২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলা সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক লালশাক দিয়ে মুরগির মাংস রান্নার একটি ঘরোয়া রেসিপি প্রকাশ করে। লালশাক বাংলাদেশের রান্নাঘরের সবচেয়ে পরিচিত শাকগুলোর একটি। রেসিপির ভূমিকায় বলা হয়, বাংলার রান্নাঘরে শাক আর মাংসের মেলবন্ধন নতুন কিছু নয়, তবে লালশাক দিয়ে মুরগির পদ এখনো অনেকের কাছে একটু ভিন্নধর্মী। প্রতিদিনের একঘেয়ে ঝোল বা ভুনার বাইরে স্বাদে বৈচিত্র্য আনার জন্য পদটি সেখানে তুলে ধরা হয়।
লেখায় লালশাককে আয়রন ও ভিটামিনে ভরপুর এবং মুরগির মাংসকে প্রোটিনসমৃদ্ধ বলা হয়। দুইয়ের মিশেলে এমন একটি পদ তৈরি হয়, যা স্বাস্থ্যকর এবং ভাতের সঙ্গে খেতে দারুণ; উপকরণও সহজ, রান্নার কায়দাও ঘরোয়া। এই প্রতিবেদনে জাগো নিউজের প্রকাশিত রেসিপিটি হুবহু ধাপে ধাপে দেওয়া হলো। সঙ্গে হাঁড়িতে যা যায়, সে সম্পর্কে জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ), যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) এবং পিয়ার-রিভিউড গবেষণা কী বলে, তা-ও তুলে ধরা হলো।
প্রকাশিত রেসিপির উপকরণ
মূল রেসিপিতে ৫০০ গ্রাম মুরগির মাংসের জন্য নিচের উপকরণগুলো দেওয়া হয়েছে। যেখানে "স্বাদমতো" বা "পরিমাণমতো" লেখা, সেখানে পরিমাণ রাঁধুনির বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
- মুরগির মাংস: ৫০০ গ্রাম
- লালশাক: ১ আঁটি
- পেঁয়াজ কুচি: আধা কাপ
- রসুন কুচি: ১ টেবিল চামচ
- আদা বাটা: ১ চা চামচ
- রসুন বাটা: ১ চা চামচ
- কাঁচা মরিচ: স্বাদমতো
- হলুদ গুঁড়া: আধা চা চামচ
- মরিচ গুঁড়া: ১ চা চামচ
- ধনিয়া গুঁড়া: ১ চা চামচ
- গরম মসলা গুঁড়া: আধা চা চামচ
- লবণ: স্বাদমতো
- তেল: পরিমাণমতো
তালিকায় আছে তাজা সুগন্ধি উপকরণ (পেঁয়াজ, কুচি ও বাটা দুই রকম রসুন, আদা আর কাঁচা মরিচ), তিনটি গুঁড়া মসলা (হলুদ, মরিচ ও ধনিয়া) এবং শেষে গরম মসলা। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় জনপ্রিয় গরম মসলা হলো লবঙ্গ, গোলমরিচ, দারুচিনি ও এলাচের মিশ্রণ, যা মূলত বিশেষ মাংসের তরকারি ও ভাতের নানা পদে ব্যবহৃত হয়। লালশাক মাপা হয়েছে আঁটি ধরে, বাংলাদেশের বাজারে যেভাবে শাক বিক্রি হয়; তাই এক আঁটি থেকে আরেক আঁটিতে শাকের ওজন কমবেশি হতে পারে।
রান্নার ধাপ
জাগো নিউজের প্রণালীতে রান্না হয় দুই পর্যায়ে: প্রথমে কষানো মসলায় মুরগি রান্না, তারপর তাতে শাক দিয়ে ঝোল কিছুটা কমে আসা পর্যন্ত একসঙ্গে রান্না। মূল রেসিপির ক্রম অনুযায়ী ধাপগুলো এই:
- প্রথমে লালশাক পরিষ্কার করে কেটে পানি ঝরিয়ে নিন। একই সঙ্গে মুরগি পছন্দমতো আকারে টুকরো করে পরিষ্কার করে নিন।
- একটি কড়াইয়ে তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি হালকা বাদামি করে ভেজে নিন।
- এরপর সব মসলা দিয়ে কষাতে থাকুন, যতক্ষণ না মসলা থেকে তেল ছাড়ে।
- এবার মুরগির মাংস দিয়ে ভালোভাবে নেড়ে মাঝারি আঁচে ১০ মিনিট ঢেকে রাখুন।
- মাংস সেদ্ধ হয়ে এলে লালশাক দিন। শাক কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের পানি ছেড়ে দেবে। ঢেকে রাখুন, মাঝে মাঝে নেড়ে দিন; প্রয়োজনে অল্প পানি দিতে পারেন।
