চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ফুজিয়ান প্রদেশের উপকূলীয় শহরগুলোতে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানো ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য ১,০১৩ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন চীনা ইউয়ান ঋণ অনুমোদন দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), যা ১৪২ দশমিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর বেইজিং থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ব্যাংকটি এ তথ্য জানায়। ঋণের অর্থ ব্যয় হবে 'ফুজিয়ান কোস্টাল সিটিজ ক্লাইমেট-রেজিলিয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন প্রজেক্ট' নামের প্রকল্পে, যার আওতায় রয়েছে প্রদেশের রাজধানী ফুঝৌ শহর এবং প্রদেশের দক্ষিণে অবস্থিত ইউনশিয়াও কাউন্টি। একই দিন এডিবির বরাত দিয়ে খবরটি প্রকাশ করে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া, আর সেদিন সন্ধ্যায় বাংলা সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ২৪ খবরটি প্রকাশ করে।
ব্যাংকটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের লক্ষ্য ফুঝৌ ও ইউনশিয়াওর ৪৪ লাখ বাসিন্দাকে, যাদের মধ্যে ২১ লাখ ৫০ হাজার নারী, চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলা। এর প্রধান উপায় নগর বন্যার ঝুঁকি কমানো, আর সে কাজের বড় অংশ হবে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে, অর্থাৎ শুধু কংক্রিটের অবকাঠামোর ওপর নির্ভর না করে জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার করে। প্রকল্পের আওতায় ২২০ হেক্টরের বেশি উপকূলীয় জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ আবাসস্থল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা হবে। এসব এলাকা পূর্ব এশীয়-অস্ট্রেলেশীয় ফ্লাইওয়ে বা পরিযায়ী পাখির উড়ানপথে জলচর পাখিদের বিশ্রাম ও খাদ্য সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ বিরতিস্থল।
ঋণের টাকায় কী হবে
২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতে এডিবি প্রকল্পের কাজকে তিন ভাগে ভাগ করে বর্ণনা করে। প্রথম ভাগ বন্যা সুরক্ষা। এর আওতায় নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মানোন্নয়ন করা হবে, ভারী বর্ষণের সময় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য পার্ক ও লেকের উন্নয়ন করা হবে, পরিবেশবান্ধব উপায়ে বাঁধ পুনর্বাসন করা হবে এবং ইউনশিয়াওতে একটি সমন্বিত জরুরি সাড়াদান কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
দ্বিতীয় ভাগ প্রকৃতি। প্রকল্পটি বিপন্ন প্রজাতির আবাসস্থল উন্নত করবে এবং আগ্রাসী উদ্ভিদ প্রজাতি অপসারণ করবে। পাশাপাশি দুই এলাকায় মোট ৬৩০ হেক্টরের বেশি জায়গায় প্রচলিত কৃষি ও জলজ চাষ বা অ্যাকুয়াকালচারকে টেকসই ও বন্যপ্রাণীবান্ধব পদ্ধতিতে রূপান্তর করা হবে।
তৃতীয় ভাগ মানুষ ও প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকটি জানায়, স্মার্ট তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা হবে, যাতে বন্যার ঝুঁকি ও জলাভূমি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা যায়। জ্ঞান বিনিময় ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জলবায়ু অভিযোজন, জলাভূমি ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগে সাড়াদানে সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই প্রকল্প থেকে পাওয়া শিক্ষা চীনের অন্যান্য উপকূলীয় শহর, জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ এলাকা এবং এডিবির অন্যান্য উন্নয়নশীল সদস্য দেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের জন্য এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রকল্পের যুক্তি ব্যাখ্যা করেন। তাঁর