বিপন্ন মিঠাপানির কাছিম ও কচ্ছপ রক্ষায় সাধারণ মানুষকে যুক্ত করতে ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরায় একটি সচেতনতা ক্যাম্পেইন শুরু করে ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি (ডব্লিউসিএস) ও বন অধিদপ্তর। স্লোগান ছিল ‘পরিবেশ বন্ধু কাছিম, প্রকৃতিতে বাঁচতে দিন’। জাগো নিউজ ২৪ ৯ ফেব্রুয়ারি জানায়, ক্যাম্পেইনটি পর্যায়ক্রমে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও খুলনায় চলার কথা। আয়োজকদের ভাষ্য, অবৈধ শিকার, বাণিজ্য ও খাবার হিসেবে খাওয়ার কারণে দেশের কাছিম ও কচ্ছপের সব প্রজাতিই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে।
পাচারের হটস্পট বাংলাদেশ
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গণমাধ্যমে ৩৪ হাজারের বেশি কাছিম ও কচ্ছপ অবৈধভাবে বিক্রি ও পাচারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশকে কাছিম ও কচ্ছপ পাচারের একটি বৈশ্বিক হটস্পট বলা হয়। শিকার, পাচার, আবাসস্থল কমে যাওয়া ও ভোক্তার চাহিদা, এসব কারণে প্রায় প্রতিটি প্রজাতি টিকে থাকার সংকটে।
পরিবেশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মংগাবে ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জানায়, আইইউসিএনের ২০১৫ সালের বাংলাদেশ লাল তালিকায় দেশের ৩০ প্রজাতির কাছিম ও কচ্ছপ মূল্যায়ন করা হয়; এর মধ্যে ২২টি ‘হুমকির মুখে’ এবং ৪টি ‘প্রায় হুমকির মুখে’ শ্রেণিতে রাখা হয়। প্রায়ই পাচার হওয়া প্রজাতির মধ্যে আছে গাঙ্গেয় সফটশেল (Nilssonia gangetica), কালো কাছিম বা স্পটেড পন্ড টার্টল (Geoclemys hamiltonii), ইন্ডিয়ান আইড টার্টল ও ইন্ডিয়ান রুফড টার্টল, যেগুলো বিশ্বজুড়ে ‘বিপন্ন’। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর চাঁদপুরের একটি বাজারের অস্থায়ী গুদাম থেকে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট ২৮০ কেজি ওজনের ১ হাজার ৩০০টি জীবিত কাছিম জব্দ করে।

চার জেলায় বাণিজ্য ও খাওয়ার জরিপ
যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক দপ্তরের (ডেফরা) অর্থায়নে ২০২২ সাল থেকে চলা একটি প্রকল্পে গণমাধ্যম বিশ্লেষণ ও হাট-বাজার জরিপের মাধ্যমে কাছিম ও কচ্ছপের বাণিজ্য ও খাওয়ার হটস্পট চিহ্নিত করা হয়। ঢাকা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা, এই আট জেলায় অমুসলিম জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, মনোভাব ও অভ্যাস নিয়ে জরিপ হয়। তাতে সাতক্ষীরা, খুলনা, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জে বেচাকেনা ও খাওয়া বেশি দেখা যায়। এই চার জেলায় জরিপ করা পরিবারের প্রায় ৫০ শতাংশ আগের এক বছরে অন্তত একবার কাছিম বা কচ্ছপের মাংস খেয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের প্রায় কেউই স্বাস্থ্যঝুঁকি, আইনি নিষেধাজ্ঞা কিংবা এই প্রাণীদের পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানেন না। তাই এই চার জেলায় চাহিদা কমাতে শিক্ষামূলক ক্যাম্পেইন হাতে নেয় ডব্লিউসিএস। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে তিনটি মূল বার্তা ঠিক করা হয়:
- কাছিম ও কচ্ছপ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
- বন্যপ্রাণী আইনে কাছিম ও কচ্ছপ নিয়ে বিধিনিষেধ আছে।
- কাছিম ও কচ্ছপের পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আছে।
ক্যাম্পেইনে ছিল বাড়ি বাড়ি প্রচারণা, রেডিও অনুষ্ঠান, মাইকিং, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, স্কুলের অনুষ্ঠান, কাছিম দৌড়, পটগান এবং ধর্মীয় গুরুদের সঙ্গে মতবিনিময়। সঙ্গে পোস্টার, স্টিকার ও লিফলেট বিতরণ করা হয়।

তালার স্কুলে উদ্বোধন
২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সাতক্ষীরার তালা ব্রজেন দে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন হয়। সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিমের সভাপতিত্বে এর উদ্বোধন করেন বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মো. সানাউল্ল্যাহ পাটোয়ারী। তালা উপজেলা খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলায়; আয়তন ৩৩৭.২৪ বর্গকিলোমিটার, ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ৩ লাখ ২৬ হাজার ১১১।
ডব্লিউসিএস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, দেশের ৩০ প্রজাতির মধ্যে ২৬টিই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে এবং প্রতিদিন নতুন হুমকির মুখে পড়ছে। ভোক্তার চাহিদা কমানো ও আইন প্রয়োগ জোরদার করে এদের রক্ষা করতে হবে, আর এতে অমুসলিম সম্প্রদায়সহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সানাউল্ল্যাহ পাটোয়ারী বলেন, ‘বাংলাদেশের কাছিম রক্ষা করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকার, গণমাধ্যমকর্মী, ধর্মীয় গুরুসহ সব নাগরিককে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাই। এ প্রজাতিগুলোকে সংরক্ষণ করা মানে শুধু এদের সংরক্ষণ নয় বরং আমাদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করা।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘প্রাকৃতিক পরিবেশে তাদের বিরক্ত বা শিকার না করা, খাদ্য হিসেবে গ্রহণ না করা এবং এদের আবাসস্থল, যেমন- পুকুর এবং জলাশয়গুলো ধ্বংস না করা এ প্রজাতিগুলোর সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

ছবি: Holly Cheng / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মংগাবে, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)