- মাংস আর শাক একসঙ্গে মিশে ঝোল কিছুটা কমে এলে গরম মসলা গুঁড়া ও কাঁচা মরিচ দিয়ে ২ থেকে ৩ মিনিট রান্না করে চুলা বন্ধ করুন।
- গরম গরম ভাত বা রুটির সঙ্গে পরিবেশন করুন।
প্রণালীর দুটি দিক চোখে পড়ার মতো। শাক দেওয়া হয় দেরিতে, মুরগি প্রায় সেদ্ধ হওয়ার পর, আর তা রান্না হয় মূলত নিজের ছাড়া পানিতে; বাড়তি পানি দিতে বলা হয়েছে কেবল প্রয়োজন হলে। আবার তৃতীয় ধাপে "সব মসলা" দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ দুই-তিন মিনিটের জন্য গরম মসলা আর কাঁচা মরিচের নাম আলাদা করে আবার এসেছে; ফলে এই দুটি কাজ করে শেষের সুবাস হিসেবে। কাঁচা মুরগি নিয়ে, বিশেষ করে মুরগি ধোয়া নিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ নিচে আলাদা অংশে দেওয়া হলো।

লালশাক কী
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় ডাটাশাক হলো Amaranthaceae গোত্রের Amaranthus গণের বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ, যার আদি নিবাস ভারত বা ইন্দো-চীন অঞ্চল। এর কচি পাতা ও ডাঁটা ভিটামিন এ ও সি, ক্যালসিয়াম এবং আয়রনে সমৃদ্ধ, তাই সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। বাংলাদেশে দুই ধরনের চাষ হয়: পাতাজাতীয়, যা সারা বছর চাষ করা যায় তবে শীতের মাসগুলোতে ফলন বেশি; আর ডাঁটাজাতীয়, যা মূলত গ্রীষ্মের সবজি। রেসিপিটি প্রকাশিত হয় জানুয়ারিতে, অর্থাৎ বাংলাপিডিয়ার হিসাবে পাতাজাতীয় শাকের প্রাচুর্যের মৌসুমে।
চাষ হয় মূলত স্থানীয় জাত দিয়ে। বাংলাপিডিয়া পাতাজাতীয় শাকের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জাত হিসেবে আলতাপেটি এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বারি লালশাক-১-এর নাম দিয়েছে; জাতভেদে হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় ১৫ টন পর্যন্ত হয় বলে উল্লেখ করেছে। কচি পাতা সাধারণত ভাজি করে খাওয়া হয়, আর ডাঁটা রান্না হয় মাছ বা অন্য সবজির সঙ্গে। দেশের প্রধান সবজির তালিকায় বাংলাপিডিয়া লালশাকের বৈজ্ঞানিক নাম দিয়েছে Amaranthus gangeticus; পাশে আছে ডাঁটা, কাঁটানটে ও নটেশাক। একই জ্ঞানকোষের সবজি নিবন্ধে লালশাককে সেই অল্প কয়েকটি সবজির মধ্যে রাখা হয়েছে, যা দুই মৌসুমেই জন্মে।
গবেষকেরা এখন লাল পাতার এই শাককে সাধারণত Amaranthus tricolor নামে ডাকেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত, গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি) ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের একটি গবেষণায় ছয়টি দেশি সবজির পুষ্টিমান মাপতে বারি লালশাক-১ (Amaranthus tricolor)-কে তুলনার মানদণ্ড হিসেবে নেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশে নব্বইটি সবজি চাষের তথ্য রয়েছে, যার উনিশটিকে প্রধান দেশি সবজি ধরা হয়।
