চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় অবস্থিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক শিক্ষার্থীকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই, বুধবার রাতে বিষধর সাপ কামড় দেয়। ক্যাম্পাসের ছাত্রী হল খালেদা জিয়া হলের পাশের সড়ক দিয়ে টিউশন শেষে ফেরার পথে এ ঘটনা ঘটে। হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাঁকে এক ডোজ অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়, পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠিয়ে ভর্তি করা হয়। ৯ জুলাই সকালে জাগো নিউজ ২৪ এ খবর প্রকাশ করে।
সাপে কাটার বিষয়টি নিশ্চিত করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) যোগাযোগ ও আবাসন বিষয়ক সম্পাদক ইসহাক ভুঁঞা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহত শিক্ষার্থীর নাম আশরাফুল; তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ঢাকা পোস্ট, সারাবাংলা ও নিউজনাউ২৪ও ৯ জুলাই ক্যাম্পাসে সাপের কামড়ে চবির এক শিক্ষার্থীর আহত হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার খবর প্রকাশ করে।
৮ জুলাই রাতে যা ঘটেছিল
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খালেদা জিয়া হল সংলগ্ন সড়কে সাপটি শিক্ষার্থীকে কামড় দেয়। প্রথমে তাঁকে নেওয়া হয় হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, যে উপজেলায় ক্যাম্পাসটি অবস্থিত সেখানকার সরকারি হাসপাতাল এটি। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম থাকলেও সাপে কাটা রোগীর পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার সব সুবিধা ছিল না। তাই সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে এক ডোজ অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসন বিষয়ক সম্পাদক ইসহাক ভুঁঞাও একই বিবরণ দেন। তিনি বলেন, টিউশন থেকে ফেরার পর খালেদা জিয়া হলের কাছে এক শিক্ষার্থীকে সাপে কামড় দিয়েছে। দ্রুত তাঁকে হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে এক ডোজ অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়, আর বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ভর্তি আছেন।
প্রতিবেদনে সাপটিকে বিষধর বলা হলেও এর প্রজাতি জানানো হয়নি। হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকার কথা ছাড়া শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে আর কোনো তথ্যও প্রতিবেদনে ছিল না।
ক্যাম্পাসে আগের সাপে কাটা ও সাপ উদ্ধারের ঘটনা
রাতে ক্যাম্পাসের সড়কে হাঁটার সময় চবির শিক্ষার্থীকে সাপে কাটার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০২২ সালের ২৭ জুন প্রথম আলো জানায়, সেদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রীতিলতা হলের পাশে জামাল নজরুল ইসলাম সড়কে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রকে সাপে কামড় দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রের কর্তব্যরত চিকিৎসক পত্রিকাটিকে বলেন, রাত ১১টার দিকে ওই শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিতে আসেন, তাঁর পায়ে সাপের কামড়ের চিহ্ন ছিল, এরপর তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়; সেখানে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর চিকিৎসা চলে। তাঁর এক সহপাঠী জানান, দুজন একসঙ্গে ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরা করার সময় হঠাৎ কালো রঙের একটি সাপ বন্ধুর পায়ে কামড় দেয়; চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তিনি আশঙ্কামুক্ত।
ক্যাম্পাসে বড় বিষধর সাপও ধরা পড়েছে। দ্য ডেইলি স্টার ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী সেদিন দুপুরে জিমনেসিয়ামের পাশের ডাক্তার কলোনি থেকে প্রায় ১২ ফুট লম্বা, ২০ কেজি ওজনের একটি কিং কোবরা উদ্ধার করা হয়। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপক পত্রিকাটিকে বলেন, কিং কোবরা অত্যন্ত বিষধর সাপ, চবি ক্যাম্পাসে খুব একটা দেখা যায় না, এরা গভীর জঙ্গলে বাস করে এবং অন্য সাপ খায়। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্র ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের এক ফেলো জানান, সাপটিকে গবেষণার জন্য রাখা হয়েছে এবং শিগগির গভীর বনে অবমুক্ত করা হবে।
