সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

মিরসরাইয়ে সরিষা ঘরে তুলছেন কৃষকেরা, পাঁচ বছরে আবাদ বেড়েছে ৬২৫ হেক্টর

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৬৬৫ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে, যা ২০১৯-২০ সালে ছিল মাত্র ৪০ হেক্টর। ২০২৬ সালের মার্চে উপজেলা কৃষি অফিস এ তথ্য জানায়; কৃষকেরা তখন ভালো ফলনের সরিষা ঘরে তুলছিলেন।

মিরসরাইয়ে সরিষা ঘরে তুলছেন কৃষকেরা, পাঁচ বছরে আবাদ বেড়েছে ৬২৫ হেক্টর
ফসল

২০২৬ সালের মার্চে চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার কৃষকেরা সরিষা কাটা ও ঘরে তোলায় ব্যস্ত ছিলেন। উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে এ মৌসুমে উপজেলায় ৬৬৫ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে, যা ২০১৯-২০ সালের তুলনায় ৬২৫ হেক্টর বেশি। সে বছর উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা মিলিয়ে সরিষা আবাদ হয়েছিল মাত্র ৪০ হেক্টরে। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ২২ মার্চ জানায়, কয়েক সপ্তাহ আগেও যে মাঠ হলুদ ফুলে ছেয়ে ছিল, সেখানে তখন পাকা শুঁটির ভারে গাছ নুয়ে পড়েছে; কৃষকেরা ফলন ভালো বলে জানান এবং ভালো দামের আশা করছিলেন। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় প্রতিবছর আরও বেশি কৃষক এই ফসলের দিকে ঝুঁকছেন বলে জানান তাঁরা।

ছয় মৌসুমে ৪০ থেকে ৬৬৫ হেক্টর


উপজেলা কৃষি অফিস জাগো নিউজকে মৌসুমভিত্তিক হিসাব দেয়। ২০১৯-২০ সালে সরিষা আবাদ হয়েছিল ৪০ হেক্টরে। ২০২০-২১ সালে ১০ হেক্টর বেড়ে তা হয় ৫০ হেক্টর, ২০২১-২২ সালে আরও ১০ হেক্টর বেড়ে ৬০ হেক্টর। বড় লাফ আসে ২০২২-২৩ সালে, যখন ৩২০ হেক্টর জমিতে সরিষা বোনা হয়। ২০২৩-২৪ সালে আবাদ আরও ৩০৫ হেক্টর বেড়ে দাঁড়ায় ৬২৫ হেক্টরে, আর ২০২৪-২৫ সালে ৬৫০ হেক্টরে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে আবাদ হয়েছে ৬৬৫ হেক্টর জমিতে।

  • ২০১৯-২০: ৪০ হেক্টর
  • ২০২০-২১: ৫০ হেক্টর
  • ২০২১-২২: ৬০ হেক্টর
  • ২০২২-২৩: ৩২০ হেক্টর
  • ২০২৩-২৪: ৬২৫ হেক্টর
  • ২০২৪-২৫: ৬৫০ হেক্টর
  • ২০২৫-২৬: ৬৬৫ হেক্টর

এবার সবচেয়ে বেশি সরিষা আবাদ হয়েছে দুর্গাপুর, খৈয়াছড়া, ইছাখালী, ওয়াহেদপুর ও করেরহাট ইউনিয়নে। জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানান, তাঁর এলাকায় এ বছর ১৫ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার হিসাবে এ মৌসুমে উপজেলায় ৫ হাজার কৃষক সরিষা চাষ করছেন।

২০২২-২৩ মৌসুম থেকে আবাদের এই দ্রুত বৃদ্ধি সারা দেশের চিত্রের সঙ্গে মিলে যায়। সেই মৌসুমে কৃষি মন্ত্রণালয় আমদানি করা ভোজ্যতেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা শুরু করে, এবং ২০২৩ সালের মে মাসে জানায় যে এক বছরেই দেশে সরিষার আবাদ ২ লাখ হেক্টরের বেশি বেড়েছে। মিরসরাই থেকেও জাগো নিউজ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতিবেদন করেছিল যে সে মৌসুমে সেখানে লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে।

