দেশের পুকুর আর অন্যান্য বদ্ধ জলাশয় থেকে বছরের পর বছর মাছের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু দ্য এগ্রো নিউজ ২০২৫ সালের এপ্রিলে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয়, এই বৃদ্ধি একা দ্রুত বাড়তে থাকা জনগোষ্ঠীর মাছের চাহিদা মেটাতে পারছে না। প্রতিবেদনের প্রশ্নটি ছিল সহজ: নদীতেই কি মাছ চাষ করা যায়, আর তা কি দেশের নিজস্ব দেশীয় প্রজাতি দিয়ে করা সম্ভব?
উত্তরটি এসেছিল বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) থেকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্র কয়েক বছর ধরে ভাসমান খাঁচায় দেশীয় মাছ চাষ নিয়ে গবেষণা চালায় এবং গুলশা মাছ চাষের একটি লাগসই পদ্ধতি উদ্ভাবন করে। গুলশা সুস্বাদু ও উচ্চমূল্যের একটি ছোট মাগুরজাতীয় মাছ, যা উন্মুক্ত জলাশয়ে কমে এসেছে। এই লেখায় থাকছে কেন্দ্রটি কী পরীক্ষা করেছিল, গুলশা কোন মাছ এবং আইইউসিএন বাংলাদেশের লাল তালিকায় এর অবস্থান কী, দেশে খাঁচায় মাছ চাষ কীভাবে এসেছে, আর ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত মাঠ গবেষণা খাঁচায় গুলশার মজুদ, খাবার ও খরচ নিয়ে কী পেয়েছে।
দেশীয় মাছ নিয়ে বিএফআরআইয়ের খাঁচা গবেষণা
প্রতিবেদনের আগের কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে খাঁচায় তেলাপিয়া চাষ হচ্ছিল। কিন্তু দেশীয় প্রজাতির ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাবদা, গুলশা, মাগুর ও শিংয়ের মতো দেশীয় মাছ খাঁচায় চাষ করা যায় কি না, তা যাচাই করতে বিএফআরআইয়ের ময়মনসিংহ স্বাদুপানি কেন্দ্র একটি গবেষণা কার্যক্রম হাতে নেয়।
কয়েক বছরের ধারাবাহিক গবেষণার পর কেন্দ্রটি ভাসমান খাঁচায় গুলশা চাষের লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সহনশীল ব্যবস্থাপনায় ভাসমান খাঁচায় গুলশা চাষ করা হলে তা মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও পুষ্টির অভাব পূরণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়। প্রতিবেদনে মজুদ ঘনত্ব বা খাবারের কোনো হিসাব ছিল না; নিচের সংখ্যাগুলো সমকক্ষ পর্যালোচিত গবেষণাপত্র থেকে নেওয়া, প্রতিটির লেখকের নামসহ।
প্রতিবেদনের যুক্তি ছিল, দেশের জলসম্পদকে এখনও যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে সুষম মৎস্য উৎপাদনের আওতায় আনা যায়নি। উন্মুক্ত জলাশয় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উপযুক্ত প্রযুক্তিতে মাছ চাষে জোর দিলে তা খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, আর নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ তেমনই একটি উৎসাহজনক প্রযুক্তি।

