নদী বা বড় জলাশয়ে ভাসমান খাঁচা বসিয়ে বেশি ঘনত্বে বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদনের পদ্ধতিই খাঁচায় মাছ চাষ। কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) ‘কৃষি কথা’ পত্রিকায় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক লেখা অনুযায়ী, চীনের ইয়াংঝি নদীতে প্রায় সাড়ে সাতশ বছর আগে খাঁচায় মাছ চাষ শুরু হয়। বাংলাদেশে এই পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীর অভিজ্ঞতা থেকে, যাকে ‘ডাকাতিয়া মডেল’ বলা হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে পদ্ধতিটির ইতিহাস, খাঁচা তৈরি ও মাছ মজুদের মূল নিয়মগুলো তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশে খাঁচায় মাছ চাষের ইতিহাস
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের অধ্যাপক মো. আখতার হোসেনের পাঠ্য নোট অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে খাঁচায় মাছ চাষ শুরু হয়। মৎস্য অধিদপ্তর ১৯৮৫-৮৬ সালে কাপ্তাই হ্রদে খাঁচায় মাছ চাষের একটি প্রকল্প চালায়, আর ১৯৯৫ সালের শেষ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কেয়ার ও ডিএফআইডি ভূমিহীন দরিদ্র মানুষের জন্য ‘কেজেস’ প্রকল্প পরিচালনা করে।
বড় পরিসরে বাণিজ্যিক চাষের সূচনা ২০০২ সালে। ওই বছর থেকে চাঁদপুর জেলার ডাকাতিয়া নদী এবং লক্ষ্মীপুর জেলায় মেঘনা নদীর রহমতখালী চ্যানেলে খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ হচ্ছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যে পদ্ধতিটি থাইল্যান্ডের অনুকরণে শুরু হয়েছিল। কৃষি তথ্য সার্ভিসের লেখা অনুযায়ী, মাত্র ছয় বছরের মধ্যে এই দুই জায়গায় প্রায় এক হাজার খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ হচ্ছিল এবং তা থেকে বছরে প্রায় ৭০০ মেট্রিক টন রপ্তানিযোগ্য তেলাপিয়া উৎপাদিত হচ্ছিল। ডাকাতিয়ায় বাণিজ্যিক সাফল্যের কারণেই এখানকার ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন পদ্ধতিকে ‘ডাকাতিয়া মডেল’ বলা হয়।
ডাকাতিয়া নদী ভারতের ত্রিপুরার পাহাড়ি এলাকা থেকে এসে কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরের বড় স্টেশন মোলহেডের কাছে মেঘনায় মিশেছে। পরে দেশের অন্য নদীতেও পদ্ধতিটি ছড়ায়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের লেখায় আছে, ২০১০ সালে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় সুরমা নদীতে ১৮টি খাঁচা দিয়ে কাজ শুরু হয়ে দুই উপজেলায় ৭০টি খাঁচায় পৌঁছায়, যাতে ১৪৮টি পরিবার উপকৃত হয়। প্রথম আলোর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে কুড়িগ্রামের দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদে খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের খবর আছে।

খাঁচায় চাষের সুবিধা ও উপযোগী জায়গা
নদীর পানি প্রবহমান থাকায় খাঁচার ভেতরের পানি অনবরত বদলাতে থাকে, তাই পুকুরের চেয়ে বেশি ঘনত্বে মাছ রাখা যায়। অধ্যাপক আখতার হোসেনের নোটে খাঁচার আরও কিছু সুবিধার কথা আছে: খরচ তুলনামূলক কম, তৈরি করা সহজ ও দ্রুত, জমির ওপর নির্ভরতা কম, প্রয়োজনে সরিয়ে নেওয়া যায় এবং আলাদা পানি সরবরাহের ব্যবস্থা লাগে না। যাদের পুকুর বা জমি নেই, এমন দরিদ্র মানুষের জন্যও পদ্ধতিটি কাজে লাগতে পারে।
জায়গা বাছাইয়ের জন্য ওই নোটে চারটি বিষয় দেখতে বলা হয়েছে:
- নদীতে উপযুক্ত স্রোত, সেকেন্ডে ৪ থেকে ৮ ইঞ্চি হলে ভালো;
- নিরাপত্তার জন্য লোকালয়ের কাছাকাছি জায়গা;
- দূষণমুক্ত পানি;
- মাছ বাজারে নেওয়ার জন্য সহজ যোগাযোগব্যবস্থা।

