২০২৬ সালের জুনে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নে ২৬ নম্বর শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পেছনের সংরক্ষিত বনে একটি ইটের বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ নিয়ে আপত্তি ওঠে। দেয়ালটির উচ্চতা ৫ মিটার, দৈর্ঘ্য ১৩৭ মিটার। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের ভাষ্য, জায়গাটি বন্যহাতিসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং বন্যহাতির চলাচলের করিডোর। দৈনিক ইত্তেফাক ২১ জুন এবং জাগো নিউজ ২৪ ২৩ জুন বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
দুই প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মাধ্যমে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়ন করছিল। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে তোলার অংশ হিসেবেই এই অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছিল। ইত্তেফাক স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানায়, প্রায় দুই মাস ধরে বনের ভেতরে দেয়ালটির কাজ চলছিল। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বলেন, এ কাজের জন্য বন অধিদপ্তরের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার বলেন, ক্যাম্পের বর্জ্যের আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও আশঙ্কা
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেয়াল নির্মাণের কারণে বনভূমির গাছপালা উজাড় হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, এতে বন্যহাতি, বানর, শিয়াল, সরীসৃপ ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখিসহ বহু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জায়গাটি বন্যহাতির চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হওয়ায় দেয়ালের কারণে হাতির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে, আর তাতে লোকালয়ে হাতির প্রবেশ ও মানুষ-হাতি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে তাঁরা উদ্বেগ জানান। বনাঞ্চলে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের ফলে বন উজাড়, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা করেন।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী মোহাম্মদ তৈয়ব উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘শালবাগান বন উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, যা দীর্ঘদিন ধরে বন্যহাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। এই বনটি হাতির চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু বনের ভেতরে ইটের বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, দেয়ালের কারণে হাতির চলাচলের পথ আরও সীমিত হয়ে পড়বে। এতে লোকালয়ে হাতির প্রবেশ বাড়তে পারে এবং মানুষ-হাতি সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়বে। তাঁর মতে, বনভূমির গাছপালা ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ধ্বংস হওয়ায় ছোট-বড় বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়ছে, আর এ ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য বড় হুমকি।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন বলেন, রোহিঙ্গারা এ দেশে আশ্রয় নেওয়ার পর পাহাড়, বনভূমি, সাধারণ মানুষের চাষের জমি ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যসহ বহু স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইত্তেফাককে তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের বর্জ্য ফেলার জন্য আবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে তোলায় বন ও বনের প্রাণী ধ্বংস হবে এবং হাতি চলাচলের করিডোর বন্ধ হয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
বন বিভাগ ও শরণার্থী কমিশনারের বক্তব্য
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘টেকনাফের শালবাগান ২৬ নম্বর ক্যাম্প সংলগ্ন বনভূমির মধ্যে ইউএনডিপির পক্ষ থেকে ঠিকাদার বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণকাজ করছে। তবে এ কাজের জন্য বন অধিদপ্তর থেকে কোনো ধরনের অনুমতি নেওয়া হয়নি।’
ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে এই বন কর্মকর্তা ব্যাখ্যা দেন, এলাকাটি ক্যাম্প এলাকার আওতাভুক্ত হওয়ায় শরণার্থী কমিশনার কার্যালয় থেকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগ শরণার্থী কমিশনার কার্যালয়ে চিঠি দিয়ে কাজ বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছিল, কিন্তু এরপরও নির্মাণকাজ চলছিল বলে তিনি জানান। তাঁর ভাষ্য, বনটি বন্যহাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ করিডোর; এখানে স্থায়ী বাউন্ডারি দেয়াল হলে বনাঞ্চলের পরিবেশ, বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল ও আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে এবং এর যথাযথ ব্যবস্থাপনা না হলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে তিনি স্বীকার করেন, বনের ভেতরে দেয়াল নির্মাণ আদর্শ সমাধান নয়; একইভাবে বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকাও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
দুটি প্রতিবেদনের কোনোটিতেই ইউএনডিপি বা কাজটি করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য ছিল না। দেয়ালটি নিয়ে কোনো সরকারি তদন্ত বা সিদ্ধান্তের কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।
শালবাগান, হ্নীলা ও টেকনাফের পাহাড়ি বন
টেকনাফ কক্সবাজার জেলার একটি উপজেলা এবং মূল ভূখণ্ডে বাংলাদেশের সবচেয়ে দক্ষিণের অংশ। এর পূর্ব সীমা দিয়ে বয়ে গেছে নাফ নদী, যার ওপারে মিয়ানমারের মংডু শহর। উইকিপিডিয়ায় উদ্ধৃত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার আয়তন ৩৮৮.৬৬ বর্গকিলোমিটার এবং ২০২২ সালের জনশুমারিতে এখানকার জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৫। উপজেলাটি টেকনাফ পৌরসভা এবং বাহারছড়া, হ্নীলা, সাবরাং, সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ সদর ও হোয়াইক্যং, এই ছয়টি ইউনিয়নে বিভক্ত। শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পটি হ্নীলা ইউনিয়নে।
টেকনাফ উপদ্বীপের পাহাড়ি বনের বড় অংশ টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এর আয়তন ১১ হাজার ৬১৫ হেক্টর; পূর্বে নাফ নদী, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) (সংশোধন) আইন, ১৯৭৪-এর অধীনে বনটিকে গেম রিজার্ভ ঘোষণা করা হয়েছিল; তখন এর নাম ছিল টেকনাফ গেম রিজার্ভ। অভয়ারণ্যটি বাহারছড়া, হ্নীলা, সাবরাং, টেকনাফ সদর ও হোয়াইক্যং, এই পাঁচ ইউনিয়নজুড়ে বিস্তৃত। বন অধিদপ্তরের পুরোনো ইকোট্যুরিজম তথ্যের বরাতে উইকিপিডিয়া জানায়, দেশে যে অল্প কয়েকটি জায়গায় বুনো অবস্থায় এশীয় হাতি দেখা যায়, এটি তার একটি। কুদুম গুহা, নিতং পাহাড় ও কুঠি পাহাড় এই বনের পরিচিত স্থান।
প্রতিবেদন দুটিতে দেয়ালের জায়গাটিকে ‘সংরক্ষিত বন’ বলা হয়েছে; জায়গাটি অভয়ারণ্যের সীমানার ভেতরে কি না, তা সেখানে বলা হয়নি। ইত্তেফাক স্থানীয় সূত্রের বরাতে শালবাগান বনকে ‘বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত’ বন বলে উল্লেখ করেছে।

এশীয় হাতি: বিশ্বে বিপন্ন, বাংলাদেশে মহাবিপন্ন
এশীয় হাতি (Elephas maximus) এশিয়ার সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী। ১৯৮৬ সাল থেকে আইইউসিএনের লাল তালিকায় প্রজাতিটি ‘বিপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত, কারণ গত তিন প্রজন্মে, অর্থাৎ প্রায় ৬০ থেকে ৭৫ বছরে, এর সংখ্যা অন্তত ৫০ শতাংশ কমেছে। প্রধান হুমকি আবাসস্থল হারানো, আবাসস্থলের অবক্ষয় ও খণ্ডিত হয়ে যাওয়া এবং শিকার। ২০২৬ সালের মে মাসে মোঙ্গাবের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৫২ হাজার বুনো এশীয় হাতি ১৩টি দেশে টিকে আছে।
বাংলাদেশে আইইউসিএন প্রজাতিটিকে ‘মহাবিপন্ন’ ঘোষণা করেছে। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৬ সালের জরিপে দেশে মাত্র ২৬৮টি আবাসিক হাতি পাওয়া যায়, যাদের সবাই দক্ষিণ-পূর্বের বনাঞ্চলে। মোঙ্গাবে জানায়, সর্বশেষ এই গণনা হয়েছিল ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে; ২০২৬ সালের মে মাসে বন অধিদপ্তরের হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের নেতৃত্বে থাকা বন সংরক্ষক এ এস এম জহির উদ্দিন আকন বলেন, বর্তমান সংখ্যা তাঁদের জানা নেই এবং নতুন গণনার পরিকল্পনা আছে।
