২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থাগুলো জানায়, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী 'সুপার এল নিনো'তে রূপ নিতে পারে। এই নতুন বিশ্লেষণ নিয়ে বিবিসির প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ২১ মে জানায়, এতে পরের বছর বিশ্বজুড়ে রেকর্ড তাপমাত্রা, খরা, বন্যা, খাদ্যসংকট ও বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, ২০২৭ সাল বিশ্বের নথিভুক্ত ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে পারে।
এই সতর্কতার ভিত্তি ছিল বিশ্বের তিনটি শীর্ষ কেন্দ্রের পূর্বাভাস: যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া), ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস (ইসিএমডব্লিউএফ) এবং অস্ট্রেলিয়ার ব্যুরো অব মেটিওরোলজি (বিওএম)। তখনো এদের কেউই এল নিনো শুরু হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়নি। ২০২৬ সালের মে মাসে তারা যা বলেছিল তা হলো, সমুদ্র দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে এবং পূর্বাভাসগুলো একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ শক্তিশালী বা খুব শক্তিশালী একটি এল নিনোর আভাস মিলছে। সামনের মাসগুলোর প্রতিটি সংখ্যা ছিল পূর্বাভাস, পর্যবেক্ষণ নয়; আর এল নিনো শেষ পর্যন্ত কত শক্তিশালী হবে, তা নিয়ে যে বড় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, সংস্থাগুলো নিজেরাই তা জোর দিয়ে বলেছিল।
অস্বাভাবিক দ্রুত উষ্ণ হচ্ছিল প্রশান্ত মহাসাগর
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক দ্রুত বাড়ছিল। সেই সপ্তাহের তথ্যে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি দেখা যায়, যা এল নিনো শুরুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়। নোয়ার ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার (সিপিসি) ২০২৬ সালের ১৪ মে তাদের পর্যালোচনায় নিনো-৩.৪ সূচকের সর্বশেষ সাপ্তাহিক মান +০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে জানায়। সবচেয়ে পশ্চিমের নিনো-৪ সূচক ছিল +০.৫ ডিগ্রি এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছের, সবচেয়ে পূর্বের নিনো-১+২ সূচক ছিল +১.০ ডিগ্রি।
এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া, যাতে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সামনের মাসগুলোতে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে উত্তর গোলার্ধের শরৎ নাগাদ 'খুব শক্তিশালী' বা তথাকথিত 'সুপার এল নিনো'তে পরিণত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। নোয়া তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে জানায়, এক মাসের মধ্যেই এল নিনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উত্তর গোলার্ধের শীতে এটি শক্তিশালী বা খুব শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তখন তিন ভাগের দুই ভাগে পৌঁছেছিল।
আগের কয়েক সপ্তাহে উষ্ণতা বৃদ্ধির গতিকে অস্বাভাবিক বলেন আবহাওয়াবিদেরা। নোয়ার আবহাওয়াবিদ নাথানিয়েল জনসন বলেন, বর্তমান গতিতে উষ্ণতা বাড়তে থাকলে এটি হবে 'একটি বিরল ঘটনা'। কারণ, আগের শীতে যে লা নিনা পরিস্থিতি ছিল, যা এল নিনোর বিপরীত ও শীতল পর্যায়, সেখান থেকে মাত্র এক বছরের মধ্যে সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোতে পৌঁছানো খুবই অস্বাভাবিক।
অস্ট্রেলিয়ার বিওএম এল নিনো ঘোষণার ক্ষেত্রে কিছুটা কঠোর মানদণ্ড ব্যবহার করে। তাদের হিসাবে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় অন্তত ০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে হবে। একই সঙ্গে তারা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বাণিজ্যিক বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনও দেখে, যা বোঝায় উষ্ণ সমুদ্র এখন বায়ুমণ্ডলকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর গোলার্ধের বসন্তে করা এল নিনো পূর্বাভাস সাধারণত খুব নির্ভরযোগ্য হয় না, তবে এবার আবহাওয়াবিদেরা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচের অবস্থাও একই কথা বলছিল। নোয়ার ১৪ মের পর্যালোচনায় বলা হয়, বিষুবীয় অঞ্চলের উপপৃষ্ঠ তাপমাত্রা সূচক টানা ষষ্ঠ মাসের মতো বেড়েছে এবং বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে পৃষ্ঠের নিচে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে গড়ের চেয়ে বেশি। পশ্চিম বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি পশ্চিমা বাতাসের অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, যা স্বাভাবিক পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী বাণিজ্যিক বায়ুর উল্টো। ইন্দোনেশিয়ার আশপাশে বৃষ্টি তৈরির পরিচলন ছিল দুর্বল। তবু সেদিন নোয়া সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের সম্মিলিত ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে তখনো 'এনসো-নিরপেক্ষ' অবস্থায় বলে মূল্যায়ন করে।