এই ঘটনার তিন মাস আগে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে, কয়েক দিনের ব্যবধানে ক্যাম্পাসে দুটি কিং কোবরা ধরা পড়ে। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল জানায়, ১০ এপ্রিল শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝরনা এলাকা থেকে প্রায় ৮ ফুট লম্বা একটি কিং কোবরা উদ্ধার করা হয়। ১২ এপ্রিল রোববার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নাট্যকলা বিভাগের পাশের একটি এলাকা থেকে আরেকটি কিং কোবরা উদ্ধার করা হয়, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ফুট, ওজন আনুমানিক ৬ কেজি। এক শিক্ষার্থী সাপটি দেখে সোসাইটি ফর স্নেক অ্যান্ড স্নেক বাইট অ্যাওয়ারনেসের (থ্রিএসএ) হেল্পলাইনে যোগাযোগ করেন; উদ্ধারকারী দল প্রায় ৩০ মিনিট চেষ্টার পর সাপটিকে নিরাপদে ধরে।
সংগঠনটির উপদেষ্টা ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইব্রাহিম খলিল আল হায়দার পত্রিকাটিকে বলেন, পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণেই ক্যাম্পাসে কিং কোবরা দেখতে পাওয়ার ঘটনা বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশের পাহাড়ি এলাকায় বন বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দারা চাষাবাদসহ নানা কাজ চালাচ্ছেন, এতে সাপের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং আশ্রয়ের খোঁজে সাপ লোকালয়ে চলে আসছে।
হাটহাজারীর পাহাড়ি ক্যাম্পাস
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম শহর থেকে ২২ কিলোমিটার উত্তরে হাটহাজারী উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের জঙ্গল পশ্চিম-পট্টি মৌজায় প্রায় ১,৭৫৪ একর পাহাড়ি জমিতে অবস্থিত। তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম ওসমান গনির নেতৃত্বে গঠিত স্থান নির্বাচন কমিশন এই নিরিবিলি পাহাড়ি এলাকাটি সুপারিশ করে, আর ১৯৬৪ সালের ২৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও অর্থনীতি, এই চার বিভাগের এমএ প্রিলিমিনারি শ্রেণিতে মাত্র ২০০ শিক্ষার্থী ও সাতজন শিক্ষক নিয়ে ক্লাস শুরু হয়। বাংলাপিডিয়া চবিকে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বলে উল্লেখ করেছে। তাদের হিসাবে ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ১৪টি আবাসিক হল, একটি হোস্টেল এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার ছিল; শিক্ষার্থী ছিলেন ২৭ হাজারের বেশি, শিক্ষক প্রায় ৯০০ জন, কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মচারী ১,১৮২ জন। নয়টি অনুষদের একটি আইন অনুষদ, আর ইনস্টিটিউটগুলোর মধ্যে আছে ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, হাটহাজারী উপজেলার আয়তন ২৪৬.৩২ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৪,৩১,৭৪৮ জন। প্রধান নদী হালদা; প্রধান ফসল ধান, আলু, বেগুন, টমেটো, সরিষা, মিষ্টি আলু ও নানা সবজি। উপজেলার উত্তরে ফটিকছড়ি, পূর্বে রাউজান, পশ্চিমে সীতাকুণ্ড আর দক্ষিণে চট্টগ্রাম শহরের পাঁচলাইশ ও চান্দগাঁও থানা। বাংলাপিডিয়া চবি ক্যাম্পাসকে উপজেলার বিনোদনকেন্দ্রগুলোর একটি হিসেবেও তালিকাভুক্ত করেছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিষধর সাপ