দেশের মাছের জোগানে নদী কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের খাদ্যতালিকায় মাছের জায়গা কেন্দ্রীয়। ইনফোফিশ ২০২৪ সালের অক্টোবরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যে দেশভিত্তিক উপস্থাপনা প্রকাশ করে, তাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের মোট মাছ উৎপাদন ধরা হয় ৪.৯১ মিলিয়ন টন। মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে, আর মাথাপিছু মাছ গ্রহণ দিনে ৬৭.৮০ গ্রাম।
একই উপস্থাপনায় ২০২৪ সালের এফএও পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়, চাষের মাছে পঞ্চম এবং তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ। দেশের জলাশয়ে ২৬০ প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ, ১২ প্রজাতির বিদেশি মাছ এবং ২৪ প্রজাতির স্বাদুপানির চিংড়ির কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়।
২০১১ সালে তেলাপিয়া চাষ নিয়ে লেখা একটি গবেষণাপত্রে মৎস্য অধিদপ্তরের চাঁদপুর মৎস্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মো. আসাদুল বাকী এবং থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির রাম সি. ভুজেল লেখেন, ঘন জনবসতি আর নগরায়ণে কৃষিজমি কমে যাওয়ায় মাছ চাষের জন্য বদ্ধ জলাশয় সীমিত, অথচ বিশাল উন্মুক্ত জলাশয় তখনও অব্যবহৃত পড়ে ছিল।
বাংলাদেশে খাঁচায় মাছ চাষ যেভাবে এল
মাছের খাঁচা হলো জালে মোড়ানো একটি কাঠামো, যা সাধারণত ভাসমান অবস্থায় নদী, হ্রদ বা প্লাবনভূমিতে বসানো হয়। এতে মাছ এক জায়গায় আটকে থাকে, আর পানি খাঁচার ভেতর দিয়ে বয়ে যায়। মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অতি প্রাচীনকাল থেকেই বাঁশ বা জালের খাঁচায় মাছ পালনের চল ছিল, যদিও তখন লাভ-লোকসানের হিসাব তেমন বিবেচ্য ছিল না। বাকী ও ভুজেল লিখেছেন, প্রায় তিন দশক ধরে বাণিজ্যিক খাঁচা চাষে এশিয়া এগিয়ে, এবং চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়া এর মাধ্যমে তাদের জাতীয় মাছ উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল। বাকী ও ভুজেলের বিবরণ অনুযায়ী, মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিএফআরআই এবং কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা বহু বছর ধরে খাঁচা নিয়ে চেষ্টা করেছে, যার মধ্যে কাপ্তাই হ্রদ ও ঢাকার ধানমন্ডি লেকে পরীক্ষামূলক চাষও ছিল। কেয়ার-বাংলাদেশ ১৯৯৫ সালে মেঘনা ও গোমতী নদীতে ‘কেজ অ্যাকুয়াকালচার ফর গ্রেটার ইকোনমিক সিকিউরিটি’ (কেজেস) নামে একটি প্রকল্প শুরু করে। এসব উদ্যোগের প্রায় সবই টেকসই হয়নি। লেখকেরা এর প্রধান কারণগুলো এভাবে তুলে ধরেন:
- মানসম্মত জালের অভাব;
- খাঁচার উপযোগী ভাসমান খাবারের অভাব;
- খাঁচায় চাষের জন্য মাছের প্রজাতি বাছাইয়ে ভুল;
- কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি এবং খাঁচা চালানোর মতো দক্ষ লোকের অভাব;
- সমন্বিত উদ্যোগের অভাব;
- চুরি ও বিরোধের মতো সামাজিক সমস্যা।