'সুপার এল নিনো' কীভাবে মাপা হয়
এল নিনো পুরো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে তৈরি হলেও পূর্বাভাসদাতারা বিশেষভাবে নজর রাখেন 'নিনো ৩.৪' নামে পরিচিত সমুদ্রের একটি অংশের ওপর। নোয়ার ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারের বর্ণনায় এই এলাকা মধ্য-পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগর, ৫ ডিগ্রি উত্তর থেকে ৫ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশ এবং ১৭০ থেকে ১২০ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। সেখানে তিন মাসের গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে নোয়া এল নিনো পর্ব শুরুর ঘোষণা দেয়। এরপর তিন মাসের গড় তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে কতটা বেশি, তা দিয়ে একটি এল নিনোর শক্তি নির্ধারণ করা হয়। এই বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে তাকে শক্তিশালী এল নিনো বলা হয়; প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পর্যায় থেকেই 'সুপার এল নিনো' কথাটি ব্যবহার করা হয়।
কথাটি অবশ্য আনুষ্ঠানিক নয়। ২০২৬ সালের ২৪ এপ্রিলের হালনাগাদে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানায়, তারা 'সুপার এল নিনো' শব্দ ব্যবহার করে না, কারণ এটি মানসম্মত কার্যকর শ্রেণিবিন্যাসের অংশ নয়। নোয়ার নিজস্ব মাপকাঠিও এর কিছুদিন আগে বদলেছিল। নিউ এজে ২০২৬ সালের ২ মার্চ প্রকাশিত এএফপির ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নোয়া 'রিলেটিভ ওশেনিক নিনো ইনডেক্স' (রনি) নামে নতুন একটি সূচক চালু করে। এতে মধ্য-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর শুধু একই এলাকার ৩০ বছরের গড়ের সঙ্গে নয়, বাকি গ্রীষ্মমণ্ডলের তুলনায় কতটা উষ্ণ বা শীতল, তা দেখা হয়। মহাসাগরগুলো দ্রুত উষ্ণ হওয়ায় পুরোনো ৩০ বছরের গড় অনেক সময় সেকেলে হয়ে পড়ে বলে নোয়া জানায়, আর রনিকে তারা এল নিনো ও লা নিনা তাৎক্ষণিকভাবে অনুসরণের 'আরও স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য উপায়' বলে উল্লেখ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসিএমডব্লিউএফ, নোয়া ও বিওএম, তিন সংস্থার পূর্বাভাসই প্রায় একই ধরনের ফল দেখাচ্ছিল। ইসিএমডব্লিউএফের সর্বশেষ পূর্বাভাসে অর্ধেকের বেশি মডেল উত্তর গোলার্ধের শরৎ নাগাদ তাপমাত্রা ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। জনসনের মতে, এর চেয়ে বেশি বৃদ্ধি হলে সেটি হবে 'ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী ঘটনা'। বিওএমের পূর্বাভাসেও ২০২৬ সালের শেষ দিকে খুব শক্তিশালী এল নিনো গড়ে ওঠার স্পষ্ট সম্ভাবনা দেখা যায়। কিছু পূর্বাভাস তথ্য এমনও ইঙ্গিত দেয় যে বৃদ্ধি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছাড়াতে পারে; তা হলে ১৮৭৭ সালে পৌঁছানো সর্বোচ্চ রেকর্ড ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ভেঙে যাবে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, ১৮৭৭ সালে পর্যবেক্ষণব্যবস্থা সীমিত ছিল, তাই সেই সময়ের তথ্যে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে।
নোয়ার নিজের প্রকাশিত সম্ভাবনার হিসাব অবশ্য এল নিনো হবে কি না তার চেয়ে কতটা শক্তিশালী হবে, সে বিষয়ে বেশি সতর্ক ছিল। ১৪ মের পর্যালোচনায় বলা হয়, এল নিনোর সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে 'এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে, কোনো শক্তি-শ্রেণির সম্ভাবনাই ৩৭ শতাংশ ছাড়ায়নি'। সংস্থাটি আরও জানায়, ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোতে উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মজুড়ে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে জোরালো সংযোগ দেখা গিয়েছিল, আর ২০২৬ সালে তা ঘটে কি না, 'তা দেখার বিষয়'। নোয়া মনে করিয়ে দেয়, শক্তিশালী এল নিনো মানেই শক্তিশালী প্রভাব নিশ্চিত নয়; এতে কেবল কিছু প্রভাবের সম্ভাবনা বাড়ে।
