অনলাইনে ‘স্পিড’ বা ‘আইশোস্পিড’ নামে পরিচিত মার্কিন ইউটিউবার ও লাইভ স্ট্রিমার ড্যারেন ওয়াটকিন্স জুনিয়র দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের সময় একটি চিতার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামেন। ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি, শনিবার, নিজের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে তিনি দৌড়ের ভিডিওটি প্রকাশ করেন। ২০ বছর বয়সী এই তরুণ দৌড়ের প্রথম মুহূর্তগুলোতে চিতার সমানে সমান ছিলেন, কিন্তু অল্পক্ষণেই চিতাটি এগিয়ে যায় এবং আগে শেষ রেখায় পৌঁছায়। ভিডিও প্রকাশের পরের দিনগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, দৌড় শুরুর আগেই চিতাটি তাঁর পায়ে আঁচড় দেয়, তবু তিনি দৌড় চালিয়ে যান।
কেনিয়ার সংবাদমাধ্যম সিটিজেন ডিজিটাল ৬ জানুয়ারি এই সফরকে আফ্রিকাজুড়ে প্রায় এক মাসের একটি ভ্রমণ হিসেবে বর্ণনা করে, আর চিতার সঙ্গে দৌড় ছিল সেই সফরের অনেক কাণ্ডের একটি। তাঁর প্রতিপক্ষ চিতা স্থলভাগের দ্রুততম প্রাণী, আবার আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এই প্রজাতিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ (ভালনারেবল) তালিকাভুক্ত করেছে।
ভিডিওতে যা দেখা গেছে
ভিডিওটির সঙ্গে লেখা ছিল ‘আই রেসড আ চিতা!’ (আমি চিতার সঙ্গে দৌড়েছি)। সিটিজেন ডিজিটালের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ভিডিওতে স্পিড দর্শকদের বলেন, ‘আজ আমি এই চিতার সঙ্গে দৌড়াব!’ দৌড়ের মাঠে তাঁর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পূর্ণবয়স্ক চিতা।
দৌড় শুরুর আগে চিতাটি হঠাৎ তাঁর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে পায়ে আঁচড় দেয়। সিটিজেন ডিজিটাল লিখেছে, আঁচড়ে তাঁর পায়ে রক্তাক্ত দুটি দাগ পড়ে; ভারতের এনডিটিভির যে প্রতিবেদন জাগো নিউজ ২৪ ৭ জানুয়ারি বাংলায় প্রকাশ করে, তাতে বলা হয়, তাঁর পা থেকে রক্ত বের হতে দেখা যায়। আঘাত পেলেও স্পিড দৌড় চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর দুই প্রতিযোগী শুরুর রেখায় দাঁড়ান। চিতাটিকে রাখা খাঁচার দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণীটি প্রচণ্ড গতিতে সামনে ছুটে যায়। দৌড়বিষয়ক সংবাদ ওয়েবসাইট ম্যারাথন হ্যান্ডবুক ৪ জানুয়ারি লিখেছে, স্পিড দৌড় শুরু করার মুহূর্তেই চিতাটিকে খাঁচা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেটি গতি তুলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এগিয়ে যায়, আর স্পিড পাশে পাশে দৌড়াতে থাকেন। স্পিড সর্বশক্তি দিয়ে দৌড়ান এবং শুরুর অংশে চিতার সমান্তরালে ছিলেন, কিন্তু চিতাটি অনায়াসে এগিয়ে গিয়ে প্রথমে শেষ রেখা পার হয়।
অনলাইনে প্রতিক্রিয়ায় ঠাট্টা আর প্রশংসা দুটোই ছিল। প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, অনেক দর্শক তাঁর সাহস ও প্রাণপণ চেষ্টার প্রশংসা করেন, আবার অনেকে আগে থেকেই নিশ্চিত ফলাফল নিয়ে রসিকতা করেন। দৌড়টি কোথায় ধারণ করা হয়েছিল, কোনো প্রতিবেদনেই সে জায়গার নাম বলা হয়নি।
‘স্পিড ডাজ আফ্রিকা’ সফরের একটি পর্ব