হাতির খাবার ও পানির চাহিদা বিপুল। মোঙ্গাবের ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি এশীয় হাতি দিনে সাধারণত ১৫০ কেজির বেশি উদ্ভিদ খায় এবং প্রায় ১৪০ লিটার পানি পান করে। মাদি হাতি ও বাচ্চারা দল বেঁধে চলে, আর পুরুষ হাতি কৈশোরে দল ছেড়ে যায়। হাতির গর্ভকাল ১৮ থেকে ২২ মাস; সাধারণত একটি বাচ্চা হয় এবং দুই প্রসবের মাঝে চার থেকে পাঁচ বছরের ব্যবধান থাকে। ফলে হাতির সংখ্যা একবার কমলে তা ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগে।
হাতি এক জায়গায় থাকে না; বনের এক অংশ থেকে আরেক অংশে যায় বনঘেরা পথ ধরে, যাকে করিডোর বলা হয়। পথে খামার, বসতি বা স্থাপনা পড়লে মানুষের সঙ্গে সংঘাত বাধে এবং দুই পক্ষেরই প্রাণ ঝুঁকিতে পড়ে। আইইউসিএন ২০১৬ সালের জরিপে দেশে ১২টি হাতি করিডোর চিহ্নিত করে। মোঙ্গাবের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, এর মধ্যে একটি করিডোর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির নির্মাণের কারণে হারিয়ে গেছে, এবং বাকি ১১টি করিডোর গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে বন অধিদপ্তর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে।
একই প্রতিবেদনে বন অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ও আইইউসিএন বাংলাদেশের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ইশতিয়াক উদ্দিন আহমদ প্রশ্ন তোলেন, বন ও হাতি করিডোরে কংক্রিটের স্থাপনা হলে হাতি চলবে কীভাবে। তাঁর মতে, হাতি এক জায়গায় থাকে না, করিডোর ধরে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যায়, তাই তাদের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে হবে।

রোহিঙ্গা শিবির ও উখিয়া-টেকনাফের হাতি
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে সহিংসতার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো বন বিভাগের বরাতে জানায়, উখিয়া ও টেকনাফে ৭ হাজার একর বনভূমিতে ৩৪টি রোহিঙ্গা শিবির গড়ে উঠেছে। এতে পাঁচটি হাতি করিডোর ও ১৫টির বেশি জলাধার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং এই বনাঞ্চলের ৬০টির বেশি হাতি তীব্র খাদ্য ও পানির সংকটে পড়েছে। জ্বালানির চাহিদা মেটাতে আরও ১ হাজার ৮৩৭ একর বন ধ্বংস হয়েছে বলেও বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান।
প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন বিভাগের হিসাবে কক্সবাজারে আটটি হাতি করিডোর আছে, যার পাঁচটি উখিয়া ও টেকনাফে। শিবির নির্মাণের কারণে উখিয়ার কুতুপালংয়ের তিনটি করিডোর সাত বছর ধরে বন্ধ, আর ঘুমধুম সীমান্তে মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়ার কারণে বন্ধ হয়েছে দুটি। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের টেকনাফ-উখিয়া সার্কেলের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মনিরুল ইসলাম তখন জানান, কক্সবাজারে হাতির সংখ্যা ২০৩, যার ২৫টি বাচ্চা; এর মধ্যে ৩৭টি টেকনাফের বনে এবং ৩০টি উখিয়ার বনে থাকে। শিবিরের কারণে টেকনাফের হাতি উখিয়ার দিকে এবং উখিয়ার হাতি টেকনাফের দিকে যেতে পারছে না বলে তিনি জানান।
একই প্রতিবেদনে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ্দৌজা বলেন, শিবিরের কারণে উখিয়া-টেকনাফের বনে এশীয় হাতির অবস্থা সংকটাপন্ন। তবে তাঁর ভাষ্য, হাতি চলাচলের জন্য শিবিরের বাইরে বিকল্প পথ তৈরি করা হয়েছে এবং মানুষ-হাতি সংঘাত কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে আইইউসিএন ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হাতির আক্রমণে ১২ জন রোহিঙ্গাসহ ২৩ জন মারা যান এবং শিবিরের আশপাশে ৩৭৫ বার হাতি ঢোকার ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
এই পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালের মার্চে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আইইউসিএন কুতুপালং শিবিরে হাতির আক্রমণে মৃত্যু ঠেকাতে একটি কর্মপরিকল্পনা নেয়। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত শিবিরে শিশুসহ অন্তত ১০ জন শরণার্থী হাতির আক্রমণে মারা গিয়েছিলেন। পরিকল্পনায় শিবিরের চারপাশে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বসানো, হাতি ঢুকলে সতর্ক করতে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন, হাতির পথ ও করিডোর চিহ্নিত করা এবং সচেতনতা কার্যক্রমের কথা বলা হয়।
