কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সমেষপুর গ্রাম সবজির চারার জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। ২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষে জাগো নিউজ জানায়, এই মৌসুমে কুমিল্লা জেলায় প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকার সবজির চারা বিক্রি হবে বলে আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। গোমতী নদীর অববাহিকার বেলে-দোআঁশ মাটির উর্বর বীজতলার কারণে সারা দেশের সবজি চাষিদের কাছে সমেষপুরের চারা পছন্দের তালিকায় শীর্ষে।
প্রতি বছর শ্রাবণ মাস থেকে চারা বেচাকেনা শুরু হয়, কিন্তু সেবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ও বেচাকেনা শুরু হয় দেরিতে। গ্রামের মাঠে তখন সারি সারি বেডে নানা ধরনের সবজির চারা। প্রান্তিক চাষিদের কেউ জমি প্রস্তুত করছিলেন, কেউ চারায় পানি দিচ্ছিলেন, কেউ বিক্রির জন্য চারা তুলে আঁটি বাঁধছিলেন, আর পাশে দাঁড়িয়ে পাইকাররা গুনে গুনে চারা বুঝে নিচ্ছিলেন। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এমন দৃশ্য দেখা যায় এ এলাকায়।
জেলাজুড়ে চারার বড় বাজার
ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, তখন কুমিল্লা জেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে সাত শতাধিক কৃষক চারা উৎপাদনে যুক্ত ছিলেন। সমেষপুর ছাড়াও বুড়িচংয়ের ডাকলাপাড়া, কালাকচুয়া, কাবিলা ও নিমসারে বড় আকারে চারা উৎপাদন হয়। জেলার চান্দিনা, দেবিদ্বার, বরুড়া ও চৌদ্দগ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলাতেও চারা উৎপাদন ও বিক্রি চলে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
টমেটো, মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ ও কুমড়াসহ নানা সবজির চারা যায় চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, হবিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। সবচেয়ে বেশি চাহিদা কাঁচামরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, লাউ ও মিষ্টিকুমড়ার চারার। প্রতিটি চারা বিক্রি হচ্ছিল ১ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ টাকা ৫০ পয়সায়।
বীজ বোনার প্রায় ২০ দিনের মাথায় চারা বিক্রি হয়ে বেড খালি হলে সেখানে আবার বীজ বোনা হয়। এভাবে ভাদ্র মাস থেকে আশ্বিন, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ পর্যন্ত চলে কাজ। চাষিরা এসব চারা কিনে নিজের জমিতে রোপণ করেন। চারার মৌসুম শেষ হলে সমেষপুরের কৃষকেরা একই জমিতে টমেটো, আলু ও বেগুনসহ বিভিন্ন রবি ফসল চাষ করেন।

গোমতীর পাড়ে সাত দশকের ঐতিহ্য
গোমতী নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে কুমিল্লা জেলায় ঢুকে মেঘনায় পড়েছে; নদীটির পানি সেচের কাজেও ব্যবহৃত হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সমেশপুর (সমেষপুর) গ্রামের এক পাশে গোমতী নদী, অন্য পাশে প্রত্নস্থান রানি ময়নামতির প্রাসাদ, আর সাত দশকের বেশি সময় ধরে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে সবজির চারা উৎপাদিত হচ্ছে। সেখানে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মরিচ, শিম, লাউ, কুমড়া ও ব্রকলিসহ অন্তত ২৩ ধরনের সবজির চারা পাওয়া যায়।
সমেষপুরের সাথী-বিথী নার্সারির মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকে আমার বাবা ইউসুফ আলী এখানে চারা উৎপাদন শুরু করেন। ওনাকে দেখে উৎসাহিত হয়ে এখন অনেকেই চারা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে আমি এ পেশায় আছি।’ তাঁর হিসাবে, বছরে তাঁদের এলাকায় অন্তত ৬ থেকে ৮ কোটি টাকার মতো চারা বিক্রি হয়।

চাষি ও পাইকারদের কথা
সমেষপুরের চারা চাষি কামাল হোসেন বলেন, ‘টমেটো, কাঁচামরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও তাল বেগুনের চারা এরই মধ্যে বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। বাজারে নেওয়ার আগেই পাইকাররা জমির আইল থেকে নিয়ে যাচ্ছেন।’ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ডাকলাপাড়ার চারা বিক্রেতা মো. আলী হোসেন জানান, বাপ-দাদাকে দেখে তিনি এ পেশায় এসেছেন এবং ৩০ বছর ধরে সবজির চারা উৎপাদন ও বিক্রি করছেন। বন্যা ও আবহাওয়ার কারণে আগের দুই বছর লোকসান গুনলেও সেবার ভালো লাভের আশা করছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট রাতে বুড়িচংয়ের বুরবুড়িয়ায় গোমতীর বাঁধ ভেঙে পুরো উপজেলা প্লাবিত হয়েছিল।
ফরিদপুর থেকে চারা কিনতে আসা লোকমান হোসেন বলেন, ‘কুমিল্লার সবজির চারা উন্নত জাতের। ফলনও ভালো পাওয়া যায়।’ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে তিনি এখান থেকে চারা নেন, তবে তাঁর মতে আগের বছরগুলোর চেয়ে চারার দাম একটু বেশি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বজলু মিয়া ৪০ বছর ধরে সমেষপুরের চারা কিনে নিজের জেলার বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন।

কৃষি বিভাগের প্রত্যাশা
বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরিনা আক্তার বলেন, চারা উৎপাদনকারী কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হয় এবং উপজেলা কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণও চলছে। তাঁর কথায়, ‘এবার ঘন ঘন বৃষ্টিপাতের কারণে প্রাথমিকভাবে কিছু ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মৌসুম শেষে ভালো ফলনের আশা করা যাচ্ছে।’
ডিএই কুমিল্লার উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘চারা উৎপাদনে কুমিল্লা দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জেলা।’ তিনি জানান, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, বীজ নির্বাচন, পোকামাকড় দমন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা দেওয়া হয় এবং চলতি মৌসুমে প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকার চারা বেচাকেনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রথম আলোর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনেও পুরো জেলায় মৌসুমে চারা বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা বলা হয়েছিল।
ছবি: Mohammed Tawsif Salam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)