২০২২ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দেশজুড়ে প্রচণ্ড শীত পড়তে শুরু করে, আর হাঁস-মুরগি ও মাছ পালন করেন যে কৃষকেরা, তাঁদের সামনে আসে বছরের সবচেয়ে কঠিন সময়। ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি জাগো নিউজ ২৪ জানায়, আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর শীতে প্রাণী ও পুকুরের যত্নে কৃষকদের জন্য বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হিমেল হাওয়া যেমন মানুষের সহ্য হয় না, তেমনি হাঁস-মুরগিও শীতে কাবু হয়ে যায়, আর মাছের খামারেও শীতে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
হাঁস-মুরগির বিষয়ে অধিদপ্তর সতর্ক করে যে এই শীতে হাঁস-মুরগি নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাদের পরামর্শ ছিল, পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এক সপ্তাহ বয়সী বাচ্চাকে রানিক্ষেত রোগের এবং দুই সপ্তাহ বয়সী বাচ্চাকে গামবোরো রোগের টিকা দিতে হবে, আর হাঁস-মুরগির থাকার জায়গা সপ্তাহে দুই দিন পরিষ্কার করতে হবে। খুপরি বা খোঁয়াড়ের ভেতরে যাতে ঠান্ডা বাতাস ঢুকতে না পারে, সে জন্য চারপাশে চটের বস্তা বা প্লাস্টিকের পর্দা দিতে বলা হয়। অধিদপ্তরের মতে, মুরগির ঘরে সন্ধ্যার পর এক থেকে দুই ঘণ্টা বাল্ব জ্বালিয়ে রাখলে ডিম উৎপাদন বাড়বে এবং রোগবালাই কম হবে।
মাছের বিষয়ে অধিদপ্তর জানায়, শীতের সময় পুকুরের পানিতে অক্সিজেন কমে যেতে পারে। এ জন্য পানির পিএইচ (দ্রবীভূত হাইড্রোজেন আয়নের সক্রিয়তার পরিমাপ) দেখে প্রয়োজনমতো চুন প্রয়োগ, পুকুরের তলা থেকে আগাছা তুলে ফেলা, পাড়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা, পুকুরের পানি নেড়ে দেওয়া এবং রোদ ঝলমলে দিনে মাছকে খাবার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। শীত আসার আগে পুকুরের আশপাশের গাছের ডালপালা ছেঁটে দিতেও বলা হয়, কারণ তা না হলে শীতে ঝরে পড়া পাতা পুকুরের পানি নষ্ট করে দেয়।
জানুয়ারি কেন সবচেয়ে কঠিন মাস
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশে তিনটি স্পষ্ট ঋতু দেখা যায়, যার মধ্যে শীতল ও শুষ্ক মৌসুম চলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। জানুয়ারি দেশের শীতলতম মাস। শীতকালে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর একটি উচ্চচাপ কেন্দ্র অবস্থান করে, আর সেখান থেকে ঠান্ডা বাতাসের একটি প্রবাহ দেশের উত্তর-পূর্ব কোণ দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। জানুয়ারিতে গড় তাপমাত্রা উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে উপকূলীয় এলাকায় ২০ থেকে ২১ ডিগ্রি পর্যন্ত থাকে। ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির শুরুতে দেশের একেবারে উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে।
শীত এর চেয়েও তীব্র হতে পারে। ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার জানায়, উত্তরের জেলাগুলোতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। তাপমাত্রাটি মাপা হয় সকাল ৮টা ৩৮ মিনিটে, আর সেদিন নীলফামারীতে তাপমাত্রা নামে ৩ ডিগ্রিতে। আবহাওয়া অফিস সেদিন দেশের কিছু অংশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশার পূর্বাভাসও দিয়েছিল। এমন ঠান্ডা রাত আর কুয়াশায় ঢাকা, রোদহীন দিনের কথা মাথায় রেখেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শগুলো দেওয়া হয়েছিল।

