায় সাপটি নিয়ে আসা হয়। জীবিত উদ্ধার হওয়ায় সেটিকে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে এবং বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পদ্মায় জেলের জালে রাসেলস ভাইপার ধরা পড়া এই অঞ্চলে নতুন নয়। দেশ রূপান্তরের খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৬ জুন হরিরামপুরের পাশের ঢাকার দোহার উপজেলার নারিশা ইউনিয়নে পদ্মায় এক জেলের জালে একটি রাসেলস ভাইপার আটকা পড়েছিল। তখন ঢাকা থেকে স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশের সদস্যরা গিয়ে সুরক্ষা মেনে সাপটিকে জাল থেকে ঝুড়িতে তোলেন এবং গবেষণার জন্য নিয়ে যান। দলের সদস্য রাকিবুল ইসলাম সে সময় বলেছিলেন, সাপটি বেশ লাজুক এবং পরিবেশের জন্য উপকারী।
রাসেলস ভাইপার ও পদ্মার চর
রাসেলস ভাইপার (Daboia russelii), যাকে দেশে চন্দ্রবোড়াও বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক চার বিষধর সাপের (‘বিগ ফোর’) একটি। এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে এর গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ সেন্টিমিটার। খোলা ঘাসবন, ঝোপঝাড় ও কৃষিজমিতে এদের বাস; প্রধান খাবার ইঁদুর। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের জুনে জানায়, সাপটি লোকালয় এড়িয়ে চলে, গায়ের রঙের কারণে মাটির সঙ্গে সহজে মিশে যায় এবং দক্ষ সাঁতারু হওয়ায় নদীর স্রোত ও বন্যার পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ না জেনে কাছে গেলে এটি ভয় পেয়ে আক্রমণ করে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহসান বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, পদ্মার অববাহিকা ধরেই রাসেলস ভাইপার মানিকগঞ্জের চরাঞ্চলে গেছে এবং ২০১৩ সাল থেকে সাপটি বেশি দেখা যাচ্ছে; পদ্মার চর থেকে শাখা ও উপনদী ধরে কচুরিপানার সঙ্গে এগুলো আশপাশের এলাকায় যাচ্ছে। দেশ রূপান্তর ২০২৪ সালের ৩ জুন তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায়, তার আগের তিন মাসে মানিকগঞ্জের কিছু এলাকায় এই সাপের কামড়ে অন্তত পাঁচজন মারা গেছেন।
ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৪ সালের ২৯ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের একটি দল হরিরামপুরের চারটি চর ঘুরে দেখে; চর থেকে মূল ভূখণ্ডে যেতে ট্রলারে অন্তত এক ঘণ্টা লাগে। বন বিভাগের জোহরা মিলা পত্রিকাটিকে বলেন, হুমকি না পেলে রাসেলস ভাইপার মানুষকে আক্রমণ করে না। হরিরামপুর উপজেলার আয়তন ২৪৫.৪২ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১৩টি; হারুকান্দি তার একটি, আর উপজেলার সীমানার একাংশজুড়ে বয়ে গেছে পদ্মা।

সাপ দেখলে ও সাপে কাটলে করণীয়
এই ঘটনায় জেলে সাপটিকে না মেরে ঘাটে আনেন, তবে মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ হলো রাসেলস ভাইপার দেখলে কখনো ধরার বা মারার চেষ্টা না করা; বরং জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩-এ বা নিকটস্থ বন বিভাগের কার্যালয়ে খবর দেওয়া। মন্ত্রণালয় জানায়, রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিভেনম নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে পাওয়া যায়।
সাপে কাটলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরামর্শ:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্থির রাখুন, একেবারেই নড়াচড়া করতে দেবেন না।
- অস্থায়ী স্ট্রেচারে করে দেরি না করে হাসপাতালে নিন।
- সরু বাঁধন দেওয়া, ক্ষত বা অঙ্গ কাটা, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মতো রাসায়নিক লাগানো বা গরম কাচের পাত্র দিয়ে বিষ টানার চেষ্টা করবেন না; এগুলো বিপজ্জনক এবং অকার্যকর।
- ‘কালো পাথর’ জাতীয় পদ্ধতিও অকার্যকর এবং মূল্যবান সময় নষ্ট করে।

ছবি: Chayant Gonsalves / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, দেশ রূপান্তর, প্রথম আলো (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)