সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

পুকুরে দেশি মাগুর চাষ: বিএফআরআইয়ের পদ্ধতিতে পোনা মজুদ, খাবার ও আয়

জীবন্ত অবস্থায় বাজারে বিক্রি করা যায় বলে দেশি মাগুরের দাম বেশি। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পদ্ধতিতে পুকুর প্রস্তুতি, পোনা মজুদের হার আর খাবার দেওয়ার নিয়ম জেনে নিন।

পুকুরে দেশি মাগুর চাষ: বিএফআরআইয়ের পদ্ধতিতে পোনা মজুদ, খাবার ও আয়
মৎস্য

হাতে গোনা যে কয়টি মাছ বাংলাদেশের ক্রেতা জীবন্ত অবস্থায় বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন, মাগুর তার একটি। গোঁফওয়ালা এই দেশি মাছের অতিরিক্ত শ্বসন অঙ্গ আছে, তাই পানির বাইরে অনেকক্ষণ বেঁচে থাকে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) বলছে, ঠিক এ কারণেই অন্য বেশির ভাগ মাছের চেয়ে মাগুর বেশি দামে বিক্রি হয়।

২০২৫ সালের এপ্রিলে দ্য এগ্রো নিউজ পুকুরে দেশি মাগুর (Clarias batrachus) চাষ করে আয় করতে চান এমন চাষিদের জন্য একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছিল। তাতে ছিল পুকুর নির্বাচন, পুকুর প্রস্তুতি, পোনা মজুদ ও খাবার দেওয়ার কথা। এই হালনাগাদ সংস্করণে সেই নির্দেশিকা রাখা হয়েছে, আর প্রতিটি ধাপ মিলিয়ে দেখা হয়েছে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিএফআরআইয়ের ‘মাগুর মাছের পোনা উৎপাদন ও চাষ ব্যবস্থাপনা’ পুস্তিকা এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলের আগে প্রকাশিত পিয়ার রিভিউড পুকুর গবেষণার সঙ্গে। যেখানে মূল প্রতিবেদনের সংখ্যা বিএফআরআইয়ের সংখ্যা থেকে আলাদা, সেখানে বিএফআরআইয়ের সংখ্যাই নেওয়া হয়েছে।

এই লেখায় থাকছে মাগুর চাষে কেন লাভ, কীভাবে এর পোনা আবার পাওয়া যাচ্ছে, কেন শুধু দেশি মাগুরই চাষ করা যাবে, এবং বিএফআরআইয়ের ধাপ অনুযায়ী পুকুর, পোনা, খাবার, রোগ, আহরণ ও আয়ের কথা।

মাগুরের দাম বেশি কেন


মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশি মাগুর সুস্বাদু ও উপাদেয়, দেশের প্রায় সব শ্রেণির মানুষের পছন্দের মাছ এবং পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে সবখানে এর চাহিদা আছে। বিএফআরআইয়ের পুস্তিকাও একই কথা বলে: বাংলাদেশের জিওল মাছগুলোর মধ্যে মাগুর অন্যতম; এটি সুস্বাদু, পুষ্টিকর ও কম চর্বিযুক্ত, আর কাঁটা কম থাকায় শিশুদের জন্য বিশেষ উপযোগী।

জিওল মাছ হলো সেই মাছ, যা পানির বাইরে অনেকক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে। শিং মাছের মতো মাগুরেরও অতিরিক্ত শ্বসন অঙ্গ আছে, ফলে এটি পানির বাইরেও বাঁচে এবং বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে পারে। বিএফআরআই মাগুর চাষের তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছে: বেশি ঘনত্বে দেশি মাগুর চাষ করা যায়, জীবন্ত অবস্থায় বাজারজাত করা যায়, এবং অন্য জিওল মাছের চেয়ে এর বাজারমূল্য বেশি।

নীলফামারীর সৈয়দপুরে বিএফআরআইয়ের স্বাদুপানি উপকেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা ২০২৩ সালে এশিয়ান জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে লিখেছেন, সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে, বিশেষ করে শিশু ও রোগীদের কাছে মাগুরের চাহিদা বেশি। আগের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁরা মাগুরে আমিষের পরিমাণ ১৫.০ শতাংশ এবং চর্বি ১.০ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা আরও লিখেছেন, জীবন্ত বিক্রি করা যায় বলে এর বাজারমূল্য বেশি, আর প্রাকৃতিক পরিবেশে মাছটি বছরে একবার ডিম ছাড়ে।

আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের স্বাদুপানির মাছের লাল তালিকায় এই প্রজাতির বাংলা নাম হিসেবে মাগুর, মশকুর, মজগুর ও জিওল লেখা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, মাগুর সর্বভুক ও আবর্জনাভোজী মাছ; এটি অন্য মাছের ডিম ও লার্ভা, ছোট মাছ, কেঁচোজাতীয় প্রাণী, কাঁকড়া-চিংড়িজাতীয় ক্রাস্টেশিয়ান ও পোকামাকড় খায়, রাতে সক্রিয় থাকে এবং গরম, বদ্ধ ও কম অক্সিজেনের পানিতেও টিকে থাকতে পারে।

মাগুর একটি বড় মৎস্য খাতের অংশ। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এক উপস্থাপনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন ছিল ৪.৯১ মিলিয়ন টন; মানুষের প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে এবং মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণ ৬৭.৮০ গ্রাম। এফএওর ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে মন্ত্রণালয় বলেছে, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়।

যে দেশি মাছ দুর্লভ হয়ে উঠেছিল


বিএফআরআইয়ের পুস্তিকা মনে করিয়ে দেয়, অতীতে প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রচুর মাগুর পাওয়া যেত। পরিবেশদূষণ ও অন্যান্য কারণে মাগুরের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় প্রকৃতিতে মাছটি খুবই কম পাওয়া যায়।

২০২৩ সালে সৈয়দপুরের বিজ্ঞানীরা কারণগুলো আরও বিস্তারিত লিখেছেন। নদীতে কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়, শুকনো মৌসুমে জলাধার ও নদী সেচে মাছ ধরা হয়, পলি জমে মাগুরের প্রজননে বাধা তৈরি হচ্ছে, আর কৃষিজমি ও জলাশয়ে বিষ দিয়ে মাছ ধরার কারণে দেশি এই মাছ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের মতে, মাগুরের উৎপাদন বাড়ানোর পথে প্রধান বাধা ভালো মানের পোনার অভাব।

তবে মাগুর বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় নেই। আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালের ২০ মার্চ মূল্যায়ন করে মাগুরকে ‘ন্যূনতম উদ্বেগ’ (লিস্ট কনসার্ন) শ্রেণিতে রেখেছে; ২০০০ সালেও একে ‘বিপদমুক্ত’ ধরা হয়েছিল। মূল্যায়নে দেখা গেছে, সারা দেশের নদী ও জলাভূমিতে, যেমন কাদাযুক্ত পুকুর, খাল, ডোবা, জলা ও প্লাবনভূমিতে মাগুর পাওয়া যায়, আর দেশের অনেক জায়গায় এর চাষ হয়। মূল্যায়নকারীর নিজের পর্যবেক্ষণে সংখ্যা কমছে বলেও উল্লেখ আছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, মাগুর প্রথম বছরের শেষে প্রজননক্ষম হয় এবং বর্ষায় মে থেকে জুলাই মাসে অগভীর পানিতে ডিম ছাড়ে।

প্রকৃতিবিদ ফ্রান্সিস ডের আঁকা মাগুর মাছ (Clarias batrachus)। ছবি: Francis Day / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
প্রকৃতিবিদ ফ্রান্সিস ডের আঁকা মাগুর মাছ (Clarias batrachus)। ছবি: Francis Day / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

হ্যাচারিতে যেভাবে ফিরল মাগুরের পোনা


বিএফআরআই বলছে, ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত কৃত্রিম প্রজননে পোনা উৎপাদন ও চাষ প্রযুক্তির ফলে জনপ্রিয় এই মাছটি বাণিজ্যিকভাবে চাষের সুযোগ বেড়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, বিএফআরআই যে ১৬টি দেশি মাছের প্রজনন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, মাগুর তার একটি। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, বিএফআরআই ২৩টি দেশি প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদনে সফল হয়েছে, মাগুরও তার মধ্যে আছে; তখনকার মৎস্যমন্ত্রীর বরাতে পত্রিকাটি লেখে, পুকুরে দেশি ছোট মাছের উৎপাদন ২০০৯ সালের ৬৭,৩৪০ টন থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২.৪১ লাখ টনে উঠেছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে মোঙ্গাবে জানায়, বিএফআরআই কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ৩৯টি প্রজাতি নিয়ে কাজ করছে, সরকার ২০২০ সালে একটি জিন ব্যাংক স্থাপন করেছে, আর বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেছেন, এসব প্রজাতির বেশির ভাগ এখন মাঠপর্যায়ে চাষ হচ্ছে।