জানুয়ারি থেকে মে ২০২৬: নোয়ার পূর্বাভাস যেভাবে বদলেছে
পরিবর্তনের গতি বোঝা যায় নোয়ার মাসিক এনসো পর্যালোচনা থেকে, যা প্রতি মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়। পরপর পড়লে দেখা যায়, পাঁচ মাসের মধ্যে পূর্বাভাস লা নিনা থেকে সম্ভাব্য এল নিনোতে সরে এসেছে:
- ৮ জানুয়ারি ২০২৬: লা নিনা চলমান ছিল; জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে এনসো-নিরপেক্ষ অবস্থায় যাওয়ার সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ। নিনো-৩.৪ সূচকের সর্বশেষ সাপ্তাহিক মান ছিল -০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
- ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: জানুয়ারিতেও লা নিনা চলে; গ্রীষ্মের শেষ ভাগ ও তার পরে এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়, তবে মডেলের অনিশ্চয়তা ছিল যথেষ্ট। নিনো-৩.৪ মান ছিল -০.৯ ডিগ্রি।
- ১২ মার্চ ২০২৬: লা নিনা সতর্কতার পাশাপাশি নোয়া 'এল নিনো ওয়াচ' জারি করে; জুন থেকে আগস্টে এল নিনো দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ৬২ শতাংশ, আর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে তা 'শক্তিশালী' (নিনো-৩.৪ অন্তত +১.৫ ডিগ্রি) হওয়ার সম্ভাবনা তিন ভাগের এক ভাগ।
- ৯ এপ্রিল ২০২৬: এনসো-নিরপেক্ষ অবস্থা শুরু হয়; মে থেকে জুলাইয়ে এল নিনো দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ৬১ শতাংশ। খুব শক্তিশালী এল নিনোর (নিনো-৩.৪ অন্তত +২.০ ডিগ্রি) সম্ভাবনা চার ভাগের এক ভাগ, যা নির্ভর করছিল উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মজুড়ে পশ্চিমা বাতাসের অস্বাভাবিকতা চলতে থাকার ওপর।
- ১৪ মে ২০২৬: এল নিনো 'শিগগিরই দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা'; মে থেকে জুলাইয়ে সম্ভাবনা ৮২ শতাংশ, আর ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টিকে থাকার সম্ভাবনা ৯৬ শতাংশ।
এই কয় মাসজুড়ে নোয়া একই চালিকাশক্তির কথা বলেছে: সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে জমতে থাকা বিপুল তাপ এবং দুর্বল হয়ে আসা বাণিজ্যিক বায়ু। মার্চে সংস্থাটি বলে, বছরের এই সময়ে মডেলের পূর্বাভাস তুলনামূলক কম নির্ভুল হলেও এল নিনোর বাড়তে থাকা সম্ভাবনার পেছনে আছে 'উপপৃষ্ঠ সমুদ্রে জমা বিপুল তাপ'। ঢাকার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পরদিন, ১৫ মে, নোয়ার ১৪ মের এই সংখ্যাগুলো প্রকাশ করে এবং সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে সিপিসির সতর্কতাও উদ্ধৃত করে।
এপ্রিলে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা যা বলেছিল
২০২৬ সালের ২৪ এপ্রিল ডব্লিউএমও জানায়, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি থেকে একটি এল নিনো গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা বিশ্বের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনকে প্রভাবিত করবে। সংস্থাটির মাসিক 'গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট' অনুযায়ী, বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছিল, যা ২০২৬ সালের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যেই এল নিনো পরিস্থিতি ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়। ডব্লিউএমওর জলবায়ু পূর্বাভাস শাখার প্রধান উইলফ্রান মুফুমা ওকিয়া বলেন, 'বছরের শুরুতে নিরপেক্ষ অবস্থার পর জলবায়ু মডেলগুলো এখন জোরালোভাবে একমত, এবং এল নিনো শুরু হওয়া ও পরের মাসগুলোতে আরও তীব্র হওয়ার বিষয়ে আস্থা বেশি।' তিনি আরও বলেন, 'মডেলগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে এটি শক্তিশালী ঘটনা হতে পারে, তবে বছরের এই সময়ে তথাকথিত বসন্তকালীন পূর্বাভাস-বাধা পূর্বাভাসের নিশ্চয়তার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।' তাঁর মতে, এপ্রিলের পর সাধারণত পূর্বাভাসের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ে।
