ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের দক্ষিণে, দেশটির উত্তর-মধ্যাঞ্চলের থান হোয়া প্রদেশের পুলিশ ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জানায়, একটি বাড়ির বেজমেন্ট থেকে দুটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের হিমায়িত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং বিপন্ন এই প্রাণীর অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগে ওই সপ্তাহের শুরুতে দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে অনলাইনে প্রকাশিত পুলিশের এক বিবৃতির বরাতে বলা হয়, মরদেহ দুটির মোট ওজন প্রায় ৪০০ কেজি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির মালিক বাঘ দুটি দুই বিলিয়ন ডংয়ে কিনেছিলেন এবং সেখানে তথাকথিত 'টাইগার বোন গ্লু' বা বাঘের হাড়ের আঠা তৈরির সরঞ্জাম রাখা ছিল। একসময় ভিয়েতনামের বনে বাঘ বিচরণ করত, কিন্তু এখন সেখান থেকে বাঘ প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে; আর দেশটি অবৈধ বন্যপ্রাণী পণ্যের ভোক্তা কেন্দ্র ও পাচারের পথ হিসেবে পরিচিত।
থান হোয়া পুলিশ যা জানিয়েছে
এএফপির প্রকাশিত পুলিশের বিবৃতি অনুযায়ী, পূর্ণবয়স্ক বাঘ দুটি হিমায়িত অবস্থায় পাওয়া যায় ৫২ বছর বয়সী হোয়াং দিন দাতের বাড়ির বেজমেন্টে। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে দাত স্বীকার করেছেন যে তিনি প্রাণী দুটি দুই বিলিয়ন ডংয়ে কিনেছিলেন, এএফপির হিসাবে যা প্রায় ৭৭ হাজার মার্কিন ডলার; আর বিক্রেতা হিসেবে তিনি ৩১ বছর বয়সী নগুয়েন ডোয়ান সনের নাম বলেছেন। পুলিশের ভাষ্য, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের অভিযোগে দুজনকেই ওই সপ্তাহের শুরুতে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ আরও জানায়, ক্রেতার কাছে তথাকথিত বাঘের হাড়ের আঠা তৈরির সরঞ্জাম ছিল; কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন, এই আঠালো পদার্থ হাড় ও জোড়ার রোগ সারায়।
ভিয়েতনামের দৈনিক তুওই ত্রের ইংরেজি সংস্করণ তুওই ত্রে নিউজ একই দিনে ঘটনাটির খবর প্রকাশ করে; প্রতিবেদনটি লেখেন ভিন থো ও হা দং, আর ছবি সরবরাহ করে থান হোয়া প্রাদেশিক জননিরাপত্তা বিভাগ। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিয়েতনামের দণ্ডবিধির ২৪৪ অনুচ্ছেদের অধীনে বিপন্ন, মূল্যবান ও দুর্লভ প্রাণী সংরক্ষণের বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে পুলিশ দুজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু করেছে। পুলিশের অভিযোগ, দাত বাঘসহ বন্যপ্রাণী কিনে অবৈধ মুনাফার জন্য সেগুলো থেকে হাড়ের পেস্ট তৈরি করতেন।
তুওই ত্রের প্রতিবেদনে পুলিশের ভাষ্য থেকে আরও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়। তদন্তকারীরা জানান, দাতের বাড়িতে মাটির নিচে একটি গোপন কুঠুরি পাওয়া গেছে, যার দরজা মজবুত লোহার তৈরি এবং সেখানে ক্যামেরা ব্যবস্থাও বসানো ছিল। সেখানেই মোট প্রায় ৪০০ কেজি ওজনের দুটি হিমায়িত বাঘের মরদেহ এবং পেস্ট তৈরির সরঞ্জাম রাখা ছিল। পুলিশ জানায়, দাত ভিয়েতনামের মেসেজিং অ্যাপ জালোর মাধ্যমে সনের সঙ্গে কেনার বিষয়টি ঠিক করেন; আর সন হা তিন প্রদেশে এক লাও নাগরিকের কাছ থেকে মরদেহ দুটি কিনে প্রায় দুই বিলিয়ন ডংয়ে দাতের কাছে বিক্রি করেন, তুওই ত্রের হিসাবে যা প্রায় ৭৭ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার। পত্রিকাটি জানায়, বাঘগুলো কোথা থেকে এসেছে তা কর্তৃপক্ষ তখনও খুঁজে দেখছিল এবং পাচার চক্রের অন্যান্য দিকও তদন্ত করছিল।
