দেশে ইলিশ উৎপাদন গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আমিরুল ইসলাম। ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল, জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের প্রথম দিনে জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, টেকসই ব্যবস্থাপনা, মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা নিধন বন্ধ, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে।
ইলিশ (Tenualosa ilisha) বাংলাদেশের জাতীয় মাছ; ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট এটি দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএফআরআইয়ের সদর দপ্তর ময়মনসিংহে, আর এর নদী কেন্দ্রটি চাঁদপুর জেলায়, যেখানে পদ্মা ও মেঘনা মিলেছে।
উৎপাদনের হিসাব: বিজ্ঞানী ও মন্ত্রীর বক্তব্য
ড. আমিরুল ইসলামের ভাষ্য, ২০০৩-০৪ সাল থেকে সরকার ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পর উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। এর আগে নির্বিচারে মা ইলিশ ও জাটকা ধরার কারণে উৎপাদন নেমে গিয়েছিল প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টনে। পরে গবেষণাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমে উৎপাদন আবার বাড়তে থাকে।
তিনি জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন। পরের বছরগুলোতে তা ৫ লাখ ৫০ হাজার, ৫ লাখ ৬৫ হাজার ও ৫ লাখ ৬৬ হাজার টন হয়ে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছায়। তাঁর মতে, সরকারি তথ্যে এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ইলিশ ব্যবস্থাপনার সাফল্য দেখায়। বাস্তবতা ও গবেষণার তথ্যে ফারাক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সরকারি গবেষণার ভিত্তিতেই তথ্য প্রকাশ করা হয় এবং সরকারি তথ্যই গ্রহণযোগ্য। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় বড় আকারের ইলিশ কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এর আগের দিন, ৬ এপ্রিল সচিবালয়ে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ৫ লাখ টনে নেমেছে, যা দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মন্ত্রী বলেন, নদী ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ ও মৎস্য সম্পদের ওপর ক্রমাগত চাপের কারণে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন।

প্রজনন রক্ষায় অভয়াশ্রম ও নিষেধাজ্ঞা
ড. আমিরুল ইসলাম বলেন, ইলিশ পরিযায়ী মাছ; সাগর থেকে নদীতে এসে ডিম ছাড়ে। তাই এর প্রজনন ও আবাসস্থল রক্ষা জরুরি, এবং এমনভাবে ইলিশ আহরণ করতে হবে যাতে প্রাকৃতিক প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত না হয়। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ ডিম ছাড়তে নদীর উজানে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যায়। কৃত্রিমভাবে ইলিশের পোনা উৎপাদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও তা সম্ভব হয়নি, তাই প্রাকৃতিক প্রজননের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ছয়টি ইলিশ অভয়াশ্রম রয়েছে, যার পাঁচটিতে মার্চ-এপ্রিল দুই মাস সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, যাতে জাটকা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে। ৬ এপ্রিলের সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের তালিকায় আরও ছিল:
- ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা, পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- প্রজনন মৌসুমে বিজ্ঞানভিত্তিক সময় ধরে ২২ দিন ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ।
- ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় সব ধরনের মাছ আহরণ নিষিদ্ধ।
- নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থান।

নাব্যতা, দূষণ ও জনসম্পৃক্ততা
উৎপাদন বাড়াতে ড. আমিরুল ইসলাম কয়েকটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেন: মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা নিধন বন্ধ, অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ, নদী ও সাগরের দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান। মন্ত্রীও সংবাদ সম্মেলনে কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালসহ অবৈধ জাল দিয়ে নির্বিচারে জাটকা নিধনকে উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অন্তরায় বলেন।
নদীর নাব্যতা কমে যাওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে এই বিজ্ঞানী বলেন, নদীতে বিপুল পলি জমে ইলিশের চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; পর্যাপ্ত স্রোত না থাকলে পলি জমে প্রজনন ব্যাহত হয়, তাই পরিকল্পিত নদী খনন ও ড্রেজিং জরুরি। তাঁর মতে, শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক পদার্থ নদী ও সাগরের পানির মান নষ্ট করছে, যা ইলিশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
ড. আমিরুল ইসলাম বলেন, ইলিশ সংরক্ষণ শুধু সরকারের কাজ নয়, সামাজিক দায়িত্বও; ইলিশ এলাকার মানুষসহ সবাইকে নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে এবং সরকারের নিষেধাজ্ঞা সবার মেনে চলা জরুরি। মন্ত্রণালয় জানায়, এ বছরের জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল দেশের ইলিশসমৃদ্ধ ২০টি জেলায় পালিত হবে, প্রতিপাদ্য 'জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী', আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে চাঁদপুর সদরে।

ছবি: Nahid Sultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দেশ রূপান্তর, উইকিপিডিয়া (ইলিশ; বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট)





মন্তব্য
(০)