চিতার সঙ্গে এই দৌড় হয়েছিল মহাদেশজুড়ে এক দীর্ঘ সফরের শুরুতে। সিটিজেন ডিজিটাল ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি জানায়, ২০ বছর বয়সী এই ইউটিউবার উৎসবের ছুটির সময়টা কেপটাউন ও জোহানেসবার্গ থেকে সরাসরি স্ট্রিম করে কাটিয়েছেন, এবং সেখানেই চিতার সঙ্গে দৌড়েছেন। পত্রিকাটি সফরটিকে ‘স্পিড ডাজ আফ্রিকা’ নামের ২৮ দিনের একটি ‘আইআরএল’ সফর বলে বর্ণনা করে। আইআরএল মানে ‘ইন রিয়েল লাইফ’, অর্থাৎ কম্পিউটারের সামনে বসে নয়, বাইরের জগতে ঘুরে ঘুরে সরাসরি সম্প্রচার; স্ট্রিমাররা এ ধরনের সম্প্রচারকে এই নামেই ডাকেন।
সিটিজেন ডিজিটালের তথ্য অনুযায়ী, এই সফরে স্পিডের আফ্রিকার ২০টি দেশে যাওয়ার কথা ছিল, যদিও দেশগুলোর ক্রম ও সময় বদলাতে পারে বলে পত্রিকাটি উল্লেখ করে। তালিকায় থাকা দেশগুলো হলো:
- আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, বেনিন, বতসোয়ানা ও মিসর
- এসওয়াতিনি, ইথিওপিয়া, ঘানা, আইভরি কোস্ট ও কেনিয়া
- লাইবেরিয়া, মরক্কো, মোজাম্বিক, নামিবিয়া ও নাইজেরিয়া
- রুয়ান্ডা, সেনেগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে
যে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভিডিওটি ধারণ করা হয়, সেখানে আগের অর্ধশতকে চিতার সংখ্যা বেড়েছে, যা এই প্রতিবেদনের পরের একটি অংশে তুলে ধরা হয়েছে। তালিকার আরও কয়েকটি দেশে, যেমন বতসোয়ানা ও নামিবিয়ায়, বুনো চিতার বাস রয়েছে।
কে এই স্পিড
স্পিডের আসল নাম ড্যারেন ওয়াটকিন্স জুনিয়র, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। সিটিজেন ডিজিটাল জানায়, বাস্কেটবলভিত্তিক ভিডিও গেম ‘এনবিএ টুকে’ খেলার সরাসরি স্ট্রিম দিয়ে তাঁর খ্যাতি শুরু হয়; দর্শকেরা তাঁর খেলার দক্ষতার চেয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া দেখতেই বেশি আসতেন, আর টিকটকে সেই প্রতিক্রিয়ার ছোট ছোট ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ায় জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। তিনি গানও প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে আছে ২০২২ সালের গান ‘ওয়ার্ল্ড কাপ’। ২০২৪ ও ২০২৫, দুই বছরই তিনি স্ট্রিমার অ্যাওয়ার্ডসে ‘স্ট্রিমার অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে ৪ কোটি ৭৩ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছেন, যাঁদের অনেকে তাঁর দুঃসাহসী ও অদ্ভুত চ্যালেঞ্জগুলো দেখার জন্য অপেক্ষা করেন। দ্রুতগামী প্রতিপক্ষের সঙ্গে দৌড় তাঁর এমন চ্যালেঞ্জের একটি হয়ে উঠেছিল। ম্যারাথন হ্যান্ডবুক মনে করিয়ে দেয়, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আরেক ইউটিউবার মিস্টারবিস্ট প্রকাশ্যে স্পিডকে চিতার সঙ্গে দৌড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন; ভারতের দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াও তখন সেই চ্যালেঞ্জের খবর প্রকাশ করে।
চিতা আসলে কত দ্রুত দৌড়ায়
এনডিটিভির প্রতিবেদনে চিতার দৌড়ের গতি ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার বলা হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক পরিমাপে ছবিটা আরও সতর্কভাবে উঠে আসে, আর গতি কীভাবে মাপা হচ্ছে তার ওপর সংখ্যাটি নির্ভর করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জু অ্যান্ড কনজারভেশন বায়োলজি ইনস্টিটিউট বলছে, চিতার সর্বোচ্চ গতি গড়ে ঘণ্টায় ৯৬ থেকে ১১২ কিলোমিটার (৬০ থেকে ৭০ মাইল)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যে, সর্বোচ্চ গতিতে একটি চিতা এক লাফে প্রায় ৭ মিটার এগোয় এবং প্রতি সেকেন্ডে চারটি পদক্ষেপ সম্পন্ন করে; স্থির অবস্থা থেকে মাত্র আড়াই সেকেন্ডে সেটি ঘণ্টায় ৭২ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে পারে।