কেন সরিষার দিকে ঝুঁকছেন মিরসরাইয়ের কৃষকেরা


জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা দেওয়া এবং সরিষা চাষে উদ্বুদ্ধ করার ফলে আবাদের পরিধি বেড়েছে। আগের তুলনায় উপজেলায় সরিষার তেলের চাহিদাও বেড়েছে। কৃষকদের ভাষায়, সরিষা অল্প সময়ে ও অল্প পুঁজিতে ঘরে তোলা যায় বলে এটি তাঁদের কাছে খুবই লাভজনক ফসল হয়ে উঠেছে।

খৈয়াছড়া ইউনিয়নের মসজিদিয়া গ্রামের কৃষক বিপুল দাশ জানান, তিনি প্রতিবছর সরিষা আবাদ করেন। এবারও এক একর জমিতে সরিষা বুনেছেন এবং ফলন ভালো হয়েছে। নিজের সরিষা থেকে তিনি নিজেই তেল উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করেন।

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা একরামুল হক জানান, এ বছর অনলাইন থেকে বীজ সংগ্রহ করে তিনি প্রথমবারের মতো ৫৪ শতক জমিতে সরিষা চাষ করেছেন এবং ফলন ভালো হয়েছে। এক জমিতে তিনি বারি সরিষা-১৭ এবং অন্য জমিতে বারি সরিষা-১৪ বুনেছেন। তাঁর খেত দেখে অনেকেই আগ্রহী হয়েছেন এবং আগামী বছর চাষের জন্য বীজ সংগ্রহ করবেন বলে জানান তিনি।

আরেক কৃষক নুরুল আবছার জানান, আগের বছর তিনি অল্প জমিতে সরিষা চাষ করেছিলেন; লাভ বেশি হওয়ায় এ বছর তিনটি জমিতে চাষ করেছেন। নিজেদের সরিষা বাজারে নিয়ে ভাঙিয়ে পরিবার সারা বছর সেই তেল খায়, তাই তাঁকে আর সয়াবিন তেল কিনতে হয় না।

ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের মধ্যম ওয়াহেদপুর গ্রামের কৃষক মহিউদ্দিন টিপু জানান, আগে তিনি নিজের পরিবারের জন্য অল্প জমিতে সরিষা আবাদ করতেন। এখন বাজারে বিক্রির জন্য বেশি জমিতে চাষ করছেন।

বাংলাদেশের একটি সরিষাখেতে কাজ করছেন একজন নারী, জানুয়ারি ২০১৩; প্রতীকী ছবি, মিরসরাইয়ে তোলা নয়। ছবি: Syed Ajwad Shahir / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি সরিষাখেতে কাজ করছেন একজন নারী, জানুয়ারি ২০১৩; প্রতীকী ছবি, মিরসরাইয়ে তোলা নয়। ছবি: Syed Ajwad Shahir / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কৃষি অফিস যা বলছে


জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মনজুর হায়দার জাগো নিউজকে বলেন, কৃষকদের নিজেদের প্রচেষ্টা ও সরকারি সহায়তায় তাঁর এলাকায় সরিষা চাষ ধাপে ধাপে বাড়ছে।

মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় জানান, কৃষি অফিস কৃষকদের প্রশিক্ষণ, বীজ, সারসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সহায়তা করেছে এবং গত পাঁচ বছরে সরিষা চাষ কয়েক গুণ বেড়েছে। তাঁর মতে, সরিষা একদিকে স্থানীয় মানুষের ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থকরী ফসল হিসেবে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে।

