মা ইলিশ রক্ষার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলায় মেঘনা নদীর অভয়াশ্রম এলাকায় ইলিশ ধরার সময় ১১ জন জেলেকে আটক করে উপজেলা টাস্কফোর্স। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর, রোববার এই অভিযানের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত আটক জেলেদের ৮ জনকে ১৫ দিন করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন। বাকি ৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
মেঘনায় অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত
অভিযান পরিচালনাকারী হাইমচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা এ.বি.এম. আশরাফুল হক সেদিন দিনগত রাত ১২টার দিকে জাগো নিউজকে তথ্যগুলো নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, টাস্কফোর্স বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেঘনার অভয়াশ্রম এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় হাইমচর উপজেলার বারতহবিল সংলগ্ন এলাকায় জেলেরা অবৈধভাবে ইলিশ ধরছিলেন। অভিযানকারী দল ধাওয়া করে ১১ জনকে আটক করে।
ওই নৌকা থেকে প্রায় ২ হাজার মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করা হয় এবং ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে জালগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়। পরে কোস্ট গার্ডের নয়ানী আউটপোস্টে হাইমচর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্বরূপ মুহুরী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এই দণ্ড দেন।
হাইমচর চাঁদপুর জেলার একটি উপজেলা, মেঘনা নদীর তীরে এর অবস্থান। উপজেলাটির আয়তন ১৩৪.১৬ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ৬টি; ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এর জনসংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৩৩।

মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা
২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও মজুত নিষিদ্ধ থাকবে। তিনি বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার আলোকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আশ্বিনী পূর্ণিমার আগের চার দিন ও অমাবস্যার পরের তিন দিনকে অন্তর্ভুক্ত করে সময় ঠিক করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শুরু হয় ৩ অক্টোবর দিনগত মধ্যরাত থেকে।
উপদেষ্টার তথ্য অনুযায়ী, এ সময় ৩৭ জেলার ১৬৫ উপজেলার ৬ লাখ ২০ হাজার জেলে পরিবারকে ভিজিএফ কর্মসূচিতে পরিবারপ্রতি ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা ছিল। তিনি আরও জানান, আগের বছরের নিষেধাজ্ঞার ফলে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পেরেছিল।
বাসসের ২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত পদ্মা ও মেঘনার প্রায় ৭০ কিলোমিটার অংশ ইলিশের অভয়াশ্রম, যেখানে টাস্কফোর্স দিনরাত অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেয়। জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে জেলায় নিবন্ধিত জেলে প্রায় ৪৩ হাজার।

আইনে কী শাস্তি
ইলিশ ধরার এই নিষেধাজ্ঞা মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০-এর আওতায় জারি হয়। বাসস জানায়, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরলে মৎস্য আইনে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান ছিল। কারেন্ট জাল বহন, রাখা ও ব্যবহারও একই আইনে আলাদাভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
নিষেধাজ্ঞার আগে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন জেলেদের উদ্দেশে বলেছিলেন, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা হলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর এই নিষেধাজ্ঞা জেলেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্যই।
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। ২০১৭ সালে এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়। ডিম ছাড়ার জন্য ইলিশ সাগর থেকে নদীর মিঠা পানিতে উঠে আসে, তাই প্রজনন মৌসুমে নদীর অভয়াশ্রম রক্ষা করা জরুরি।

ছবি: Nahid Sultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাদেশের আইন (মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০), উইকিপিডিয়া (হাইমচর উপজেলা; ইলিশ)





মন্তব্য
(০)