টেকনাফেও হাতির আক্রমণে প্রাণহানি ঘটেছে। ২০২০ সালের ১০ জুলাই বাংলা ট্রিবিউন জানায়, লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন পাহাড়ে বন্যহাতির আক্রমণে এক রোহিঙ্গা নারী মারা যান; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হিসাবে তার আগের তিন বছরে হাতির আক্রমণে ১৪ জন রোহিঙ্গাসহ ২২ জনের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন। বন বিভাগের টেকনাফ রেঞ্জ কর্মকর্তা সৈয়দ আশিক আহমেদ তখন বলেন, পাহাড়ি এলাকার গাছপালা কেটে ঘর তোলায় বাসস্থান ও খাবারের সংকটে পড়া হাতির দল বিভিন্ন সময় লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।
দেশজুড়ে হাতির মৃত্যু ও মানুষের প্রাণহানি
হাতি ও মানুষের সংঘাত কক্সবাজারের বাইরেও বেড়েছে। ২০২৬ সালের ৭ মে মোঙ্গাবে বন অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যের বরাতে জানায়, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে আবাসিক, অনাবাসিক ও পোষা মিলিয়ে অন্তত ১৪৮টি হাতি মারা পড়েছে; ২০২৬ সালের তিনটি মৃত্যু মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫১। গবেষকেরা এর কারণ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্বে সরকারি-বেসরকারি অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং উত্তর-পূর্বে সীমান্তের বেড়াকে চিহ্নিত করেন। যেমন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ১০৩ কিলোমিটার রেলপথের ২৭ কিলোমিটার চুনতি ও ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে গেছে, যেখানে দেশের আবাসিক হাতির প্রায় অর্ধেকের বাস।
প্রথম আলোর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের এক বছরে সাতটি হাতি মারা যায়, যার দুটি টেকনাফে, তিনটি রামুতে এবং দুটি ঈদগাঁও ও চকরিয়ায়; মৃত্যুর কারণ ছিল মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদ, গুলি, দুর্ঘটনা ও রোগ। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী আগের ছয় বছরে হাতির আক্রমণে ১৩৫ জন মানুষ মারা গেছেন, আর হাতি হত্যার ১৬টি মামলার একটিরও নিষ্পত্তি হয়নি। কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগ জানায়, তিন বছরে প্রায় এক কিলোমিটার করে লম্বা ৫২টি বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদ সরানো হয়েছে।
সংরক্ষণে সরকার ২০১৮ সালে ১০ বছর মেয়াদি হাতি সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের আওতায় বন অধিদপ্তর আইইউসিএন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংস্থাকে নিয়ে সংঘাতপ্রবণ এলাকায় স্থানীয় মানুষদের নিয়ে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করে। বন্যপ্রাণীর আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ২০১০ সালে ক্ষতিপূরণ চালু হয়; ২০২১ সালে তা বাড়িয়ে নিহতের পরিবারকে ১ লাখের বদলে ৩ লাখ টাকা, আহতকে ৫০ হাজারের বদলে ১ লাখ টাকা এবং ঘরের জিনিস ও ফসলের ক্ষতিতে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞানের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান মোঙ্গাবেকে বলেন, রেসপন্স টিমের সংখ্যা কম এবং সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবী হওয়ায় উদ্যোগটি পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না।

সংরক্ষিত বন ও বন্যপ্রাণী নিয়ে আইনে যা আছে
সংরক্ষিত বনে কী করা যাবে না, তা ঠিক করে দেয় বন আইন, ১৯২৭-এর ২৬ ধারা, যা ১৯৯০ ও ২০০০ সালে সংশোধিত হয়। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) আইন সংগ্রহে রাখা সংশোধিত পাঠ অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনে কেউ নিচের কাজগুলো করলে তা দণ্ডনীয়:
- কোনো গাছ কাটা, ছাঁটা, পোড়ানো, বাকল বা পাতা ছাড়ানো বা অন্যভাবে গাছের ক্ষতি করা;
- চাষ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জমি পরিষ্কার করা বা ভাঙা;
