দেশের বাজারে ইলিশের রেকর্ড দামের মধ্যেই ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, সোমবার, আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেয় সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সেদিন এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এবং কেজিপ্রতি ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য ১২ দশমিক ৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন ঢাকার বাজারে এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ বিক্রি হচ্ছিল আড়াই হাজার টাকায়।
রপ্তানির শর্ত ও সময়সীমা
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ইউএনবির খবর অনুযায়ী, আগের বছরগুলোর মতো এবারও রপ্তানি হবে শর্তসাপেক্ষে। আগ্রহী রপ্তানিকারকদের ১১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার মধ্যে অফিস সময়ে আবেদনের কাগজ জমা দিতে বলা হয়। আবেদনের সঙ্গে চাওয়া হয় হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, ইআরসি, আয়কর ও ভ্যাট সনদ, বিক্রয় চুক্তি এবং মৎস্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স। প্রজ্ঞাপনের আগে যাঁরা আবেদন করেছিলেন, তাঁদেরও নতুন করে আবেদন করতে বলা হয়।
জাগো নিউজ জানায়, অনুমোদিত পরিমাণের বেশি রপ্তানি করা যাবে না, অনুমতি হস্তান্তর করা যাবে না এবং অনুমোদিত রপ্তানিকারক ছাড়া ঠিকায় (সাব-কন্ট্রাক্ট) রপ্তানি করা যাবে না। সরকার যে কোনো সময় রপ্তানি বন্ধ করতে পারবে। প্রতিবেদনটি প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য ১ হাজার ৫২৫ টাকা হিসাব করে, যে দামে ঢাকার বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছিল না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, দেশে দাম বেশি থাকায় ও উৎপাদন কমার আশঙ্কায় এবার অনুমোদিত পরিমাণ কমানো হয়েছে এবং রপ্তানিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি রয়েছে। জাগো নিউজের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের দুর্গাপূজায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রথমে ৩ হাজার টন রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত ২ হাজার ৪২০ টনের অনুমতি দেয়; সেবার ৪৯টি প্রতিষ্ঠান অনুমতি পেয়েছিল।

বাজারে দাম ও ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া
জাগো নিউজের ৮ সেপ্টেম্বরের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশের জন্য বিক্রেতারা তিন হাজার টাকারও বেশি চাইছিলেন। সুপারশপে এক কেজি ওজনের ইলিশের কেজি ছিল কম-বেশি ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। প্রায় ৮০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং প্রায় ৬০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, সে বছর ইলিশের দাম ছিল ৯০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, আগের বছর যা ছিল ৮০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা।
সেগুনবাগিচা বাজারে সরকারি চাকরিজীবী মনির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, 'এ বছর এখনো ইলিশ খেতে পারিনি। বাজারে চড়া দামে। এর মধ্যে ভারতে রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ভেবেছিলাম দাম কমবে। এখন আর খাওয়ার কোনো আশাই থাকলো না।'
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, 'এর মধ্যে রপ্তানি করলে ব্যবসায়ীরা আরও দাম বাড়িয়ে দেবে। সরকারের উচিত ছিল সাধারণ মানুষের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।' ইলিশ বিশেষজ্ঞ আনিছুর রহমান বলেন, 'এর মধ্যে ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্ত না নেওয়া ভালো ছিল বলে আমার মনে হয়।' ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ভরা মৌসুমে ৫০০ থেকে ১০০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের গড় দাম ছিল ৫০৫ টাকা।
আহরণ কমার আশঙ্কা
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জাগো নিউজ জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৪২ হাজার টন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব তখনো তৈরি হয়নি, তবে আহরণ আবারও কমার আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
আনিছুর রহমানের ব্যাখ্যায়, ইলিশের ভরা মৌসুম সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর। তাঁর মতে আবহাওয়ার পরিবর্তন, দূষণ, নদীর নাব্য কমে যাওয়া এবং নদীতে মাছের পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় ইলিশ কমছে। ইলিশ (Tenualosa ilisha) বাংলাদেশের জাতীয় মাছ; ডিম ছাড়ার জন্য এটি সাগর থেকে নদীতে উঠে আসে। ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়।

ভারতে ইলিশ রপ্তানির পটভূমি
২০১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত জাতীয় রপ্তানি নীতিতে (২০১৫-১৮) ইলিশ শর্তসাপেক্ষে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের তালিকায় রাখা হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রপ্তানি বন্ধ ছিল এবং দুর্গাপূজার সময় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার টন ইলিশের চাহিদা জানান। জাগো নিউজ জানায়, ২০১৯ সালে প্রথম অনুমতির পর ইলিশের তিনটি চালান ভারতে যায়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ইলিশ রপ্তানি হয় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৭৬ টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৯৯ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ২৩০ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৯১ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০২ টন।

ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ইউএনবি, উইকিপিডিয়া (ইলিশ)





মন্তব্য
(০)