তাঁদের বিবরণে মোড় ঘোরে ২০০১ সালে, যখন মৎস্য অধিদপ্তরের একদল কর্মকর্তা থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে মনোসেক্স তেলাপিয়া হ্যাচারি ও খাঁচায় চাষের প্রশিক্ষণ নেন। ২০০২ সালে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীতে ৪০টি খাঁচা বসানো হয়, প্রতিটির মাপ ৬ মিটার × ৩ মিটার × ১.৫ মিটার (২৭ ঘনমিটার)। ২০০৬ সালে খাঁচায় চাষ লক্ষ্মীপুর জেলায় ছড়ায়।
২০১১ সালের ওই গবেষণাপত্র লেখার সময় চাঁদপুরে ডাকাতিয়া নদীর তীরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি এবং লক্ষ্মীপুরে মেঘনার তীরে ৫০০টি খাঁচা চালু ছিল। চাষিরা প্রতি ঘনমিটারে ২০ থেকে ২৫ গ্রাম ওজনের ৩৭ থেকে ৪০টি লিঙ্গ-রূপান্তরিত তেলাপিয়া পোনা ছাড়তেন। ভাসমান খাবারে ছয় থেকে সাত মাসে মাছ প্রায় ৪০০ গ্রাম হতো, প্রতি ঘনমিটারে উৎপাদন দাঁড়াত প্রায় ১৫ কেজি, মৃত্যুহার ৫ শতাংশের নিচে, আর খাদ্য রূপান্তর হার প্রায় ১.৭৫। এসব খাঁচা থেকে বছরে অন্তত ৩ হাজার ২০০ টন তেলাপিয়া উৎপাদিত হতো এবং অন্তত ৬০০ জন কাজ করতেন, যাঁদের প্রায় ৫ শতাংশ নারী। লেখকেরা এ-ও সতর্ক করেন যে নিবিড় চাষের সঙ্গে যুক্ত রোগবালাই তেলাপিয়ার খাঁচা চাষকে হুমকিতে ফেলছে।
গুলশা: গবেষণার কেন্দ্রে যে মাছ
গুলশা (Mystus cavasius) বাগ্রিডি গোত্রের একটি ছোট মাগুরজাতীয় (ক্যাটফিশ) মাছ। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের লাল তালিকা অনুযায়ী, এর ইংরেজি নাম গ্যাঞ্জেটিক মিস্টাস, আর বাংলাদেশে এটি গোলশা, কাবাশি টেংরা বা গোলশা টেংরা নামে পরিচিত। বাংলাদেশের বাইরে ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে এই মাছ পাওয়া যায়।
লাল তালিকার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতরে তিস্তা, পদ্মা-যমুনা-মেঘনা, সুরমা, কুশিয়ারা ও কংস নদীব্যবস্থা এবং এদের সঙ্গে যুক্ত বিল ও হাওরে, আর দক্ষিণের জোয়ার-ভাটার নদীতে গুলশা পাওয়া যায়। বালু থেকে কাদামাটির তলদেশওয়ালা বড় নদীতে এরা থাকে এবং সেখান থেকে হাওর, বাঁওড়, বিল, খাল ও প্লাবিত জমিতে চলে যায়। প্রাপ্তবয়স্ক মাছ মূলত তলদেশে পোকার লার্ভা, ছোট মাছ ও জৈব আবর্জনা খায়, আর ছোট মাছ আংশিকভাবে প্রাণিকণা (জুপ্ল্যাংকটন) খায়।
গবেষকেরা শুধু স্বাদের জন্য এই মাছকে গুরুত্ব দেন না। ২০২৪ সালে জার্নাল অব ফিশারিজে প্রকাশিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শোভন খান সবুজ ও সহকর্মীদের একটি গবেষণা আগের কাজ উদ্ধৃত করে জানায়, গুলশায় প্রায় ১৩.৮১ শতাংশ আমিষ ও ২.২৬ শতাংশ চর্বি থাকে এবং এটি ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসে সমৃদ্ধ। একই গবেষণায় বলা হয়, এই প্রজাতি কম অক্সিজেন, তাপমাত্রার বড় ওঠানামা ও খারাপ পানির অবস্থা সহ্য করতে পারে, আর এর উচ্চ বাজারদর ও স্বাদ একে চাষের জন্য সম্ভাবনাময় করেছে। ২০২৩ সালে অ্যাকুয়াকালচার রিপোর্টসে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়, খাঁচায় গুলশা চাষ নিয়ে তথ্য তখনও সীমিত ছিল।