এ ধরনের সহায়তা জাতীয় কর্মসূচিরই অংশ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপজেলা কৃষি অফিসগুলো প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে সরিষাচাষিদের বীজ ও সার দেয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের মে মাসে জানায়, তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকেরা প্রণোদনা পাচ্ছেন। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৪ সালের এপ্রিলে জানায়, সরিষা, সূর্যমুখী ও চিনাবাদামের জন্য ২০২০ থেকে ২০২৫ মেয়াদের ২৭৮ কোটি টাকার একটি সরকারি প্রকল্পের লক্ষ্য তেলবীজের আবাদ ও ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) বরগুনা থেকে একই ধরনের সহায়তার খবর দেয়; সেখানে উপজেলা কৃষি অফিস প্রদর্শনী প্লট, বীজ সহায়তা ও সচেতনতামূলক কাজের মাধ্যমে সরিষা চাষে উৎসাহ দিচ্ছিল।

মিরসরাই: পাহাড়, খাল আর প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক ফসল


মিরসরাই চট্টগ্রাম জেলার একটি উপজেলা, যার উত্তরে ফেনী জেলা। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলার আয়তন ৪৮২.৮৮ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলা, দক্ষিণে সীতাকুণ্ড উপজেলা ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ফটিকছড়ি উপজেলা এবং পশ্চিমে সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা। প্রধান নদী ফেনী; উপকূলে সন্দ্বীপ চ্যানেল, আর উপজেলার ভেতর দিয়ে গেছে ইছাখালী, মহামায়া, ডোমখালী, হিঙ্গুলী ও মায়ানী খাল। মিরসরাই থানা গঠিত হয় ১৯০১ সালে এবং উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। এর দুটি পৌরসভা হলো মিরসরাই ও বারইয়ারহাট।

কৃষিই এখানকার আয়ের সবচেয়ে বড় একক উৎস। আদমশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাপিডিয়া জানায়, ৩৮.৯৩ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয় কৃষি থেকে; বাণিজ্য থেকে ১৩.২৬ শতাংশ এবং চাকরি থেকে ১৮ শতাংশ। প্রধান ফসল হিসেবে ধান, ডাল, আলু, বেগুন, শাকসবজি ও বাঁশের কথা বলা হয়েছে, আর প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে বাঁশ, মাছ, ধান, আলু, কলা ও শাকসবজি। উপজেলার ৫২টি হাটবাজারের মধ্যে আবু তোরাব বাজার, করেরহাট, বারইয়ারহাট ও শান্তিরহাটের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে বাংলাপিডিয়া। ২০২২ সালের জনশুমারিতে উপজেলায় ১ লাখ ১১ হাজার ৯টি খানায় ৪ লাখ ৭২ হাজার ৭৯৪ জন মানুষ গণনা করা হয়।

একই বাংলাপিডিয়া ভুক্তিতে আখ, পাট, তিল, তিসি ও চিনাবাদামের সঙ্গে সরিষাকেও উপজেলার "বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় ফসল"-এর তালিকায় রাখা হয়েছে; ভুক্তিটি ২০০১ ও ২০১১ সালের আদমশুমারি এবং ২০০৭ সালের একটি সাংস্কৃতিক সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে লেখা। কৃষি অফিসের হিসাব দেখায় সেই চিত্র কতটা বদলেছে: ২০১৯-২০ সালের ৪০ হেক্টর থেকে ২০২৫-২৬ সালে সরিষা ফিরে এসেছে ৬৬৫ হেক্টরে।

এ মৌসুমে সবচেয়ে বেশি সরিষা আবাদের ইউনিয়নগুলোর একটি খৈয়াছড়া, যা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে। এই ইউনিয়নের নামেই খৈয়াছড়া ঝরনার নাম; ঝরনাটি মহাসড়কের বড়তাকিয়া বাজার থেকে প্রায় ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে পাহাড়ের ভেতরে, এমন এক বনাঞ্চলে, যা সরকার ২০১০ সালে একটি জাতীয় উদ্যানের অন্তর্ভুক্ত করে।