বিএফআরআইয়ের পুস্তিকায় হ্যাচারিতে মাগুরের পোনা উৎপাদনের ধাপগুলো এভাবে দেওয়া আছে:

  • কৃত্রিম প্রজননের জন্য ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সুস্থ-সবল স্ত্রী ও পুরুষ মাছ সংগ্রহ করে প্রতি হেক্টরে ১০,০০০টি হারে মজুদ করতে হয়।
  • মজুদ করা মাছকে প্রতিদিন দেহের ওজনের ৫ থেকে ৬ শতাংশ হারে সম্পূরক খাবার দিতে হয়; বাজারের বাণিজ্যিক খাবার বা ঘরে তৈরি খাবার দেওয়া যায়, যাতে আমিষ থাকবে ৩০ শতাংশ।
  • দেশি মাগুর সাধারণত মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রজনন করে। শুধু স্ত্রী মাছকেই হরমোন ইনজেকশন দিতে হয়, এবং ইনজেকশনের ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে মাছ ডিম দেয়।
  • পুস্তিকায় বর্ণিত পদ্ধতিতে পুরুষ মাছের পেট কেটে শুক্রাশয় বের করে ০.৯ শতাংশ লবণ দ্রবণে মিশিয়ে শুক্রাণুর দ্রবণ তৈরি করা হতো; স্ত্রী মাছের পেটে চাপ দিয়ে ডিম বের করে এই দ্রবণে মিশিয়ে নিষিক্ত করা হতো।
  • নিষিক্ত ডিম দ্রুত ট্রেতে ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার পানিতে ছড়িয়ে দিতে হয়, যাতে জমাট না বাঁধে, আর ট্রেতে পানির ঝরনা চালু রাখতে হয়। তাপমাত্রাভেদে ২৪ থেকে ৩০ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে রেণু পোনা বের হয়।
  • ডিম ফোটার চার-পাঁচ দিন পর রেণু পোনাকে ডিমের কুসুম, টিউবিফেক্স কৃমি বা প্রাণিকণা (জুপ্ল্যাংকটন) খেতে দেওয়া হয়।

পুরুষ মাছ মেরে ফেলায় পুরুষ মাছের সংখ্যা কমত এবং পোনার দাম বাড়ত। সৈয়দপুরের বিজ্ঞানীরা লিখেছেন, ২০২১ সালে তাঁদের উপকেন্দ্র দেশে প্রথমবারের মতো পুরুষ মাছ না মেরেই মাগুরের পোনা উৎপাদন করে। চিকলি ও আত্রাই নদী থেকে সংগ্রহ করা মাছ দিয়ে ২০২১ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত চালানো পরীক্ষায় তাঁদের সবচেয়ে ভালো হরমোন প্রয়োগে ডিম পরিপক্ব হয়েছে শতভাগ মাছের, নিষিক্তকরণের হার ছিল ৮৬ শতাংশ, ডিম ফোটার হার ৮০ শতাংশ এবং তিন দিন পর লার্ভা বেঁচে ছিল ৭৪ শতাংশ।

শুধু দেশি মাগুর: আফ্রিকান মাগুর নিষিদ্ধ


এই নির্দেশিকা দেশি মাগুরের জন্য। একসময় বাংলাদেশে আফ্রিকান মাগুরও (Clarias gariepinus) চাষ হতো, যা বিদেশ থেকে আনা একটি প্রজাতি। বাংলাদেশে এর চাষ নিয়ে এফএওর একটি ম্যানুয়ালে বলা হয়েছিল, দেশি মাগুরের চেয়ে আফ্রিকান মাগুরের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা লালন সহজ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জানায়, ২০১৪ সালে আফ্রিকান মাগুরের আমদানি, উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করা হয়; এর আগে ২০০৮ সালে পিরানহা নিষিদ্ধ হয়েছিল। তাই চাষিদের শুধু দেশি মাগুরের পোনাই কিনতে হবে।

পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতি


মূল প্রতিবেদনে ১০ থেকে ৩৩ শতাংশ আয়তনের পুকুরের কথা বলা হয়েছিল। গভীরতা সেখানে ৮০ থেকে ১২০ সেন্টিমিটার লেখা ছিল, কিন্তু বিএফআরআইয়ের পুস্তিকা মাগুর চাষের জন্য ১ থেকে ১.৫ মিটার গভীর পুকুরকে উপযুক্ত বলেছে; এখানে সেটিই নেওয়া হয়েছে। মূল প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছিল, পুকুরের পাড় সর্বোচ্চ বন্যার উচ্চতার ওপরে রাখতে হবে, যাতে ভারী বৃষ্টিতে মাছ বুকে হেঁটে বেরিয়ে যেতে না পারে এবং সাপ-ব্যাঙ ঢুকতে না পারে; বিএফআরআইও বলেছে, বর্ষায় মাছ যাতে বেরিয়ে যেতে না পারে সে জন্য চাষের পুকুরের পাড় উঁচু রাখতে হবে।

বিএফআরআইয়ের পুস্তিকা অনুযায়ী মাগুর চাষের পুকুর প্রস্তুতের ধাপ:

  • পুকুরের পাড় মেরামত করতে হবে এবং পুকুর থেকে রাক্ষুসে মাছ সরিয়ে ফেলতে হবে।
  • পুকুর শুকিয়ে ফেলতে পারলে সবচেয়ে ভালো।
  • প্রতি শতাংশে ১ কেজি চুন, ১০ কেজি গোবর, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০০ গ্রাম টিএসপি সার দিয়ে পুকুর তৈরি করতে হবে।
  • সার দেওয়ার ৪ থেকে ৫ দিন পর পুকুরের পানি সবুজ বা হালকা বাদামি হলে পোনা মজুদ করতে হবে।
  • পুরো পুকুর এক মিটার উঁচু জাল দিয়ে ঘিরে দিতে হবে।

মূল প্রতিবেদনের সারের হিসাব ছিল ভিন্ন: সেখানে প্রতি শতাংশে ১ থেকে দেড় কেজি চুন এবং ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি ও ২০ গ্রাম এমওপি সারের কথা ছিল, আর জালের বেড়া ছিল ৩০ সেন্টিমিটার উঁচু। মানতে হবে বিএফআরআইয়ের কম মাত্রার সার এবং এক মিটার উঁচু বেড়া।

২০২১ সালের এপ্রিলে জার্নাল অব ফিশারিজে প্রকাশিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পুকুর গবেষণায় একই নিয়ম মানা হয়েছিল। সেখানে পুকুরের পানি পুরোপুরি সেচে প্রায় ১৫ দিন রোদে শুকানো হয়, এবং পোনা ছাড়ার সাত দিন আগে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন দেওয়া হয়।

গাইবান্ধার একটি গ্রামের পুকুর। এ ধরনের পুকুরেই মাগুর চাষ হয়। ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাইবান্ধার একটি গ্রামের পুকুর। এ ধরনের পুকুরেই মাগুর চাষ হয়। ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

পোনা লালন ও পুকুরে মজুদ


বিএফআরআইয়ের পুস্তিকায় নার্সারির কথাও আছে। সঠিকভাবে প্রস্তুত করা নার্সারি পুকুরে ৫ থেকে ১০ দিন বয়সের ধানী পোনা প্রতি শতাংশে ৮,০০০ থেকে ১০,০০০টি পর্যন্ত মজুদ করা যায়, আর এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অঙ্গুলি পোনা পাওয়া যায়। ধানী পোনা ছাড়ার আগে হাঁসপোকা, ব্যাঙাচি ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে, এবং ক্ষতিকর ব্যাঙ ও সাপ যাতে ঢুকতে না পারে সে জন্য নার্সারি পুকুর ১ মিটার উঁচু জাল দিয়ে ঘিরে দিতে হবে।