সবচেয়ে পরিচিত সময় মেপে নেওয়া দৌড়টি এসেছে ১৯৯৭ সালে জার্নাল অব জুলজিতে প্রকাশিত এন. সি. সি. শার্পের একটি গবেষণাপত্র থেকে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক চিতার গতি মাপা হয় সেকেন্ডে ২৯ মিটার; ছুটে আসা অবস্থায় শুরু করে ২০১.২ মিটারের একটি পথে তিনবার দৌড়ের গড় থেকে এই হিসাব পাওয়া যায়। গবেষণাপত্রে একে যেকোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যভাবে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ দৌড়গতি বলা হয়।
বুনো চিতা নিজের মতো করে শিকার ধরার সময় কদাচিৎই এত দ্রুত ছোটে। ২০১৩ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ. এম. উইলসনের নেতৃত্বে একদল গবেষক বতসোয়ানার পাঁচটি বুনো চিতার গলায় নিজেদের নকশা করা কলার পরান, যাতে জিপিএসের সঙ্গে গতিবিধি মাপার সেন্সর যুক্ত ছিল। তাঁরা ৩৬৭টি দৌড় রেকর্ড করেন, যার বেশির ভাগই ছিল শিকারের জন্য। সবচেয়ে দ্রুত দৌড়টি ছিল সেকেন্ডে ২৫.৯ মিটার, অর্থাৎ ঘণ্টায় ৯৩ কিলোমিটার, কিন্তু বেশির ভাগ শিকারে গতি ছিল মাঝারি। নজর কাড়ে প্রাণীগুলোর গতি ও দিক বদলানোর সক্ষমতা: পাশের দিকে ও সামনের দিকে গতি বাড়ানো, গতি কমানো এবং দেহের ওজনের তুলনায় শক্তি উৎপাদনে তারা কোনো স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য মাপা সর্বোচ্চ মানগুলোর কয়েকটি দেখিয়েছে।
স্মিথসোনিয়ান আরও জানায়, শিকারি চিতা সাধারণত শিকারের প্রায় ৯১ মিটারের (১০০ গজ) মধ্যে চুপিসারে এগিয়ে গিয়ে তারপর শেষ দফায় গতি তোলে; তার ধাওয়ার প্রায় অর্ধেক সফল হয়, আর শিকার ধরার পর সেটির শ্বাসনালি চোয়ালে চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে মারে।

দৌড়ের জন্যই গড়া দেহ
স্মিথসোনিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, চিতার দেহ সরু, পা লম্বা, আর নখ ভোঁতা ও আংশিকভাবে ভেতরে গুটিয়ে নেওয়া যায়। লম্বা লেজটি দেহের ভার সামলে দ্রুত মোড় নেওয়ার জন্য হালের মতো কাজ করে। নমনীয় মেরুদণ্ড শক্তিশালী পেছনের পায়ের জন্য স্প্রিংয়ের মতো কাজ করে প্রতিটি পদক্ষেপের দৈর্ঘ্য বাড়ায়, আর বড় নাসারন্ধ্র ও ফুসফুস দ্রুত বাতাস টেনে নেয়, ফলে দৌড়ের সময় শ্বাস নেওয়া সহজ হয়। একটি প্রাপ্তবয়স্ক চিতার ওজন ৩৪ থেকে ৬৪ কিলোগ্রাম, কাঁধ পর্যন্ত উচ্চতা প্রায় ৭৭ সেন্টিমিটার।
বিড়ালগোত্রের এই প্রাণী কেন এত বেশি দ্রুত, তা জানতে ব্রিটেনের রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজের পেনি হাডসন ও সহকর্মীরা ২০১২ সালে জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজিতে প্রকাশিত গবেষণায় প্রায় একই আকার ও গড়নের দৌড়বিদ গ্রেহাউন্ড কুকুরের সঙ্গে চিতার দৌড়ের তুলনা করেন। মাটিতে পড়া বল মাপার যন্ত্র (ফোর্স প্লেট) ও উচ্চগতির ভিডিও ব্যবহার করে তাঁরা দেখেন, একই গতিতে চিতা গ্রেহাউন্ডের চেয়ে কম ঘন ঘন কিন্তু লম্বা পদক্ষেপ ফেলে। কিছু পরীক্ষায় চিতারা গ্রেহাউন্ডের মতোই দ্রুত পা ঘুরিয়েছে, মাত্র ০.২ সেকেন্ডে, ফলে প্রয়োজনে তারা সেকেন্ডে চারটি পর্যন্ত পদক্ষেপ ফেলতে পারে। সেকেন্ডে ১৮ মিটার গতিতে চিতা দেহের ওজনের ৭০ শতাংশ পেছনের পায়ে বহন করেছে, যেখানে গ্রেহাউন্ড বহন করেছে ৬২ শতাংশ; গবেষকদের মতে, এতে জোরে ধাক্কা দিয়ে এগোনোর সময় পিছলে পড়ার ঝুঁকি সম্ভবত কমে।