দেশের ঘরে ঘরে হাঁস-মুরগি
গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতেই হাঁস-মুরগি পালন করা হয়। খানা জরিপের তথ্য উদ্ধৃত করে বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশের ৮৩ দশমিক ৯ শতাংশ খানা গবাদিপশু বা হাঁস-মুরগির মালিক এবং ৭৬ দশমিক ৩ শতাংশ খানা হাঁস-মুরগি পালন করে; প্রতিটি খানায় গড়ে ৬ দশমিক ৮টি হাঁস-মুরগি থাকে। মুরগির মধ্যে আছে নির্দিষ্ট জাতহীন দেশি মুরগি, আসিল, চট্টগ্রামের মুরগি ও গলাছিলা মুরগি, আবার বিদেশি জাতের মধ্যে হোয়াইট লেগহর্ন, রোড আইল্যান্ড রেড, ফাউমি ও অস্ট্রালর্প এবং নানা বাণিজ্যিক ব্রয়লার ও লেয়ার জাত। হাঁসের মধ্যে জ্ঞানকোষটি দেশি হাঁস, সিলেট মেটে, নাগেশ্বরী, মাসকোভি ও রাজহাঁসের পাশাপাশি বিদেশি খাকি ক্যাম্পবেল, ইন্ডিয়ান রানার, জিনডিং ও চেরি ভ্যালি জাতের কথা উল্লেখ করেছে। গ্রামের পরিবেশে পালনের উপযোগী সংকর মুরগির মধ্যে রয়েছে সোনালি, যার জন্ম রোড আইল্যান্ড রেড মোরগ ও ফাউমি মুরগির সংকরায়ণে। গৃহপালিত হাঁসের আদি পুরুষ বুনো মালার্ড বা নীলশির হাঁস।
২০২১-২২ সালের শীত যখন শুরু হয়, বাণিজ্যিক পোলট্রি খাত তখন একটি কঠিন সময় পার করছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২১ সালের ২৮ আগস্ট জানায়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ২০২০-২১ সালের প্রাণিসম্পদ অর্থনীতি প্রতিবেদনে ডিম ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধির হিসাব দিয়েছে: ডিম উৎপাদন বেড়েছে ৩২১ কোটি পিস, আর মাথাপিছু বছরে ডিমের প্রাপ্যতা ১০৪টি থেকে বেড়ে হয়েছে ১২১টি। অধিদপ্তরে নিবন্ধিত পোলট্রি খামার ছিল প্রায় ৯০ হাজার, আর বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা এক লাখের বেশি। শিল্পসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো এই প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে আপত্তি তোলে: বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের হিসাবে, মহামারির মধ্যে আগের দেড় বছরে ডিম উৎপাদনকারী খামারের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং মাংস উৎপাদনকারী পোলট্রি ইউনিটের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, অধিদপ্তরের তথ্য সঠিক। যে খামারিরা তখনো ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছিলেন, শীতে ঠান্ডা ও রোগে পাখি হারানো ছিল তাঁদের জন্য বড় ক্ষতি।

টিকার পরামর্শের পেছনের রোগগুলো