ভাষায়, "নগরের জলবায়ু সহনশীলতা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল সম্প্রসারণকে একসঙ্গে যুক্ত করলে কী গুরুত্বপূর্ণ সুফল ও সমন্বয় পাওয়া যায়, প্রকল্পটি তা দেখায়।" তিনি আরও বলেন, "জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আমরা বিপন্ন প্রজাতির আবাসস্থল উন্নত ও সম্প্রসারণ করব, একই সঙ্গে এমন প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান দেব যা ফুঝৌ ও ইউনশিয়াওতে উপকূলীয় ও নগর বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা জোরদার করতে পারে।"
ফুজিয়ানের উপকূল কেন ঝুঁকিতে
ফুজিয়ান চীনের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের প্রদেশ। এর পূর্বে পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণে দক্ষিণ চীন সাগর এবং দক্ষিণ-পূর্বে তাইওয়ান প্রণালী। প্রদেশটির উপকূলরেখা এবড়োখেবড়ো, তাতে অসংখ্য উপসাগর ও দ্বীপ রয়েছে। এখানকার জলবায়ু উপক্রান্তীয়, শীত মৃদু; গ্রীষ্মে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা টাইফুন বা ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে থাকে প্রদেশটি। এখানে বছরে গড়ে ১,৪০০ থেকে ২,০০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।
এডিবি জানায়, ফুজিয়ানের উপকূলীয় এলাকা ক্রমেই বাড়তে থাকা চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে আছে আরও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টি। ব্যাংকটির মতে, এগুলো জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও নগরের জলাবদ্ধতা থেকে মারাত্মক বন্যার হুমকিকে আরও তীব্র করে তুলছে। শহরে ভারী বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে না পারলে রাস্তা ও নিচু এলাকা ডুবে যায়; উপকূলে সেই বৃষ্টির সময়েই যদি জলোচ্ছ্বাস সাগরের পানি ভেতরে ঠেলে দেয়, তবে ক্ষতি আরও বাড়ে। প্রকল্পে নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পানি ধরে রাখার পার্ক এবং পুনরুদ্ধার করা জলাভূমির যে মিশ্রণ রাখা হয়েছে, তার লক্ষ্য এই দুই ধরনের বিপদই সামাল দেওয়া।
ফুঝৌ শহর গড়ে উঠেছে মিন নদীর নিম্নপ্রবাহে। মিন ফুজিয়ানের সবচেয়ে বড় নদী, দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০৫ কিলোমিটার। প্রদেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকার পানি এই নদী দিয়েই নামে। শহর পেরিয়ে নদীটি সাগরে মিশেছে, আর এর বয়ে আনা পলিতেই গড়ে উঠেছে সেই মোহনা, যা এই প্রকল্পে সুরক্ষার আওতায় আসছে। অন্যদিকে ইউনশিয়াও কাউন্টি প্রদেশের অনেক দক্ষিণে, ঝাংজিয়াং নদীর মোহনায়।
নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যা মোকাবিলায় চীনের একটি জাতীয় পদ্ধতিও আগে থেকে চালু ছিল। 'স্পঞ্জ সিটি' বা স্পঞ্জ নগরী নামের এই মডেলকে চীনের স্টেট কাউন্সিল ২০১৪ সালে দেশব্যাপী নগর নির্মাণ নীতি হিসেবে গ্রহণ করে। এই মডেলে শহরগুলোকে শুধু পাইপ ও খালের ওপর নির্ভর না করে পার্ক, সবুজ এলাকা, জলাভূমি ও পানি শোষণে সক্ষম পথঘাট ব্যবহার করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, জমিয়ে রাখা ও মাটিতে শোষণ করানোর কথা বলা হয়। এডিবির বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পার্ক ও লেকও একই ধারণার অনুসারী।

পাখির উড়ানপথে দুই মোহনা
এডিবির বিজ্ঞপ্তিতে প্রকল্পের কেন্দ্রে থাকা দুটি সংরক্ষিত এলাকার নাম বলা হয়েছে: ফুঝৌর মিনজিয়াং নদী মোহনা জাতীয় জলাভূমি সংরক্ষিত এলাকা এবং ইউনশিয়াওর ঝাংজিয়াং নদী মোহনা জাতীয় ম্যানগ্রোভ সংরক্ষিত এলাকা। ব্যাংকটির ভাষ্য, দুটিই পরিযায়ী পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল এবং পূর্ব এশীয়-অস্ট্রেলেশীয় উড়ানপথে পাখিদের শীত কাটানো ও প্রজননের জায়গা। জলাভূমি বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি রামসার কনভেনশনের সাইট তথ্যসেবা অনুযায়ী, দুটি এলাকাই আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি বা রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত।