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মহামায়া লেক, অক্টোবর ২০১৪। ছবি: Hasib / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মহামায়া লেক, অক্টোবর ২০১৪। ছবি: Hasib / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বারি সরিষা-১৪ ও বারি সরিষা-১৭


একরামুল হক যে দুটি জাত চাষ করেছেন, দুটিই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বারি, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মিলে ২০টির বেশি সরিষার জাত অবমুক্ত করেছে। একই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) বরাতে বলা হয়, বাংলাদেশের কৃষকেরা রেপসিড (ব্রাসিকা ক্যাম্পেস্ট্রিস ও ব্রাসিকা নেপাস) এবং সরিষা (ব্রাসিকা জুনসিয়া) দুটোই চাষ করেন এবং দুটোকেই সরিষা বলেন।

বারি সরিষা-১৪ একটি উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি জাত। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যশোরের ডিএই উপপরিচালক প্রথম আলোকে বলেন, এ জাতের সরিষা ৭৫ থেকে ৮০ দিনে ঘরে তোলা যায়, হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় দেড় হাজার কেজি, আর সরিষা কাটার পর একই জমিতে বোরো ধান চাষ করা যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গাছ লম্বা হওয়ায় ঝরে পড়া পাতা মাটিতে মিশে জৈব সারের কাজ করে।

বারি সরিষা-১৭-ও একটি স্বল্পমেয়াদি জাত। বাসস ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জের হাওরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একটি মাঠ গবেষণার খবর দেয়। সেখানে ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিনটি ভিন্ন তারিখে বাকৃবি, বারি ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ছয়টি স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত বোনা হয়। ২০ নভেম্বর বোনা হলে বিনাসরিষা-৯ সবচেয়ে বেশি ফলন দেয়, আর বারি সরিষা-১৭-এর ফলন ছিল প্রায় সমান। গবেষণার দ্বিতীয় বছরে, ২০২৪-২৫ সালে, এই দুই জাতকে ভিন্ন ভিন্ন সারমাত্রা ও বীজহারে পরীক্ষা করা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাসস বরগুনা থেকে জানায়, সে মৌসুমে সেখানে চাষ হওয়া উচ্চফলনশীল জাতগুলোর মধ্যে ছিল বারি সরিষা-১৪, ১৭, ১৮, ১৯ এবং টরি-৭।

এর মধ্যে একটি নতুন জাতের খবরও এসেছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউন লেখে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবিত বিইউ সরিষা-১-এর ফলন সম্ভাবনা হেক্টরপ্রতি ২ টন, যেখানে দেশের গড় ফলন ১.৩ টন; বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এর ভিত্তি বীজ উৎপাদন করছিল।

আমন ও বোরোর মাঝে সরিষা


সরিষা রবি মৌসুমের, অর্থাৎ শুকনো মৌসুমের ফসল। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে তেলবীজ রবি মৌসুমে বোনা হয় এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চে কাটা হয়; ২০২৬ সালের মার্চে মিরসরাইয়ে চলমান সরিষা কাটার সঙ্গে তা মিলে যায়। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশের প্রায় সব জেলাতেই সরিষা চাষ হয়, এবং সিলেট, ঢাকা, টাঙ্গাইল, যশোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার সঙ্গে চট্টগ্রামকেও এই রবি ফসলের তুলনামূলক বেশি আবাদের জেলা হিসেবে উল্লেখ করে।