স্মিথসোনিয়ানের হিসাবে বুনো চিতার গড় আয়ু ৮ থেকে ১০ বছর, আর মানুষের তত্ত্বাবধানে ১২ থেকে ১৫ বছর। ১৮ থেকে ২৩ মাস বয়সে চিতা প্রজননক্ষম হয়; গর্ভকাল প্রায় তিন মাস, আর সাধারণত এক প্রসবে তিন থেকে ছয়টি শাবক জন্মায়।
এর আগে যাঁরা চিতার সঙ্গে দৌড়েছেন
স্বল্প দূরত্বের দৌড়ে কোনো মানুষ চিতার ধারেকাছেও নেই। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, পুরুষদের ১০০ মিটারে সবচেয়ে কম সময়ের রেকর্ডটি জ্যামাইকার উসাইন বোল্টের, ৯.৫৮ সেকেন্ড; ২০০৯ সালের ১৬ আগস্ট জার্মানির বার্লিনে বিশ্ব অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে তিনি এই রেকর্ড গড়েন।
একটি চিতা একই দূরত্ব এর চেয়ে অনেক কম সময়ে পার হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ ২০১২ সালের ২ আগস্ট জানায়, সে বছরের ২০ জুন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের একটি আলোকচিত্র ধারণের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটি চিড়িয়াখানার ১১ বছর বয়সী সারা নামের একটি মাদি চিতা ১০০ মিটার পার হয় ৫.৯৫ সেকেন্ডে, তখন তার গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৯৮ কিলোমিটার। চিড়িয়াখানার ‘ক্যাট অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রাম’-এর সদস্য সারা ২০০৯ সালে ৬.১৩ সেকেন্ডে দৌড়ে আগের সেরা সময়ের রেকর্ড গড়েছিল; তার আগে ২০০১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নিয়ানা নামের একটি পুরুষ চিতা ৬.১৯ সেকেন্ডে এই দূরত্ব পার হয়েছিল। এই দৌড় নথিভুক্ত করার খরচ জুগিয়েছিল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের বড় বিড়াল সংরক্ষণ উদ্যোগ ‘বিগ ক্যাটস ইনিশিয়েটিভ’।
দক্ষিণ আফ্রিকায় এর আগেও তারকা খেলোয়াড় আর চিতার দৌড় হয়েছে। ২০০৭ সালের এপ্রিলে দেশটির জাতীয় রাগবি দল স্প্রিংবকসের উইঙ্গার ব্রায়ান হাবানা ডি ভিল্ড চিতা অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারে, যা অ্যান ভ্যান ডাইক চিতা সেন্টার নামেও পরিচিত, একটি চিতার সঙ্গে ১০০ মিটারের প্রদর্শনী দৌড়ে অংশ নেন। কেন্দ্রটির কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, চিতা ‘বিপন্ন’ শ্রেণিভুক্ত হওয়ার আসন্ন ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতেই এই আয়োজন। ডি ভিল্ড হলো উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে ম্যাগালিসবার্গ পর্বতমালার পাদদেশে, ব্রিটস শহর ও হার্টবিসপুর্ট বাঁধের কাছে অবস্থিত চিতা ও অন্যান্য প্রাণীর একটি আবদ্ধ প্রজনন কেন্দ্র। কেন্দ্রটির বিবরণে বলা হয়, সেতান নামের তিন বছর বয়সী চিতাটি সুপার ফোরটিন রাগবির ‘দ্রুততম খেলোয়াড়’ বলে পরিচিত হাবানাকে অনায়াসে পেছনে ফেলে ছুটে যায়। পরে হাবানা বলেন, তিনি ‘সবসময়ই জানতেন’ যে জেতার কোনো সম্ভাবনা তাঁর নেই; দৌড়ের আগে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা আমাকে নিয়ে নয়। এই মুহূর্তে চিতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর চিতা সংরক্ষণে মনোযোগ দিতে আমার সাধ্যের সবকিছু করব।’