বাংলাদেশের বেশির ভাগ সাপ মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপ আছে, যার তিন-চতুর্থাংশের বেশি বিষহীন; উচ্চ বিষধর স্থলচর সাপ আধা ডজনেরও কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ কার্যালয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জানায়, দেশের ৮২ প্রজাতির সাপের মধ্যে ২৭টি বিষধর এবং ৬টি মানুষের জন্য উদ্বেগজনক বিষধর সাপ। বিষের ধরনও আলাদা: বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করেছে, গোখরা ও কেউটে-শঙ্খিনী জাতের সাপের বিষ প্রধানত স্নায়ুতে আঘাত করে এবং শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করে মৃত্যু ঘটাতে পারে, আর বোড়া জাতের সাপের বিষ কোষকলা ও লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করে রক্তক্ষরণ ঘটায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের জন্য প্রণীত 'গাইডলাইনস ফর দ্য ম্যানেজমেন্ট অব স্নেকবাইটস' (দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০১৬) বাংলাদেশের চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাপ হিসেবে তিন ধরনের শঙ্খিনী বা ক্রেইট (কমন ক্রেইট, বড় কালো ক্রেইট ও ওয়ালস ক্রেইট), দুই ধরনের গোখরা (পদ্ম গোখরা বা মনোকলড কোবরা এবং খইয়া গোখরা বা স্পেকটাকলড কোবরা), চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার এবং একটি সবুজ বোড়ার নাম দিয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী পদ্ম গোখরা সারা দেশে আছে, গোখরার কামড়ের বেশির ভাগ এই সাপের, এবং চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশে এটিই একমাত্র গোখরা। ওয়ালস ক্রেইট ও কমন ক্রেইট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নেই, তবে ডোরাকাটা শঙ্খিনী এবং বড় কালো ক্রেইট সারা দেশেই আছে; বড় কালো ক্রেইট আগে বাংলাদেশে অজানা ছিল, পরে এর কামড়ে মৃত্যুর ঘটনা ধরা পড়ে।

একই নির্দেশিকা বলছে, বাংলাদেশে সবুজ বোড়া অনেক মানুষকে কামড়ায়, তাতে কিছু অসুস্থতা হলেও মৃত্যু খুব কম বা নেই বললেই চলে; চন্দ্রবোড়া দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে সীমিত; আর কিং কোবরা বা রাজগোখরা তুলনামূলক অক্ষত বাঁশঝাড় ও বন যেখানে আছে সেখানে থাকে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর কামড়ের নথিভুক্ত ঘটনা ছিল না। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, রাতে ঘরের ভেতরে ঘুমন্ত অবস্থায় কেউ সাপের কামড় খেলে সাপটি সম্ভবত শঙ্খিনী বা ক্রেইট।
টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক এম এ ফয়েজ ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রায় একই চিত্র দেন। তাঁর মতে, হাসপাতালে আসা রোগীদের ভিত্তিতে ধারণা করা যায়, দেশে ১০ থেকে ১২ প্রজাতির বিষধর সাপ আছে। রাজগোখরা চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বেশি দেখা যায়, আর চট্টগ্রাম অঞ্চলে সবুজ বোড়া বেশি। তাঁর ধারণা, চার ধরনের সাপ বেশি কামড়ায়: পদ্ম গোখরা, বিভিন্ন ধরনের শঙ্খিনী বা ক্রেইট, সবুজ বোড়া ও চন্দ্রবোড়া।

দেশে ও বিশ্বে সাপের কামড়ের ব্যাপ্তি
সাপের বিষক্রিয়া নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যপত্রের ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের সংস্করণে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন, এর মধ্যে ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ ক্ষেত্রে শরীরে বিষ ছড়ায়। প্রতিবছর ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন সাপের কামড়ে মারা যান, আর এর প্রায় তিন গুণ মানুষের অঙ্গহানি বা স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা হয়। এশিয়ায় প্রতিবছর ২০ লাখ পর্যন্ত মানুষের শরীরে সাপের বিষ ছড়ায়। কৃষিশ্রমিক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। ২০১৭ সালের জুনে ডব্লিউএইচও সাপের বিষক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অবহেলিত ক্রান্তীয় রোগের তালিকায় তোলে, আর সংস্থাটির কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যু ও প্রতিবন্ধিতা অর্ধেকে নামিয়ে আনা।