এসবই পুলিশের ভাষ্য এবং দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ। প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো আদালত মামলাটির বিষয়ে রায় দেননি।

যে আইনে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ভিয়েতনামের ২০১৫ সালের দণ্ডবিধির ২৪৪ অনুচ্ছেদ বিপন্ন, মূল্যবান ও দুর্লভ প্রাণীর ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষার বিধান লঙ্ঘন নিয়ে। দেশটির বিচার মন্ত্রণালয়ের প্রকাশনা ভিয়েতনাম ল ম্যাগাজিন ২০২০ সালের আগস্টে এর যে ব্যাখ্যা দেয়, সে অনুযায়ী এই অনুচ্ছেদে এমন প্রাণী, তাদের দেহাংশ ও সেগুলো থেকে তৈরি পণ্য অবৈধভাবে শিকার, ধরা, হত্যা, পরিবহন ও কেনাবেচা দণ্ডনীয়। ওই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রথম ধারায় মূল জরিমানা ৫০ কোটি থেকে ২০০ কোটি ডং; প্রথম দুই ধারায় কারাদণ্ড এক থেকে পাঁচ বছর এবং পাঁচ থেকে দশ বছর; আর আদালত এর সঙ্গে অতিরিক্ত ৫ কোটি থেকে ২০ কোটি ডং জরিমানা করতে পারেন।
ম্যাগাজিনটি জানায়, প্রাণীর সংখ্যা অনুযায়ী অনুচ্ছেদটিতে গুরুতর পরিস্থিতি নির্ধারণ করা আছে। এর মধ্যে তিন থেকে পাঁচটি ভালুক বা বাঘ জড়িত থাকলে মামলাটি ভারী দণ্ডের দ্বিতীয় ধারায় পড়ে; একটি বা দুটি হাতি বা গণ্ডারের ক্ষেত্রেও একই কথা। তৃতীয় ধারায় আরও কিছু গুরুতর পরিস্থিতি যুক্ত করা হয়েছে, যেমন অবৈধ মুনাফা অর্জন, সীমান্ত পেরিয়ে কেনাবেচা বা পরিবহন এবং বিপজ্জনক পুনরাবৃত্তি। ভিয়েতনাম টেলিভিশন (ভিটিভি) ২০২৫ সালের এপ্রিলে জানায়, ২০১৭ সালে সংশোধিত ২০১৫ সালের দণ্ডবিধিতে বিপন্ন ও দুর্লভ প্রজাতির বিরুদ্ধে অপরাধে সর্বোচ্চ ১৫ বছর কারাদণ্ডের বিধান আছে।
ভিয়েতনামের প্রশাসনিক বিধিতে বাঘের বাণিজ্যিক কেনাবেচা অনেক দিন ধরেই নিষিদ্ধ। ২০১৮ সালে প্রকাশিত ট্রাফিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বাঘের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় বাণিজ্যই ভিয়েতনামে নিষিদ্ধ; এর সূত্র হিসেবে ডিক্রি ১৬০/২০১৩/এনডি-সিপি ও ডিক্রি ৮২/২০০৬/এনডি-সিপির উল্লেখ করা হয়। ভিটিভি ২০২৫ সালে জানায়, ডিক্রি ৮৪/২০২১/এনডি-সিপিতে ১০৫টি প্রাণী প্রজাতিকে গ্রুপ আইবি-তে রাখা হয়েছে; এটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতির তালিকা, যাদের আহরণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ।
২০২০ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী নগুয়েন জুয়ান ফুক বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা কঠোর করার জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে নির্দেশনা ২৯/সিটি-টিটিজি জারি করেন। দান চি পত্রিকা ২০২০ সালের ২৪ জুলাই জানায়, এর মাধ্যমে জীবিত বা মৃত বন্যপ্রাণী এবং সেগুলোর ডিম, লার্ভা, দেহাংশ ও উপজাত আমদানি পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত স্থগিত করা হয়; তবে খাদ্য ও পশুখাদ্যে ব্যবহৃত কিছু জলজ প্রাণী এবং আগেই ওষুধে প্রক্রিয়াজাত দেহাংশ এর বাইরে রাখা হয়। নির্দেশনায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বন্যপ্রাণীর বাজার বন্ধ করতে এবং অবৈধ শিকার, কেনাবেচা, পরিবহন, জবাই, খাওয়া, মজুত ও বিজ্ঞাপন কঠোরভাবে দমন করতে বলা হয়, আর কর্মকর্তা, সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের এসব কাজে জড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়।