আবাদ বাড়ানোর প্রধান সুযোগ দুই ধানের মাঝের ফাঁকা সময়ে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২২ সালের মে মাসে কৃষি মন্ত্রণালয়ের খসড়া রোডম্যাপের বরাতে জানায়, আমন ও বোরো মৌসুমের মাঝে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমি দুই থেকে তিন মাস পতিত থাকে; আমন কাটার পর কৃষকদের স্বল্পমেয়াদি তেলবীজ দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা ওই সময়ে সরিষা চাষ করতে পারেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ফরিদপুরে বিনা ও ডিএই আয়োজিত এক কর্মশালায় কৃষিমন্ত্রী জানান, বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ধান ও সরিষার জাত উদ্ভাবন করেছেন, যাতে ধানের উৎপাদন না কমিয়েই আমন ও বোরোর মাঝে বাড়তি ফসল হিসেবে সরিষা চাষ করা যায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বরগুনা থেকে বাসসের প্রতিবেদনেও একই ধারা দেখা যায়: আমন কাটার পর পতিত বা এক-ফসলি জমিতে সরিষা, তারপর একই জমিতে বোরো।

কিশোরগঞ্জে বাকৃবির গবেষণা হয়েছে ভিন্ন পরিবেশে, হাওরে, যেখানে একটি বোরো ফসলের পর বছরের বাকি সময় জমি পতিত থাকে। বাসস জানায়, গবেষকদের হিসাবে ওই অঞ্চলে পতিত-বোরো-পতিত শস্যবিন্যাস আবাদি জমির প্রায় ৪০ শতাংশ জুড়ে, এবং সময়মতো বোনা গেলে সেখানকার উঁচু জমিতে সরিষা ভালো মানায়।

সরিষা ও দেশের ভোজ্যতেলের ঘাটতি


বাংলাপিডিয়া জানায়, মাত্র কয়েক দশক আগেও সরিষার তেলই ছিল বাংলাদেশের একমাত্র রান্নার তেল; পরে আমদানি করা সস্তা সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেলের কারণে সরিষার আবাদ কমে যায়। ২০২২ সাল নাগাদ দেশ নিজের প্রয়োজনের সামান্য অংশই উৎপাদন করত। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২২ সালের মে মাসে জানায়, দেশে বছরে রান্নার তেলের চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন, অথচ দেশি বীজ থেকে তেল আসে প্রায় ৩ লাখ টন, অর্থাৎ চাহিদার সাড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। বাকিটা, অর্থাৎ সয়াবিন, পাম, সূর্যমুখী ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেল, আমদানি করতে হয়। দেশে তেলবীজ উৎপাদন ছিল প্রায় ১২ লাখ টন, যার ৬০ শতাংশের বেশি সরিষা; আবাদ ছিল ৮ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে।

সে বছর ঈদুল ফিতরের সময় সয়াবিন ও পাম তেল সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হয় এবং বহু মুদি দোকানে কয়েক সপ্তাহ ভোজ্যতেল পাওয়া যায়নি। এরপর কৃষি মন্ত্রণালয় একটি রোডম্যাপের খসড়া করে। এর স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য ছিল ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫, এই তিন অর্থবছরে দেশি সরবরাহ চাহিদার ৪০ শতাংশে তোলা। সরিষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, এবং ওই সময়ে দেশে উৎপাদিত রান্নার তেলের ৯৮ শতাংশ সরিষা থেকে আসবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়।

২০২৩ সালের মে মাসে মন্ত্রণালয় প্রথম বছরের ফল জানায়। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া ডিএইর হিসাবে সরিষার আবাদ আগের মৌসুমের ৬ লাখ ১০ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ সালে ৮ লাখ ১২ হাজার হেক্টর হয়, আর উৎপাদন ৮ লাখ ২৪ হাজার টন থেকে বেড়ে ১১ লাখ ৫২ হাজার টন, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বাড়তি সরিষা থেকে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার টন বেশি তেল পাওয়া যাবে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ সালের জন্য ঢাকা ট্রিবিউন ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, তেলবীজের মোট আবাদ দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার হেক্টরে এবং উৎপাদন প্রায় ১৮ লাখ ৩০ হাজার টনে, যা আগের বছরের চেয়ে যথাক্রমে ৩১ ও ২৯ শতাংশ বেশি; এর প্রধান কারণ সরিষা চাষের বিস্তার।

