২০২৬ সালের জুলাইয়ের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার। ১৪ জুলাই (মঙ্গলবার) ঢাকায় সাংবাদিকদের এ কথা জানান কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেন, বন্যাদুর্গত এলাকায় গবাদিপশুর জন্য শুকনা খাদ্য সরবরাহ করা হবে এবং রোগ প্রতিরোধে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হবে।
জাগো নিউজ ২৪ জানায়, সচিবালয়ে বন্যাজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও ঢাকা ট্রিবিউনের খবরে ঘোষণাটি এসেছে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে।
ঘোষণার আগে বন্যার ক্ষতির চিত্র
ঘোষণার আগের কয়েক দিনে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে চট্টগ্রাম বিভাগসহ কয়েকটি জেলায় বড় ক্ষতি হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১২ জুলাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে জানায়, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ, এই সাত জেলায় বন্যায় অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু হয় এবং ২ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে ১৫,৯১১.১৬ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ছিল ৯,০৪৩.৫ হেক্টর আউশ ধান, ৯৬০.৬৬ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৫,৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি। জেলা মৎস্য অফিসের হিসাবে ১৫৩টি ইউনিয়নের ৯,৯৩৩টি পুকুর, দিঘি ও মাছের খামার থেকে মাছ ভেসে যায়; এ খাতে ক্ষতি ধরা হয় প্রায় ৯১.৪২ কোটি টাকা। ১১ জুলাই প্রকাশিত এই হিসাবকে প্রাথমিক বলে জানিয়েছিলেন কর্মকর্তারা।

আমনের বীজতলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি
মন্ত্রী বলেন, চলমান বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা। অনেক এলাকায় ধানের চারা পানির নিচে তলিয়ে গেছে, ফলে কৃষকদের নতুন করে রোপণের প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে তখনো ব্যাপক পরিসরে আমন রোপণ শুরু না হওয়ায় বড় ধরনের ফসলহানির আশঙ্কা তুলনামূলক কম বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আমন বাংলাদেশের বর্ষানির্ভর ধানের মৌসুম। এ ধানের চারা সাধারণত জুলাই থেকে আগস্টে রোপণ করা হয় এবং নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরে ফসল কাটা হয়। দেশের ধানের মৌসুমগুলোর মধ্যে আমনের আবাদ এলাকাই সবচেয়ে বড়।
মন্ত্রী জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরা সার্বক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করছেন, আর মন্ত্রণালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে। দুর্গত এলাকায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও কৃষি বিভাগের জমিতে জরুরি বীজতলা তৈরি করা হবে। সেখানে উৎপাদিত চারা পানি নেমে যাওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষকদের দেওয়া হবে। জাগো নিউজের খবরে মন্ত্রী বলেন, ১৫ আগস্ট পর্যন্ত রোপণ উপযোগী ধানের জাত দিয়ে পুনরায় আবাদ নিশ্চিত করা হবে।
ঢাকা ট্রিবিউনের খবরে মন্ত্রী বলেন, যাঁরা আগেই ধান রোপণ করেছিলেন, তাঁরা শুধু ফসলই হারাননি, জমিতে দেওয়া সারও বন্যার পানিতে ধুয়ে গেছে; তাই আবার চাষ শুরু করতে তাঁদের বাড়তি সহায়তা লাগবে। নগদ সহায়তা দেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আপাতত বীজ ও সার সরবরাহেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে; প্রয়োজন হলে পরে অতিরিক্ত সহায়তা প্যাকেজ বিবেচনা করা হবে।
গবাদিপশুর খাদ্য ও খুরা রোগের টিকা
গবাদিপশুর খাদ্যসংকটের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বন্যায় খড়, ঘাস ও পশুখাদ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাই দুর্গত এলাকায় গরু ও ছাগলের জন্য শুকনা খাদ্য, খড় ও ভুসি সরবরাহ করা হবে।
তিনি বলেন, বর্ষা ও বন্যার সময় গবাদিপশুর রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে খুরা রোগ প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সব গবাদিপশুকে দ্রুত টিকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; বাসস ও ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, এক থেকে দুই দিনের মধ্যে এই টিকাদান শুরুর কথা বলেন তিনি। বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউওএএইচ) তথ্যমতে, খুরা রোগ গবাদিপশুর একটি গুরুতর ও অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা গরু, শূকর, ভেড়া, ছাগলসহ দ্বিখণ্ডিত খুরের প্রাণীকে আক্রান্ত করে। সংস্থাটি বলছে, রোগটি সহজে মানুষের মধ্যে ছড়ায় না এবং এটি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নয়। পশুর টিকার বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মাছচাষিদের ক্ষতি ও পূর্ণ হিসাবের অপেক্ষা
মৎস্য খাতের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আকস্মিক বন্যায় অনেক পুকুরের পাড় ভেঙে মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং তাঁদের সহায়তায় সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
কৃষিতে মোট ক্ষতির পরিমাণ জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, তখনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ চলছে। কৃষি, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন খাতের ক্ষতির বিস্তারিত চিত্র তৈরিতে আরও কয়েক দিন লাগবে বলে জানান তিনি।
ছবি: MdRamjanAliWiki / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (WOAH), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)