ডব্লিউএমও এল নিনোকে এল নিনো-দক্ষিণী দোলনের (এনসো) উষ্ণ পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করে, যা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জলবায়ু ধরনগুলোর একটি। এটি সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর ঘটে এবং প্রায় নয় থেকে বারো মাস স্থায়ী হয়। সংস্থাটি জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর পুনরাবৃত্তি বা তীব্রতা বাড়ায় এমন প্রমাণ নেই, তবে এটি এল নিনোর প্রভাবকে বাড়িয়ে দিতে পারে, কারণ উষ্ণ সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলে তাপপ্রবাহ ও ভারী বৃষ্টির জন্য বেশি শক্তি ও আর্দ্রতা থাকে। ২০২৬ সালের মে থেকে জুলাইয়ের জন্য ডব্লিউএমওর মৌসুমি হালনাগাদে প্রায় সর্বত্র স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার কথা বলা হয়; দক্ষিণ উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকায় এই সংকেত ছিল বিশেষভাবে জোরালো। ডব্লিউএমও জানায়, পরবর্তী এল নিনো/লা নিনা হালনাগাদ তারা মে মাসের শেষ দিকে প্রকাশ করবে।
নোয়ার ব্যাখ্যা থেকে প্রক্রিয়াটি বোঝা সহজ হয়। সিপিসির বর্ণনায়, এল নিনোর সময় বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব অর্ধেকে পূর্বমুখী বাণিজ্যিক বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে নিচু স্তরে পশ্চিমা বাতাস দেখা দেয়, আর ইন্দোনেশিয়া ও উত্তর অস্ট্রেলিয়ার ওপর বায়ুচাপ বাড়ে, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে কমে। উষ্ণ পানির সঙ্গে বৃষ্টিও সরে যায়: মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে পরিচলন ও বৃষ্টি বাড়ে, ইন্দোনেশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে কমে। গ্রীষ্মমণ্ডলের বৃষ্টিপাতের এই পরিবর্তন পৃথিবীর পরিধির প্রায় অর্ধেকজুড়ে ঘটে বলে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বহু দূরের আবহাওয়াও বদলে যায়।
এল নিনো ও বিশ্ব তাপমাত্রার রেকর্ড
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠে বাড়তি তাপ জমে তা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে বলে এল নিনোর সবচেয়ে বিস্তৃত প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এল নিনো সাধারণত বিশ্বের তাপমাত্রা প্রায় ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। ২০২৬ সালের মার্চে এএফপির ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে নোয়ার নাথানিয়েল জনসনও একই কথা বলেন: 'অন্য সব কিছু সমান থাকলে, একটি সাধারণ এল নিনো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা সাময়িকভাবে ০.১ থেকে ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো বাড়িয়ে দেয়।'
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের জলবায়ু ঝুঁকি ও সহনশীলতা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লিজ স্টিফেন্স বিবিসিকে বলেন, এটি যদি খুব শক্তিশালী এল নিনো হয়, তাহলে 'আগামী বছর সম্ভবত আমরা রেকর্ড বৈশ্বিক তাপমাত্রা দেখতে যাচ্ছি'। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর পর বিশ্বে রেকর্ড উষ্ণ বছর দেখা গিয়েছিল; তবে প্রতিটি এল নিনো শক্তি ও বিশ্ব আবহাওয়ায় প্রভাবের দিক থেকে আলাদা হয়।
পটভূমিতে চলমান উষ্ণায়ন এই আশঙ্কাকে আরও গুরুতর করে তুলেছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ডব্লিউএমও জানায়, শক্তিশালী ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো এবং মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে ২০২৪ সাল ছিল রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ বছর। ২০২৬ সালের ২৩ মার্চ বিবিসির প্রতিবেদনে বর্ণিত 'স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট' প্রতিবেদনে ডব্লিউএমও জানায়, ১৮৫০ সাল থেকে চলা রেকর্ডে গত ১১ বছরই ছিল সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর, এবং ২০২৫ সালে বৈশ্বিক গড় বায়ু তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে প্রায় ১.৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। লা নিনার সাময়িক শীতল প্রভাবে ২০২৫ সাল ২০২৪-এর মতো উষ্ণ না হলেও তা ছিল রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ তিন বছরের একটি। ডব্লিউএমওর ড. জন কেনেডি তখন বিবিসিকে বলেন, 'আমরা যদি এল নিনোর দিকে যাই, তাহলে আবার বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়তে দেখব, এবং সম্ভবত নতুন রেকর্ডও হবে।'
