বক ও বুনোহাঁস জবাই করে খাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের অভিযোগে রাজশাহীতে দুই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আল-আমিন সোহাগ ও তুলির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি, সোমবার। রাজশাহী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এ মামলাটি করেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, রাজশাহীর বন্যপ্রাণী পরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবির। সেদিনই জাগো নিউজ খবরটি প্রকাশ করে।
মামলায় যা বলা হয়েছে
মামলার বিবরণীতে বলা হয়, দুই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর কানিবক ও পাতি সরালি নামের দুই প্রজাতির পাখি জবাই করে রোস্ট করে খাওয়ার ৩৩ সেকেন্ড ও ৫৪ সেকেন্ডের দুটি ভিডিও প্রকাশ করেন। বিবরণীতে পাখি দুটিকে অতিথি পাখি বলা হয়েছে। ভিডিওর বিষয়ে জানার পর বন্যপ্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির প্রমাণ সংগ্রহ করে আদালতে মামলাটি করেন।
জাহাঙ্গীর কবির জাগো নিউজকে জানান, আদালত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আইন অনুযায়ী তাদের বিচারকার্য চলবে এবং আমরা সর্বোচ্চ সাজা আশা করছি।’ প্রতিবেদনে অভিযুক্ত দুজনের কোনো বক্তব্য ছিল না। এর আগে জানুয়ারিতে জাগো নিউজ মুঠোফোনে কয়েক দফা চেষ্টা করেও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।
জাগো নিউজ ও ঢাকা পোস্টের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি ভিডিওতে আল-আমিনকে কয়েকটি বক হাতে নিয়ে বলতে দেখা যায়, বাসায় বিশেষ অতিথিদের জন্য বকের রোস্ট হবে। অন্য ভিডিওতে তুলিকে মুরগির ঘর থেকে পা বাঁধা একটি বুনোহাঁস বের করে বলতে দেখা যায়, তাঁর বাবা বিল থেকে হাঁসটি ধরে এনেছেন।
জানুয়ারি থেকে বন বিভাগের খোঁজ
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভিডিও দুটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ১৩ জানুয়ারি রাজশাহীর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস) রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে দুজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, ভিডিওগুলো পরিযায়ী পাখি ধরা ও খাওয়ায় প্ররোচনা দিচ্ছে, যা বন্যপ্রাণী আইনের লঙ্ঘন। সংগঠনটি নগরজুড়ে পাখির বিচরণস্থল ও আবাসস্থল সংরক্ষিত ঘোষণা করে সেখানে আলো ও শব্দদূষণ রোধেরও দাবি জানায়।
১৪ জানুয়ারি জাহাঙ্গীর কবির জাগো নিউজকে বলেছিলেন, ‘আমরা দুটি ভিডিও পেয়েছি। শুধু ভিডিও আছে তাদের নাম বা ঠিকানা নেই।’ ১৬ জানুয়ারি ঢাকা পোস্টকে তিনি জানান, ‘তবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। মামলার প্রস্তুতি চলছে।’

কানিবক ও পাতি সরালি কোন পাখি
কানিবক (ইংরেজিতে Indian pond heron, বৈজ্ঞানিক নাম Ardeola grayii) ছোট আকারের একটি বক। দক্ষিণ ইরান থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত এরা প্রজনন করে। পাখিটি বিস্তৃত এলাকায় দেখা যায় এবং সংখ্যায় সুলভ; ছোট জলাশয়ের কিনারে চুপচাপ শিকার খোঁজে, লোকালয়ের কাছেও রাত কাটায়।

পাতি সরালি (Lesser whistling duck, Dendrocygna javanica) সরালি গোত্রের এক প্রজাতির হাঁস, যা ছোট সরালি বা গেছো হাঁস নামেও পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এরা প্রজনন করে; বাংলাদেশেও দেখা যায়। এরা রাতে খাবার খোঁজে, দিনে দল বেঁধে হ্রদ ও ভেজা ধানখেতের আশপাশে থাকে। গাছে বসতে পারে, কখনো গাছের কোটরে বাসা বাঁধে। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত শ্রেণিতে রেখেছে।

বন্যপ্রাণী আইনে পাখি হত্যার শাস্তি
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী রক্ষার মূল আইন বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২। এর ৩৮(১) ধারা অনুযায়ী, আইনের তফসিল ১ ও ২-এ উল্লিখিত কোনো পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা করলে সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে; একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।
৩৮(২) ধারায় বলা আছে, এসব পাখির ট্রফি, মাংস বা দেহের অংশ সংগ্রহ, দখলে রাখা, কেনাবেচা বা পরিবহন করলে সর্বোচ্চ ৬ মাস কারাদণ্ড বা ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড; পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। আইনের ৪৪ ধারা অনুযায়ী, ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত এই আইনের অপরাধ বিচারের জন্য গ্রহণ করে না, আর এসব অপরাধের বিচার করেন প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। রাজশাহীর মামলাটি আইনের কোন ধারায় হয়েছে, জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তা উল্লেখ ছিল না।
ছবি: Tareq Uddin Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা পোস্ট, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ (বাংলাদেশ আইন ও বিচার বিভাগের আইন ওয়েবসাইট), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)