২০২৬ সালের জুনের শেষ সপ্তাহে গাইবান্ধার তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীর পানি কখনো কমেছে, কখনো বেড়েছে। এই ওঠানামায় নদীতীর ও চরাঞ্চলে তীব্র ভাঙন দেখা দেয় এবং নিম্নাঞ্চলে অন্তত ১১৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। জাগো নিউজ ৩০ জুন এ খবর দেয়।
কোন ফসলের কত ক্ষতি
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাত উপজেলায় বন্যায় প্রায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। এর মধ্যে ছিল:
- আউশ ধান: ৪৫ হেক্টর
- পাট: ৩০ হেক্টর
- তিল: ২৫ হেক্টর
- শাকসবজি: ১০ হেক্টর
- আমনের বীজতলা: ৮ হেক্টর
গাইবান্ধা ডিএইর উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম তখন বলেন, মাঠপর্যায়ের হিসাবে জেলায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে এবং বন্যার পানি দীর্ঘ সময় থাকলে ক্ষতির তালিকা আরও বাড়বে।
কৃষকেরা নিজেদের ক্ষতির কথা জানান। সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের চিথতুলিয়া দিগর গ্রামের কৃষক আশরাফ বলেন, তাঁর তিন বিঘা জমির আউশ ধান তলিয়ে গেছে। সুন্দরগঞ্জের কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালিরখামার গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল ইসলামের দুই বিঘা পাটখেতে তখন গলাসমান পানি, পাটগাছে পচন ধরেছিল। আরেক কৃষক আঙ্গুর মিয়ার দাবি, হঠাৎ ভারত থেকে পানি ছাড়ায় নদীতে পানি বেড়েছে; তাঁর এক বিঘা তিলখেত তলিয়ে যায়।

নদীর পানির অবস্থা
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ২৯ জুন সোমবার বিকেল ৩টা থেকে পরদিন বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৪৩ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। একই সময়ে ব্রহ্মপুত্রের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ১৯ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৭০ সেন্টিমিটার নিচে, ঘাঘটের পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার নিচে এবং গোবিন্দগঞ্জের করতোয়ার পানি চকরহিমাপুর পয়েন্টে ৫৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৩৫৪ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। তখন পর্যন্ত জেলার কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলায় সাতটি উপজেলা: সদর, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, ফুলছড়ি, সাঘাটা, সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা, করতোয়া, বাঙালি ও ঘাঘট জেলার প্রধান নদী। নদীভাঙন এই জেলার পুরোনো সমস্যা; উনিশ শতকের সত্তরের দশকে ভবানীগঞ্জ নদীগর্ভে বিলীন হলে ১৮৭৫ সালে মহকুমা সদর গাইবান্ধায় সরিয়ে আনা হয়।

ভাঙনে গৃহহীন শত শত পরিবার
স্থানীয়রা জানান, পানি বাড়া-কমার মধ্যে জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন চলছিল। সদর, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলায় উজানের পাহাড়ি ঢলে পানি বাড়ার পর কয়েক দিনে নদীতীরের আট শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়।
ফুলছড়ির ফজলুপুর ইউনিয়নের চৌমহন চর, খাটিয়ামারি ও কাউয়াবাদায় ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সাড়ে তিন শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারায়; একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকশ বিঘা আবাদি জমি ও বহু গাছপালা নদীতে বিলীন হয়। কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাট ও রসুলপুর এবং উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুরেও ভাঙন দেখা দেয়। রসুলপুরের আয়নুল মিয়া বলেন, সবজির জমি নদীতে যাচ্ছে, ভাঙন ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগোচ্ছে।
সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার ও কেরানির চর এলাকায় দুই শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি এবং একশোর বেশি বিঘা ফসলি জমি হারায়। হরিপুর, চণ্ডীপুর ও কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামেও ভাঙন চলছিল। এর এক সপ্তাহ আগে, ২৪ জুন বাংলাদেশ প্রতিদিন জানিয়েছিল, উত্তর লালচামার গ্রামে তিন দিনে শতাধিক বসতবাড়ি ও দুই শতাধিক বিঘা আবাদি জমি তিস্তায় বিলীন হয়েছে।
সিধাইল গ্রামের রিপন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, 'আমার বয়সে ৯ বার আমাদের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আমার বাবার সঙ্গে হয়েছে বহুবার। এবছরও ভাঙন চলছে। ভাঙনের কারণে ২০টির বেশি পরিবার এখান থেকে সরে গেছে। আরও অনেক পরিবার ভাঙনের মুখে রয়েছে।'
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, পানি বাড়ার প্রভাবে নদীতীর ও চরাঞ্চলের অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন শুরু হয়েছে এবং জিওব্যাগসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় তা ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ সরাসরি নদীভাঙনের শিকার হন।

ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)