রানিক্ষেত নামেই বাংলাদেশে নিউক্যাসল রোগ বেশি পরিচিত। এটি পাখির একটি ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রথম শনাক্ত হয় ১৯২৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভায় এবং ১৯২৭ সালে ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল আপন টাইনে। ভাইরাসটি মূলত আক্রান্ত পাখির বিষ্ঠা এবং নাক, মুখ ও চোখের নিঃসরণের সংস্পর্শে ছড়ায়; দূষিত খাবার, পানি, যন্ত্রপাতি ও পোশাকের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। লক্ষণের মধ্যে আছে শ্বাসকষ্ট, ঘাড় বেঁকে যাওয়া ও পক্ষাঘাত, মুখ ফুলে যাওয়া, সবুজ পাতলা পায়খানা এবং ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া; তীব্র ক্ষেত্রে পাখি হঠাৎ মারা যায়। এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই; টিকা ও পরিচ্ছন্নতাই নিয়ন্ত্রণের উপায়।
বাংলাপিডিয়া লিখেছে, গ্রামীণ বাংলাদেশে নিউক্যাসল রোগ বেশ ব্যাপক এবং গ্রামের মুরগি মারা যাওয়ার প্রধান কারণ; এতে মৃত্যুহার ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, আর আক্রান্ত ডিমপাড়া মুরগির ডিমের পরিমাণ ও মান দুই-ই অনেক কমে যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০০৪ সালের একটি প্রযুক্তি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলে সুরক্ষাহীন হাঁস-মুরগির সাধারণত ৮০ শতাংশ পর্যন্ত এ রোগে মারা যেতে পারে, আর রোগটি পাখি থেকে পাখিতে সংস্পর্শে ছড়ায়, গ্রামের হাটে পাখি একসঙ্গে মেশানো হলে যা আরও বাড়ে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ২০১৭ সালের জুন-জুলাইয়ে গ্রামীণ হাঁস-মুরগির ওপর চালানো এবং ২০১৮ সালে প্রিভেন্টিভ ভেটেরিনারি মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, নমুনায় নেওয়া পাখির ৮৩ দশমিক ৪ শতাংশকে এ রোগের টিকা দেওয়া হয়নি, আর ২১ দশমিক ২ শতাংশ পাখির শরীরে ভাইরাসটির অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে।
গামবোরো বা ইনফেকশাস বারসাল ডিজিজ হয় বার্নাভিরিডি গোত্রের একটি ভাইরাসে, যা প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যারের গামবোরো এলাকায়। রোগটি সাধারণত তিন থেকে ছয় সপ্তাহ বয়সী মুরগির বাচ্চাকে আক্রমণ করে এবং বারসা অব ফ্যাব্রিসিয়াস নামের অঙ্গটি নষ্ট করে দেয়, যে অঙ্গ পাখির অ্যান্টিবডি তৈরির কোষ জোগায়। যে পাখি বেঁচে যায়, তার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অন্য রোগে সহজে আক্রান্ত হয়। লক্ষণের মধ্যে আছে পাতলা পায়খানা, পালক উসকোখুসকো হয়ে যাওয়া, ঝিমিয়ে পড়া ও খাওয়া কমে যাওয়া। ভাইরাসটি খামারের ঘর ও পানিতে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে, তাই প্রাদুর্ভাবের পর শুধু পরিষ্কার করাই অনেক সময় যথেষ্ট হয় না। বাংলাপিডিয়া জানায়, ঢাকা ও আশপাশের খামারে মুরগির বাচ্চার ব্যাপক মৃত্যুর জন্য গামবোরোকে দায়ী মনে করা হয়েছিল, আর এতে মৃত্যুহার ৫০ শতাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আরও কিছু রোগ ঋতুর সঙ্গে আসে। বাংলাপিডিয়া বলছে, ফাউল পক্স বা মুরগির বসন্ত, যে ভাইরাসজনিত রোগে ঝুঁটি, চোখের পাতা ও নাকের ছিদ্রের চারপাশে আঁচিলের মতো গুটি ওঠে, বাংলাদেশে সাধারণত শীতকালে বেশি দেখা যায়। হাঁসের জন্য আলাদা হুমকি ডাক প্লেগ বা হাঁসের প্লেগ, যার কারণ একটি হারপিস ভাইরাস। রোগটি দূষিত পানি ও সরাসরি সংস্পর্শে ছড়ায়, পরিযায়ী জলচর পাখি কোনো লক্ষণ ছাড়াই এর জীবাণু বহন করতে পারে, আর মৃত্যুহার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এ রোগ মানুষে