গুলশা কতটা বিপন্ন: ২০১৫ সালের লাল তালিকা যা বলে
মূল প্রতিবেদনে গুলশাকে বিলুপ্তপ্রায় বলা হয়েছিল। জাতীয় মূল্যায়ন বিষয়টি আরও নির্দিষ্টভাবে বলে। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, ভলিউম ৫: ফ্রেশওয়াটার ফিশেস’-এ ২০১৪ সালের ২১ আগস্টের মূল্যায়নে গুলশাকে ‘প্রায় সংকটাপন্ন’ (নিয়ার থ্রেটেন্ড) তালিকায় রাখা হয়, যা হুমকিগ্রস্ত শ্রেণিগুলোর ঠিক এক ধাপ নিচে। এর আগে আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০০০ সালের তালিকায় মাছটি ছিল ‘সংকটাপন্ন’ (ভালনারেবল)।
লাল তালিকায় এই সিদ্ধান্তের কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মাছটি এখনও দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে: এর আনুমানিক বিস্তৃতি এলাকা ২ লাখ ২৪ হাজার ৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং বসবাসের এলাকা ১৮ হাজার ৫৫৪ বর্গকিলোমিটার, দুটিই হুমকিগ্রস্ত শ্রেণির সীমার অনেক ওপরে। কিন্তু ব্যাপক হারে আবাসস্থল হারানো ও নষ্ট হওয়া, অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত আহরণের কারণে এর সংখ্যা দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে কমছিল, এবং মূল্যায়নকারীদের মতে এসব হুমকি অদূর ভবিষ্যতে থামার সম্ভাবনা কম। প্রজাতিটির জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় একে ‘প্রায় সংকটাপন্ন’ ধরা হয়, আর এর সংখ্যার প্রবণতা নিম্নমুখী। ২০২৪ সালের জার্নাল অব ফিশারিজের গবেষণায়ও বলা হয়, উচ্চ বাজার চাহিদা মেটাতে বাড়তি আহরণ, আবাসস্থল ধ্বংস ও পরিবেশগত পরিবর্তনে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে গুলশার আহরণ ধীরে ধীরে কমছে।
প্রতিবেদনে নাম আসা অন্য মাছগুলোর অবস্থান তালিকায় ভিন্ন। পাবদা (Ompok pabda) ‘বিপন্ন’ (এনডেঞ্জারড): ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের মূল্যায়নে বলা হয়, একসময় সারা দেশে মাছটি মোটামুটি প্রচুর ছিল, কিন্তু পলি জমা, জলাভূমি রূপান্তর, অতিরিক্ত আহরণ ও দূষণে আশির দশকে এর সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়, এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী আগের দশ বছরে এর সংখ্যা ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে। অন্যদিকে মাগুর (Clarias batrachus) ও শিং (Heteropneustes fossilis) ২০১৫ সালের মূল্যায়নে ‘ন্যূনতম উদ্বেগ’ (লিস্ট কনসার্ন) শ্রেণিতে ছিল।