সবচেয়ে উষ্ণ বছর কেন ২০২৬ নয়, বরং ২০২৭ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, বিজ্ঞানীরা তারও ব্যাখ্যা দেন। আয়ারল্যান্ডের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থার জলবায়ুবিজ্ঞানী টিডো জেমলার ২০২৬ সালের মার্চে এএফপিকে বলেন, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এল নিনো তৈরি হলে এর প্রভাব ২০২৬-এর চেয়ে ২০২৭ সালে বেশি হবে, কারণ 'এল নিনোর প্রতি বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলের সাড়া দিতে সময় লাগে'। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ধারার কারণে এল নিনো ছাড়াও ২০২৬ সাল রেকর্ড উষ্ণ বছর হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল।
১৮৭৭ ও ২০১৫-১৬: তুলনার দুই এল নিনো
রেকর্ডে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো, ১৮৭৭-৭৮ সালের ঘটনাটি স্মরণীয় হয়ে আছে এর মানবিক মূল্যের জন্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই এল নিনো প্রায় ১৮ মাস স্থায়ী হয়েছিল এবং ভয়াবহ বৈশ্বিক জলবায়ু বিপর্যয় ডেকে আনে: এশিয়া, ব্রাজিল ও আফ্রিকায় ভয়াবহ খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং লাখো মানুষের মৃত্যু হয়, একই সময়ে পেরুর মতো অঞ্চলে তীব্র বন্যা হয়। ইতিহাসবিদেরা ১৮৭৭-৭৮ সালের এল নিনো এবং সক্রিয় ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোলকে ভারত, চীন, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার কিছু অংশে খরা ও ফসলহানির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ব্রিটিশ ভারতে ১৮৭৬-৭৮ সালের মহাদুর্ভিক্ষ শুরু হয় দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে তীব্র খরায় ফসল নষ্ট হওয়ার পর, এবং পরে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে; শুধু ওই দুর্ভিক্ষে অতিরিক্ত মৃত্যুর অনুমান ৫৬ লাখ থেকে ৯৬ লাখ।
২০২৬ সালের আগে সবশেষ 'খুব শক্তিশালী' এল নিনো হয়েছিল ২০১৫-১৬ সালে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে নিনো ৩.৪ অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ছিল ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই এল নিনোয় ভেনেজুয়েলা, অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি দ্বীপে খরা দেখা দেয়, প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ও আটলান্টিকে কম ঘূর্ণিঝড় হয়। তারও আগে ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোকে নথিভুক্ত ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ধরা হয়, যাতে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক খরা, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগ হয়েছিল।
২০২৬ সালের মের আগে সবশেষ এল নিনো ছিল ২০২৩-২৪ সালের। ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল ঢাকা ট্রিবিউনে উদ্ধৃত বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) তথ্য অনুযায়ী, সেই সময় বাংলাদেশে দীর্ঘ তাপপ্রবাহে দেশের ৬৪ জেলার ৫১টিতে তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি পর্যন্ত উঠেছিল।

বিশ্বজুড়ে বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়
প্রশান্ত মহাসাগর থেকে দূরে এল নিনোর সাধারণ প্রভাবগুলোর কথা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। এল নিনোর সময় উত্তর পেরু ও দক্ষিণ ইকুয়েডরে বন্যা সাধারণ ঘটনা, আর পূর্ব আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলেও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এল নিনো আটলান্টিকের হারিকেন কমিয়ে দেয়, আর আবহাওয়াবিদেরা তখনই ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন যে ২০২৬ সালের আটলান্টিক হারিকেন মৌসুম স্বাভাবিকের চেয়ে শান্ত থাকতে পারে। নোয়ার সিপিসি এর কারণ ব্যাখ্যা করে: আগস্ট থেকে অক্টোবরে এল নিনো ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডলে পশ্চিমা বাতাস বাড়ায়, ফলে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উত্তর আটলান্টিকে বাতাসের উল্লম্ব কর্তন (উইন্ড শিয়ার) বেড়ে হারিকেন কমে, আর পূর্ব গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে তা কমে গিয়ে হারিকেন বাড়ে।