বাংলাদেশ নিয়ে ডব্লিউএইচওর ২০১৬ সালের নির্দেশিকা সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০০৯ সালের একটি জরিপের উল্লেখ করেছে। তখনকার ছয়টি বিভাগের দৈবচয়নে বাছাই করা প্রায় চার হাজার খানার প্রায় নয় হাজার মানুষের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে জরিপটি হিসাব করে, গ্রামীণ বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জন সাপের কামড় খান এবং ৬ হাজার ৪১ জন মারা যান। এর আগে ২০০৩ সালে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার খানায় চালানো জাতীয় জরিপে দেখা যায়, সাপে কাটা মানুষের ৬১ শতাংশ প্রথমে প্রথাগত চিকিৎসকের কাছে যান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাম্প্রতিক এক গবেষণার বরাত দিয়ে প্রথম আলো ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, দেশে প্রতিবছর ৪ লাখ ৩ হাজারের বেশি মানুষ সাপের দংশনের শিকার হন এবং তাঁদের মধ্যে সাড়ে সাত হাজারের বেশি মারা যান। একই গবেষণায় দেখা গেছে, সাপে কাটা মানুষের ৯৫ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার। অধ্যাপক ফয়েজ পত্রিকাটিকে বলেন, গ্রামের রোগীরা হাসপাতালে না এসে প্রথমে ওঝার কাছে যান, আর সেখানেই অনেক দেরি হয়ে যায়।
উপজেলায় অ্যান্টিভেনম, তারপর চট্টগ্রামে পাঠানো
ডব্লিউএইচওর তথ্যপত্র অনুযায়ী, সাপের বিষের বেশির ভাগ প্রভাব ঠেকাতে বা ফিরিয়ে আনতে মানসম্পন্ন অ্যান্টিভেনমই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। অ্যান্টিভেনম ডব্লিউএইচওর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় আছে, এবং যেখানে সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে সেখানকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় এটি থাকা উচিত বলে সংস্থাটি বলে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ডব্লিউএইচও জানায়, সে বছরের শুরুতে তারা সারা দেশে ৫ হাজার ডোজ অ্যান্টিভেনম বিতরণ করেছে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে মিলে সব বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৫২ জন চিকিৎসককে সাপের কামড়ের চিকিৎসায় প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
তবে সাপে কাটলেই অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয় না। ২০২৩ সালের সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ফয়েজ বলেন, অ্যান্টিভেনমেরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, তাই সাপে কাটলেই তা দেওয়া যাবে না। বিষধর সাপ কামড়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার কোনো পরীক্ষা বাংলাদেশে নেই; কেবল রক্ত জমাট বাঁধছে কি না, সেই পরীক্ষাটি করা যায়, ফলে উপসর্গ দেখে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসব রোগীকে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়; কামড়ের জায়গা ফুলে যাচ্ছে কি না, চোখে দেখতে সমস্যা হচ্ছে কি না, চোখের ওপরের পাতা পড়ে যাচ্ছে কি না, পেটে ব্যথা হচ্ছে কি না, হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে কি না, এসব লক্ষণ দেখে চিকিৎসক বোঝেন কামড়টি বিষধর সাপের কি না। ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকাতেও রোগীর শয্যার পাশে করা যায় এমন রক্ত জমাট বাঁধার পরীক্ষা, ২০ মিনিটের হোল ব্লাড ক্লটিং টেস্ট, এবং কোন কোন বিষক্রিয়ার লক্ষণে অ্যান্টিভেনম দিতে হয় তার তালিকা আছে।
অধ্যাপক ফয়েজ আরও বলেন, প্রতিটি উপজেলায় অন্তত এক-দুজন রোগীর চিকিৎসার মতো অ্যান্টিভেনম মজুত রাখতে হবে এবং শেষ হলে আবার আনতে হবে, জেলা পর্যায়ে ডিপো রাখতে হবে, পাশাপাশি সাপের কামড়ের অন্যান্য জটিলতার চিকিৎসা-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়, দেশে অ্যান্টিভেনম আসে ভারত থেকে; আর দেশেই অ্যান্টিভেনম তৈরির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চলমান গবেষণার প্রথম পর্যায়ের কাজ, অর্থাৎ সাপ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও এদের বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ, সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ১৯৫৭ সালে চট্টগ্রাম শহরের কে বি ফজলুল কাদের সড়কে ৭৯ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি প্রতিষ্ঠান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত; কলেজের হাসপাতালে ১,০৩০ জন রোগী ভর্তি রাখার ব্যবস্থা আছে।

ডব্লিউএইচওর পরামর্শে প্রাথমিক চিকিৎসা ও সতর্কতা
