সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

কিশোরগঞ্জে বেড়েছে মিষ্টি কুমড়ার চাষ, মাঠে দাম কেজিপ্রতি ৬ থেকে ১০ টাকা

কিশোরগঞ্জে ২০২৪-২৫ মৌসুমে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ ১ হাজার ৫ হেক্টর থেকে বেড়ে ১ হাজার ২১৬ হেক্টর হলেও হাওরের কৃষকেরা ২০২৫ সালের মার্চের শুরুতে জানান, ফলন কম আর খরচ বেশি, অথচ মাঠে দাম কেজিপ্রতি ৬ থেকে ১০ টাকা। ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম পড়েছে।

কিশোরগঞ্জে বেড়েছে মিষ্টি কুমড়ার চাষ, মাঠে দাম কেজিপ্রতি ৬ থেকে ১০ টাকা
শাকসবজি

২০২৫ সালের মার্চের শুরুতে কিশোরগঞ্জের হাওরে মিষ্টি কুমড়ার চাষিরা লোকসানের হিসাব কষছিলেন। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৫ সালের ১ মার্চ জানায়, জেলায় এ ফসলের আবাদ বেড়েছে: আগের বছর ১ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়েছিল, ২০২৪-২৫ মৌসুমে হয়েছে ১ হাজার ২১৬ হেক্টরে, আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু কৃষকদের কথায়, ফলন আশানুরূপ হয়নি, আর স্থানীয় বাজারে বা পাইকারের কাছে আকারভেদে প্রতি কেজি মিষ্টি কুমড়া বিক্রি হচ্ছিল মাত্র ৬ থেকে ১০ টাকায়। ব্যবসায়ীরা পত্রিকাটিকে বলেন, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম পড়ে গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলার মিষ্টি কুমড়ার বড় অংশ চাষ হয়েছে হাওরের দুই উপজেলায়: তাড়াইলে ৩০০ হেক্টর আর ইটনায় ২৫০ হেক্টর জমিতে। বিস্তীর্ণ এই হাওরে প্রতি বছর এ সময়ের মধ্যে খেতের প্রায় ৬০ ভাগ কুমড়া বিক্রি হয়ে যায়, কিন্তু ২০২৫ সালের শুরুতে ফসলের বড় অংশই অবিক্রীত ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ফসলের বীজ সাধারণত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বোনা হয়, হাওরের পানি নেমে যাওয়ার পর।

মাঠ আর শহরের দামের ফারাক ছিল বড়। কৃষক যখন প্রতি কেজি ৬ থেকে ১০ টাকায় কুমড়া বেচছিলেন, তখন কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের খুচরা বাজারগুলোতে ঘুরে প্রতিবেদক দেখেন, প্রতি কেজি মিষ্টি কুমড়া বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়।

খরচ বেড়েছে, দাম কমেছে: কৃষকেরা যা বললেন


কৃষকেরা জাগো নিউজকে বলেন, আগের বছরগুলোতে তাঁরা প্রতি কেজি মিষ্টি কুমড়া ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি করেছেন। ২০২৪-২৫ মৌসুমে সার, ডিজেল ও কীটনাশক কিনতে হয়েছে আগের চেয়ে বেশি দামে, শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে; ফলে চাষের খরচ তোলাই তাঁদের প্রধান দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, মিষ্টি কুমড়া এখন তাঁদের গলার কাঁটা।

ইটনা উপজেলার রায়টুটি ইউনিয়নের কৃষক আমিনুল ইসলাম জানান, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার তিনটি হাওরে ১ হাজার ২০০ কাঠা জমিতে তিনি মিষ্টি কুমড়ার চাষ করেছেন, খরচ হয়েছে ৫৬ লাখ টাকা। তিনি বলেন, 'এখন যে দাম আছে, সেই দামে খরচ পুষিয়ে ওঠা বড় চ্যালেঞ্জ।' তাঁর জমিতে ১৫ জন কর্মচারী কাজ করেন, প্রত্যেকের মাসিক বেতন ১৫ হাজার টাকা। ফলন কম হওয়ার পাশাপাশি দাম নিয়েও তিনি বিপাকে আছেন বলে জানান।