বাঘের হাড়ের আঠা কী
পুলিশ যে পণ্য তৈরির সরঞ্জাম পাওয়ার কথা বলেছে, ভিয়েতনামি ভাষায় তার নাম 'কাও হো' বা 'কাও হো কোত'; ট্রাফিক এর ইংরেজি করেছে টাইগার বোন গ্লু, অর্থাৎ বাঘের হাড়ের আঠা। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণা জার্নাল অব নেচার কনজারভেশনে প্রকাশিত হয়, যার বিবরণ বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দেয়। তাতে বলা হয়, বাঘের কঙ্কাল উচ্চচাপের কুকারে দুই থেকে তিন দিন ধরে গলিয়ে বাদামি, গাছের কষের মতো একটি পদার্থ তৈরি করা হয়। গবেষণা অনুযায়ী, এর সঙ্গে অ্যান্টিলোপের হাড়, কচ্ছপের খোল, হরিণের নরম শিং ও ভেষজ এবং কিছু ক্ষেত্রে আফিমও মেশানো হয়।
প্রধান গবেষক ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও সম্পদ অর্থনীতি বিভাগের পিএইচডি ফেলো দাং ভু হোয়াই নাম। তিনি ভিয়েতনামে বাঘের হাড়ের আঠার ২২৮ জন ক্রেতা ও ব্যবহারকারীর ওপর জরিপ চালান। গবেষণায় দেখা যায়, ক্রেতারা সাধারণত সচ্ছল এবং প্রায়ই বয়স্ক মানুষ, যাঁদের আয় ভিয়েতনামের গড় আয়ের প্রায় ১৫ গুণ; তাঁরা সাধারণত আঠাটি মদ বা ভদকায় মিশিয়ে প্রতিদিন খান। কেন খান জানতে চাইলে ৪০ শতাংশ বলেন পেশি ও হাড়ের সমস্যার কথা, ৩২ শতাংশ সাধারণ স্বাস্থ্যের কথা, ৬ শতাংশ রোগ প্রতিরোধের কথা এবং ৫ শতাংশ যৌনক্ষমতার কথা। ক্রেতারা প্রতি কেজির জন্য ১৫ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি দাম দিতেন।
গবেষকেরা জানান, বেশির ভাগ ক্রেতা বন্য বাঘ থেকে তৈরি আঠা বেশি পছন্দ করেন, কারণ তাঁদের বিশ্বাস বন্য প্রাণীর হাড় বেশি কার্যকর; আর তাঁরা চান আঠায় বাঘের হাড়ের পরিমাণ যত সম্ভব বেশি থাকুক। গবেষণায় দেখা যায়, আঠা প্রস্তুতকারীদের অনেকেই ভিয়েতনামের বাড়ির বেজমেন্টে কাজ করা ছোট উৎপাদক; তাঁরা বাঘের খামার থেকে শাবক কিনে বড় হলে জবাই করেন, আর কিছু কাঁচামাল আসে শিকার করা বন্য বাঘ থেকে। উত্তরদাতাদের এক-তৃতীয়াংশ বলেছেন, বাঘের খামার বৈধ করা হলেও তাঁরা শিকার করা বন্য বাঘ কিনবেন; এ কারণে গবেষকেরা যুক্তি দেন, খামার বৈধ করলে শিকার বন্ধ হবে না। তাঁরা বাঘের আবাসস্থলে বেশি বিনিয়োগ, পুলিশ ও বনরক্ষী বাহিনী শক্তিশালী করা এবং ভোক্তাদের লক্ষ্য করে তথ্যভিত্তিক প্রচারণার সুপারিশ করেন।

ভিয়েতনামের বনে বাঘ
থান হোয়ার ঘটনার অনেক আগেই ভিয়েতনামে বন্য বাঘ খুবই বিরল হয়ে পড়েছিল। বন্যপ্রাণী বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক ট্রাফিক ২০১০ সালের জুনে জানায়, দেশটিতে বড়জোর ৩০টি বন্য বাঘ টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। রোজা এ. ইনডেনবাউমের লেখা ট্রাফিকের ২০১৮ সালের ভিয়েতনামে বাঘ বাণিজ্যের দ্রুত মূল্যায়নে ডব্লিউডব্লিউএফের বরাতে বলা হয়, ২০১৬ সালের মধ্যে বন্য বাঘের সংখ্যা পাঁচটির নিচে নেমে আসে, ফলে প্রজাতিটি দেশটিতে কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়।
