২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পৌষ মাসের শুরুতে মাগুরা জেলার চারটি উপজেলাতেই কৃষকেরা আগাম পেঁয়াজ চাষে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর জানায়, তীব্র শীত উপেক্ষা করে ভোর থেকেই তারা পেঁয়াজের চারার আঁটি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। শ্রীপুর উপজেলার নাকোল গ্রামের কদমতলা উত্তর গোবিন্দপুর মাঠে দেখা যায়, সকাল থেকেই কৃষকেরা হাতে করে পেঁয়াজের চারা জমিতে রোপণ করছেন; সারিবদ্ধভাবে প্রতিটি লাইনে চারাগাছ বসানো হচ্ছে।
এই রোপণ চলেছে ২০২৫-২৬ সালের শীতের প্রথম শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে। দুই দিন আগে, ২৭ ডিসেম্বর, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর মাগুরার দক্ষিণের প্রতিবেশী জেলা যশোরসহ চুয়াডাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নীলফামারীর ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহের কথা জানায়। সেদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয় যশোরে, ইউএনবির বরাতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এ খবর দেয়।
মাঠে কৃষকেরা: শীত, শ্রমিক ও খরচ
শীতের মধ্যে কাজ করার কথা বলেছেন কৃষক হারেজ আলী। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, 'আজ চার দিন হলো সূর্যের দেখা ঠিকঠাক মিলছে না। তীব্র শীত উপেক্ষা করে কাজে আসতে চায় না সাধারণ কৃষক। তবুও পারিবারিক আর্থিক অভাব-অনটনের কারণে আমাদের কাজ করতে হয়। কাদা, মাটি, পানি, কাচি নিয়ে আমাদের কাজ।'
আগাম ফসল কীভাবে তোলা হয়, তা বুঝিয়ে বলেছেন নাকোল গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, 'একমাস আগে পেঁয়াজের চারার বীজ রোপণ করেছিলাম। একমাসের মধ্যে চারা গজানোর পরপর তা উত্তোলন করে জমিতে রোপণ করতে হয়। পৌষের শুরুতে ২০ বিঘা জমিতে আগাম পেঁয়াজের চারা রোপণ করছি। এতে ৮-১০ জন শ্রমিক নিয়োগ করেছি।'
খরচ ও প্রত্যাশার হিসাবও দিয়েছেন তিনি: 'প্রতিদিন একেক জন শ্রমিক বাবদ ৫০০-৬০০ টাকা খরচ হচ্ছে। ২০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে উৎপাদন খরচ হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা। আশা করছি আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হবে। এবার বাম্পার ফলন হলে এ চাষে ৩০ লাখ টাকা আয় হবে। চৈত্র মাসের শুরুতে এই পেঁয়াজ উঠতে শুরু করবে।'
কদমতলা উত্তর গোবিন্দপুর গ্রামের চাষি ইকরাম মোল্লা পেঁয়াজ লাগাচ্ছিলেন ১৫ বিঘা জমিতে। তিনি বলেন, 'আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পেঁয়াজের আবাদ ভালো হবে। তীব্র শীতের মধ্যে পেঁয়াজের চারা রোপণ করছি। এই চাষে ৬-৭ লাখ টাকা আয় করবো। চাষে আমার ৪ লাখ খরচ হচ্ছে। পেঁয়াজের চারা রোপণের আগে জমি প্রস্তুত করতে হয়। চারা গাছ রোপণের পরপর জমিতে নিয়মিত সার ও সেচ দিতে হবে।'
রোপণের পরের পরিচর্যার কথাও বলেছেন তিনি: 'পেঁয়াজের চারা একমাস পর বড় হলে জমিতে পরিচর্যা বাড়াতে হবে। অতিরিক্ত ঘন কুয়াশার কারণে পেঁয়াজের চারা অনেক সময় বাড়তে বাধাগ্রস্ত হয়। চারা গাছের বেশি ক্ষতি হলে কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিতে হবে। এবার আমি দুই জাতের পেঁয়াজের বীজ রোপণ করেছি। আশা করছি আবহাওয়া ও পরিবেশ অনুকূলে থাকলে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হবে।' জাত দুটির নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
কৃষকদের দেওয়া খরচ ও আয়ের সংখ্যাগুলো রোপণের সময়ে তাদের নিজেদের অনুমান; তখনো একটি কন্দও তোলা হয়নি। তাদের ব্যবহৃত বিঘা স্থানীয় জমির মাপ: বাংলাদেশে এক বিঘা সমান ২০ কাঠা বা ১৪ হাজার ৪০০ বর্গফুট (প্রায় ১ হাজার ৩৩৭ দশমিক ৮ বর্গমিটার), আর এক একর সমান ৩ দশমিক ০২৫ বিঘা।

জেলা কৃষি বিভাগ যা জানাল