ছড়ায় না। গৃহপালিত হাঁসকে বুনো জলচর পাখি ও দূষিত পানি থেকে দূরে রাখা এবং নতুন কেনা পাখি পরীক্ষা করে নেওয়া প্রতিরোধের উপায়গুলোর মধ্যে পড়ে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রতিটি টিকার কথা পশু চিকিৎসকের পরামর্শের সঙ্গে যুক্ত করে বলেছিল; কোন খামারে কোন বয়সে কোন টিকা কীভাবে দিতে হবে, তা জানাবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর। ছোট পরিসরে হাঁস-মুরগি পালন নিয়ে এফএওর ২০০৪ সালের নির্দেশিকা আরও দুটি সাধারণ কথা বলে: ভাইরাসজনিত রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় টিকা, আর বেশির ভাগ প্রচলিত টিকা পাখিকে দেওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত ঠান্ডায় সংরক্ষণ (কোল্ড চেইন) করতে হয়, কারণ গরমে রাখা টিকা নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে এবং তাতে কোনো সুরক্ষা মেলে না।
খোঁয়াড় গরম রাখা, তবে বাতাস চলাচল বন্ধ না করে
অধিদপ্তরের পরামর্শমতো খোঁয়াড়ের চারপাশে চটের বস্তা বা প্লাস্টিক দিলে রাতের ঠান্ডা বাতাস থেকে পাখি রক্ষা পায়। এফএওর ছোট পরিসরে হাঁস-মুরগি পালনের নির্দেশিকা এখানে ভারসাম্যের কথা মনে করিয়ে দেয়: মানুষের চেয়ে মুরগির বেশি বাতাস চলাচল দরকার, তবে বাতাস, ধুলা ও বৃষ্টি থেকে তাদের আড়াল রাখতে হবে, আর শীতপ্রধান অঞ্চলে মুরগির ঘরের দেয়াল মোটা বা তাপনিরোধী হওয়া উচিত। রাতে নামিয়ে দেওয়া যায় এবং রোদের দিনে তুলে রাখা যায় এমন পর্দা দুই প্রয়োজনই মেটায়। মুরগির ছোট বাচ্চাকে গরম ও শুকনো রাখতে হবে, আর নির্দেশিকা অনুযায়ী রাতের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে বাসার জায়গায় খড় বিছিয়ে তা গরম রাখা উচিত।
উষ্ণতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ আলো। এফএওর নির্দেশিকা বলছে, মুরগির ঘর ভালোভাবে আলোকিত থাকা অপরিহার্য, কারণ অন্ধকার ঘরে পাখি ঝিমিয়ে পড়ে, নিষ্ক্রিয় ও অনুৎপাদনশীল হয়ে যায়, আর আলো খুব কম হলে ডিম উৎপাদন কমে। বাণিজ্যিক ডিম উৎপাদনকারীরা গ্রীষ্মের দিনের দৈর্ঘ্যের অনুকরণে আলোর সময়সূচি মেনে চলেন, যাতে মুরগি সারা বছর ডিম পাড়ে, কারণ দিনের দৈর্ঘ্য ডিম পাড়া নিয়ন্ত্রণকারী সংকেতগুলোর একটি। জানুয়ারির ছোট দিনে সন্ধ্যার পর এক থেকে দুই ঘণ্টা বাল্ব জ্বালিয়ে রাখার পরামর্শের পেছনে এই যুক্তিই কাজ করে। তবে এফএওর নির্দেশিকা সতর্ক করে যে দিনে ১৭ ঘণ্টার বেশি আলো ডিম উৎপাদনের ক্ষতি করতে পারে; তাই বাড়তি আলোর উদ্দেশ্য শীতের ছোট দিনকে কিছুটা লম্বা করা, সারা রাত ঘর আলোকিত রাখা নয়।
পরামর্শের তৃতীয় অংশ ছিল পরিচ্ছন্নতা। এফএওর নির্দেশিকা অনুযায়ী, পাখি ঘরের ভেতরে রাখা হলে মেঝে প্রতিদিন ঝাড়ু দিতে হবে, বাইরের মুরগির ঘর প্রতি সপ্তাহে পরিষ্কার করতে হবে, খাবার ও পানির পাত্র ঘন ঘন ধুতে হবে, অসুস্থ পাখিকে আলাদা করতে হবে, মরা পাখি দ্রুত মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে এবং নতুন কেনা পাখিকে ঝাঁকে মেশানোর আগে অন্তত ১৫ দিন আলাদা রাখতে হবে।

শীতে পুকুর: রোদ, অক্সিজেন আর খাবার
বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় মাছের স্থান কেন্দ্রীয়। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর মৎস্য অধিদপ্তর ও তাদের মৎস্য পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪৫ দশমিক ০৩ লাখ টন, যার ৫৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ এসেছে চাষ থেকে। চাষের মাছ ২৫ দশমিক ৮৪ লাখ টন, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে আহরিত মাছ ১২ দশমিক ৪৮ লাখ টন এবং সামুদ্রিক মাছ ৬ দশমিক ৭১ লাখ টন। মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণ ছিল ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম, যেখানে লক্ষ্য ছিল ৬০ গ্রাম, আর দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বে তৃতীয়, চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম এবং তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ। অধিদপ্তরের হিসাবে মৎস্য খাতের অবদান জাতীয় জিডিপির ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপির ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ; ২০২০-২১ অর্থবছরের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ দশমিক ৫২ লাখ টন।
রুই, কাতলা ও মৃগেলের মতো কার্পজাতীয় মাছ দেশের মিঠাপানির প্রায় সব এলাকায় পাওয়া যায় এবং পুকুরে ব্যাপকভাবে চাষ হয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী রুই প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হয়; কমন কার্প চীন থেকে বাংলাদেশে আনা হয় ১৯৬০ সালে, আর মিরর কার্প নেপাল থেকে ১৯৭৯ সালে। মাছ শীতল রক্তের প্রাণী; বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, পরিবেশের অবনতি হলে মাছ সহজেই রোগে আক্রান্ত হয়, আর মাছের রোগের প্রধান কারণ পানির মানের অবনতি, অতিরিক্ত মাছ মজুত, অতিরিক্ত খাবার দেওয়া, পানিদূষণ ও পুকুরের দুর্বল ব্যবস্থাপনা।
অক্সিজেন কমে যাওয়ার সতর্কতাটি বোঝা যায় পুকুর কীভাবে শ্বাস নেয় তা থেকে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত এফএওর অভ্যন্তরীণ জলজ চাষ প্রকৌশল বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা ব্যাখ্যা করে, দিনের বেলা শৈবাল ও জলজ উদ্ভিদ সূর্যালোক ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষণ করলে পুকুরের পানিতে অক্সিজেন বাড়ে, আর রাতে শুধু শ্বসন চলায় অক্সিজেন কমে। মেঘলা দিনে অক্সিজেন কম তৈরি হয়, ফলে রাতের মজুত কম থাকে এবং তা ফুরিয়েও যেতে পারে; নির্দেশিকায় এমন পুকুরের কথাও আছে যেখানে সূর্যোদয়ের সময় অক্সিজেন বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে গিয়েছিল। পুকুরের তলায় জৈব পদার্থ পচতেও অক্সিজেন খরচ হয়। কুয়াশাঢাকা শীতের দিন আর পানিতে পচতে থাকা পাতা, দুটিই মাছের বিপক্ষে কাজ করে।
এ কারণেই অধিদপ্তরের ব্যবহারিক পরামর্শগুলো একে অপরের পরিপূরক। পুকুরের ওপর ঝুঁকে থাকা ডালপালা ছেঁটে দিলে পানিতে বেশি রোদ পড়ে এবং পাতা পানিতে পড়ে না; আগাছা ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার করলে পচনশীল উপাদান কমে; পানি নেড়ে দিলে ওপরের স্তরের অক্সিজেন নিচের স্তরে মেশে, যে পদ্ধতিকে এফএওর নির্দেশিকা দিনের অক্সিজেন পুকুরজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছে। রোদ ঝলমলে দিনে খাবার দেওয়ার পরামর্শও একই যুক্তির। বাংলাপিডিয়ায় পুকুর ব্যবস্থাপনার বিবরণেও দৈনিক খাবার দেওয়ার সময়সূচি মেঘলা ও বৃষ্টির দিন ছাড়া চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, কারণ ঠান্ডা ও মেঘলা আবহাওয়ায় মাছ যে খাবার খায় না, তা তলায় জমে পচে।
