২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা উপজেলা ও বেনাপোল এলাকায় শীত ও কুয়াশা দুটোই বেড়ে যায়। সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত মাঠঘাট ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকছিল। জাগো নিউজ ২৪ ৬ জানুয়ারি জানায়, এতে কৃষকের সদ্য তৈরি বোরো ধানের বীজতলা কোল্ড ইনজুরি বা ঠান্ডাজনিত ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ে, আর কৃষকেরা পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে চারা বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন।
শার্শা যশোর জেলার একটি সীমান্ত উপজেলা। এর পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আর এই উপজেলাতেই বেনাপোল শহর, যেখানে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর।
দেরিতে শীত, তারপর দ্রুত তাপমাত্রা কমা
আবহাওয়া অফিসের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেই মৌসুমে এ অঞ্চলে শীত এসেছিল বেশ দেরিতে। নভেম্বরের শেষ দিকেও গরম ছিল; ডিসেম্বরের শুরু থেকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং জানুয়ারির শুরুতে শীত জেঁকে বসে।
৫ জানুয়ারি (রোববার) যশোরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মতিউর রহমান বিমানঘাঁটি নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া অফিসের এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, আগের এক সপ্তাহ ধরে যশোরের তাপমাত্রা কমছিল, প্রতিদিন এক থেকে দুই ডিগ্রি করে।

বীজতলা বাঁচাতে কৃষকের বাড়তি খরচ
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই মৌসুমে শার্শায় ১১৭৫ হেক্টর জমিতে বোরোর বীজতলা করা হয়েছিল, আর তখনও অনেকে নতুন বীজতলা তৈরি করছিলেন।
কৃষক জাহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, তখন বোরোর বীজতলা তৈরির ভরা মৌসুম, কিন্তু শুরুতেই ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতে বীজতলা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল; তাই তাঁরা বাজার থেকে পলিথিন কিনে বীজতলা রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। আরেক চাষি আব্দুল মান্নান জানান, সে বছর আমনের ফলন কম হওয়ায় তাঁরা আগেই লোকসানে ছিলেন; এখন চড়া দামে পলিথিন কিনতে গিয়ে খরচ আরও বাড়ছে, আর এভাবে চললে বোরো আবাদ ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে বলে তাঁর আশঙ্কা।
কৃষি বিভাগ ও ব্রির পরামর্শ
শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা জাগো নিউজকে বলেন, শীত ও কুয়াশায় ধানের চারার মাথায় পানি জমে থাকা এবং ঠান্ডার কারণে বীজতলা নষ্ট হয়। তাই কৃষকদের পুরো বীজতলা পলিথিনে ঢেকে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, সে বছর অনেক চাষি সমলয় পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করেছিলেন।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ) মো. আবু তালহা বলেন, বোরোর ভালো ফলনের জন্য মানসম্মত চারার বিকল্প নেই। কৃষকেরা অভিজ্ঞতা থেকে রাতে বীজতলা পলিথিনে ঢেকে রাখছিলেন এবং দিনে তা সরিয়ে নিচ্ছিলেন। তাপমাত্রা আরও কমলে বীজতলা থেকে ঠান্ডা পানি বের করে দিয়ে বেশি করে সেচ দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছিল বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রকাশিত নির্দেশনাও একই ধরনের:
- শৈত্যপ্রবাহের সময় বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢেকে দিতে হবে।
- শৈত্যপ্রবাহ দীর্ঘ সময় চললে দিনে ও রাতে সবসময় পলিথিন দিয়ে চারা ঢেকে রাখতে হবে।
- তখন বীজতলার দুই পাশে পলিথিন আংশিক খোলা রাখতে হবে।
২০২৪ সালের জানুয়ারির শৈত্যপ্রবাহের সময় নিউ এজের প্রতিবেদনে কৃষিবিদেরাও রাতে স্বচ্ছ পলিথিনে বীজতলা ঢেকে রাখা, প্রতিদিন সকালে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচ দেওয়া এবং চারা ও বীজতলা থেকে প্রতিদিন শিশির ঝরিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলায় কোনো ছত্রাকনাশক বা সার দেওয়ার আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বোরো মৌসুম ও সমলয় পদ্ধতি
বোরো দেশের প্রধান ধানের মৌসুম; নিউ এজের ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো থেকে। মাঠে রোপণের আগে চারা বীজতলায় প্রায় ৪৫ দিন বড় হয়, আর রোপণ সাধারণত জানুয়ারির মাঝামাঝি শুরু হয়ে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শেষ হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্বের শিক্ষক মশিউর রহমান তখন নিউ এজকে বলেছিলেন, তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে বোরোর বৃদ্ধি থমকে যায়, আর ঘন কুয়াশা সূর্যের আলো আটকে সালোকসংশ্লেষণে বাধা দেয়।
দীপক কুমার সাহা যে সমলয় পদ্ধতির কথা বলেছেন, তাতে প্লাস্টিকের ট্রেতে যন্ত্রের সাহায্যে ধানের বীজ বোনা হয় এবং রাইস ট্রান্সপ্লান্টার দিয়ে একই গভীরতায় সমানভাবে চারা লাগানো হয়। দ্য ডেইলি স্টার বাংলার ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে একটি মাঠের কৃষকেরা একই জাতের ধান একই সময়ে রোপণ করেন, ফলে ধান একসঙ্গে পাকে এবং একসঙ্গে ঘরে তোলা যায়।

ছবি: Abuxyz bokor / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), নিউ এজ, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)