উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ২০২৬ সালের ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শক্তিয়ারখলা সড়ক ও তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ারপুর সড়ক আবারও পানিতে তলিয়ে যায়। এতে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের সঙ্গে তাহিরপুর উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় লক্ষাধিক মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন।
টানা দুই দিন ধরে সুনামগঞ্জে এবং উজানে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। প্রথম আলোর সেদিনের প্রতিবেদনে চেরাপুঞ্জির পাশাপাশি মৌসিনরামেও ভারী বৃষ্টির কথা বলা হয়। এই বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে জেলার সব নদ-নদী ও হাওরে পানি দ্রুত বাড়ছিল।
মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টি, বাড়ছিল সুরমার পানি
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হিসাবে, ৮ জুলাই বুধবার সকাল ৯টা থেকে ৯ জুলাই সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। প্রথম আলো জানায়, চলতি মৌসুমে এক দিনে এটিই ছিল জেলার সর্বোচ্চ বৃষ্টি; এর আগে ২৮ এপ্রিল এক দিনে ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। দুই দিনে জেলায় বৃষ্টি হয় ৩৬৫ মিলিমিটার।
৯ জুলাই সকাল ৯টায় সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ৭ দশমিক ২০ মিটার, আগের দিন একই সময়ে যা ছিল ৬ দশমিক ৬৯ মিটার। ২৪ ঘণ্টায় পানি বাড়ে ৫১ সেন্টিমিটার। এই পয়েন্টে বিপৎসীমা ৭ দশমিক ৮০ মিটার, অর্থাৎ নদী তখনো বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছিল। ছাতকে সুরমা, তাহিরপুরে যাদুকাটা ও পাটলাই, জগন্নাথপুরে কুশিয়ারা, দোয়ারাবাজারে খাসিয়ামারা এবং সদর উপজেলায় চলতি নদের পানিও বাড়ছিল। সীমান্তবর্তী সদর, ছাতক, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার ও তাহিরপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছিল।
সুরমা বাংলাদেশ ও ভারতের আসামের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি বড় আন্তসীমান্ত নদী। ভারতের বরাক নদী বাংলাদেশ সীমান্তে এসে সুরমা ও কুশিয়ারায় ভাগ হয়, পরে কিশোরগঞ্জে ভৈরবের কাছে দুই নদী মিলে মেঘনা নাম নেয়। উজানের চেরাপুঞ্জি (সোহরা) পৃথিবীর অন্যতম বৃষ্টিবহুল এলাকা হিসেবে পরিচিত, আর কাছের মৌসিনরামকে এখন সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল স্থান ধরা হয়। তাই মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টি হলে সেই পানি অল্প সময়ের মধ্যে সুনামগঞ্জের নদী ও হাওরে নেমে আসে।

নৌকায় যাতায়াত, বাড়তি খরচ আর ঝুঁকি
তাহিরপুর থেকে সুনামগঞ্জে আসা মামুনুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, 'পাহাড়ি ঢল নামলেই এই সড়কটি তলিয়ে যায়। এটা সত্যিই কষ্টদায়ক। বছরে বছরে এমন দুর্ভোগ মেনে নেওয়া যায় না।'
আজাদ মিয়া নামের আরেকজন বলেন, 'ছোট বোন সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি। অবস্থা আশঙ্কাজনক। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে নৌকায় করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে খরচ ও ভোগান্তি দুটোই বেড়েছে।'
সুনামগঞ্জ থেকে অটোরিকশায় তাহিরপুরে মালামাল নিয়ে যাওয়া চালক রেজাউল বলেন, 'তীব্র স্রোতের গতিতে রাস্তার এক পাশ থেকে আরেক পাশে ঢলের পানি যাচ্ছে। কিন্তু আমাকে যেভাবেই হোক মালামাল নিয়ে তাহিরপুর যেতে হবে। কারণ এই মালামাল পৌঁছাতে পারলে বাড়তি কিছু টাকা পাবো।'
হাওরের পানি নিয়ে অবশ্য স্থানীয়দের দেখার ভঙ্গি ভিন্ন। বিশ্বম্ভরপুরের মল্লিকপুর গ্রামের বাসিন্দা ও পলাশ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আবদুল গণী আনসারী প্রথম আলোকে বলেন, 'এখন হাওরে যে পানি আছে, সেটাকে আমরা স্বাভাবিক বর্ষা বলি। বর্ষায় হাওর দিয়ে মানুষের যাতায়াত ও মাছের উৎপাদন বাড়াতে এই পানির দরকার আছে। তবে ব্যাপক বৃষ্টি হচ্ছে। এখন বন্যা না হলেই হলো।' হাওর হলো বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাটির মতো নিচু জলাভূমি; বর্ষায় নদী-খালের পানিতে তা বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয় এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র হয়, শুকনো মৌসুমে সেই জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়।

বন্যার আশঙ্কায় প্রশাসনের প্রস্তুতি
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস ছিল, ৯ ও ১০ জুলাই সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টি হবে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাভাস ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কয়েক দিনের মধ্যে জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছিল। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রস্তুতি হিসেবে প্রতিটি উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত, স্বেচ্ছাসেবক ও মেডিকেল টিম গঠন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট মজুত এবং নৌযান প্রস্তুত রাখা হয়; সব দপ্তরকে সতর্ক রাখা হয়।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার মেহেদী হাসান হৃদয় বলেন, বন্যা কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পাউবো সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর বিভাগ-২) মো. এমদাদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, বৃষ্টির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে; এর মধ্যেই বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুরের সড়ক তলিয়ে গেছে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে ও উজানে আরও দুই দিন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় পানি আরও বাড়বে এবং জেলায় সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

ছবি: Sumon Mallick / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া (সুরমা নদী, চেরাপুঞ্জি, হাওর)





মন্তব্য
(০)