মাগুরার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. তাজুল ইসলাম আগাম পেঁয়াজ চাষের তৎপরতার কথা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, 'এবার শীত মৌসুমে মাগুরার ৪ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে আগাম পেঁয়াজ চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। এবার আবহাওয়া ও পরিবেশ অনুকূলে থাকলে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হবে।'
আবাদের হিসাব দিয়ে তিনি বলেন, 'চলতি বছর জেলায় ৮৫৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। সদরে ১৪০ হেক্টর, শ্রীপুরে ৪৫০ হেক্টর, শালিখায় ২০৫ হেক্টর ও মহম্মদপুরে ১৬৩ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।' প্রকাশিত চার উপজেলার সংখ্যা জেলার মোট হিসাবের সঙ্গে মেলে না; প্রতিবেদনে এই পার্থক্যের ব্যাখ্যা নেই, আর হিসাবটি শুধু এ পর্যন্ত রোপণ করা আগাম পেঁয়াজের নাকি পুরো মৌসুমের, তাও বলা হয়নি।
কৃষকদের সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমরা কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। বিনা মূল্যে প্রান্তিক চাষিদের মাঝে সার ও বীজ বিতরণ করেছি।' কতজন কৃষক কী পরিমাণ উপকরণ পেয়েছেন, প্রতিবেদনে তা জানানো হয়নি।
এই হিসাব যে সংস্থার, সেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯৮২ সালে কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা) ও পাট পরিদপ্তরসহ কয়েকটি পুরোনো দপ্তর একীভূত করে এটি গঠিত হয়; উদ্ভিদ সংরক্ষণ ও উদ্যান উন্নয়নের কাজও এর আওতায় আনা হয়। মাগুরায় এর জেলা কার্যালয়ের প্রধান উপপরিচালক, যে পদে ছিলেন মো. তাজুল ইসলাম।
মাগুরা জেলা ও শ্রীপুর উপজেলা
মাগুরা খুলনা বিভাগের জেলা, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জেলার আয়তন ১ হাজার ৩৯ দশমিক ১০ বর্গকিলোমিটার, অবস্থান ২৩ ডিগ্রি ১৫ মিনিট থেকে ২৩ ডিগ্রি ৪১ মিনিট উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে। এর উত্তরে রাজবাড়ী, দক্ষিণে যশোর ও নড়াইল, পূর্বে ফরিদপুর এবং পশ্চিমে ঝিনাইদহ জেলা। ১৯৪৫ সালে মাগুরা মহকুমা গঠিত হয়, আর ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ এটি জেলায় রূপান্তরিত হয়।
জেলায় উপজেলা চারটি, উপপরিচালক যে চারটির নাম বলেছেন: মাগুরা সদর (৪০১ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার), মহম্মদপুর (২৩৩ দশমিক ৭০), শালিখা (২২৮ দশমিক ৬৫) ও শ্রীপুর (১৭৫ দশমিক ১৫)। জেলায় একটি পৌরসভা, ৩৬টি ইউনিয়ন, ৫১৩টি মৌজা ও ৭১১টি গ্রাম রয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৯ লাখ ১৮ হাজার ৪১৯ জন, আর বাংলাপিডিয়ার হিসাবে পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রধান নদী গড়াই-মধুমতি, নবগঙ্গা ও কুমার।
প্রতিবেদক যেখানে রোপণ দেখেছেন, সেই শ্রীপুর আয়তনে জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা। বাংলাপিডিয়া এর আটটি ইউনিয়নের নাম দিয়েছে: আমলসার, কাদিরপাড়া, গয়েশপুর, দারিয়াপুর, নাকোল, শ্রীকোল, শ্রীপুর ও সব্দালপুর; কৃষকেরা যে নাকোল গ্রামে কাজ করছিলেন, সেই নামেই একটি ইউনিয়ন। উপজেলার উত্তরে রাজবাড়ীর পাংশা ও বালিয়াকান্দি উপজেলা, আর এর নদীর মধ্যে আছে গড়াই, কুমার ও মরা কুমার। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় শ্রীপুরের প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, সরিষা, ডাল ও শাকসবজি, আর সেখানে পরিবারের আয়ের ৬৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ আসে কৃষি থেকে।

আগের মৌসুমগুলোতে মাগুরার পেঁয়াজ