তবু আমদানির খরচ ছিল বিপুল। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভোজ্যতেল ও তেলবীজ আমদানিতে খরচ হয় ৪১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, যা তিন বছর আগের ২০ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকার প্রায় দ্বিগুণ। একই প্রতিবেদনে ইউএসডিএর এক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়, সরিষার তেলের উৎপাদন বাড়ায় দেশে সয়াবিন তেলের চাহিদা কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, বছরে ভোজ্যতেল আমদানিতে খরচ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি, এবং দেশের মানুষ যে রান্নার তেল কেনেন তার প্রায় ৭৫ শতাংশই সয়াবিন ও পাম তেল। নুরুল আবছারের কথা, যে তাঁর পরিবারকে আর সয়াবিন তেল কিনতে হয় না, একটি খামারের পরিসরে সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন, যা জাতীয় পরিকল্পনা চাইছিল।

বাংলাদেশের একটি সরিষার তেলের কল, জুন ২০২২; প্রতীকী ছবি, মিরসরাইয়ে তোলা নয়। ছবি: Hossain Md Nazmul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি সরিষার তেলের কল, জুন ২০২২; প্রতীকী ছবি, মিরসরাইয়ে তোলা নয়। ছবি: Hossain Md Nazmul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

গ্রামে বীজ থেকে তেল


মিরসরাইয়ের কয়েকজন কৃষক নিজেরাই নিজেদের ফসল প্রক্রিয়াজাত করেন। বিপুল দাশ নিজের সরিষা থেকে তেল করে বিক্রি করেন, আর নুরুল আবছারের পরিবার বাজারে সরিষা ভাঙিয়ে নিজেদের জন্য তেল রাখে। বাংলাপিডিয়া জানায়, ঐতিহ্যগতভাবে সরিষার তেল বের করা হতো ঘানিতে, যা একটি বলদ দিনভর, এমনকি রাতভরও টেনে ঘোরাত; এই পেশার মানুষকে বলা হতো কলু। বলদের কাজ এতই একঘেয়ে ছিল যে "কলুর বলদ" কথাটি এমন মানুষকে বোঝাতে চালু হয়ে যায়, যিনি প্রশ্ন না করে দিনের পর দিন একই কাজ করে যান। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, এখন বেশির ভাগ সরিষার তেল বের করা হয় বিদ্যুৎচালিত কলে।

সরিষা বীজের প্রায় ৩০ শতাংশই তেল। বাঙালি রান্নায় সরিষার তেলের যে ঝাঁঝালো স্বাদ, তা আসে অ্যালাইল আইসোথায়োসায়ানেট নামের একটি যৌগ থেকে, যা সরিষা-গোত্রের উদ্ভিদে পাওয়া যায়। সরিষার তেলে ইরুসিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে, যদিও কিছু জাতে তা অনেক কম। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ফরিদপুরে বিএডিসির এক উপপরিচালক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বারি সরিষা-১৮-এর তেলে ইরুসিক অ্যাসিড খুবই কম এবং এটি সয়াবিন তেলের বিকল্প হতে পারে।

ছবি: Hopeoflight / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলা ট্রিবিউন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (জনশুমারি ২০২২, উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
বিশ্ব

ভালো ফসলের বছরেও আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনুকূল বৃষ্টি ও ভালো ফসলের পরও নভেম্বর-এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৩৮ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি; গত বছর একই সময়ের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ।

ডব্লিউএফপি১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

জমির সিদ্ধান্তের ভার পেয়ে তুলার ফলন সাত গুণ করলেন মহারাষ্ট্রের সুনীতা

একসময় দিনমজুরি করা, পরিবারের ১২ একর জমি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার না থাকা মহারাষ্ট্রের পাচোদ গ্রামের সুনীতা নেহারে এখন খামার চালান; মাটি ও পানি সংরক্ষণে একরপ্রতি তুলার ফলন প্রায় ১ থেকে বাড়িয়েছেন ৭ দশমিক ১৪ কুইন্টালে।

ডাউন টু আর্থ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)