কৃষক রইছ মিয়া জানান, তিনি ২২০ কাঠা জমিতে চাষ করেছেন, খরচ হয়েছে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা। তিনি বলেন, 'গাছে ফলনও কম, দামও কম। আমি একা না, এলাকায় যারা মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছেন, সবার একই অবস্থা।' তিনি আশা করেছিলেন প্রতি কেজি ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি করবেন, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ১০ টাকায়।

কৃষিকাজ ও ব্যবসা দুটোই করেন জুম্মন। তিনি জানান, তাঁর মাঠে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, অথচ এ বছর ৫ লাখ টাকাও ফেরত পাওয়ার আশা করতে পারছেন না। তাঁর হিসাবে সেই বছর কীটনাশকের দাম ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০০ টাকা, সারের দাম ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, 'অন্য বছর যেখানে লাখ লাখ টাকা আয় হতো, সেখানে এইবার লোকসান।'

শীতের সকালে মিষ্টি কুমড়ার খেতে দাঁড়িয়ে আছে একটি কাকতাড়ুয়া; পটভূমির ছবি, এই প্রতিবেদনের কিশোরগঞ্জের খেত নয়। ছবি: Hamimnrafi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
শীতের সকালে মিষ্টি কুমড়ার খেতে দাঁড়িয়ে আছে একটি কাকতাড়ুয়া; পটভূমির ছবি, এই প্রতিবেদনের কিশোরগঞ্জের খেত নয়। ছবি: Hamimnrafi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

শান্তিপুর হাট ও ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যা


হাওরের কুমড়ার কেনাবেচা চলে নদীর পাড়ের একটি হাটকে ঘিরে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিন হাওরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে কৃষকেরা নৌকায় করে ইটনা উপজেলার রায়টুটি ইউনিয়নের শান্তিপুর হাটে মিষ্টি কুমড়া নিয়ে আসেন। সেখান থেকে পাইকারদের মাধ্যমে কুমড়া যায় ঢাকা, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, পাবনা, চুয়াডাঙ্গা, পাইকগাছা, বেনাপোলসহ দেশের নানা জায়গায়। আগে এই হাটে প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি মিষ্টি কুমড়া বিক্রি হতো; ২০২৪-২৫ মৌসুমে দৈনিক বিক্রি গড়ে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকায় নেমেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

স্থানীয় আড়তদার উমর ফারুক জানান, প্রতিদিন তাঁর আড়ত থেকে প্রায় ৭৫ টন মিষ্টি কুমড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। আগের মৌসুমে সর্বনিম্ন দাম ছিল প্রতি কেজি ২০ টাকা; এ মৌসুমে বাজার শুরু হয়েছিল ১৭ টাকায়, পরে তা নেমে এসেছে ৬ থেকে ১০ টাকায়। তিনি বলেন, 'আমদানি বেশি থাকায় বাজারদর কমে গেছে।' তাঁর কথায়, এই হাটে ইটনা ও কালিয়াজুড়ি এলাকা থেকেই বেশি কুমড়া আসে। কালিয়াজুড়ি (খালিয়াজুরি) নেত্রকোণা জেলার হাওর উপজেলা, যার সীমানা ইটনার উত্তরে।

যশোর থেকে আসা পাইকার সবুজ মিয়া জানান, ২০ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসা করছেন। প্রতিদিন মাঠ ও ঘাট থেকে তিনি ১৫ টনের চার গাড়ি মিষ্টি কুমড়া কেনেন। তাঁর হিসাবে, সেই মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে তাঁরা সর্বোচ্চ ১০ টাকা কেজি দরে কিনছিলেন আর বিক্রি করছিলেন ১৪ থেকে ১৫ টাকায়। তিনি বলেন, 'আমরা বেশি দামে বিক্রি করতে না পারলে কৃষকের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতেও পারবো না।' তিনিও দাম কমার কারণ হিসেবে সে বছরের বাড়তি সরবরাহের কথা বলেন। এগুলো ব্যবসায়ীদের নিজেদের ব্যাখ্যা; সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপে লাভের হার নিয়ে আলাদা কোনো সমীক্ষা প্রতিবেদনে ছিল না।