সব স্বাদুপানির মাছ মিলিয়ে আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালে ২৫৩টি প্রজাতি মূল্যায়ন করে এবং এর ৬৪টিকে, অর্থাৎ ২৫.৩ শতাংশকে হুমকিগ্রস্ত পায়: ৯টি মহাবিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন ও ২৫টি সংকটাপন্ন। আরও ২৭টি প্রায় সংকটাপন্ন, ১২২টি ন্যূনতম উদ্বেগ এবং ৪০টি তথ্য-অপর্যাপ্ত শ্রেণিতে ছিল। কোনো মাছকে বিলুপ্ত বা আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত পাওয়া যায়নি। ২০০০ সালের মূল্যায়নে ২৬৬টি প্রজাতির মধ্যে ৫৪টিকে হুমকিগ্রস্ত ধরা হয়েছিল, এবং ২০১৫ সালের প্রতিবেদনের উপসংহার ছিল, তার পর থেকে দেশে মাছের ওপর হুমকি কমেনি।

দেশীয় মাছ ফেরাতে বিএফআরআইয়ের বৃহত্তর কাজ
খাঁচার গবেষণা দেশীয় প্রজাতি নিয়ে বিএফআরআইয়ের দীর্ঘ প্রচেষ্টারই অংশ। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ময়মনসিংহের বিএফআরআই আগের এক দশকে মাছ চাষের মাধ্যমে ১৬টি বিপন্ন দেশীয় মাছ সংরক্ষণে সহায়তা করেছে, যার মধ্যে পাবদা, গুলশা, টেংরা, দেশি কই, শিং ও মাগুর রয়েছে। প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউটের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদের উদ্ধৃতি ছিল: “দেশীয় মাছের জাতগুলো পুষ্টিতে ভরপুর এবং বেশি সুস্বাদু।”
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, বিএফআরআই প্রায় হারিয়ে যেতে বসা ২৩টি দেশীয় মাছের পোনা উৎপাদন করেছে, যার মধ্যে গুলশা ও পাবদাও আছে, এবং ইনস্টিটিউটে দেশীয় মাছের একটি জীবন্ত জিন ব্যাংক গড়ে তোলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, পুকুরে ছোট দেশীয় মাছের উৎপাদন ২০০৯ সালের ৬৭ হাজার ৩৪০ টন থেকে বেড়ে ২০১৭-১৮ সালে ২ লাখ ৪১ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালের মে মাসে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, বিএফআরআইয়ের ময়মনসিংহ স্বাদুপানি কেন্দ্রের গবেষকেরা টেংরা, গুলশা ও পাবদাসহ ২৪টি বিপন্ন প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজননে সফল হয়েছেন।
খাঁচায় গুলশা নিয়ে মাঠ গবেষণা যা পেয়েছে
২০২৫ সালের এপ্রিলের আগে প্রকাশিত কয়েকটি সমকক্ষ পর্যালোচিত গবেষণায় খাঁচায় গুলশা চাষ পরীক্ষা করা হয়েছে; এর একটির লেখকদের মধ্যে বিএফআরআইয়ের একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। এসব ফল যে পরিবেশে গবেষণা হয়েছে সেখানকার জন্য প্রযোজ্য, এগুলো বিএফআরআইয়ের আনুষ্ঠানিক সুপারিশ নয়।
চলনবিলে মজুদ ঘনত্ব। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. আবু সাঈদ জুয়েল ও সহকর্মীরা মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি কেবাংসান মালয়েশিয়ার গবেষকদের সঙ্গে মিলে এই গবেষণা করেন, যা অ্যাকুয়াকালচার রিপোর্টসে (খণ্ড ২৮, ২০২৩; অনলাইনে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে) প্রকাশিত হয়। নাটোরের সিংড়া উপজেলায় চলনবিল প্লাবনভূমির আত্রাই নদীতে ১২০ দিন ধরে গবেষণাটি চলে; লেখকেরা চলনবিলকে দেশের সবচেয়ে বড় জলাভূমি বলে উল্লেখ করেন। ৫ মিলিমিটার ফাঁসের নাইলন জালের ১২টি ভাসমান খাঁচা এক সারিতে বসানো হয়, প্রতিটির মাপ ৬ মিটার × ৩ মিটার × ২ মিটার (৩৬ ঘনমিটার), তলার কাদা থেকে প্রায় ৩ মিটার ওপরে। প্রথম দুই মাস ০.৫ মিলিমিটারের লাইনার নার্সারি হিসেবে কাজ করে, পরে পানি চলাচল ঠিক রাখতে তা খুলে ফেলা হয়। জমে থাকা ময়লা সরাতে প্রতি দুই সপ্তাহে শক্ত নাইলন ব্রাশ দিয়ে খাঁচা ঘষে পরিষ্কার করা হয়।