মাগুরায় পেঁয়াজ নতুন ফসল নয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, সে বছর জেলায় ৬ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছিল, মোট উৎপাদন ছিল ৮৫ হাজার ৬৭০ টন, আর মে মাসে ফসল তোলা শেষ হয়েছিল। শ্রীপুরের এক কৃষক তখন পত্রিকাটিকে বলেন, মৌসুমে তিনি কেজিপ্রতি ২০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করেছিলেন।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই পত্রিকা জানায়, সে মৌসুমে মাগুরায় পেঁয়াজ চাষ হয়েছে ৯ হাজার ৫০ হেক্টরে, আগের বছর যা ছিল ৬ হাজার ২০০ হেক্টর। মাগুরার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তখন জানায়, ৬০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজবীজ উৎপাদন হচ্ছে, যা থেকে ৫ হাজার ৬২৫ কেজি বীজ পাওয়ার আশা করা হচ্ছিল; স্থানীয় বাজারে বীজ বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ১ হাজার ৮০০ টাকায়, আগের বছর যা ছিল ৭০০ টাকা। চাষিরা পত্রিকাটিকে বলেন, নিজেরা বীজ উৎপাদন করলে বীজ কেনার খরচ বাঁচে।
আগের এসব হিসাব ছিল পুরো মৌসুমের। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেওয়া ৮৫৮ হেক্টরের হিসাব রোপণ চলাকালীন সময়ের, আর জেলার পুরো মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে এর তুলনা কী, জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি।
পেঁয়াজ যেভাবে চাষ হয়
পেঁয়াজের বৈজ্ঞানিক নাম Allium cepa; অ্যালিয়াম গণের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া প্রজাতি। প্রকৃতিগতভাবে এটি দ্বিবর্ষজীবী বা বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, তবে চাষিরা একে একবর্ষজীবী ফসল হিসেবে চাষ করে প্রথম মৌসুমেই তুলে ফেলেন। পেঁয়াজ চাষ হয় বীজ থেকে, অথবা আংশিক বেড়ে ওঠা ছোট কন্দ বা 'সেট' থেকে; উর্বর ও পানি সহজে নেমে যায় এমন মাটিতে এটি সবচেয়ে ভালো হয়। কন্দ গঠনকারী পেঁয়াজ দিনের দৈর্ঘ্যের প্রতি সংবেদনশীল: দিনের দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছালে গাছের গোড়ার কন্দ ফুলতে শুরু করে, আর অতিরিক্ত গরম বা অন্য চাপে গাছে আগেভাগে ফুলের ডাঁটা বের হয়।
মাগুরার কৃষকেরা চাষ করেছেন চারা পদ্ধতিতে। রবিউল ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথমে বীজতলায় বীজ বোনা হয়, আর গজানোর প্রায় এক মাস পর কচি চারা তুলে তৈরি জমিতে সারি করে রোপণ করা হয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে পেঁয়াজের চারা রোপণের উপযুক্ত সময় ডিসেম্বর বা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ, অর্থাৎ ঠিক যে সময়ে মাগুরার কৃষকেরা কাজ করছিলেন। বাংলাপিডিয়া তাহিরপুর ও ফরিদপুরীকে দেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় জাত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বাংলাদেশে পেঁয়াজ একাধিক পদ্ধতিতে এবং একাধিক মৌসুমে চাষ হয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষকেরা প্রথাগতভাবে মূল ফসল জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে লাগিয়ে বন্যার আগে এপ্রিল বা মের মধ্যে তোলেন, আর স্থানীয়ভাবে মুড়িকাটা নামে পরিচিত শীতকালীন পেঁয়াজ লাগানো হয় নভেম্বর-ডিসেম্বরে এবং তোলা হয় মূল ফসলের আগে। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের জাত বারি পেঁয়াজ-৫-এর কথা বলা হয়, যা উদ্ভাবন করা হয়েছে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য, যখন সাধারণত সরবরাহে টান পড়ে; কেন্দ্রটি তখন উচ্চফলনশীল ছয়টি জাত নিয়ে গবেষণা করছিল, যার মধ্যে গ্রীষ্মকালের জন্য বারি-১, বারি-৩ ও বারি-৫।
কৃষকদের সময়সূচি বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলা বর্ষপঞ্জির সঙ্গে মেলে: এই বর্ষপঞ্জিতে শীতের মাস পৌষ শুরু হয় ১৬ ডিসেম্বর, আর বছরের শেষ মাস চৈত্র শুরু হয় ১৫ মার্চ। ফলে চৈত্রের শুরুতে পেঁয়াজ উঠতে শুরু করবে, রবিউল ইসলামের এই প্রত্যাশা মানে ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি থেকে ফসল তোলা।
ইকরাম মোল্লার বর্ণনাও সাধারণ চাষপদ্ধতির সঙ্গে মেলে: রোপণের আগে জমি তৈরি করতে হয়, আর রোপণের পর নিয়মিত সার ও সেচ লাগে, চারা লেগে গেলে পরিচর্যা আরও বাড়াতে হয়। প্রতিবেদনে সারের কোনো মাত্রা দেওয়া হয়নি; মাত্রা জানতে চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে বলা হয়।