- সংরক্ষিত বন থেকে কাঠ সরানো বা ধারা ৫-এ নিষিদ্ধ নতুন জমি পরিষ্কার করা।
এসব অপরাধে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে, সঙ্গে আদালত বনের ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিতে পারেন। একই ধারায় বলা আছে, বন কর্মকর্তার লিখিত অনুমতি নিয়ে বা সরকারের প্রণীত বিধির অধীনে করা কাজ এই নিষেধের আওতায় পড়ে না। এ কারণেই সংরক্ষিত বনে কোনো কাজের ক্ষেত্রে বন বিভাগের অনুমতির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে শালবাগানের দেয়ালটি আইন ভেঙেছে কি না, সে বিষয়ে কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনগুলোতে ছিল না।
দেশের বন্যপ্রাণী সুরক্ষার আইনি কাঠামো তখন সদ্য বদলেছিল। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর জায়গায় ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা অধ্যাদেশ’ অনুমোদন করে; বিডিনিউজ২৪ জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাদেশটি জারি হয়, আর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১৪ এপ্রিল ২০২৬ জানায়, এটি সংসদে পাস হয়ে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় বাঘ ও হাতি তফসিল-১(ক)-তে রাখা হয়, আর অধ্যাদেশের ৪৬ ধারায় তফসিল-১-এর (ক) ও (খ) ভাগের প্রাণী হত্যাকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ করা হয়; আমলযোগ্য অপরাধে বন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতে পারেন।
ক্যাম্পের বর্জ্য সমস্যা ও ইউএনডিপির বর্জ্য প্রকল্প
দেয়ালটি যে সমস্যার সমাধানে তৈরি হচ্ছিল, সেই বর্জ্য সমস্যা পুরোনো। ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর প্রথম আলো জানায়, ইউএনডিপি সুইডেন সরকারের সঙ্গে মিলে কক্সবাজারে টেকসই কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর জন্য ৪৮ লাখ মার্কিন ডলারের তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প শুরু করে, যার নাম ছিল ‘সাসটেইনেবল সলিউশনস টু সলিড ওয়েস্ট: আ লোকাল রেসপন্স টু দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস’। প্রকল্পের উদ্বোধনী সভায় বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা আগমনের ফলে উখিয়া ও টেকনাফের জনসংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে এবং এই ঘন জনসংখ্যা মাসে ১০ হাজার টন বর্জ্য তৈরি করছে। তখনকার শরণার্থী কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেছিলেন, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ ও প্রতিদিনের বিপুল বর্জ্যের কারণে কক্সবাজারে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন জরুরি প্রয়োজন।
ইউএনডিপি বাংলাদেশের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থাটি ২০১৮ সালে ক্যাম্প ২০ এক্সটেনশনে শিবির এলাকার প্রথম স্যানিটারি ল্যান্ডফিল স্থাপন করে। ৪০ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতার এই ল্যান্ডফিল সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৪৭০ টন বর্জ্য রাখতে পারে এবং ৩৩টি ক্যাম্প থেকে দিনে ১২ থেকে ১৫ টন বর্জ্য প্রক্রিয়া করে। এনজিও ব্র্যাক এর পরিচালনায় যুক্ত। প্রথম ল্যান্ডফিল ভরে আসায় পাশেই ৬০ হাজার ঘনমিটারের দ্বিতীয় ল্যান্ডফিল নির্মাণ করছিল ইউএনডিপি, আর পলিথিন সামলাতে বদ্ধ চুল্লিতে পোড়ানো ও পুনর্ব্যবহারের মতো উপায়ও তারা খুঁজছিল। প্রকল্পটিতে ৪৫ জনের বেশি রোহিঙ্গা দৈনিক মজুরিতে কাজ পান।
২০২৬ সালের জুনের প্রতিবেদনগুলো শালবাগানের দেয়ালকে টেকনাফে একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ফলে বিষয়টি দুই প্রয়োজনের টানাপোড়েনে দাঁড়ায়: ক্যাম্পের বর্জ্য সামলানো, যাকে শরণার্থী কমিশনার জরুরি বলেছেন, আর সংরক্ষিত বন ও হাতি চলাচলের পথ রক্ষা, যার দায়িত্ব বন বিভাগের এবং যেখানে কাজের জন্য তাদের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ছবি: Masum-al-Hasan Rocky / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, মোঙ্গাবে, বাংলা ট্রিবিউন, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইউএনডিপি বাংলাদেশ, ইউএনওডিসি (বন আইন, ১৯২৭), উইকিপিডিয়া, বিডিনিউজ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড





মন্তব্য
(০)