২০২৫ সালের দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু ৫ অক্টোবর রপ্তানির সময়সীমা শেষ হওয়া পর্যন্ত ভারতে গেছে মোট ১৪৪ মেট্রিক টন ইলিশ। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার মাছ আমদানিকারকদের বরাত দিয়ে ১৪ অক্টোবর জাগো নিউজ ২৪ জানায়, বাংলাদেশ থেকে এত কম ইলিশ আসায় কলকাতার ক্রেতারা হতাশ।
অনুমতি ১ হাজার ২০০ টনের, এল ১৪৪ টন
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শর্তসাপেক্ষে ৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে এই ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেয়। রপ্তানির সময় ঠিক হয় ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর, আর প্রতি কেজির ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য ধরা হয় ১২ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার। শর্ত ছিল, রপ্তানি নীতি ২০২৪-২৭ মেনে চলতে হবে এবং অনুমোদিত পরিমাণের বেশি পাঠানো যাবে না।
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে ১৪৪ মেট্রিক টন ইলিশ ভারতে গেছে, তার মধ্যে প্রায় ৩৯ মেট্রিক টন গেছে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্য ত্রিপুরায়। বাকিটা এসেছে হাওড়ার পাইকারি মাছের বাজারে। সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় তখনকার মতো বাংলাদেশ থেকে আর কোনো ইলিশ পশ্চিমবঙ্গে আসার সুযোগ ছিল না।
অনুমোদন আর প্রকৃত রপ্তানির এই ফারাক নতুন নয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম আলো জানায়, আগের অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৫০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও সব মিলিয়ে রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ৮০২ টন। ২০১২ সালের জুলাই থেকে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ রাখার পর ২০১৯ সাল থেকে পূজা উপলক্ষে ভারতে বিশেষ অনুমতিতে ইলিশ পাঠানো হচ্ছে। ২০১৭ সালে ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়।

কম ধরা, বেশি দাম: আমদানিকারকের ব্যাখ্যা
হাওড়ার ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ জাগো নিউজকে বলেন, "বাংলাদেশ সরকার ১২০০ মেট্রিক টন ইলিশ আমাদেরকে দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ইলিশ মাছ কম ধরা পড়েছে। ফলে বেশি মাছ আনা সম্ভব হয়নি। এছাড়া দামও বেশি ছিল।"
তার ভাষ্য, এবার যত কম মাছ এসেছে তা আগের সব বছরের চেয়ে কম; আগের বছর পূজার আগে এসেছিল ৫৭৭ মেট্রিক টন। কলকাতায় বাংলাদেশের ইলিশ কোথাও প্রতি কেজি ১ হাজার ৯০০ রুপি, কোথাও ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ রুপিতে বিক্রি হয়েছে, ফলে অনেকে কেনেননি। তিনি বলেন, সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা বেশি, আর চাহিদা থাকলে দামও বেশি হয়।
মাকসুদের মতে, শুরু থেকেই বাংলাদেশের মাছের জোগান কম ছিল, আর সেখানকার ব্যবসায়ীরাও দেখছিলেন বেশি মাছ পাঠানো যায় কি না। তিনি বলেন, "আগে দেশের লোক খাবে তারপরে মাছ আসবে।" তার মতে, বাংলাদেশের ইলিশ দুই পারের বাঙালির মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে; তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরের বছর পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।
বাংলাদেশে ইলিশ আহরণের চিত্র
আমদানিকারকের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি তথ্যের মিল আছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বণিক বার্তা ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জানায়, আগের বছরের তুলনায় জুলাইয়ে ইলিশ আহরণ ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং আগস্টে ৪৭ দশমিক ৩১ শতাংশ কমেছে; পাঁচ বছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, প্রাকৃতিক কারণে এবারও উৎপাদন সীমিত হয়েছে।
প্রথম আলোর ৪ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয় ৫ লাখ ২৯ হাজার টন, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশের বাজারে ইলিশের কেজি ছিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। পত্রিকাটির উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞরা অতিরিক্ত আহরণ, অবৈধ কারেন্ট জাল, নদীদূষণ, কম বৃষ্টি ও নদীর গভীরতা কমে যাওয়াকে কারণ হিসেবে দেখান।
এর মধ্যেই মা ইলিশের নিরাপদ প্রজননের জন্য ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন দেশজুড়ে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বেচাকেনা নিষিদ্ধ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

কলকাতার বাজারে গুজরাট ও মিয়ানমারের ইলিশ
জাগো নিউজ জানায়, বাংলাদেশের ইলিশ না মিললেও কলকাতার বাজারে তখন গুজরাট ও মিয়ানমারের ইলিশ ছিল প্রচুর। গুজরাটের ইলিশ প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ৯০০ রুপি এবং মিয়ানমারের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার রুপিতে বিক্রি হচ্ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাদ ও গন্ধের জন্য পদ্মার ইলিশের কদর বেশি, তাই প্রতি বছর পূজার আগে গঙ্গাপাড়ের মানুষ বাংলাদেশের ইলিশের অপেক্ষায় থাকেন।


ছবি: Yogabrata Chakraborty / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ট্রিবিউন (ভারত), বণিক বার্তা, প্রথম আলো




মন্তব্য
(০)