প্রায় ৫.৫৫ গ্রাম ওজনের পোনা প্রতি ঘনমিটারে ৫০, ১০০, ১৫০ ও ২০০টি করে ছাড়া হয়। লেখকেরা এই পরিসর বেছে নেন মৎস্য অধিদপ্তরের একটি নীতিপত্র (২০১৬) থেকে, যেখানে খাঁচায় প্রতি ঘনমিটারে ৫০ থেকে ২৫০টি পোনা ছাড়ার কথা বলা আছে। মাছকে দিনে দুবার ৩২ শতাংশ আমিষযুক্ত বাণিজ্যিক ভাসমান খাবার দেওয়া হয়: প্রথম দুই মাস দেহের ওজনের ৫ শতাংশ হারে, পরের দুই মাস ৩ শতাংশ হারে। পানির তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২৬ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রতি লিটারে প্রায় ৬.৪ থেকে ৬.৫ মিলিগ্রাম, যা মাছ চাষের উপযোগী সীমার মধ্যে।
সবচেয়ে কম ঘনত্বে ফল সবচেয়ে ভালো হয়। প্রতি ঘনমিটারে ৫০টি মাছে গুলশার ওজন বাড়ে ১৮.৭০ গ্রাম, বেঁচে থাকার হার ৯৫.৮৪ শতাংশ এবং খাদ্য রূপান্তর হার ১.৭৫; অথচ ২০০টিতে ওজন বাড়ে ৮.৬৬ গ্রাম, বেঁচে থাকার হার ৮৬.৬৬ শতাংশ এবং খাদ্য রূপান্তর হার ৪.০৯। খাঁচাপ্রতি মোট উৎপাদন ছিল সবচেয়ে কম ঘনত্বে ৮৮.৩১ কেজি আর সবচেয়ে বেশি ঘনত্বে ৪০.৮৯ কেজি। বিভিন্ন পরীক্ষায় মোট খরচের ৩৪ থেকে ৯৫ শতাংশই ছিল খাবারের খরচ, এবং লাভজনক ও ভালো ফলনের জন্য লেখকেরা প্রতি ঘনমিটারে ৫০টি মাছ ছাড়ার সুপারিশ করেন।

খরচ কমাতে খাবার দেওয়ার কৌশল। খাবারই যেহেতু সবচেয়ে বড় খরচ, দ্বিতীয় একটি গবেষণায় দেখা হয় সপ্তাহে কয়েক দিন খাবার বন্ধ রাখা যায় কি না। জেসমিন আরা ও সহকর্মীরা, ময়মনসিংহের বিএফআরআইয়ের মো. আয়েনউদ্দিন হককে সঙ্গে নিয়ে, জার্নাল অব ফিশারিজে (খণ্ড ১১, সংখ্যা ৩; অনলাইনে ২০২৩ সালের অক্টোবরে) এই গবেষণা প্রকাশ করেন। ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলনবিলের আত্রাই নদীতে গবেষণাটি চলে। ৬ মিটার × ৩ মিটার × ২ মিটার মাপের খাঁচাগুলোর কাঠামো ছিল স্টেইনলেস স্টিলের, আর ভাসানোর জন্য ব্যবহার করা হয় প্লাস্টিকের ড্রাম। প্রতিটি খাঁচা ০.৫ সেন্টিমিটার ফাঁসের জালে মোড়ানো, তার ওপরে ১ সেন্টিমিটার ফাঁসের আরেকটি জাল, দুটির মাঝে ১২.৭ সেন্টিমিটার ফাঁক, যাতে কাঁকড়া ভেতরের জাল কাটতে না পারে। খাঁচা যেন ভেসে না যায়, সে জন্য প্রতিটিকে তিনটি ব্লকের সঙ্গে বাঁধা হয়।