নার্সারিতে শুরুতে প্রতিদিন দেহের ওজনের দুই থেকে তিন গুণ খাবার দুই বারে খাওয়াতে হয়। বাণিজ্যিকভাবে তৈরি চিংড়ি বা পাঙাশের নার্সারি খাবার দেওয়া যায়; প্রথম দুই-তিন দিন সেদ্ধ ডিমের কুসুম ও ময়দা সমপরিমাণে মিশিয়ে ছিটিয়ে দিলে ভালো হয়। পোনা ছাড়ার ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে পোনার আকার গড়ে ৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটার হয়।

চাষের পুকুরের জন্য মূল প্রতিবেদনে মে-জুন মাসে প্রতি বর্গমিটারে ৫ থেকে ৮ সেন্টিমিটার লম্বা ৫০ থেকে ৮০টি সুস্থ-সবল পোনা ছাড়ার কথা বলা হয়েছিল। বিএফআরআইয়ের পুস্তিকায় এই হার নেই। পুস্তিকা বলছে, পানি সবুজ বা হালকা বাদামি হলে প্রতি শতাংশে ৩০০ থেকে ৫০০টি পোনা মজুদ করতে হবে, এবং মজুদ করতে হবে শুধু সুস্থ-সবল পোনা।

রাজশাহীর গবেষণায় জামালপুরের একটি হ্যাচারি থেকে কেনা পোনা, যেগুলোর গড় দৈর্ঘ্য ছিল ৫.২১ থেকে ৫.৬৯ সেন্টিমিটার এবং গড় ওজন ৪.৪৮ থেকে ৪.৫৬ গ্রাম, প্রতি হেক্টরে ১৬,৭৫০টি হারে মজুদ করে ১৮০ দিন চাষ করা হয়।

মাগুরের খাবার


মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মাগুর মূলত জলাশয়ের তলার খাবার খেয়ে বাঁচে: তলায় জমা আমিষজাতীয় পচনশীল দ্রব্য, প্রাণিকণা এবং কেঁচোর মতো ছোট প্রাণী। চাষের ঘনত্বে এই প্রাকৃতিক খাবার যথেষ্ট নয়, তাই সম্পূরক খাবার দিতে হয়।

বিএফআরআইয়ের পুস্তিকার নিয়ম হলো, মাছের দেহের ওজনের ৪ থেকে ৫ শতাংশ হারে দিনে দুইবার খাবার দিতে হবে, আর খাবারে আমিষ থাকলে ভালো ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। বাণিজ্যিকভাবে তৈরি ক্যাটফিশ খাবার দেওয়া যায়, অথবা নিচের দুটি ফর্মুলার যেকোনো একটি দিয়ে খাবার তৈরি করা যায়:

  • ফর্মুলা ১: ফিশমিল ৪০%, সরিষার খৈল ২০%, চালের কুঁড়া ২০%, গমের ভুসি ১৫%, চিটাগুড় ৪%, ভিটামিন ও খনিজ লবণ ১%।
  • ফর্মুলা ২: ফিশমিল ২৫%, বোন অ্যান্ড মিট মিল ১৫%, সরিষার খৈল ২০%, চালের কুঁড়া ২০%, গমের ভুসি ১৫%, চিটাগুড় ৪%, ভিটামিন ও খনিজ লবণ ১%।

মূল প্রতিবেদনে ৪০ শতাংশ চালের কুঁড়া, ৩০ শতাংশ তৈলবীজের খৈল ও ৩০ শতাংশ শুঁটকি মিশিয়ে বল বানিয়ে দেহের ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে, সকালে এক-চতুর্থাংশ আর সন্ধ্যায় তিন-চতুর্থাংশ খাওয়ানোর কথা ছিল। বিএফআরআইয়ের পুস্তিকায় এই মিশ্রণ বা ভাগ নেই, তাই এখানে বিএফআরআইয়ের ফর্মুলা ও হার দেওয়া হলো।