আবাসের বেশির ভাগ হারানো এক ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি
যে গতি চিতাকে দর্শনীয় করে তোলে, তা তাকে রক্ষা করতে পারে না। ২০২১ সালে অ্যানিমেলস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) লাল তালিকায় চিতা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ (ভালনারেবল) হিসেবে তালিকাভুক্ত।
চিতার সবচেয়ে বিস্তারিত বৈশ্বিক গণনাটি ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস (পিএনএএস) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়; এর নেতৃত্বে ছিলেন জুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব জুলজির সারা ডুরান্ট। গবেষণায় বিশ্বে চিতার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার ১০০ বলে অনুমান করা হয়, যারা প্রজাতিটির ঐতিহাসিক বিচরণক্ষেত্রের মাত্র ৯ শতাংশে সীমিত হয়ে পড়েছে। বাকি থাকা বিচরণক্ষেত্রের বেশির ভাগ, ৭৭ শতাংশ, সংরক্ষিত এলাকার বাইরে, যেখানে চিতা নানা হুমকির মুখে থাকে। গবেষকদের মতে, প্রাপ্ত প্রমাণ আইইউসিএনের লাল তালিকায় চিতাকে ‘বিপন্ন’ (এনডেঞ্জারড) শ্রেণিতে তোলার পক্ষে। তাঁরা মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করা বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে চিতা রক্ষার দিকে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর এবং সহাবস্থানে প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বান জানান।
অবৈধ বাণিজ্য এই চাপ আরও বাড়ায়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে কনজারভেশন বায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, আফ্রিকায় ৭ হাজারের কম চিতা টিকে আছে। মানুষের সঙ্গে সংঘাত, আবাসের অবক্ষয় ও শিকারপ্রাণী কমে যাওয়া বড় হুমকি হলেও আফ্রিকার শৃঙ্গ (হর্ন অব আফ্রিকা) অঞ্চলে পোষা প্রাণী হিসেবে জীবিত চিতাশাবকের অবৈধ বাণিজ্যই সম্ভবত সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে বলে গবেষণাটি জানায়। পাচারপথের যে মডেল গবেষকেরা তৈরি করেন, তাতে পূর্ব ইথিওপিয়া ও উত্তর সোমালিয়ার চিতার সঙ্গে আরব উপদ্বীপের ক্রেতাদের যোগসূত্র উঠে আসে।
এশিয়া প্রায় পুরোপুরি চিতা হারিয়েছে। স্মিথসোনিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, এশীয় চিতা এখন কেবল ইরানে টিকে আছে এবং সেটি মহাবিপন্ন। ভারতে প্রশিক্ষিত চিতা দিয়ে শিকার (কোর্সিং), শখের শিকার, অতিরিক্ত শিকার ও আবাস ধ্বংসের কারণে চিতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, আর ১৯৫২ সালে দেশটির সরকার প্রাণীটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। ভারতের সংবাদমাধ্যম ইটিভি ভারত ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এ তথ্য জানায়, যখন পুনঃপ্রবর্তন কর্মসূচি শুরুর জন্য নামিবিয়া থেকে আটটি চিতা, পাঁচটি মাদি ও তিনটি পুরুষ, মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যানে আনা হচ্ছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকার চিতা