শাকের লাল রং নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২০ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বশেমুরকৃবির উমাকান্ত সরকার এবং জাপানের গিফু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিনিয়া ওবা লেখেন, ডাটাশাক বিটাসায়ানিন নামের লাল রঞ্জকের উৎস, যার মধ্যে আছে অ্যামারান্থিন, আইসো-অ্যামারান্থিন, বিটানিন ও আইসো-বিটানিন; আর সবুজ ডাটাশাকের তুলনায় লালশাকে বিটাসায়ানিন ও ক্যারোটিনয়েডের মতো রঞ্জক বেশি থাকে। বিটা-ক্যারোটিন ও সংশ্লিষ্ট ক্যারোটিনয়েডের কারণে তাঁরা Amaranthus tricolor-কে প্রো-ভিটামিন এ-র একটি সস্তা প্রাকৃতিক উৎস বলেছেন, এবং উল্লেখ করেছেন যে একই প্রজাতির ক্যারোটিনয়েডের গঠন জলবায়ু ও অঞ্চলভেদে বদলায়।
বাংলাপিডিয়া ফসলটিকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও দেখিয়েছে। বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১০০ ধরনের সবজি চাষ হয়, তবু জ্ঞানকোষটির হিসাবে সবজির প্রাপ্যতা জনপ্রতি দৈনিক প্রস্তাবিত ২০০ গ্রামের মাত্র এক-পঞ্চমাংশের মতো। সরবরাহের বড় অংশ আসে বসতবাড়ির বাগান থেকে, যেখানে কৃষক পরিবার নিজেদের খাবারের জন্য স্থানীয় জাতের সবজি ফলায় এবং উদ্বৃত্ত বিক্রি করে; বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, এই ব্যবস্থায় নারীরাই প্রধান ভূমিকা রাখেন।

দুই প্রধান উপকরণে কী আছে
লালশাক আয়রন ও ভিটামিনে সমৃদ্ধ এবং মুরগি প্রোটিনে, মূল লেখার এই দাবি মিলিয়ে দেখা যায় ইউএসডিএর খাদ্য-উপাদান তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রালে। সেখানে "Amaranth leaves, raw" (কাঁচা ডাটাশাকের পাতা) অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রামে আছে ২৩ কিলোক্যালরি, ৯১.৭ গ্রাম পানি, ২.৪৬ গ্রাম প্রোটিন, ৪.০২ গ্রাম শর্করা ও ০.৩৩ গ্রাম চর্বি; ২১৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ২.৩২ মিলিগ্রাম আয়রন, ৫৫ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম, ৬১১ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও ০.৯ মিলিগ্রাম জিংক; ৪৩.৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ১৪৬ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ (রেটিনল অ্যাকটিভিটি ইকুইভ্যালেন্ট হিসেবে), ৮৫ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট এবং ১,১৪০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে।
ইউএসডিএর হিসাবে রান্নায় এসব মান সামান্যই বদলায়। লবণ দিয়ে সেদ্ধ করে পানি ঝরানো ডাটাশাকের পাতায় প্রতি ১০০ গ্রামে আয়রন ২.২৬ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ২০৯ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪১.১ মিলিগ্রাম ও ভিটামিন এ ১৩৯ মাইক্রোগ্রাম; সোডিয়াম সেখানে ২৫৭ মিলিগ্রাম, যেখানে কাঁচা পাতায় ২০ মিলিগ্রাম। এই পার্থক্য আসে যোগ করা লবণ থেকে।