একই সময়ে ভিয়েতনামে খাঁচায় রাখা বাঘের সংখ্যা বাড়ছিল। ওই মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশটিতে বন্দী বাঘ ২০১৬ সালের মে মাসে ছিল ১৮০টি, যা একই বছরের সেপ্টেম্বরে দাঁড়ায় ২৫৩টিতে; আর নিবন্ধিত বাঘের খামার ২০০৭ সালে পাঁচটি থেকে ২০১৭ সালে ১৩টিতে পৌঁছায়। ট্রাফিক জানায়, তারা ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে ভিয়েতনামে বাঘ বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশটিতে ২০০৪ সাল থেকে বাঘ জব্দের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ভিয়েতনাম ও এর প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থানীয় বাঘ ইন্দোচীনা বাঘ নামে পরিচিত মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ানের ন্যাশনাল জু জানায়, বাঘ স্থলভাগের সবচেয়ে বড় স্তন্যপায়ী যার খাদ্য পুরোপুরি মাংস; আমুর জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় পুরুষ বাঘের ওজন ৩০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। চিড়িয়াখানাটির তথ্য অনুযায়ী, একসময় পূর্ব, দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার বড় অংশজুড়ে বাঘের বিচরণ থাকলেও এখন তারা আগের বিচরণ এলাকার মাত্র প্রায় ৭ শতাংশে টিকে আছে, আর কোনো দুটি বাঘের ডোরার নকশা এক নয়। বনে বাঘ সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর বাঁচে, আর বন্য শাবকের প্রায় অর্ধেক দুই বছর বয়সের আগেই মারা যায়।
বিশ্বে বাঘের অবস্থা
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় বাঘ 'বিপন্ন' হিসেবে তালিকাভুক্ত। ২০২২ সালের জুলাইয়ে আইইউসিএন নতুন মূল্যায়ন প্রকাশ করে, যাতে অনুমান করা হয় বনে ৩ হাজার ৭২৬ থেকে ৫ হাজার ৫৭৮টি বাঘ রয়েছে। ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি ২০২২ সালের ২২ জুলাই এক বিবৃতিতে জানায়, এই অনুমান ২০১৫ সালের আগের মূল্যায়নের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি, এবং এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির উন্নতি থেকে, কেবল সংখ্যা বাড়ার কারণে নয়। প্রজাতিটির 'বিপন্ন' মর্যাদায় কোনো পরিবর্তন হয়নি।
আন্তর্জাতিকভাবে সব বাঘই বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কনভেনশন সাইটেসের পরিশিষ্ট ১-এ তালিকাভুক্ত, যা প্রজাতিটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেনাবেচা নিষিদ্ধ করে; স্মিথসোনিয়ানের ন্যাশনাল জুও তা উল্লেখ করেছে। সাইটেস বাঘ ও অন্যান্য এশীয় বড় বিড়ালকে রেজল্যুশন কনফ. ১২.৫-এর আওতায় বিবেচনা করে, যাতে সদস্য দেশগুলোকে এদের দেহাংশ ও উপজাতের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করতে বলা হয়েছে; আর সিদ্ধান্ত ১৪.৬৯-এ বলা হয়েছে, দেহাংশ ও উপজাত বাণিজ্যের জন্য বাঘের প্রজনন করা উচিত নয়।
বাঘের খামার ও সাইটেসের পর্যালোচনা