কৃষি বিভাগ যা বলেছে


কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইমরুল কায়েস জেলায় ১ হাজার ২১৬ হেক্টর জমিতে আবাদের তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, কৃষকেরা মিষ্টি কুমড়ার ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। তাঁর মতে, অন্যান্য সবজির উৎপাদনও বেশি হওয়ায় দাম কমেছে। তিনি আরও জানান, অন্য বছর বিভিন্ন জুস কোম্পানি এ এলাকা থেকে মিষ্টি কুমড়া কিনে নিত, কিন্তু এ মৌসুমে তখনো কোনো কোম্পানির দেখা মেলেনি; তারা কিনলে কৃষক বেশি দাম পাবেন বলে তিনি মনে করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারের মাঠপর্যায়ের সম্প্রসারণ সংস্থা; প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এর কার্যালয় রয়েছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত আবাদি জমি ও সম্ভাব্য উৎপাদনের হিসাব রাখে এর জেলা কার্যালয়, আর জাত বাছাই, সার প্রয়োগ ও রোগবালাই নিয়ে কৃষকের প্রথম পরামর্শদাতা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।

কিশোরগঞ্জের হাওর ও প্রতিবেদনের উপজেলাগুলো


এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ ঢাকা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ২ হাজার ৬৮৮.৫৯ বর্গকিলোমিটার। জেলায় ১৩টি উপজেলা; প্রধান নদী পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, কালনী, ঘোড়াউত্রা ও ধনু। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ১১ হাজার ৯০৭। ১৮৬০ সালে ময়মনসিংহ জেলার অধীনে কিশোরগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয়, আর ১৯৮৪ সালে এটি জেলায় উন্নীত হয়।

শান্তিপুর হাট যে উপজেলায়, সেই ইটনার আয়তন ৪০১.৯৩ বর্গকিলোমিটার, জেলার উত্তর-পূর্ব অংশে। বাংলাপিডিয়া এর প্রধান নদী হিসেবে সুরমা, ধনু, বাউলাই ও কালনীর নাম দিয়েছে; সঙ্গে আছে হাউলার হাওর ও বেশ কয়েকটি বিল। রায়টুটি ইটনার নয়টি ইউনিয়নের একটি। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্যে ইটনার ৭৭.৮৪ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, আর প্রধান ফসল ধান, আলু, সরিষা, চিনাবাদাম ও শাকসবজি। জ্ঞানকোষটি উপজেলায় ১৫০ কিলোমিটার নৌপথের বিপরীতে মাত্র ১৫ কিলোমিটার পাকা রাস্তার কথা লিখেছে। প্রতিবেদনের কৃষকেরাও কুমড়া হাটে আনেন নৌকায়।

প্রতিবেদনের আরেক প্রধান কুমড়া-উপজেলা তাড়াইল ইটনার পশ্চিমে, আয়তন ১৪১.৪৩ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়া সেখানে বাথাইল, বারুনী, নরসুন্দা ও বুড়ি নদী এবং কয়েকটি বিলের কথা উল্লেখ করেছে; ২০১১ সালের শুমারিতে তাড়াইলের ৬৯.৭৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ছিল কৃষি। আমিনুল ইসলাম যে দুই উপজেলাতেও চাষ করেছেন বলে জানান, সেই মিঠামইন (২২২.৯১ বর্গকিলোমিটার) ও অষ্টগ্রাম (৩৫৫.৫৩ বর্গকিলোমিটার) জেলার অন্য দুই গভীর হাওর-উপজেলা।