মুরগির ক্ষেত্রে ইউএসডিএর "Chicken, broilers or fryers, meat only, raw" (ব্রয়লার মুরগির কাঁচা মাংস, চামড়া ও হাড় ছাড়া) অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রামে আছে ১১৯ কিলোক্যালরি, ২১.৪ গ্রাম প্রোটিন ও ৩.০৮ গ্রাম চর্বি; সঙ্গে ০.৮৯ মিলিগ্রাম আয়রন, ১.৫৪ মিলিগ্রাম জিংক, ১৭৩ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ৮.২৪ মিলিগ্রাম নিয়াসিন, ০.৪৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি৬, ০.৩৭ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি১২ ও ১৫.৭ মাইক্রোগ্রাম সেলেনিয়াম। কোন অংশের মাংস, তাতেও তফাত হয়: কাঁচা রানের মাংসে প্রোটিন ১৯.২ গ্রাম ও চর্বি ৪.২২ গ্রাম, আর কাঁচা ডানার মাংসে প্রোটিন ২২.০ গ্রাম ও চর্বি ৩.৫৪ গ্রাম।
এগুলো যুক্তরাষ্ট্রে সংগৃহীত নমুনার পরীক্ষাগারে মাপা মান। সরকার ও ওবা ডাটাশাক সম্পর্কে যেমন বলেছেন, একই প্রজাতির উপাদান চাষের পরিবেশভেদে বদলায়; তাই এই সংখ্যাগুলোকে মোটামুটি মাত্রার নির্দেশক হিসেবে দেখা উচিত, বাংলাদেশের বাজার থেকে কেনা কোনো আঁটির হুবহু হিসাব হিসেবে নয়।
আয়রনের জন্য শাক আর মাংস একসঙ্গে কেন কাজের
রেসিপিতে যে জুটির প্রশংসা, পুষ্টিবিজ্ঞানে তার ভিত্তি আছে। এনআইএইচের অফিস অব ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টস (ওডিএস) আয়রন নিয়ে সাধারণ পাঠকের জন্য তৈরি তথ্যপত্রে (হালনাগাদ ১৭ আগস্ট ২০২৩) ব্যাখ্যা করেছে, শরীর আয়রন দিয়ে হিমোগ্লোবিন তৈরি করে, যা লোহিত রক্তকণিকার প্রোটিন হিসেবে ফুসফুস থেকে সারা শরীরে অক্সিজেন বয়ে নেয়; আর তৈরি করে মায়োগ্লোবিন, যা পেশিতে অক্সিজেন জোগায়। খাবারে আয়রন থাকে দুই রূপে: উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকে নন-হিম আয়রন, আর মাংস, সামুদ্রিক খাবার ও পোলট্রিতে থাকে হিম ও নন-হিম দুই ধরনই।
তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীর ভালোভাবে শোষণ করে, যখন তা মাংস, পোলট্রি বা সামুদ্রিক খাবারের সঙ্গে এবং ভিটামিন সি আছে এমন খাবারের সঙ্গে খাওয়া হয়। এই পদে লালশাকের আয়রন দুই দিক থেকেই সহায়তা পায়: হাঁড়িতে থাকা মুরগি, আর ইউএসডিএর হিসাবে শাকের পাতাতেই থাকা ভিটামিন সি। ওডিএস আরও জানিয়েছে, যাঁরা মাংস, পোলট্রি বা সামুদ্রিক খাবার খান না, সেই নিরামিষভোজীদের স্বাভাবিকের প্রায় দ্বিগুণ আয়রন দরকার হয়, কারণ শরীর নন-হিম আয়রন হিম আয়রনের মতো ভালোভাবে শোষণ করতে পারে না।
ওডিএসের দেওয়া দৈনিক প্রস্তাবিত পরিমাণ হলো ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষ এবং ৫১ বছর ও তার বেশি বয়সী সব প্রাপ্তবয়স্কের জন্য ৮ মিলিগ্রাম, ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীর জন্য ১৮ মিলিগ্রাম, ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরীর জন্য ১৫ মিলিগ্রাম এবং গর্ভাবস্থায় ২৭ মিলিগ্রাম। শরীরে আয়রনের মজুত কমে গেলে আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়; ওডিএসের তালিকায় এর লক্ষণ পেটের গোলমাল, দুর্বলতা, ক্লান্তি, শক্তির অভাব এবং মনোযোগ ও স্মৃতির সমস্যা। গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যসেবাদাতার সঙ্গে কথা বলে, পরামর্শ পেলে আয়রন সাপ্লিমেন্ট নিতে বলেছে সংস্থাটি। কোনো রান্নার পদ চিকিৎসা নয়: রক্তস্বল্পতার সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
রক্ত পাতলা করার ওষুধ যাঁরা খান, তাঁদের জন্য সতর্কতা