৭.৯০ থেকে ৮.১০ গ্রাম ওজনের হ্যাচারির পোনা প্রতি ঘনমিটারে ৫০টি করে ছাড়া হয় এবং দেহের ওজনের ৫ শতাংশ হারে ৩২ শতাংশ আমিষযুক্ত খাবার দেওয়া হয়, সকালে ৪০ শতাংশ ও রাতে ৬০ শতাংশ। চারটি পদ্ধতি তুলনা করা হয়: প্রতিদিন খাবার দেওয়া, আর সপ্তাহে এক, দুই বা তিন দিন খাবার বন্ধ রাখা। প্রতিদিন খাবার দিলে মাছ সবচেয়ে বড় হয়, কিন্তু সপ্তাহে এক দিন খাবার বন্ধ রাখলে খাদ্য রূপান্তর হার সবচেয়ে ভালো, উৎপাদন সবচেয়ে বেশি এবং লাভও সবচেয়ে বেশি হয়। লেখকদের উপসংহার, প্রবহমান পানিতে খাঁচায় প্রতি ঘনমিটারে ৫০টি গুলশা ছেড়ে সপ্তাহে এক দিন খাবার বন্ধ রাখা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।
পুকুরের ভেতরে খাঁচা। তৃতীয় একটি গবেষণায় মাহমুদুল হাসান মিঠুন ও সহকর্মীরা বাংলাদেশ জার্নাল অব ফিশারিজে (খণ্ড ৩৩, সংখ্যা ২, ২০২১; প্রকাশ ২০২২ সালের মার্চে) জানান, মাটির পুকুরে বসানো গোল জালের খাঁচায় প্রতি ঘনমিটারে ২০০, ৩০০ ও ৪০০টি পোনা ছেড়ে ৯০ দিন গুলশা পালন করা হয়। ওজন বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়নি, আর সবচেয়ে বেশি ঘনত্বে মোট উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয়, প্রতি ঘনমিটারে ৪.২৯ কেজি। নদীর গবেষণার সঙ্গে এই পার্থক্য দেখায়, ঠিক ঘনত্ব নির্ভর করে পরিবেশের ওপর: পুকুরের স্থির পানি আর নদীর প্রবহমান পানি এক ব্যবস্থা নয়।
চাষিদের জন্য গবেষণার অর্থ এবং কোথায় পরামর্শ মিলবে
গবেষকেরা নিজেরাই কয়েকটি শিক্ষা তুলে ধরেছেন। প্রবহমান পানিতে খাঁচা থাকলে স্রোত বর্জ্য সরিয়ে নেয়, তাই পানির মান স্থির থাকে; কাঁকড়া থেকে জাল রক্ষা করতে হয় এবং পানি চলাচলের জন্য নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হয়; শুরু হয় হ্যাচারির পোনা দিয়ে; আর খাবারই প্রধান খরচ, তাই মজুদ ঘনত্ব ও খাবার দেওয়ার সূচিই ঠিক করে খাঁচা লাভজনক হবে কি না।
নদী থেকে নদীতে, মৌসুম থেকে মৌসুমে পরিস্থিতি বদলায়, আর ওপরের গবেষণাগুলো ছিল গবেষণা প্রকল্প, সব জায়গার জন্য যাচাই করা প্যাকেজ নয়। খাঁচায় গুলশা বা অন্য দেশীয় মাছ চাষের কথা ভাবলে চাষির উচিত আগে মৎস্য অধিদপ্তরের উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা এবং বিএফআরআইয়ের পরামর্শ নেওয়া, যার ময়মনসিংহ স্বাদুপানি কেন্দ্র প্রতিবেদনে বর্ণিত গবেষণাটি করেছিল।
ছবি: Zeynel Cebeci / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), আইইউসিএন বাংলাদেশ (রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, ভলিউম ৫: ফ্রেশওয়াটার ফিশেস, ২০১৫), অ্যাকুয়াকালচার রিপোর্টস (জুয়েল ও সহকর্মী, ২০২৩), জার্নাল অব ফিশারিজ (আরা ও সহকর্মী, ২০২৩; সবুজ ও সহকর্মী, ২০২৪), বাংলাদেশ জার্নাল অব ফিশারিজ (মিঠুন ও সহকর্মী, ২০২১), বাকী ও ভুজেল (তেলাপিয়া চাষবিষয়ক নবম আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামের কার্যবিবরণী, ২০১১), মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় (ইনফোফিশে দেশভিত্তিক উপস্থাপনা, ২০২৪), দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস





মন্তব্য
(০)