বন্দী অবস্থায় বাঘ রাখার পরিমাণ নিয়ে সাইটেসে বারবার উদ্বেগ উঠেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে পানামা সিটিতে অনুষ্ঠিত কনভেনশনের স্থায়ী কমিটির ৭৫তম সভার জন্য সাইটেস সচিবালয় যে নথি তৈরি করে, তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে করা একটি পর্যালোচনার ফল তুলে ধরা হয়: ৬৮টি সদস্য দেশে ১ হাজার ৩৮টি স্থাপনায় মোট ১২ হাজার ৫৭৪টি বাঘ রাখা হয়েছে। কোনো স্থাপনা বাণিজ্যিকভাবে নিবিড় পদ্ধতিতে বাঘের প্রজনন করলে, অথবা বাঘের দেহাংশ ও উপজাত অবৈধ বাণিজ্যে যাওয়া ঠেকাতে ব্যর্থ হতে পারে এমন হলে, সচিবালয় সেটিকে উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচনা করে।
এই মানদণ্ডে সচিবালয়ের প্রথম তালিকায় ভিয়েতনামে পাঁচটি এবং লাওসে ছয়টি উদ্বেগজনক স্থাপনা ছিল। আরও তথ্য পাওয়ার পর হালনাগাদ তালিকায় ভিয়েতনামে আটটি এবং লাওসে ১০টি স্থাপনা রাখা হয়; সাত দেশে মোট ৮৩টি, বাকিগুলো চীন, চেক প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে। সচিবালয় জানায়, ২০২২ সালের আগস্টে তারা এই দেশগুলোকে একটি প্রশ্নমালা পূরণ করতে বলেছিল, ভিয়েতনাম এর জন্য আরও সময় চেয়েছিল, এবং যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে ২০২৩ সালের জানুয়ারির প্রথমার্ধে লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে মিশন পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল।
কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার বিবরণ অনুযায়ী, লন্ডনভিত্তিক প্রচারণা সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (ইআইএ) ২০১৭ সালে চীন, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে ২০০টির বেশি বাঘের খামার শনাক্ত করে, যেগুলোতে আনুমানিক ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার বাঘ ছিল; এই সংখ্যা তখন বনে টিকে থাকা বাঘের দ্বিগুণেরও বেশি।

লাওস হয়ে পাচারের পথ
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী থান হোয়ার বাঘ দুটি লাওস সীমান্তবর্তী হা তিন প্রদেশে এক লাও নাগরিকের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল; এটি ট্রাফিকের বহু বছরের নথিভুক্ত ধারার সঙ্গে মেলে। রামাচন্দ্র ওং ও কানিথা কৃষ্ণস্বামীর লেখা এবং ২০১৯ সালের আগস্টে প্রকাশিত 'স্কিন অ্যান্ড বোনস আনরিজলভড' প্রতিবেদনে ট্রাফিক ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাঘ জব্দের ঘটনা বিশ্লেষণ করে। এতে ৩২টি দেশ ও অঞ্চলে ১ হাজার ১৪২টি জব্দের ঘটনায় ২ হাজার ৩৫৯টি বাঘের হিসাব পাওয়া যায়, অর্থাৎ বছরে গড়ে ১২০টির বেশি বাঘ; আর জব্দের প্রায় ৯৫ শতাংশ ঘটেছে বাঘের বিচরণভূমির দেশগুলোতে।
ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে দেখা যায়, জব্দ হওয়া বাঘের ৩০ শতাংশ বন্দী প্রজনন কেন্দ্র থেকে আসা বলে শনাক্ত হয়েছে। যে ২৩১টি ঘটনার পথের তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলোতে ভিয়েতনামের জন্য উল্লেখ করা পথের প্রায় ৯০ শতাংশই লাওস থেকে বাঘ সরবরাহের দিকে ইঙ্গিত করে। ট্রাফিক জানায়, লাওসে টিকে থাকার মতো বন্য বাঘের জনগোষ্ঠী নেই, তাই ওই বাঘগুলো সম্ভবত বন্দী প্রাণী থেকেই এসেছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালের জুলাইয়ে, ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবসের ঠিক আগে, হ্যানয়ে সাতটি হিমায়িত বাঘের মরদেহ জব্দ করা হয়েছিল।