স্পিড যে দক্ষিণ আফ্রিকায় দৌড়টি ধারণ করেন, চিতার ক্ষেত্রে দেশটি আশার একটি জায়গা। পরিবেশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মোঙ্গাবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, বিশ্বের প্রায় ৭ হাজার ১০০ চিতার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি দক্ষিণ আফ্রিকায়, যা ১৯৭৫ সালে ছিল প্রায় ৫০০। প্রতিবেশী দেশগুলোর চিত্র ভিন্ন: বতসোয়ানায় সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০-তে স্থির ছিল, নামিবিয়ায় প্রায় ৩ হাজার থেকে কমে মোটামুটি ১ হাজার ৪০০ হয়, আর জিম্বাবুয়েতে ১ হাজার ৫০০ থেকে নেমে আসে প্রায় ১৭০-এ; এসব দেশের বেশির ভাগ চিতা বাস করে বেড়াহীন জমিতে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বেশির ভাগ চিতা জাতীয় উদ্যান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সংরক্ষিত এলাকায় বেড়ার ভেতরে থাকে, যা তাদের খামারিদের সঙ্গে সংঘাত ও অবৈধভাবে ধরা পড়া থেকে রক্ষা করে। ছোট ছোট বেড়াঘেরা দলে অন্তঃপ্রজনন ঠেকাতে দেশটির সংরক্ষণ সংস্থা এনডেঞ্জারড ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট (ইডব্লিউটি) ২০১১ সালে চিতার একটি ‘মেটাপপুলেশন’ প্রকল্প শুরু করে, যেখানে আলাদা আলাদা সংরক্ষিত এলাকার চিতাকে একটি সম্মিলিত জনগোষ্ঠী হিসেবে ব্যবস্থাপনা করা হয় এবং এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় প্রাণী স্থানান্তর করা হয়। শুরুর সময় প্রকল্পে ছিল ৪১টি সংরক্ষিত এলাকার ২১৭টি চিতা; ২০২০ সালে তা দাঁড়ায় ৬০টি এলাকার ৪১৯টি চিতায়, যা দক্ষিণ আফ্রিকার মোট চিতার এক-তৃতীয়াংশের বেশি। প্রকল্পের সমন্বয়ক মোঙ্গাবেকে বলেন, বেড়া একই সঙ্গে ‘আশীর্বাদ ও অভিশাপ’, কারণ তা প্রাণীগুলোকে রক্ষা করলেও তাদের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা দেয়।
দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতের জন্যও চিতার উৎস হয়ে উঠেছে। দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা এসএনিউজ ২০২৩ সালের ২৭ জানুয়ারি জানায়, ভারতে চিতা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারত একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম দফায় ১২টি চিতা বিমানে ভারতে পাঠানোর কথা, যারা ২০২২ সালে নামিবিয়া থেকে আনা আটটি চিতার সঙ্গে যোগ দেবে; এরপর আগামী আট থেকে ১০ বছর প্রতিবছর আরও ১২টি করে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে কর্মসূচিটি সমন্বয় করে বন, মৎস্য ও পরিবেশ বিভাগ, তাদের সঙ্গে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকান ন্যাশনাল বায়োডাইভারসিটি ইনস্টিটিউট, সাউথ আফ্রিকান ন্যাশনাল পার্কস, চিতা রেঞ্জ এক্সপ্যানশন প্রজেক্ট ও ইডব্লিউটি; ভারতের পক্ষে ছিল ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি ও ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া।
আবদ্ধ অবস্থায় থাকা চিতাও এই গল্পের অংশ। অ্যানিমেলস সাময়িকীর ২০২১ সালের পর্যালোচনায় বলা হয়, চিতা সংরক্ষণে বহু দিন ধরেই আবদ্ধ প্রজনন ব্যবহৃত হচ্ছে; উদ্দেশ্য, বেশি জিনগত বৈচিত্র্যসহ সুস্থ প্রাণী জন্মানো, যাদের সংরক্ষিত এলাকায় ছাড়া যায়। পর্যালোচনাটি জানায়, বয়স্ক মাদি চিতার উর্বরতা কম আর অল্পবয়সী মাদি কম মিলিত হয় বলে প্রজনন কঠিন, তবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নেদারল্যান্ডসের প্রজনন কেন্দ্রগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, আবদ্ধ অবস্থায়ও চিতার সফল প্রজনন সম্ভব।