অধিদপ্তরের উল্লেখ করা আরেকটি উপকরণ চুন, যা অভ্যাসবশে নয়, পুকুরের পিএইচ দেখে দিতে হবে। বাংলাপিডিয়া মাছের কয়েকটি রোগ নিয়ন্ত্রণের উপায়ের মধ্যে নিয়মিত চুন প্রয়োগের কথা বলেছে এবং জানিয়েছে, পুকুরে চুন দিলে কার্পের পোনার ব্যাকটেরিয়াজনিত ফুলকা পচা রোগে উন্নতি হতে পারে। কতটা চুন লাগবে তা নির্ভর করে পুকুরের মাটি, পানি ও পিএইচের ওপর; অধিদপ্তরের পরামর্শে কোনো মাত্রা দেওয়া হয়নি। নিজের পুকুরে কতটা চুন দরকার তা নিয়ে নিশ্চিত না হলে পানি পরীক্ষা করিয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ক্ষতরোগ: শীতে পুকুরের মাছের বড় হুমকি
শীতের মাসগুলোতে মাছচাষিরা যে রোগকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান, তা হলো এপিজুটিক আলসারেটিভ সিনড্রোম (ইইউএস), দেশে যা ক্ষতরোগ নামে পরিচিত। অ্যাফানোমাইসিস ইনভাডান্স নামের একটি জলজ ছত্রাকসদৃশ জীব (ওয়াটার মোল্ড) এ রোগের কারণ, আর এটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মিঠা ও লোনা পানির বহু প্রজাতির মাছকে আক্রমণ করে। আক্রান্ত মাছের চামড়ায় প্রথমে লাল দাগ দেখা দেয়, যা পরে গভীর ক্ষতে পরিণত হয়; এরপর সংক্রমণ ভেতরের অঙ্গে ছড়ায় এবং মাছ মারা যায়। অল্প আক্রান্ত মাছকে ভালো মানের পানিতে সরিয়ে নিলে তা সেরে উঠতে পারে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশে রোগটি প্রথম ধরা পড়ে ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জে, আর একই বছরের সেপ্টেম্বরে ফরিদপুরে। সাধারণত ভারী বৃষ্টি বা বন্যার পর, যখন পানির ক্ষারত্ব ও লবণের পরিমাণ কমে যায় এবং মৌসুমি তাপমাত্রা কমতে শুরু করে, তখন এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তলায় বাস করা মাংসাশী মাছ সাধারণত আগে আক্রান্ত হয়; সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩০ শতাংশ আক্রান্তের হার পাওয়া গেছে শোল-টাকি-গজার জাতীয় (চান্না প্রজাতি) মাছে, এর পরেই বেশ সংবেদনশীল পুঁটি জাতীয় মাছ। মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য এ রোগের কোনো ঝুঁকির কথা জানা যায়নি, তবে যেখানেই রোগটি দেখা দিয়েছে, সেখানেই মাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে।
এ আহমেদ ও এম এ রবের এক জরিপ, যা ১৯৯৫ সালে জার্নাল অব ফিশ ডিজিজেস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়, বাংলাদেশের ২৫৭টি পুকুরের ৪৬ শতাংশে এ রোগ পায়। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় থাই সরপুঁটির পুকুর, ৬৪ শতাংশ, অথচ শুধু নাইলোটিকা (নাইল তেলাপিয়া) চাষ করা কোনো পুকুর আক্রান্ত হয়নি। থাই সরপুঁটি মজুত, পোনা ছাড়ার আগে অবাঞ্ছিত মাছ মারতে বিষ প্রয়োগ এবং আগে পরিত্যক্ত পড়ে থাকা পুকুরে চাষ, এসব কারণে প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা বেড়েছিল; অন্যদিকে থাই সরপুঁটি ছাড়া অন্য প্রজাতি বেছে নেওয়া এবং পোনা মজুতের পর চুন ব্যবহার করলে পুকুরের মাছ কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছিল। শীত শুরুর সময় পুকুরের পানি ভালো অবস্থায় রাখা ও বুঝেশুনে চুন ব্যবহারের পরামর্শের সঙ্গে এই ফলাফল সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কৃষকেরা কোথায় সহায়তা পাবেন