শীত, কুয়াশা ও পাতার রোগের ঝুঁকি
কৃষকেরা যে শীতের কথা বলেছেন, তা ছিল দেশজুড়ে চলা এক শীতের অংশ। ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে, কোথাও তা দুপুর পর্যন্ত থাকতে পারে; সংস্থাটি সতর্ক করে যে সামনের দিনগুলোতে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে এবং শীত ও কুয়াশা বাড়তে পারে। সেদিন সকালে ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি, আর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌপথে প্রায় ১৫ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ফেরি চলাচল আবার শুরু হয়।
ঘন কুয়াশায় চারার বৃদ্ধি আটকে যায়, ইকরাম মোল্লার এই উদ্বেগ একটি পরিচিত ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করে। পাতা দীর্ঘ সময় ভেজা থাকলে পেঁয়াজের পাতায় ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এর মধ্যে সুপরিচিত একটি হলো পার্পল ব্লচ বা বেগুনি দাগ রোগ, যার কারণ Alternaria porri ছত্রাক। যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াশিংটন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় ও আইডাহো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট প্ল্যান্ট ডিজিজ ম্যানেজমেন্ট হ্যান্ডবুক অনুযায়ী, ছত্রাকটি আক্রান্ত কন্দ ও ফসলের অবশেষে টিকে থাকে, বীজের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে, আর বৃষ্টি, পানি, যন্ত্রপাতি ও মাঠে চলাচলকারী শ্রমিকের মাধ্যমে ছড়ায়; সংক্রমণের জন্য বৃষ্টি বা দীর্ঘস্থায়ী শিশির লাগে, আর তাপমাত্রা কম হলে পাতা আরও বেশি সময় ভেজা থাকা দরকার হয়।
হ্যান্ডবুকে লক্ষণের বর্ণনা এমন: পাতায় প্রথমে পানিভেজা ছোট দাগ দেখা দেয়, যার মাঝখান শিগগিরই সাদা হয়ে যায়; পরে দাগ বড় হয়ে বাদামি থেকে বেগুনি রং ধারণ করে, প্রায়ই চারপাশে লাল বা বেগুনি কিনারা থাকে এবং তার বাইরে হলদেটে অংশ। আর্দ্র আবহাওয়ায় দাগের ওপর বাদামি-কালো গুঁড়ার মতো ছত্রাকের আস্তরণ পড়ে, আর বড় দাগযুক্ত পাতা হলুদ হয়ে নুয়ে পড়ে।
হ্যান্ডবুকে চাষাবাদভিত্তিক যেসব ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে:
- রোগজীবাণুমুক্ত বীজ ব্যবহার করা;
- দীর্ঘ মেয়াদে ভিন্ন গোত্রের ফসলের সঙ্গে পেঁয়াজের শস্যপর্যায় করা;
- চারার দূরত্ব, ঘনত্ব ও সতর্ক সেচের মাধ্যমে পাতা ভেজা থাকার সময় কমানো;
- বাতিল পেঁয়াজের পুরোনো স্তূপ নষ্ট করা ও ফসলের অবশেষ মাটিতে পুঁতে ফেলা;
- চাষের সময় গাছে আঘাত না লাগানো;
- তোলার পর মাঠে কন্দ ঠিকমতো শুকিয়ে নেওয়া।
চারার বেশি ক্ষতি হলে কৃষি বিভাগের পরামর্শ নেওয়ার যে কথা ইকরাম মোল্লা বলেছেন, সেটিই সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের সুপারিশ করা পথ: কোনো রাসায়নিক প্রয়োগ ও তার মাত্রা ঠিক করতে হবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে, যিনি মাঠে গিয়ে সমস্যা শনাক্ত করতে পারেন।
দেশের উৎপাদন ও ডিসেম্বরের বাজার
মাগুরার চাষিরা এমন এক বাজারের দিকে তাকিয়ে চারা লাগাচ্ছিলেন, যা আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপে ছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, আগের মৌসুমে দেশে ২ দশমিক ৮০ লাখ হেক্টর জমিতে ৪২ দশমিক ৪৫ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে, লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ২১ লাখ টন, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ; ২০২৩-২৪ সালে উৎপাদন ছিল ৩৯ দশমিক ১১ লাখ টন, আর ২০২২-২৩ সালে ৩৪ দশমিক ৫৬ লাখ টন। বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের একজন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অবশ্য উৎপাদন প্রায় ৩৬ লাখ টন বলে মত দেন, দেশের চাহিদা অন্তত ৪০ লাখ টন বলে জানান, এবং বলেন সংরক্ষণের সময় প্রায় ২৫ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়।