ট্রাফিকের ২০১৮ সালের মূল্যায়নে ২০০৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ভিয়েতনামে বাঘসংক্রান্ত ৬১টি জব্দের ঘটনা এবং ২০১৬ সালে আরও সাতটি ঘটনার হিসাব দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমের খবর পর্যালোচনা করে সংস্থাটি জানায়, ২০১৭ সালে ভিয়েতনামে জব্দ হয় ১২টি মৃত বাঘ, দুটি জীবিত বাঘ এবং ৪৭ কেজি কাঁচা বাঘের হাড়। ২০১৭ সালের মার্চ-এপ্রিলে ২৫ দিনের এক অনলাইন জরিপে গবেষকেরা ভিয়েতনামি ভাষার ১৮টি প্ল্যাটফর্মে ১৮৭টি বিজ্ঞাপন পান, যেগুলোতে বাঘের ১ হাজার ৯৫টি সামগ্রী বিক্রির প্রস্তাব ছিল; এর বেশির ভাগ নখ, দাঁত ও চামড়ার টুকরা, সঙ্গে ৮ কেজি বাঘের হাড়ের আঠা। গবেষকেরা জানান, অনলাইনে দেওয়া পণ্যগুলো আসল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব ছিল না।
ভিয়েতনামের বাড়িতে আগেও মিলেছে হিমায়িত বাঘ
থান হোয়ার ঘটনাটি ভিয়েতনামের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের বাড়িঘর থেকে হিমায়িত বাঘ জব্দের ধারাবাহিক ঘটনার একটি। ট্রাফিক ২০১০ সালের জুনে জানায়, ২০০৯ সালের অক্টোবরে হ্যানয়ে পরিবেশ পুলিশ মোট ১৩০ কেজি ওজনের দুটি হিমায়িত বাঘের মরদেহ জব্দ করে এবং পাঁচ সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে; আর ২০১০ সালের জুনের শেষ দিকে এনগে আন প্রদেশের পরিবেশ পুলিশ দিয়েন চাউ জেলার এক ব্যক্তির বাড়ি থেকে দুটি হিমায়িত বাঘ, একটি হিমায়িত চিতা এবং বাঘের হাড় বলে সন্দেহ করা প্রায় পাঁচ কেজি হাড় জব্দ করে।
২০১৭ সালের মার্চে তুওই ত্রে নিউজ জানায়, জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের চোরাচালানবিরোধী কর্মকর্তারা স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে মিলে এনগে আন প্রদেশের দিয়েন চাউ জেলার একটি বাড়ির ফ্রিজ থেকে পাঁচটি ইন্দোচীনা বাঘের মরদেহ উদ্ধার করেন; অবৈধ বন্যপ্রাণী বিক্রির একটি চক্রের তদন্তের ধারাবাহিকতায় ওই অভিযান চালানো হয়। প্রতিটি প্রাণীর পেট কেটে ভেতরের অঙ্গ বের করে নেওয়া হয়েছিল, আর কর্মকর্তাদের অনুমান, জীবিত অবস্থায় প্রতিটির ওজন ছিল ১০০ থেকে ১৫০ কেজি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী যে হা তিন প্রদেশে বিক্রেতা মরদেহ দুটি কিনেছিলেন, সেখানেও এমন ঘটনা ঘটেছে। দান চির ইংরেজি সংস্করণ ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট জানায়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হা তিনের হুয়ং সন জেলার একটি বাড়ির ফ্রিজে সাতটি হিমায়িত বাঘশাবক পাওয়া যায়, যেগুলোর প্রতিটির ওজন ৫ থেকে ১০ কেজি; সঙ্গে ছিল ছয়টি হিমায়িত বনরুই ও একটি সেরোর মাথা। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোকটি পুলিশকে বলেছিলেন, তিনি লাওসের বলিখামসাই প্রদেশের একটি বাজারে এক লাও নারীর কাছ থেকে প্রাণীগুলো কিনে ওষুধি মদ তৈরি করে বিক্রির জন্য ফ্রিজে রেখেছিলেন। কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট সাতটি শাবক ধ্বংস করে।
ছবি: Cburnett / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, এএফপি (দ্য পেনিনসুলা, কাতার), তুওই ত্রে নিউজ, ভিয়েতনাম ল ম্যাগাজিন, ভিয়েতনাম টেলিভিশন (ভিটিভি), দান চি, ট্রাফিক, সাইটেস সচিবালয়, কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয় (ফিউচারিটি), ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি, স্মিথসোনিয়ানের ন্যাশনাল জু





মন্তব্য
(০)