এ ধরনের পরামর্শ কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয় সরকারের কয়েকটি সংস্থা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাজের সূচনা ১৮৯৩ সালে, ব্রিটিশ শাসনামলে সিভিল ভেটেরিনারি ডিপার্টমেন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে; এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার ফার্মগেটের কৃষি খামার সড়কে, আর গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসাসেবা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ সেবার দায়িত্ব এই অধিদপ্তরের। মৎস্য অধিদপ্তর প্রকাশ করে মৎস্য পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ, যা দেশের মাছ উৎপাদনের জাতীয় হিসাব। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সদর দপ্তর ময়মনসিংহে; ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্র, চাঁদপুরের নদী কেন্দ্র, খুলনার পাইকগাছার লোনাপানি কেন্দ্র ও কক্সবাজারের সামুদ্রিক কেন্দ্র এবং রাঙামাটি ও সান্তাহারের উপকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মৎস্য গবেষণা চালায়।
২০২২ সালের জানুয়ারির শীতে অসুস্থ হাঁস-মুরগি বা মরতে থাকা মাছ নিয়ে বিপাকে পড়া কৃষকের জন্য কার্যকর পথ ছিল হাঁস-মুরগির ক্ষেত্রে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আর পুকুরের ক্ষেত্রে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শগুলো সংক্ষেপে:
- পশু চিকিৎসকের পরামর্শে মুরগির বাচ্চাকে এক সপ্তাহ বয়সে রানিক্ষেতের এবং দুই সপ্তাহ বয়সে গামবোরোর টিকা দিন।
- সপ্তাহে অন্তত দুই দিন হাঁস-মুরগির ঘর পরিষ্কার করুন এবং বিছানা শুকনো রাখুন।
- খোঁয়াড়ের চারপাশে চটের বস্তা বা প্লাস্টিকের পর্দা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঠেকান, তবে বাতাস চলাচলের সুযোগ রাখুন।
- মুরগির ঘরে সন্ধ্যার পর এক থেকে দুই ঘণ্টা বাল্ব জ্বালিয়ে রাখুন।
- পুকুরের পিএইচ দেখে প্রয়োজন হলে তবেই চুন দিন।
- পুকুরের তলার আগাছা তুলে ফেলুন, পাড়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করুন এবং পানি নেড়ে দিন।
- রোদ ঝলমলে দিনে মাছকে খাবার দিন এবং পুকুরের ওপর ঝুঁকে থাকা ডালপালা ছেঁটে দিন, যাতে পাতা পানিতে না পড়ে।
ছবি: Masum Ibn Musa / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, মৎস্য অধিদপ্তর (মৎস্য পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০১৯-২০), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), প্রিভেন্টিভ ভেটেরিনারি মেডিসিন (বেলগ্রাদ ও অন্যান্য, ২০১৮), জার্নাল অব ফিশ ডিজিজেস (আহমেদ ও রব, ১৯৯৫), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)