খাঁচা তৈরি ও স্থাপন
ডাকাতিয়া মডেলে সাধারণত দুই মাপের খাঁচা ব্যবহার হয়: ২০ ফুট x ১০ ফুট x ৬ ফুট এবং ১০ ফুট x ১০ ফুট x ৬ ফুট। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটেও নদীর ভাসমান খাঁচার মাপ ৬ মিটার x ৩ মিটার x ২ মিটার বা ৩ মিটার x ৩ মিটার x ২ মিটার বলা হয়েছে। খাঁচার কাঠামো তৈরি হয় জিআই পাইপ দিয়ে, ভাসিয়ে রাখা হয় ২০০ লিটারের ড্রামে, আর নোঙর বা গেরাপি দিয়ে নদীর নির্দিষ্ট জায়গায় শক্ত করে বাঁধা হয়। জাল এমন হতে হবে যেন কাঁকড়া কেটে ফেলতে না পারে, কারণ কাঁকড়ার জাল কাটা খাঁচায় চাষের একটি পরিচিত সমস্যা।

পোনা মজুদ ও খাদ্য
মজুদ ঘনত্ব নির্ভর করে মাছের প্রজাতি ও উৎপাদন লক্ষ্য, পানির গভীরতা ও স্রোত, জালের ফাঁসের মাপ এবং খাদ্যের মান ও পরিমাণের ওপর। অধ্যাপক আখতার হোসেনের নোট অনুযায়ী, নদীর খাঁচায় খাদ্যনির্ভর মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষে প্রতি ঘনমিটারে ৩০ থেকে ৪০টি মাছ মজুদ করা যায়, যদি মজুদের সময় পোনার ওজন ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম হয়।
স্রোতের পানিতে খাবার যেন ভেসে থাকে এবং জালের ফাঁক দিয়ে নষ্ট না হয়, সে জন্য ভাসমান পিলেট খাদ্য দিতে হয়। তেলাপিয়ার খাদ্যে ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ আমিষ থাকা দরকার। মাছের ওজন অনুযায়ী দৈনিক কতটা খাবার দিতে হবে, কখন বাছাই করতে হবে এবং রোগ হলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত। খাঁচায় বছরে দুই থেকে তিনবার মাছ উৎপাদন করা যায়।

খাঁচায় চাষের প্রচলিত সমস্যা
অধ্যাপক আখতার হোসেনের নোটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাঁচায় চাষের কিছু সমস্যার কথাও বলা হয়েছে: মানসম্মত পোনার অভাব, কম দামে সম্পূরক খাদ্য না পাওয়া, বসতবাড়ি থেকে খাঁচা দূরে থাকায় দেখাশোনার সমস্যা, বন্যায় মাছ বেরিয়ে যাওয়া, কাঁকড়ার জাল কাটা, পাট জাগ দেওয়ার কারণে পানির মান খারাপ হওয়া, ঝড়, রোগ ও পরজীবীতে মাছ মারা যাওয়া, চুরি এবং বিষ প্রয়োগ।
ছবি: AsikBinRahim / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (অনলাইন ডেস্ক), কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষি কথা, জানুয়ারি ২০১৮), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মৎস্য বিভাগ (অধ্যাপক মো. আখতার হোসেনের পাঠ্য নোট), প্রথম আলো (৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫), উইকিপিডিয়া (খাঁচায় মাছ চাষ, ডাকাতিয়া নদী, নাইল তেলাপিয়া)




মন্তব্য
(০)