ডাটাশাকের পাতায় ভিটামিন কে-র পরিমাণ বেশি, তাই একটি সতর্কতা দরকার। ভিটামিন কে নিয়ে ওডিএসের সাধারণ পাঠকের তথ্যপত্র (হালনাগাদ ২২ মার্চ ২০২১) অনুযায়ী এই ভিটামিন রক্ত জমাট বাঁধা ও হাড়ের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রধান খাদ্য-উৎসের মধ্যে আছে পালংশাক, কেল, ব্রকলি ও লেটুসের মতো সবুজ শাকসবজি। ১৯ বছর ও তার বেশি বয়সীদের জন্য দৈনিক পর্যাপ্ত গ্রহণমাত্রা পুরুষের ১২০ মাইক্রোগ্রাম ও নারীর ৯০ মাইক্রোগ্রাম। ইউএসডিএর হিসাবে ১০০ গ্রাম কাঁচা ডাটাশাকের পাতায় ভিটামিন কে ১,১৪০ মাইক্রোগ্রাম।
ওডিএস সতর্ক করেছে, রক্ত পাতলা করার ওষুধ ওয়ারফারিনের সঙ্গে ভিটামিন কে-র গুরুতর মিথস্ক্রিয়া হতে পারে। যাঁরা ওয়ারফারিন খান, খাবার ও সাপ্লিমেন্ট থেকে প্রতিদিন তাঁদের ভিটামিন কে গ্রহণের পরিমাণ মোটামুটি একই রাখা জরুরি; হঠাৎ কম খেলে বিপজ্জনক রক্তক্ষরণ, আর হঠাৎ বেশি খেলে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন ওষুধ যাঁরা খান, তাঁরা বড় পরিমাণে শাক খাওয়া হঠাৎ শুরু বা বন্ধ করার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলবেন।
কাঁচা মুরগি নিরাপদে সামলানো
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যপত্রে (৪ অক্টোবর ২০২৪) অনুমান করা হয়েছে, বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ, অর্থাৎ প্রায় প্রতি দশজনে একজন, দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হন এবং প্রতিবছর ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যান; এই বোঝার ৪০ শতাংশ বহন করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা, যাদের মৃত্যু বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার। সংস্থাটি সালমোনেলা, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টর ও এন্টেরোহেমোরেজিক ই. কোলাইকে সবচেয়ে প্রচলিত খাদ্যবাহিত রোগজীবাণুর মধ্যে রেখেছে। সালমোনেলোসিসের প্রাদুর্ভাবে যেসব খাবার বেশি জড়িত, তার মধ্যে পোলট্রির নাম আছে; আর ক্যাম্পাইলোব্যাক্টর সংক্রমণের প্রধান উৎস কাঁচা দুধ, কাঁচা বা কম রান্না করা পোলট্রি এবং খাবার পানি।
ইউএসডিএর ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস (এফএসআইএস) তাদের "চিকেন ফ্রম ফার্ম টু টেবিল" নির্দেশিকায় (সর্বশেষ হালনাগাদ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪) মুরগির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাকটেরিয়া হিসেবে সালমোনেলা, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টর জেজুনি, লিস্টেরিয়া মনোসাইটোজিনিস ও ই. কোলাইয়ের নাম দিয়েছে। ৪০ থেকে ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বাড়ে; হিমায়িত করলে তা মরে না, তবে ভালোভাবে রান্না করলে নষ্ট হয়। সংস্থাটির চারটি ধাপ: পরিষ্কার (হাত ও কাজের জায়গা বারবার ধোয়া), আলাদা (কাঁচা মাংস ও পোলট্রি অন্য খাবার থেকে দূরে রাখা), রান্না (সব পোলট্রি ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত) এবং ঠান্ডা (দ্রুত ফ্রিজে রাখা)।
