একসময় যে পাটকলগুলোর চাকা ঘুরত হাজারো শ্রমিকের শ্রমে, নরসিংদীর পলাশের সেই বন্ধ কারখানাগুলো আবার চালুর আশা জাগিয়েছে সরকারের একটি পরিকল্পনা। ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল, মঙ্গলবার সকালে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম পলাশের কো-অপারেটিভ জুট মিলস ও বাংলাদেশ জুট মিলস পরিদর্শন করেন। পরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে দেশের বন্ধ পাটকলগুলো ইজারার মাধ্যমে আবার চালু করতে চায় সরকার।
সফরের আগের দিন মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, "জুট মিল দুটোর বর্তমান সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে এই সফর। পাটকল চালুর বিষয়ে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে আমরা ইজারার মাধ্যমে বন্ধ থাকা পাটকল পুনরায় চালু করতে চাই।"
ইজারা ও পিপিপি: কীভাবে চালু হবে মিলগুলো
প্রতিমন্ত্রী জানান, বন্ধ কয়েকটি পাটকলের ইজারার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং মূল্যায়নের কাজ চলছিল। সরকার মিলগুলো মূলত পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বা বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাদের মাধ্যমে চালাতে আগ্রহী। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিয়ে এই শিল্পাঞ্চল আবার সচল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে জাতীয় অর্থনীতিতে গতি আসে।
বাংলা ট্রিবিউনের খবর অনুযায়ী, কো-অপারেটিভ জুট মিলস ইজারা দিতে তখন আগ্রহপত্র (ইওআই) আহ্বান করা হয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেডের মোট জমি প্রায় ৭৭ দশমিক ০২৫ একর, যার একাংশ আগেই ইজারার মাধ্যমে শিল্পায়নের আওতায় এসেছে। মিলটির বছরে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৩ হাজার ৯৬৮ মেট্রিক টন; এখানে হেসিয়ান ও স্যাকিং (চট ও বস্তা) তৈরি হয়।
এর আগে ২০২৬ সালের ৫ মার্চ সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতার ২৫টি পাটকলের সবই বন্ধ; এর ১৪টি দীর্ঘমেয়াদি ইজারার আওতায় আনা হয়েছে এবং আরও সাতটি চালুর প্রক্রিয়ায় আছে। প্রতিমন্ত্রী তখন বলেন, অতীতে দীর্ঘদিন লোকসান হওয়ায় সরকার নিজে না চালিয়ে মিলগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দিচ্ছে। দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, ২০২০ সালের জুলাইয়ে সরকার বিজেএমসির ২৫টি পাটকলের উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের পাওনা শতভাগ পরিশোধের কথা বলে। পরে নরসিংদীর বাংলাদেশ জুট মিলস ২০ বছরের জন্য বে গ্রুপকে ইজারা দেওয়া হয়।

স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি
প্রতিমন্ত্রী বলেন, একসময় নরসিংদীর এই শিল্পকারখানাগুলোতে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ছিল, যা এ এলাকার মানুষের কাছে আবেগের বিষয়। মিলগুলো আবার চালু হলে সাধারণ পদে প্রায় শতভাগ কর্মী নেওয়া হবে স্থানীয়ভাবে; তবে কারিগরি বা বিশেষজ্ঞ পদের জন্য প্রয়োজনে বাইরে থেকে লোক নিয়োগ হতে পারে। তাঁর মতে, এ উদ্যোগ স্থানীয়দের জীবন-জীবিকার মান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পলাশ নরসিংদী জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা, আয়তন ৯৪ দশমিক ৪৩ বর্গকিলোমিটার; শীতলক্ষ্যা, হাড়িদোয়া ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। উপজেলার একমাত্র পৌরসভা ঘোড়াশাল শীতলক্ষ্যার পূর্ব তীরে, শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত।

পাটের বীজ, গবেষণা ও কৃষকের দাম
সোনালি আঁশের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে পাটবীজের মানোন্নয়ন ও গবেষণায় জোর দেওয়ার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা বীজের তুলনায় দেশি বীজের ফলন যাতে প্রতিযোগিতামূলক হয়, সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) সঙ্গে কাজ চলছিল। কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পান, সেদিকেও নজর রাখার কথা বলেন তিনি; তাঁর হিসাবে তখন পাটের দাম মণপ্রতি ৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার টাকায় উঠেছিল।
রঙ ও অর্থমূল্যের কারণে বাংলাদেশে পাটকে "সোনালি আঁশ" বলা হয়। একসময় দেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় পাট ও পাটজাত পণ্য ছিল শীর্ষে; এখন তৈরি পোশাকের পরে এর অবস্থান দ্বিতীয়।

ছবি: Moheen Reeyad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, যুগান্তর, বাংলা ট্রিবিউন, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, অর্থসূচক, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)