২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রথম আলো জানায়, রাজধানীর খুচরা বাজারে এক কেজি পেঁয়াজের দাম ১৫০ টাকা ছাড়িয়েছে, এক সপ্তাহে বেড়েছে ২০-৩০ টাকা; কারওয়ান বাজারের কয়েকটি দোকানে আগাম পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। পত্রিকাটি ট্যারিফ কমিশনের এক পর্যালোচনার বরাত দিয়ে মৌসুমি দাম বাড়ার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করে, যার মধ্যে আছে নভেম্বর ও ডিসেম্বর পেঁয়াজ মৌসুমের শেষ পর্যায়, যখন কৃষকের নিজের মজুত কমে আসে, এবং সরকারি সংরক্ষণাগার না থাকায় কৃষকেরা নিজেরাই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও জানান, আগের মাসে পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও মেহেরপুরের মতো পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলায় বৃষ্টিতে বিপুল পরিমাণ আগাম পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে।
পরদিন প্রথম আলো জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ৫০ জন আমদানিকারককে জনপ্রতি ৩০ টন করে মোট ১ হাজার ৫০০ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিয়েছে, অনুমতির মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত, আর এ ঘোষণার পর ঢাকায় খুচরা দাম কমে প্রায় ১৪০ টাকায় নামে। ১৯ ডিসেম্বর খবরসংযোগ কারওয়ান বাজার থেকে জানায়, নতুন দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসায় কেজিতে ২০ টাকা কমে দাম দাঁড়িয়েছে ৯০ টাকায়।
এই প্রেক্ষাপটেই শ্রীপুরের কৃষকেরা বাম্পার ফলনের আশার কথা বলেছেন, আর উপপরিচালক জানিয়েছেন যে বিভাগ চাষিদের উদ্বুদ্ধ করছে।
ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য বিনা মূল্যে বীজ ও সার
উপপরিচালক যে বিনা মূল্যের বীজ ও সারের কথা বলেছেন, তা আসে সরকারের একটি নিয়মিত কর্মসূচি থেকে। এর আওতায় কৃষি মন্ত্রণালয় তার কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতের বরাদ্দ থেকে নির্দিষ্ট ফসলের জন্য ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উপকরণ দেয়। যেমন ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মন্ত্রণালয় শীতকালীন পেঁয়াজসহ ১০টি রবি ফসলের জন্য ১৮৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে, যার আওতায় ৬৪ জেলার ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ৭০০ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক বিনা মূল্যে বীজ ও সার পান; একজন কৃষক কেবল একটি ফসলের জন্য সহায়তা নিতে পারতেন, আর পেঁয়াজচাষি এক বিঘা জমির জন্য পেতেন ১ কেজি বীজ, জানায় দ্য ডেইলি স্টার বাংলা।
গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের জন্য ২০২৩ সালের আগস্টে ঘোষিত আরেকটি ধাপে ১৮ হাজার কৃষকের প্রত্যেককে এক বিঘা জমির জন্য ১ কেজি বীজ, ২০ কেজি ডিএপি ও ২০ কেজি এমওপি সার এবং জমি তৈরি ও শ্রমিকের মজুরির জন্য নগদ ২ হাজার টাকা দেওয়া হয়, একই পত্রিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে জানায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের জাগো নিউজের প্রতিবেদনে মাগুরায় বিতরণের পরিমাণ জানানো হয়নি।
ছবি: RockyMasum / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (২৯ ডিসেম্বর ২০২৫), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড/ইউএনবি (২৭ ডিসেম্বর ২০২৫; ১৫ আগস্ট ২০২৫), প্রথম আলো (৬ ও ৭ ডিসেম্বর ২০২৫), খবরসংযোগ (১৯ ডিসেম্বর ২০২৫), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯; ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০), দ্য ডেইলি স্টার (২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (২৯ আগস্ট ও ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩), বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট প্ল্যান্ট ডিজিজ ম্যানেজমেন্ট হ্যান্ডবুক, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)