অধ্যাপক স্টিফেন্স বলেন, আটলান্টিকে কম ঝড় শুনতে ভালো লাগলেও মধ্য আমেরিকার জন্য এর অর্থ অনেক কম বৃষ্টি ও সম্ভাব্য খরা। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশেও খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা কৃষি উৎপাদন ও বৈশ্বিক খাদ্য মজুতের জন্য হুমকি। ডব্লিউএমওর এপ্রিলের সারসংক্ষেপেও একই চিত্র: এল নিনো সাধারণত দক্ষিণ দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, আফ্রিকার শিং অঞ্চল ও মধ্য এশিয়ায় বেশি বৃষ্টি এবং অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে খরার সঙ্গে যুক্ত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ায় এল নিনোর সরাসরি প্রভাব কতটা পড়বে তা তখনো নিশ্চিত ছিল না, তবে দেশটির আবহাওয়া অফিসের (মেট অফিস) জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলেন, এল নিনো বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে বেশি শীতল শীতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পূর্বাভাসদাতাদের উদ্ধৃত করে ঢাকা ট্রিবিউনের এপ্রিলের প্রতিবেদনেও বড় পরিসরের চিত্র তুলে ধরা হয়: অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বেশি গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া এবং দাবানলের ঝুঁকি, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায়ই দুর্বল বর্ষা, পূর্ব আফ্রিকায় গড়ের চেয়ে বেশি বৃষ্টি এবং আমাজনে শুষ্কতা।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য যা অর্থ বহন করে
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল বর্ষা। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল ডব্লিউএমও মালদ্বীপের মালেতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় জলবায়ু পূর্বাভাস ফোরামের (সাসকফ) পূর্বাভাস প্রকাশ করে। এতে নয়টি দেশের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা অংশ নেয়: আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। ফোরাম জানায়, ২০২৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়ার বড় অংশে বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনা, যার সবচেয়ে জোরালো সংকেত মধ্যাঞ্চলে; তবে উত্তর-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণের কিছু অংশে স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে। দিনের সর্বোচ্চ ও রাতের সর্বনিম্ন, দুই তাপমাত্রাই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার কথা বলা হয়।
ফোরাম জানায়, ২০২৬ সালের বর্ষা মৌসুমে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে জোরালো ঐকমত্য রয়েছে, আর অঞ্চলের আরেকটি প্রধান জলবায়ু চালক ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল নিরপেক্ষ থেকে ধনাত্মক পর্যায়ে যেতে পারে। ডব্লিউএমও উল্লেখ করে, দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ এলাকায় বছরের মোট বৃষ্টির ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ আসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু থেকে, যা সেচ ও খাবার পানির উৎস নদী, হ্রদ ও ভূগর্ভস্থ পানি পূরণ করে; আর বর্ষায় গড়ের চেয়ে কম বৃষ্টি হলে দুর্বল জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিতে পারে।
এপ্রিলে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও একই কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মারুফুর রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, 'এল নিনোর কারণে সাগর থেকে আর্দ্রতার স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হয়। ফলে বাংলাদেশে বৃষ্টি কম হতে পারে, দীর্ঘ শুষ্ক সময় এমনকি খরাও দেখা দিতে পারে।' বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. রবিউল আউয়াল বলেন, বর্ষার আগে এল নিনো গড়ে উঠলে বৃষ্টি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হতে পারে: 'দুর্বল মানে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টি, যার কিছু পরিণতি থাকবে।' পত্রিকাটি স্প্রিংগার নেচারে প্রকাশিত ২০২০ সালের একটি গবেষণার কথাও উল্লেখ করে, যাতে দেখা গেছে এনসো বাংলাদেশের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রাকে জোরালোভাবে প্রভাবিত করে।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় প্রতিবেশী ভারত এরই মধ্যে তীব্র গরমে ছিল। ২০২৬ সালের ২০ মে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) সতর্ক করে, সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো আসন্ন 'চরম' গরমকে আরও খারাপ করতে পারে; সংস্থাটি তাপপ্রবাহ মোকাবিলার প্রস্তুতি নির্দেশিকা প্রকাশ করে এবং বলে, 'ভারতে তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘ, তীব্র ও ঘনঘন হচ্ছে'। আইএমডি সেই সপ্তাহের উচ্চ তাপমাত্রাকে সরাসরি এল নিনোর সঙ্গে যুক্ত করেনি, তবে আগের গবেষণার উল্লেখ করে জানায়, এল নিনো বছরগুলোতে উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতে তাপপ্রবাহ বেশি হয়েছে। সংস্থাটির তথ্যে ১৯ মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল উত্তর প্রদেশের বান্দায়, ৪৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