মূল রেসিপিতে মুরগির টুকরো কেটে "পরিষ্কার" করে নিতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে এফএসআইএসের পরামর্শ স্পষ্ট: রান্নার আগে কাঁচা পোলট্রি ধোয়া উচিত নয়, কারণ কাঁচা মাংসের রসে থাকা ব্যাকটেরিয়া অন্য খাবার, বাসনপত্র ও কাজের জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে; ধুয়ে বা ভিজিয়ে রাখলে ব্যাকটেরিয়া মরে না, মরে কেবল রান্নায়। সংস্থাটির দেওয়া উদাহরণ হলো, একই কাটিং বোর্ডে কাঁচা মুরগি কেটে না ধুয়েই টমেটো কাটা। এই রেসিপিতে তার মানে, লালশাক কাটতে হবে পরিষ্কার বোর্ডে বা মুরগি কাটার আগে, আর কাঁচা মাংস ধরার পর হাত, ছুরি ও বোর্ড ধুয়ে নিতে হবে।
একই নির্দেশিকা অনুযায়ী কাঁচা মুরগি ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রার ফ্রিজে রেখে এক বা দুই দিনের মধ্যে ব্যবহার করতে হবে, নয়তো হিমায়িত করতে হবে। বরফ গলাতে হবে ফ্রিজে, ঠান্ডা পানিতে বা মাইক্রোওয়েভে, কখনোই রান্নাঘরের তাকে খোলা রেখে নয়। রান্না করা মুরগির রং দেখে নিরাপত্তা বোঝা যায় না; মাংস পুরোটা ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত হয় কেবল খাদ্য থার্মোমিটারে। রান্না করা মুরগির বেঁচে যাওয়া পদ ফ্রিজে তিন থেকে চার দিন রাখা যায়।
কৃষি অর্থনীতিতে মসলা ও মুরগি
হাঁড়ির প্রায় সব উপকরণই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় দেশে সাধারণভাবে চাষ হওয়া মসলার মধ্যে আছে আদা, রসুন, হলুদ, পেঁয়াজ, মরিচ ও ধনিয়া; অনেক মসলা অবশ্য এখনো ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি হয়। পেঁয়াজ চাষ হয় সব জেলায়, সবচেয়ে বেশি ফরিদপুরে; এর চারা রোপণের উপযুক্ত সময় ডিসেম্বর বা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ। রসুন লাগানো হয় নভেম্বর-ডিসেম্বরে, আর প্রধান এলাকার মধ্যে আছে ফরিদপুর, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, ঢাকা ও কুমিল্লা।
আদা চাষ হয় বৃষ্টিনির্ভর বর্ষজীবী ফসল হিসেবে উঁচু জমি ও পাহাড়ের ঢালে; গুরুত্বপূর্ণ জেলা দিনাজপুর, রংপুর, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি, আর অনেক কৃষক বসতবাড়িতেই আদা ফলান। মরিচ চাষ হয় গ্রীষ্ম ও শীত দুই মৌসুমেই; বাংলাপিডিয়া জানায়, কাঁচা ও শুকনা দুই রকম মরিচই তরকারিতে মসলা হিসেবে লাগে এবং শুকনা মরিচ কারি পাউডারের উপকরণ। ধনিয়া ব্যাপকভাবে শীতের ফসল হিসেবে চাষ হয়, বোনা হয় অক্টোবর-নভেম্বরে; এর শুকনা বীজ, যা থেকে রেসিপির ধনিয়া গুঁড়া হয়, কারি পাউডারের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

মুরগিরও নিজস্ব দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বাংলাপিডিয়া গৃহপালিত মুরগির উৎস খুঁজেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনমোরগে (রেড জাঙ্গল ফাউল), যা সম্ভবত চার হাজার বছরেরও আগে পোষ মানানো হয়; জ্ঞানকোষটি আরও জানায়, দেশি মুরগিতে মাংস ও ডিম কম হয় বলে ছোট-বড় খামারগুলো উন্নত জাতের দিকে ঝুঁকেছে। খাতটির আকার পাওয়া যায় ডিএলএসের "লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স (২০২৩-২০২৪)" সারসংক্ষেপে: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মুরগি ছিল ৩,২৭৭.৭৭ লাখ এবং হাঁস ৬৮২.৬১ লাখ, মোট পোলট্রি ৩,৯৬০.৩৮ লাখ।
