২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে, আলু রোপণের ভরা মৌসুমে, রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের আলু চাষিরা সার ও বীজ নিয়ে বিপাকে পড়েন। কৃষকদের অভিযোগ ছিল, চাহিদামতো সার না পেয়ে অনেককে বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে, আর ভালো মানের বীজ আলুরও সংকট চলছে। তাঁরা এই সংকটকে কৃত্রিম বলে দাবি করেন এবং এর জন্য কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, ডিলার ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন। জাগো নিউজ ২৪ ৮ ডিসেম্বর এবং নিউ এজ ৩ ডিসেম্বর এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
উত্তরাঞ্চলে আলুর বড় আবাদ, বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বার্ষিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নিউ এজ জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ১০৬ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল, যার ৭৯ লাখ টনই এসেছিল রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে।
ডিএই রাজশাহীর তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় ৩৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। আগ্রহ বাড়ায় আরও প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরে আলু লাগানো হচ্ছিল। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি থেকে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়, যা আগের কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, এমন লক্ষ্যমাত্রার পরও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) চলতি মৌসুমে বীজ ও সারের বরাদ্দ বাড়ায়নি।
ডিএই রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের হিসাবে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহী জেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে নভেম্বরে ১৪ হাজার ৩৭৪ টন এমওপি, ২৫ হাজার ৬০০ টন ড্যাপ ও ৯ হাজার ২৮৬ টন টিএসপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

ডিলারের দোকানে সরকারি দামের চেয়ে বেশি
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে কৃষক পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দাম ছিল প্রতি বস্তা এমওপি ১ হাজার টাকা, ড্যাপ ১ হাজার ৫০ টাকা এবং টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা। পবা উপজেলার বায়া বাজারে বিসিআইসির এক ডিলারের দোকানে সরেজমিনে দেখা যায়, এমওপি ১ হাজার ১৮০ টাকা, ড্যাপ ১ হাজার ৩০০ টাকা ও টিএসপি ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। দোকানের এক কর্মচারী জানান, বরাদ্দ কম হওয়ায় তাঁরা অন্য জায়গা থেকে সার এনেছেন; প্রত্যেক ডিলার পেয়েছিলেন মোট ১২০ বস্তা টিএসপি, অথচ একজন কৃষকেরই ২০০ বস্তার বেশি লাগে।
তানোর উপজেলার কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, তাঁর ১৫ বিঘা জমিতে আলু লাগাতে ৩০ বস্তা এমওপি, ১৫ বস্তা ড্যাপ ও ১৫ বস্তা টিএসপি দরকার। তাঁর ভাষায়, ‘বিসিআইসি ডিলারের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও সরকার নির্ধারিত দামে মাত্র এক বস্তা এমওপি সার পেয়েছি।’ নিউ এজকে তিনি আরও বলেন, একই ডিলার অন্য উৎস থেকে আনার কথা বলে এমওপি বস্তাপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করছিলেন।

রংপুরে মানসম্মত বীজ আলুর ঘাটতি
বীজের সংকট রংপুর অঞ্চলেও ছিল। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ৩০ নভেম্বর ডিএই রংপুরের বরাত দিয়ে জানায়, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলায় এ মৌসুমে ১ লাখ ১ হাজার ৫৭৬ হেক্টরে আলু আবাদের লক্ষ্য ছিল। ওই অঞ্চলে ১ লাখ ৬৭ হাজার টন বীজের চাহিদার বিপরীতে বিএডিসি সরবরাহ করেছিল মাত্র ২ হাজার ৭৯৭ টন। কৃষকেরা জানান, আগের বছর প্রতি কেজি বীজ আলু ৬০ থেকে ৭০ টাকায় কিনলেও এ বছর জাতভেদে দাম ছিল ৭৫ থেকে ১৪০ টাকা। ডিএই রংপুরের অতিরিক্ত পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় অনেক চাষি আলু চাষে আগ্রহী হয়েছেন; চাহিদা বাড়া আর বীজের ঘাটতির কারণে দাম বেড়েছে।
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার, কৃষি বিভাগের বক্তব্য
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উঠে আসে আরেকটি দিক: অনেক কৃষক জানেন না কখন কতটা সার দিতে হয়। হাবিবুর রহমান বলেন, তাঁরা পূর্বপুরুষদের পদ্ধতিতে প্রতি বিঘায় রোপণের আগে দুই বস্তা (১০০ কেজি) এমওপি, এক বস্তা (৫০ কেজি) ড্যাপ ও এক বস্তা টিএসপি দেন। একই উপজেলার কৃষক মোস্তাকিন ইসলাম বলেন, ‘আমরা যত বেশি সার ব্যবহার করবো, মৌসুম শেষে তত বেশি ফলন পাবো।’ সারের মাত্রা নিয়ে কৃষি বিভাগের কেউ তাঁকে পরামর্শ দেননি বলে জানান তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক কাওসার আলী বলেন, ‘প্রতি বিঘা জমি আলু চাষের উপযোগী করতে ২০ থেকে ২৫ কেজি এমওপি এবং টিএসপি বা ড্যাপই যথেষ্ট।’ তাঁর মতে, সচেতনতার অভাবে বাড়তি সার দেওয়ায় কৃষকের আর্থিক ক্ষতি হয় এবং ফসলি জমির ওপরের মাটিও নষ্ট হয়, ফলে উৎপাদন কমে।

রাজশাহী ডিএইর উপপরিচালক উম্মে সালমা জানান, কৃষকেরা যাতে অনুমোদিত মাত্রায় সার দেন, সে জন্য নিয়মিত গ্রুপ মিটিং ও উঠান বৈঠক (ইয়ার্ড মিটিং) হচ্ছে এবং মাত্রার বেশি সার প্রয়োগ ঠেকাতে প্রচারণা চলছে। কৃষকদের দাবি, এসব উদ্যোগ অপর্যাপ্ত। দাম নিয়ে উম্মে সালমা বলেন, কোনো ডিলার যাতে কৃষকের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিতে না পারেন, সে জন্য তাঁরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন; কেউ অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ছবি: কুউ পুলক / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, নিউ এজ, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস





মন্তব্য
(০)