দিনে কতবার খাবার দিলে ভালো, তা রাজশাহীর গবেষণায় যাচাই করা হয়েছিল। মাছকে ২৮ শতাংশ আমিষযুক্ত তৈরি খাবার দেওয়া হয়, প্রথম তিন মাস দেহের ওজনের ৮ শতাংশ হারে, শেষ তিন মাসে ধীরে ধীরে কমিয়ে ৫ শতাংশে। একটি দলকে দিনে একবার, একটিকে দুইবার এবং একটিকে তিনবার, সকাল ৮টা, দুপুর সাড়ে ১২টা ও বিকেল ৫টায় খাবার দেওয়া হয়। ১৮০ দিন পর তিনবার খাওয়ানো মাছের গড় ওজন বেড়েছিল ৫৬.১০ গ্রাম, দুইবারে ৪৪.৪৯ গ্রাম এবং একবারে ৪১.১৪ গ্রাম। খাবারের সবচেয়ে ভালো ব্যবহারও হয়েছিল তিনবারের দলে: খাদ্য রূপান্তর হার (এফসিআর) ছিল ১.৬৫, যেখানে দিনে একবারের দলে ২.১৪। গবেষকদের সিদ্ধান্ত, দিনে তিনবার খাবার দেওয়া মাগুরের জন্য কার্যকর।

দানাদার মাছের খাবার; বিএফআরআই বলছে, মাগুরের জন্য এ ধরনের বাণিজ্যিক খাবার দেওয়া যায়। ছবি: Narek75 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
দানাদার মাছের খাবার; বিএফআরআই বলছে, মাগুরের জন্য এ ধরনের বাণিজ্যিক খাবার দেওয়া যায়। ছবি: Narek75 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

মাগুরকে সুস্থ রাখা


বিএফআরআইয়ের পুস্তিকা বলছে, দেশি মাগুর শক্ত প্রকৃতির মাছ, তাই রোগবালাই খুব একটা দেখা যায় না। তবে পানির গুণাগুণ নষ্ট হলে মাছের গায়ে ঘা দেখা দিতে পারে। এই রোগে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন ও ১ কেজি লবণ দুই বারে, তিন দিন অন্তর প্রয়োগ করতে বলেছে বিএফআরআই। প্রতি মাসে পুকুরে আধা কেজি হারে চুন দিলে পানির গুণাগুণ ভালো থাকে, আর কোনো কারণে পানি নষ্ট হলে বাইরে থেকে পরিষ্কার ঠান্ডা পানি দিতে হবে।

রাজশাহীর গবেষণায় মাগুরের পুকুরে ভালো পানির মাপও নেওয়া হয়েছিল: পানির গড় তাপমাত্রা ৩০.২৯ থেকে ৩০.৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রতি লিটারে ৫.৩৪ থেকে ৫.৪৯ মিলিগ্রাম এবং পিএইচ ৭.৭৫ থেকে ৭.৭৮, যা গবেষকদের মতে মাছ চাষের উপযোগী সীমার মধ্যে। সেখানে মাছ বেঁচে ছিল ৯৫.৩২ থেকে ৯৬.২৩ শতাংশ।

বিএফআরআই নিয়মিত জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করারও পরামর্শ দিয়েছে। মাছ অসুস্থ হলে কোনো ওষুধ দেওয়ার আগে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নিন।

আহরণ, উৎপাদন ও বিএফআরআইয়ের আয়ের হিসাব


বিএফআরআই বলছে, আহরণের সময় জাল টেনে বেশির ভাগ মাছ ধরতে হয়, আর সব মাছ ধরতে হলে পুকুর শুকিয়ে ফেলতে হয়। পুস্তিকা অনুযায়ী, ঠিকমতো পরিচর্যা করলে ছয় থেকে আট মাসে হেক্টরপ্রতি ৬,০০০ থেকে ৮,০০০ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন হতে পারে।

২০১৫ সালের জানুয়ারির ওই পুস্তিকায় আয়-ব্যয়ের হিসাব ছিল এমন: হেক্টরপ্রতি উৎপাদন খরচ ৬,৫০,০০০ থেকে ৮,৫০,০০০ টাকা এবং হেক্টরপ্রতি মুনাফা ১১,০০,০০০ থেকে ১৩,০০,০০০ টাকা। ২০২৫ সালের মধ্যে খাবার, পোনা ও মাছের দাম বদলে গেছে, তাই এগুলো সেই সময়ের বিএফআরআইয়ের হিসাব, কোনো পুকুরের আয়ের নিশ্চয়তা নয়।