ডিএলএসের একই সারসংক্ষেপে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের মাংস উৎপাদন ধরা হয়েছে ৯২.২৫ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে জনপ্রতি দৈনিক ১২০ গ্রাম হিসাবে চাহিদা ৭৬.২১ লাখ মেট্রিক টন; প্রাপ্যতা জনপ্রতি দৈনিক ১৪৩.৭৭ গ্রাম। স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে প্রাণিসম্পদের সাময়িক অংশ ১.৮০ শতাংশ, আর কৃষি জিডিপিতে ১৬.৩৩ শতাংশ।
জাতীয় খাদ্যনির্দেশিকায় এই পদের জায়গা
এফএওর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০০০ সালে খাদ্যভিত্তিক খাদ্যনির্দেশিকা প্রকাশ করে এবং ২০১৩ সালে তা সংশোধন করে। ২০০০ সালের নির্দেশিকা তৈরি করেছিল বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ; ২০১৩ সালের সংশোধনের কাজ করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিজঅর্ডারস (বারডেম), এফএও, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কারিগরি সহায়তায়।
নির্দেশিকায় পাঁচ স্তরের একটি খাদ্য পিরামিড ব্যবহার করা হয়েছে। সবচেয়ে নিচে ভাত, রুটি ও অন্যান্য দানাশস্য, যা বেশি পরিমাণে খাওয়া যায়; দ্বিতীয় স্তরে শাকসবজি ও ফল, এগুলোও বেশি করে খাওয়ার কথা। এরপর মাছ, মাংস, ডিম ও ডাল, তার ওপর দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, এগুলো পরিমিত পরিমাণে; আর চূড়ায় চর্বি, তেল ও চিনি, যা খেতে হবে অল্প। এফএওর তালিকায় নির্দেশিকার বার্তার মধ্যে আছে প্রতিবেলা নানা রকম খাবার দিয়ে সুষম খাদ্য খাওয়া, তেল ও চর্বি পরিমিত খাওয়া, লবণ সীমিত রাখা ও কেবল আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার, নিরাপদ ও পরিষ্কার খাবার খাওয়া এবং সঠিক রান্না ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস চর্চা।
এই পিরামিডের সামনে রাখলে ভাতের সঙ্গে লালশাকের মুরগি একসঙ্গে তিনটি স্তর ছুঁয়ে যায়: নিচের দানাশস্য, দ্বিতীয় স্তরের শাক এবং পরিমিত মাংস। মূল রেসিপিতে তেল "পরিমাণমতো" আর লবণ "স্বাদমতো" রাখা হয়েছে; জাতীয় নির্দেশিকার পরামর্শ হলো তেল পরিমিত, আর লবণ সীমিত ও আয়োডিনযুক্ত।
ছবি: Mamun2a / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.5)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৭ জানুয়ারি ২০২৬), বাংলাপিডিয়া (ডাটাশাক, সবজি, মসলা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, ধনিয়া, পোলট্রি), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, এনআইএইচ অফিস অব ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টস (আয়রন, ১৭ আগস্ট ২০২৩; ভিটামিন কে, ২২ মার্চ ২০২১), ইউএসডিএ ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস (৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (৪ অক্টোবর ২০২৪), এফএও, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪), সায়েন্টিফিক রিপোর্টস (সরকার ও ওবা, ২০২০; মিলা ও অন্যান্য, নভেম্বর ২০২৪)





মন্তব্য
(০)