ডব্লিউএইচওর ২০১৬ সালের নির্দেশিকা বলছে, সাপের কামড়ের প্রচলিত প্রাথমিক চিকিৎসার বেশির ভাগ পদ্ধতি অকেজো, এমনকি বিপজ্জনক, এবং এগুলোর কারণে চিকিৎসায় দেরি করা চলবে না। নির্দেশিকা যেসব পদ্ধতির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে:
- কামড়ের জায়গা বা আক্রান্ত অঙ্গ কাটা বা খোঁচানো, এবং মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা;
- সাপের পাথর বা বিষপাথর, বৈদ্যুতিক শক, আর ক্ষতে রাসায়নিক, লতাপাতা বা বরফ লাগানো;
- অঙ্গে শক্ত করে বাঁধন বা টর্নিকেট দেওয়া, যা কখনো পরামর্শ দেওয়া যাবে না বলে ডব্লিউএইচও জানায়; এমন বাঁধন আগে থেকে দেওয়া থাকলে রোগী হাসপাতালে চিকিৎসক ও জরুরি পুনরুজ্জীবনের ব্যবস্থার মধ্যে না পৌঁছানো এবং অ্যান্টিভেনম শুরু না হওয়া পর্যন্ত তা খোলা যাবে না;
- ক্ষত ঘষা, মালিশ করা বা জোরে পরিষ্কার করা।
এর বদলে ডব্লিউএইচও যা করতে বলে: আক্রান্ত ব্যক্তিকে আশ্বস্ত করা, কারণ বিষধর সাপের কামড়েও অনেক সময় বিষ ঢোকে না (একে 'ড্রাই বাইট' বলে) এবং গুরুতর বিষক্রিয়া সাধারণত ধীরে ঘটে বলে চিকিৎসার সময় পাওয়া যায়; রোগীকে আরামদায়ক ও নিরাপদ ভঙ্গিতে, সম্ভব হলে রিকভারি পজিশনে শুইয়ে রাখা এবং আক্রান্ত অঙ্গ স্প্লিন্ট বা স্লিং দিয়ে স্থির রাখা, কারণ যেকোনো নড়াচড়ায় বিষ ছড়ায়; আর যত দ্রুত ও নিরাপদে সম্ভব হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া। গোখরা বা শঙ্খিনীর কামড় হওয়ার সম্ভাবনা বাদ দেওয়া না গেলে নির্দেশিকা কামড়ের জায়গায় প্রেশার প্যাড দিয়ে অঙ্গ স্থির রাখার পরামর্শ দেয়, যা প্রেশার ব্যান্ডেজের চেয়ে সহজ ও বেশি বাস্তবসম্মত বলে নির্দেশিকায় উল্লেখ আছে। সাপ মারতে বা ধরতে যাওয়া যাবে না; নিরাপদ দূরত্ব থেকে মোবাইল ফোনে তোলা কয়েকটি কাছের ছবি চিকিৎসকদের সাপ শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
সাপের কামড় এড়াতে নির্দেশিকার পরামর্শ: আশপাশে কোন সাপ থাকে তা জানা; কখনো সাপ ধরা, উত্ত্যক্ত করা বা আক্রমণ না করা; খালি পায়ে বা স্যান্ডেল পরে না হেঁটে উপযুক্ত জুতা বা বুট এবং লম্বা প্যান্ট পরা; আর রাতে, বিশেষ করে ভারী বৃষ্টির পর বাইরে হাঁটার সময় টর্চের মতো আলো ব্যবহার করা এবং লাঠি দিয়ে সামনের মাটিতে আঘাত করে এগোনো। সাপে কাটলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
বন্যপ্রাণী আইনে সাপ
বাংলাদেশে সাপ আইনে সুরক্ষিত বন্যপ্রাণী। এই ঘটনার দিন কার্যকর আইন ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬; এটি ২০২৬ সনের ৮৬ নং আইন, তারিখ ১০ এপ্রিল ২০২৬, এবং ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য। আইনের ৫৪ ধারা বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ রহিত করেছে। ১০ ধারা অনুযায়ী সব বন্যপ্রাণী সরকারের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত, এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, যার মধ্যে আইনে প্রহার, উত্ত্যক্ত করা, অপ্রয়োজনে আটক রাখা ও ভীতি প্রদর্শন ধরা হয়েছে, এই আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা বন্যপ্রাণীর বিষয়ে বিধান আছে ১২ ধারায়। এমন ক্ষেত্রে প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমোদন সাপেক্ষে বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন কারণ উল্লেখ করে প্রাণীটি অপসারণ বা ক্ষেত্রমতো পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন এবং ১৫ দিনের মধ্যে বিষয়টি আইনের অধীন উপদেষ্টা বোর্ড ও বৈজ্ঞানিক কমিটিতে প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করবেন।
ছবি: মোহিন রিয়াদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা পোস্ট, সারাবাংলা, নিউজনাউ২৪, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (সাপের বিষক্রিয়া বিষয়ক তথ্যপত্র, ২০২৩; গাইডলাইনস ফর দ্য ম্যানেজমেন্ট অব স্নেকবাইটস, ২০১৬; ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ, ২০১৮), বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ (বাংলাদেশের আইন, bdlaws.minlaw.gov.bd)





মন্তব্য
(০)