গবেষণার পুকুরে উৎপাদন ছিল কম। রাজশাহীর গবেষণায় দিনে তিনবার খাবার পাওয়া পুকুরে ১৮০ দিনে হেক্টরপ্রতি ৩,৫৫৯.২৭ কেজি মাছ হয়েছিল, গবেষণাপত্রে যা শতাংশপ্রতি ১৪.৪১ কেজি হিসেবেও দেওয়া আছে; দিনে একবার খাবার পাওয়া পুকুরে হয়েছিল হেক্টরপ্রতি ২,৬৭৭.৪৮ কেজি।

পুস্তিকার শেষে বিএফআরআই চাষিদের জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে:

  • ব্রুড ও মজুদ করা মাছকে নিয়মিত সুষম খাবার দিতে হবে।
  • নার্সারি পুকুরে ধানী পোনা ছাড়ার আগে হাঁসপোকা, ব্যাঙাচি ইত্যাদি সরাতে হবে এবং নার্সারি পুকুর জাল দিয়ে ঘিরে দিতে হবে।
  • চাষের পুকুরের পাড় উঁচু রাখতে হবে, যাতে বর্ষায় মাছ বেরিয়ে যেতে না পারে।
  • সুস্থ-সবল পোনা মজুদ করতে হবে।
  • নিয়মিত জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে এবং পানির গুণাগুণের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

প্রশিক্ষণ, পোনার উৎস ও নির্দিষ্ট পুকুর নিয়ে পরামর্শের জন্য প্রথমে যেতে হবে মৎস্য অধিদপ্তরের উপজেলা মৎস্য অফিসে। এখানে বর্ণিত প্রযুক্তি প্রকাশ করেছে বিএফআরআই, যার সদর দপ্তর ও স্বাদুপানি কেন্দ্র ময়মনসিংহে এবং মাগুরের প্রজনন নিয়ে কাজ করা উপকেন্দ্রটি সৈয়দপুরে।

ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (মাগুর মাছের পোনা উৎপাদন ও চাষ ব্যবস্থাপনা, ২০১৫), আইইউসিএন বাংলাদেশ (রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, ভলিউম ৫: ফ্রেশওয়াটার ফিশেস, ২০১৫), জার্নাল অব ফিশারিজ (রেজা, সামাদ ও ফেরদৌস, ২০২১), এশিয়ান জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস (আহামেদ ও সহকর্মী, ২০২৩), মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় (দেশভিত্তিক উপস্থাপনা, অক্টোবর ২০২৪), এফএও (বাংলাদেশে আফ্রিকান মাগুর চাষবিষয়ক ম্যানুয়াল), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (জানুয়ারি ২০২৩), দ্য ডেইলি স্টার (জানুয়ারি ২০১৮), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (সেপ্টেম্বর ২০২০), মোঙ্গাবে (জুলাই ২০২৩)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

মৎস্য

সম্পর্কিত খবর

মৎস্য

কেরালার উপকূলীয় নারীদের ৮৪টি মাছের ব্যবসা, পারিবারিক আয় বেড়েছে ৩০-৩৫ শতাংশ

আইসিএআর-সিএমএফআরআইয়ের এক কর্মসূচির সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সালে কেরালার আট জেলায় ৮৪টি মৎস্যভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে উঠেছে; সরাসরি উপকৃত ৪৬৯ জন, যাঁদের বেশির ভাগ তফসিলি জাতিভুক্ত।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

সৌরশক্তির রিসার্কুলেটিং ট্যাংকে পাহাড়ে ট্রাউট চাষ, পানি লাগবে ৮০ শতাংশ কম

ভারতের উত্তরাখণ্ডের এক খামারে সৌরশক্তিচালিত হাইব্রিড রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম চালু করেছে আইসিএআর-সিআইসিএফআর; প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে পানি প্রায় ৮০ শতাংশ কম লাগে এবং একজন ট্রাউটচাষি বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি উদ্বৃত্ত পেতে পারেন।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

আট পদের পাঁচটিই শূন্য, তিনজনে চলছে শায়েস্তাগঞ্জের সরকারি মৎস্য বীজ খামার

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে ১২টি পুকুরে পোনা উৎপাদন চললেও আট পদের পাঁচটি শূন্য, নৈশপ্রহরী নেই, বরাদ্দ না থাকায় চাষি প্রশিক্ষণও বন্ধ।

মানবজমিন১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)