ফুঝৌর চাংলে জেলায় অবস্থিত ফুজিয়ান মিনজিয়াং নদী মোহনা জলাভূমি ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর রামসার সাইট ঘোষিত হয়; এর আয়তন ২,১০০ হেক্টর। রামসারের নথিতে বলা হয়েছে, এলাকাটির বড় অংশ জোয়ার-ভাটার কাদাচর, যা মিন নদীর বয়ে আনা পলিতে গড়ে উঠেছে, সঙ্গে আছে পূর্ব চীন সাগরের অগভীর সামুদ্রিক জলরাশি। নথি অনুযায়ী, এই সংরক্ষিত এলাকা ২৮টি বিপন্নপ্রায় প্রজাতিকে আশ্রয় দেয় এবং প্রতিবছর ২১৯ প্রজাতির ৫০ হাজারের বেশি স্থায়ী ও শীতকালীন পাখি এখানে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে চামচঠুঁটো বাটান বা স্পুন-বিল্ড স্যান্ডপাইপার এবং চাইনিজ ক্রেস্টেড টার্ন। মহাবিপন্ন চাইনিজ স্টার্জন মাছ এই এলাকা দিয়ে চলাচল করে, আর এর জলজ চাষের পুকুরে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য মাছ চাষ হয়। এলাকাটি টাইফুনপ্রবণ, বছরে প্রায় পাঁচটি টাইফুনের মুখে পড়ে। উপকূলের দিকের ম্যানগ্রোভ বন এসব ঝড়ের আঘাত কমাতে, তীর স্থিতিশীল রাখতে এবং বিরল প্রজাতিকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। নথিতে আগে থেকে চালু ব্যবস্থাপনার মধ্যে আগ্রাসী স্মুথ কর্ডগ্রাস নামের ঘাস দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ এবং ভাসমান আবর্জনা পরিষ্কারের কথা উল্লেখ আছে।
ইউনশিয়াও কাউন্টির ফুজিয়ান ঝাংজিয়াংখৌ জাতীয় ম্যানগ্রোভ প্রকৃতি সংরক্ষিত এলাকা ২০০৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রামসার সাইট ঘোষিত হয়; এর আয়তন ২,৩৫৮ হেক্টর। রামসারের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ঝাংজিয়াং নদীর মোহনায় ম্যানগ্রোভ বনের সঙ্গে রয়েছে জোয়ার-ভাটার কাদাচর ও লবণাক্ত জলাভূমি। সেখানে ম্যানগ্রোভ জলাভূমি ও উপকূলীয় উদ্ভিদ ১৫৪টির বেশি প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। আইইউসিএনের লাল তালিকাভুক্ত প্রজাতির মধ্যে সেখানে রয়েছে চাইনিজ ইগ্রেট বা চীনা বক, সন্ডার্সের গাঙচিল এবং চার প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ: হক্সবিল, লেদারব্যাক, লগারহেড ও অলিভ রিডলে। এ ছাড়া আছে আরও ২৪০ প্রজাতির জলজ প্রাণী ও ২২৪ প্রজাতির সংবহনতন্ত্রযুক্ত উদ্ভিদ। মোহনাটি রেজর ক্ল্যাম জাতীয় ঝিনুক ও গ্রে মালেট মাছের মতো প্রজাতির ডিম ছাড়া ও প্রজননের জায়গা। সারসংক্ষেপে এলাকাটির টাইফুন প্রতিরোধ, উপকূল রক্ষা ও পানি পরিশোধনের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে, এবং উল্লেখ আছে যে স্থানীয় অর্থনীতির জন্য সেখানে জলজ চাষ হয়।
এডিবি জানায়, দুটি এলাকাই অতীতের দূষণ, আবাসস্থলের অবক্ষয় ও খণ্ডিত হয়ে যাওয়া এবং আগ্রাসী প্রজাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাংকটির মতে, এসব সমস্যা জীববৈচিত্র্যকে হুমকিতে ফেলছে, বাস্তুতন্ত্র থেকে মানুষের পাওয়া সেবা কমিয়ে দিচ্ছে এবং আশপাশের এলাকাকে বন্যার প্রতি আরও নাজুক করে তুলছে।
ম্যানগ্রোভ ও একটি আগ্রাসী ঘাস
ম্যানগ্রোভ হলো ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় উপকূলে লবণাক্ত বা আধা-লবণাক্ত পানিতে জন্মানো গাছ ও গুল্ম। ফুজিয়ানের অন্যতম প্রধান ম্যানগ্রোভ প্রজাতি কান্দেলিয়া ওবোভাটা, যা রাইজোফোরেসি পরিবারের সদস্য এবং দক্ষিণ চীন, হংকং, তাইওয়ান, জাপান ও ভিয়েতনামে জন্মে। এর বীজ মাতৃগাছে থাকা অবস্থাতেই অঙ্কুরিত হয়; তিন থেকে ছয় মাস পর চারাটি, যাকে প্রোপাগিউল বলা হয়, পানিতে ঝরে পড়ে এবং কাদায় শিকড় গাড়ার আগে বহু দূর ভেসে যেতে পারে। বাতাসের বেগ কমানো, বালু নিয়ন্ত্রণ ও বাঁধ রক্ষার জন্য প্রজাতিটি ব্যাপকভাবে রোপণ করা হয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২৩ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বে ম্যানগ্রোভ বনের মোট আয়তন ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ হেক্টর। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৬ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ হারিয়ে গেছে, যার একাংশ পূরণ হয়েছে ৩ লাখ ৯৩ হাজার হেক্টর নতুন বিস্তারে; ফলে এই ২০ বছরে নিট ক্ষতি ২ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর। এফএও জানায়, ম্যানগ্রোভ এখনো জলজ চাষ, কৃষি, নগরায়ণ ও অবকাঠামোর জন্য রূপান্তরিত হচ্ছে, আর প্রাকৃতিকভাবে বন সংকুচিত হওয়াও ক্ষতির একটি বড় কারণ, যা অন্তত আংশিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য পরিণতি। বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ এলাকা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়।

এডিবির বিজ্ঞপ্তিতে প্রকল্পে কোন আগ্রাসী উদ্ভিদ অপসারণ করা হবে, তার নাম বলা হয়নি। তবে মিনজিয়াং মোহনার রামসার নথিতে একটির নাম আছে: স্মুথ কর্ডগ্রাস বা স্পার্টিনা অল্টারনিফ্লোরা, যাকে এখন স্পোরোবোলাস অল্টারনিফ্লোরাস নামেও শ্রেণিভুক্ত করা হয়। ঘাসটির আদি নিবাস আমেরিকা মহাদেশের আটলান্টিক উপকূল, কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড থেকে উত্তর আর্জেন্টিনা পর্যন্ত। চীনে উপকূল রক্ষা ও পলি আটকানোর উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সাল থেকে উত্তর আমেরিকার কয়েকটি জায়গার গাছ এনে পরিকল্পিতভাবে এটি লাগানো হয়। পরে তা দশটি প্রদেশ ও হংকংয়ে ৩৪ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যা এই প্রজাতির বিশ্বের সবচেয়ে বড় আগ্রাসন। ঘাসটির ঘন বিস্তার দেশীয় উদ্ভিদকে কোণঠাসা করে এবং খোলা কাদাচর ঢেকে ফেলে; ফলে কাদায় বাস করা ছোট প্রাণীরা হারিয়ে যায় এবং সেগুলো খেয়ে বাঁচা পাখিদের খাবার কমে যায়।

কৃষক, মাছের ঘের ও পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ
দুই সংরক্ষিত এলাকার আশপাশের জমির বড় অংশে চাষাবাদ করেন কৃষক এবং মাছ ও ঝিনুক চাষিরা। প্রকল্পের পরিকল্পনা হলো ৬৩০ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ও জলজ চাষের এলাকাকে টেকসই ও বন্যপ্রাণীবান্ধব পদ্ধতিতে নিয়ে আসা।
এই পরিবর্তনের খরচ জোগাতে এডিবি জানায়, একটি "উদ্ভাবনী পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা" বা ইকো-কমপেনসেশন মেকানিজম চালু করা হবে, যা স্থানীয় কৃষকদের টেকসই পদ্ধতি গ্রহণে আর্থিক প্রণোদনা দেবে, আর জীবিকার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আংশিক অর্থ পরিশোধ ছাড় করা হবে। বিজ্ঞপ্তিতে প্রণোদনার অঙ্ক জানানো হয়নি। জাগো নিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে এই অংশটি প্রচলিত কৃষি ও জলসেচ এবং কৃষকদের মধ্যে অর্থ পুনর্বণ্টন হিসেবে লেখা হয়েছিল; এডিবির নিজের ভাষায় বিষয়টি হলো কৃষি ও জলজ চাষ, এবং জীবিকার উন্নতির সঙ্গে আংশিক অর্থ পরিশোধ ছাড়।
এক বছর আগে ব্যাংকটি একই ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করেছিল। ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর চীনের হুনান প্রদেশের দক্ষিণ দোংতিং হ্রদের জলাভূমি পুনরুদ্ধারে ১৫০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ঋণ অনুমোদনের সময় এডিবি জানায়, সেই প্রকল্পে কৃষকদের পরিবেশবান্ধব কৃষি ও জলজ চাষে উৎসাহ দিতে একটি পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা গড়া হবে। ইকো-ট্যুরিজম এবং হ্রদের নলখাগড়া বাণিজ্যিকভাবে সংগ্রহের মতো আয়ের উৎস থেকে অর্থ জুগিয়ে ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখা হবে বলে তখন জানানো হয়।
পূর্ব এশীয়-অস্ট্রেলেশীয় উড়ানপথ
