গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কছিম বাজার এলাকা থেকে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি, সোমবার, একটি অসুস্থ হিমালয়ান গৃধিনী শকুন উদ্ধার করা হয়। গাইবান্ধা বন বিভাগের সহায়তায় শিক্ষার্থীদের পরিবেশবাদী সংগঠন টিম ফর এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (তীর)-এর গাইবান্ধা সরকারি কলেজ শাখার সদস্যরা শকুনটিকে উদ্ধার করেন। সেদিন সন্ধ্যায় এটিকে রংপুর বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জাগো নিউজ ও প্রথম আলো একই দিনে খবরটি প্রকাশ করে।
যেভাবে পাওয়া গেল শকুনটি
তীর সূত্রে প্রথম আলো জানায়, আগের দিন রোববার সকাল ৯টার দিকে কছিম বাজার এলাকার বাসিন্দা আমিন হোসেনের জমিতে স্থানীয় লোকজন শকুনটিকে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে সোমবার তীরের গাইবান্ধা সরকারি কলেজ শাখার একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থলে যায়। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাঁরা শকুনটিকে উদ্ধার করে প্রথমে গাইবান্ধা বন বিভাগে নিয়ে যান, সেখানে পাখিটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
উদ্ধারের সময় উপস্থিত ছিলেন শাখার সাবেক সভাপতি জিসান মাহমুদ, প্রচার সম্পাদক মেজবাহুল হক, কার্যকরী সদস্য নিফাউল ইসলাম এবং সদস্য কাশফিহা খানম ও সাইমুম ইসলামসহ সংগঠনের অন্য সদস্যরা। আইইউসিএনের কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ ও গাইবান্ধা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শরিফুল ইসলামের পরামর্শে শকুনটিকে রংপুর বন বিভাগে হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে উন্নত পরিচর্যার জন্য এটিকে দিনাজপুরের সিংড়া জাতীয় উদ্যানের ‘শকুন উদ্ধার ও পরিচর্যাকেন্দ্রে’ পাঠানোর কথা জানানো হয়।
সিংড়া জাতীয় উদ্যান দিনাজপুর শহর থেকে সড়কপথে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে একটি শালবন। বন বিভাগ ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর এর ৩০৫.৬৯ হেক্টর এলাকাকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে।

শীতে কেন সমতলে নামে হিমালয়ান গৃধিনী
হিমালয়ান গৃধিনী (Gyps himalayensis) পুরোনো পৃথিবীর শকুনদের মধ্যে আকারে দ্বিতীয় বৃহত্তম। এরা মূলত হিমালয় ও তিব্বত মালভূমির ১ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায় থাকে। আইইউসিএনের লাল তালিকায় প্রজাতিটি ‘প্রায় বিপন্ন’ (নিয়ার থ্রেটেনড) শ্রেণিতে আছে। এদের ওজন সাধারণত ৬ থেকে সাড়ে ১২ কেজি, ডানার বিস্তার আড়াই থেকে ৩.১ মিটার পর্যন্ত। মরা প্রাণীর মাংসই এদের খাবার।
আইইউসিএনের প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট সুলতান আহমেদ জানান, হিমালয়ের প্রচণ্ড ঠান্ডা ও হিমঝড় সহ্য করতে না পেরে নভেম্বর-ডিসেম্বরে এই শকুনগুলো সমতলের দিকে নেমে আসে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নেওয়ার সময় এরা অনেক সময় উড়তে পারে না, আর স্থানীয় লোকজন একে অসুস্থতা ভেবে ভুল করেন।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে আইইউসিএনের শকুন সংরক্ষণ প্রকল্পের মুখ্য গবেষক সারোয়ার আলম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, প্রতিবছর শ খানেক হিমালয়ান গৃধিনী বাংলাদেশে আসে, তার মধ্যে প্রায় ৪০টি অসুস্থ হয়ে পড়ে। একেকটি শকুনকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার আকাশপথ পাড়ি দিতে হয়, আর সমতলে এসে এরা পর্যাপ্ত খাবার পায় না। তাঁর হিসাবে, এই শকুনের ওজন ১৩ কেজি পর্যন্ত হলেও বাংলাদেশে পাওয়ার সময় ওজন থাকে চার থেকে পাঁচ কেজি। মার্চের দিকে এরা আবার ফিরে যায়।

দেশে শকুন কমছে, উদ্ধারে স্বেচ্ছাসেবীরা
তীর গাইবান্ধা সরকারি কলেজ শাখার সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে একসময় সাত প্রজাতির শকুন থাকলেও রাজশকুন এখন পুরোপুরি বিপন্ন এবং দেশে মাত্র ২৬০টির মতো বাংলা শকুন টিকে আছে। এই অবস্থায় পরিযায়ী হিমালয়ান গৃধিনী রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। তীরের উপদেষ্টা ও গাইবান্ধা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ খলিলুর রহমান বলেন, প্রকৃতির ঝাড়ুদার হিসেবে পরিচিত এই পাখিগুলো মৃত পশুর মাংস খেয়ে পরিবেশকে রোগব্যাধি থেকে মুক্ত রাখে।
তীর ২০১১ সাল থেকে শকুনসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করছে। আইইউসিএন-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রচারণার ফলে উত্তরাঞ্চলের কোথাও অসুস্থ শকুন পাওয়া গেলে স্থানীয় লোকজন এখন তীরের স্বেচ্ছাসেবীদের খবর দেন, আর তাঁরা প্রাথমিক পরিচর্যার পর পাখিগুলো বন বিভাগ ও পরিচর্যাকেন্দ্রে হস্তান্তর করেন। আগের মৌসুমে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষে, তীরের একই শাখা গাইবান্ধা শহরের বানিয়ারজান ও ফুলছড়ি উপজেলা থেকে দুটি হিমালয়ান গৃধিনী উদ্ধার করে রংপুর বন বিভাগে দিয়েছিল।

ছবি: Ksuryawanshi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো (৫ জানুয়ারি ২০২৬; ১১ ডিসেম্বর ২০২২; ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪), উইকিপিডিয়া (হিমালয়ান গৃধিনী; সিংড়া জাতীয় উদ্যান)





মন্তব্য
(০)