ভাইরাল ভিডিওতে বন্যপ্রাণী: প্রাণিকল্যাণ নিয়ে বিতর্ক
স্পিডের ভিডিওতে চিতাটিকে খাঁচা থেকে ছেড়ে প্রস্তুত করা একটি দৌড়পথে নামানো হয়। ম্যারাথন হ্যান্ডবুক লিখেছে, ভিডিওটি দেখে মনে হয় সেটি একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে, প্রাণী-তত্ত্বাবধায়কদের উপস্থিতিতে ধারণ করা হয়েছে; তবে বন্যপ্রাণী নিয়ে তৈরি কনটেন্ট প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়ে, এবং ক্লিপটি ঘিরে ইনফ্লুয়েন্সারদের নৈতিক সীমা কোথায় টানা উচিত, তা নিয়ে কিছু আলোচনা শুরু হয়। কোনো প্রতিবেদনে চিতাটি আহত হওয়ার কথা বলা হয়নি, আর যে প্রতিষ্ঠানে দৌড়টি হয় তাদের কোনো বক্তব্যও কোনো প্রতিবেদনে আসেনি।
দক্ষিণ আফ্রিকার বন্যপ্রাণী পর্যটন নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা এই বৃহত্তর বিতর্কের কথা লিখেছেন। সিংহশাবক হাতে নিয়ে আদর করতে টাকা দেওয়া পর্যটকদের নিয়ে ২০২৪ সালে অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়, পর্যটকদের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর এমন সংস্পর্শ বিতর্কিত, আর বিতর্কের মূল বিষয় ব্যবহৃত প্রাণীগুলোর কল্যাণ ক্ষুণ্ন হওয়া। গবেষকেরা দক্ষিণ আফ্রিকার সিংহশাবকের সংস্পর্শের সুযোগ দেওয়া তিনটি কেন্দ্রের ৩০০ দর্শনার্থীর ওপর জরিপ চালান: ৩৮ শতাংশ এই বিতর্কের কথা জানতেন, ৬৯ শতাংশ তা সত্ত্বেও অভিজ্ঞতাটি চেয়েছিলেন, আর ৭৪ শতাংশ বলেন, শাবকের সংস্পর্শের সুযোগ না থাকলেও তাঁরা কেন্দ্রগুলোতে যেতেন।
অনলাইন ভিডিও এই বিতর্কের অংশ। ২০২২ সালে অ্যানিমেলস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার অন্তত ১১টি সাফারি পার্কে ধারণ করা, পর্যটকদের সিংহশাবক হাতে নেওয়ার ৪৯টি উন্মুক্ত ইউটিউব ভিডিও বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা প্রতিটি ভিডিওতে মধ্যমায় চারটি করে দুর্বল পরিচর্যার নজির পান, আর ৬১ শতাংশ ভিডিওতে শাবকগুলোর বয়স তিন মাসের কম বলে মনে হয়েছে। দুটি গবেষণাই সিংহ নিয়ে, চিতা নিয়ে নয়।
ছবি: Derek Keats / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (৭ জানুয়ারি ২০২৬, এনডিটিভির বরাতে), এনডিটিভি, সিটিজেন ডিজিটাল (৬ জানুয়ারি ২০২৬), ম্যারাথন হ্যান্ডবুক (৪ জানুয়ারি ২০২৬), স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জু অ্যান্ড কনজারভেশন বায়োলজি ইনস্টিটিউট, জার্নাল অব জুলজি (শার্প, ১৯৯৭), নেচার (উইলসন ও অন্যান্য, ২০১৩), জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজি (হাডসন ও অন্যান্য, ২০১২), গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস, এনবিসি নিউজ (২ আগস্ট ২০১২), ডি ভিল্ড চিতা অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টার, উইকিপিডিয়া, পিএনএএস (ডুরান্ট ও অন্যান্য, ২০১৬), কনজারভেশন বায়োলজি (২০২৪), অ্যানিমেলস (২০২১ ও ২০২২), অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার (২০২৪), ইটিভি ভারত (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২), মোঙ্গাবে (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০), এসএনিউজ (২৭ জানুয়ারি ২০২৩), দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (জুলাই ২০২৫)





মন্তব্য
(০)