ফ্লাইওয়ে বা উড়ানপথ হলো পরিযায়ী পাখির একটি দল প্রজননস্থল ও প্রজনন-বহির্ভূত মৌসুমের আবাসের মধ্যে যে পথ ধরে যাতায়াত করে। পূর্ব এশীয়-অস্ট্রেলেশীয় উড়ানপথ রাশিয়া ও আলাস্কার উত্তর মেরু অঞ্চলের প্রজননস্থল থেকে চীন, জাপান, কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০২১ সালের অক্টোবরে উড়ানপথ বিষয়ক কর্মসূচি চালুর সময় এডিবি জানায়, ২১০টির বেশি প্রজাতির ৫ কোটির বেশি পরিযায়ী জলচর পাখি খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য এই উড়ানপথের জলাভূমির ওপর নির্ভর করে, আর প্রায় ২০ কোটি মানুষ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য সেবার জন্য এসব জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল।
ফুজিয়ানের ঋণ অনুমোদনের দুই সপ্তাহ আগে, ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে ব্যাংকটি জানায়, উড়ানপথটি ২২টি দেশজুড়ে বিস্তৃত এবং প্রায় ৫০০ প্রজাতির পাখির আবাস। নিবন্ধে বলা হয়, গত ৩০০ বছরে এই অঞ্চলের ৮৭ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে, ফলে প্রতি পাঁচটি পাখি প্রজাতির একটি ঝুঁকিতে পড়েছে। এডিবি একে বিশ্বের সবচেয়ে হুমকির মুখে থাকা পরিযায়ী পথগুলোর একটি বলে উল্লেখ করে।
বাটান বা স্যান্ডপাইপারের মতো সৈকত পাখিরা পথের ধারে একের পর এক কাদাচরের ওপর নির্ভর করে, যেখানে তারা বিশ্রাম নেয় ও খাবার খেয়ে পরের যাত্রার শক্তি সঞ্চয় করে। রামসার নথিতে মিনজিয়াং মোহনায় যে পাখিদের নাম আছে, তার একটি চামচঠুঁটো বাটান। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাওয়া আট প্রজাতির বাটানের মধ্যেও এটি রয়েছে, আর আট প্রজাতিই পরিযায়ী। বাংলাপিডিয়া এর অনন্য চামচের মতো চ্যাপ্টা ঠোঁটের বর্ণনা দিয়েছে। অর্থাৎ এই ছোট সৈকত পাখিটি মিনজিয়াং মোহনাতেও দেখা যায়, বাংলাদেশেও।
আঞ্চলিক উড়ানপথ উদ্যোগ
এডিবি ২০২১ সালের ১৪ অক্টোবর চীনের কুনমিংয়ে জীববৈচিত্র্য বিষয়ক কনভেনশনের পক্ষগুলোর ১৫তম সম্মেলনের (কপ১৫) একটি আয়োজনে 'রিজিওনাল ফ্লাইওয়ে ইনিশিয়েটিভ' বা আঞ্চলিক উড়ানপথ উদ্যোগ চালু করে। ব্যাংকটি জানায়, পূর্ব এশীয়-অস্ট্রেলেশীয় ফ্লাইওয়ে পার্টনারশিপের সচিবালয়, বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে মিলে তারা ১০ বছরে ৩০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করে উড়ানপথের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জলাভূমি রক্ষা করতে চায়। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অন্তত ৫০টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকার সুরক্ষা ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করা। এলাকাগুলো চিহ্নিত করা ও একটি টেকসই অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ১০ লাখ ডলারের কারিগরি সহায়তা অনুদান দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্যাংকটি জানায়, উদ্যোগটি এডিবির ১১টি উন্নয়নশীল সদস্য দেশে প্রায় ১৫০টি উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জলাভূমি চিহ্নিত করেছে, আর কম্বোডিয়া, চীন ও ফিলিপাইনে পাইলট কাজ চলছে। উদ্যোগটি পাঁচটি বিনিয়োগ মডেলের প্রস্তাব করেছে: আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, টেকসই কৃষি, টেকসই জলজ চাষ, দূষণ প্রতিরোধ ও পানি ব্যবস্থাপনা, এবং ইকো-ট্যুরিজম।
উদ্যোগটির প্রথম ফ্ল্যাগশিপ বা প্রধান বিনিয়োগ ছিল হুনান দক্ষিণ দোংতিং হ্রদ জলাভূমি পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প, যা ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর অনুমোদন পায়। দোংতিং চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির হ্রদ। এডিবির একজন পরিবেশ বিশেষজ্ঞের বর্ণনায়, সেই প্রকল্প সেখানে ১২ হাজার হেক্টর জলাভূমি আবাসস্থল পুনরুদ্ধার করছে। ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতে ফুজিয়ান প্রকল্পকে এই উদ্যোগের আওতায় অনুমোদিত দ্বিতীয় ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প বলা হয় এবং জানানো হয়, এটি চীনের জাতীয় জলবায়ু অঙ্গীকার এবং উপকূল ও জলাভূমি সংরক্ষণের কৌশলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এডিবি একটি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক, যার সদস্য ৬৯টি, তাদের মধ্যে ৫০টি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের।
বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য লক্ষ্যমাত্রা
প্রকল্পের লক্ষ্যগুলো কুনমিং-মন্ট্রিয়েল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর কয়েকটি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে মেলে। জীববৈচিত্র্য বিষয়ক কনভেনশনের (সিবিডি) পক্ষগুলো ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর এই কাঠামো গ্রহণ করে। এর লক্ষ্যমাত্রা ২ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে অবক্ষয়িত স্থলভাগ, অভ্যন্তরীণ জলাশয়, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের অন্তত ৩০ শতাংশকে কার্যকর পুনরুদ্ধারের আওতায় আনতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা ৩ অনুযায়ী, স্থলভাগ, অভ্যন্তরীণ জলাশয়, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক এলাকার অন্তত ৩০ শতাংশ সংরক্ষিত এলাকা ও অন্যান্য এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা ৬-এ আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির প্রভাব দূর করা, কমানো বা প্রশমিত করার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকায় সেগুলো নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করাও রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ১১-তে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান ও বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষের জন্য প্রকৃতির অবদান পুনরুদ্ধার ও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে প্রাকৃতিক বিপদ ও দুর্যোগ থেকে সুরক্ষাও আছে।
লক্ষ্যমাত্রা ৬ বিষয়ে সিবিডি সচিবালয়ের নির্দেশিকায় আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতিকে জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান প্রত্যক্ষ কারণগুলোর একটি বলা হয়েছে। এগুলো দেশীয় প্রজাতির সঙ্গে খাদ্য ও জায়গা নিয়ে প্রতিযোগিতা করে, সরাসরি শিকার করে বা রোগজীবাণু ছড়ায় এবং বাস্তুতন্ত্রের গঠন বদলে দেয়। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানকে সংজ্ঞায়িত করেছে এমন পদক্ষেপ হিসেবে, যা প্রাকৃতিক বা পরিবর্তিত বাস্তুতন্ত্র রক্ষা, টেকসই ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সামাজিক চ্যালেঞ্জ কার্যকর ও নমনীয়ভাবে মোকাবিলা করে এবং একই সঙ্গে মানুষের কল্যাণ ও জীববৈচিত্র্যের উপকার করে। ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এর একটি পরিচিত দৃষ্টান্ত: ম্যানগ্রোভ উপকূলীয় জনবসতিতে ঢেউ ও বাতাসের আঘাত কমায়, কার্বন ধরে রাখে, মাছের পোনার আশ্রয় দেয় এবং উপকূলের ভাঙন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
এডিবি জানায়, ফুজিয়ান প্রকল্প জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জনকল্যাণমূলক লক্ষ্যে অবদান রাখবে।
ছবি: Qgg / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ২৪, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (২০২১ সালের ১৪ অক্টোবর, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর ও ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বরের নিবন্ধ), রামসার সাইটস ইনফরমেশন সার্ভিস, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), জীববৈচিত্র্য বিষয়ক কনভেনশন, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)