সার, হরমুজ প্রণালি ও খাদ্য সরবরাহ
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, এল নিনোর হুমকি এমন সময়ে আসছিল যখন বিশ্বের খাদ্য সরবরাহ এমনিতেই চাপে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছিল: হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার সরবরাহে এরই মধ্যে বিঘ্ন ঘটছিল এবং সারের দাম বেড়েছিল, যার প্রভাব সামনের মাসগুলোতে কৃষি উৎপাদনে পড়তে পারে; ফলে খাদ্য সরবরাহ কমা ও দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অধ্যাপক স্টিফেন্স বলেন, আগে থেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি, আর এল নিনোর কারণে খরা বা বন্যায় ফসল উৎপাদন কমলে খাদ্যের দাম আরও বাড়বে। তাঁর ভাষায়, 'বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যদি চলতে থাকে, তাহলে এ বছর আমরা সম্ভাব্য বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারি।'
এশিয়ার প্রধান খাদ্য চালের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কী দাঁড়াচ্ছিল, আগের প্রতিবেদনে তা দেখা যায়। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সারের ঘাটতি ও জ্বালানির চড়া দামের কারণে এশিয়াজুড়ে কৃষকেরা আবাদ কমানোয় ২০২৬ সালে চালের সরবরাহ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল; যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও সারের প্রবাহ কমে গিয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূলত ক্ষুদ্র কৃষকেরা বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এল নিনোর কারণে বেশি গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার মুখেও ছিলেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, 'কিছু দেশে কৃষকেরা এরই মধ্যে ধান লাগানো শুরু করেছেন এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় কম উপকরণ ব্যবহার করছেন। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ও আগামী বছরের শুরুতে আমরা বিশ্বে আরও টানাটানির সরবরাহ পরিস্থিতি দেখব।'
একই প্রতিবেদনে কিছু সংখ্যাও দেওয়া হয়। এপ্রিলে এফএও পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৫/২৬ সালে বিশ্বে চাল উৎপাদন ২ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাবে। থাইল্যান্ডের চাই নাত প্রদেশের এক কৃষক জানান, সারের দাম বস্তাপ্রতি ৮৫০ বাত থেকে বেড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ বাতে উঠেছে, ফলে তিনি সারের ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ায় সার সরবরাহ সমস্যা না হলেও এল নিনো উৎপাদন কমাবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল; দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে মার্চ থেকে মে মৌসুমে ধান কাটার এলাকা ১০.৬ শতাংশ কমে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরে নামবে। বছরের পর বছর ভালো ফলনের কারণে বিশ্বে তখনো চালের যথেষ্ট মজুত ছিল; প্রতিবেদনে উদ্ধৃত যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের হাতে ছিল রেকর্ড ৪ কোটি ২০ লাখ টন, যা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
বাংলাদেশের জন্য দুর্বল বর্ষা আর দামি কৃষি উপকরণ একই মৌসুমে এসে পড়তে পারত। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৬ সালের ১৫ মের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, এল নিনোর কারণে বর্ষায় পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে দেশে বৃষ্টিনির্ভর প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ছবি: NOAA / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (বিবিসির বরাতে), নোয়া ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও), বিবিসি নিউজ, ঢাকা ট্রিবিউন, নিউ এজ (এএফপি), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (রয়টার্স), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)