বর্ষায় কিশোরগঞ্জের একটি হাওর, ২০২০ সালের আগস্টে তোলা; শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে এই জমিতেই কুমড়াসহ নানা ফসল হয়। ছবি: Ahad Adnan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
বর্ষায় কিশোরগঞ্জের একটি হাওর, ২০২০ সালের আগস্টে তোলা; শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে এই জমিতেই কুমড়াসহ নানা ফসল হয়। ছবি: Ahad Adnan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)

বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, হাওর হলো গামলা আকৃতির ভূতাত্ত্বিক নিম্নভূমি, যেখানে নদী ও খাল দিয়ে পানি এসে জমে। বর্ষায় তা বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়, গ্রামগুলো তখন দ্বীপের মতো দেখায়; শুকনো মৌসুমে বেশির ভাগ পানি নেমে গিয়ে অগভীর বিল থেকে যায় এবং উর্বর পলিমাটি বেরিয়ে আসে, যেখানে ব্যাপক চাষাবাদ হয়। বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের হাওর অববাহিকায় প্রায় ৪৭টি বড় হাওর এবং প্রায় ৬ হাজার ৩০০ বিল রয়েছে, আর সমতলভূমি বছরে প্রায় সাত থেকে আট মাস পানির নিচে থাকে। কিশোরগঞ্জের প্রতিবেদনে এই জমির কুমড়া বোনা হয়েছিল অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে, পানি নেমে যাওয়ার পর।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত সার সুপারিশ নির্দেশিকা ২০২৪-এ সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের 'হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকা'কে বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তে কৃষির জন্য চিহ্নিত পাঁচটি ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে। ২০০৩ থেকে ২০২১ সালের নমুনায় হাওরের মাটির পিএইচ পাওয়া গেছে প্রায় ৩.৪ থেকে ৬.৯, অর্থাৎ তীব্র অম্লীয় থেকে প্রায় নিরপেক্ষ পর্যন্ত।

কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলাকে যুক্ত করা অলওয়েদার সড়ক, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তোলা। ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলাকে যুক্ত করা অলওয়েদার সড়ক, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তোলা। ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়া


মিষ্টি কুমড়া কিউকারবিটেসি পরিবারের একটি লাউজাতীয় ফসল। বাংলাপিডিয়া একে জনপ্রিয় সবজি এবং শর্করা, ভিটামিন এ ও সি এবং খনিজের ভালো উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছে; এর আদি নিবাস আমেরিকা মহাদেশ বলে মনে করা হয়। জ্ঞানকোষটি এর বৈজ্ঞানিক নাম লিখেছে Cucurbita maxima, আর বিএআরসির ২০২৪ সালের সার নির্দেশিকা দেশের মিষ্টি কুমড়ার জাতগুলোকে Cucurbita moschata হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয় এবং গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টন; বিক্রমপুরী ও বারোমাসি দুটি স্থানীয় জাত।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, সরাসরি বীজ বুনে অথবা দুই সপ্তাহ বয়সী চারা রোপণ করে মিষ্টি কুমড়ার চাষ করা যায়, আর বীজ বোনার প্রায় ৯০ দিনের মধ্যে পুরো পাকা কুমড়া তোলা হয়। এর পাতা, ডগা, ফুল ও ফল সবই সবজি হিসেবে খাওয়া হয়; ফল দিয়ে তরকারি ও নানা মিষ্টান্ন রান্না হয়, আর পাকা আস্ত কুমড়া শুকনো জায়গায় কয়েক মাস রেখে দেওয়া যায়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) মিষ্টি কুমড়ার উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। বিএআরসির সার সুপারিশ নির্দেশিকা ২০২৪-এ বারি মিষ্টিকুমড়া-১, -২ ও -৩ এবং বারি হাইব্রিড মিষ্টিকুমড়া-১, -২ ও -৩ জাতের নাম আছে, আর এগুলোর জন্য ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে হেক্টরপ্রতি ৪৫ টন। নির্দেশিকা মাটি পরীক্ষার ফল অনুযায়ী সারের পরিমাণ ঠিক করে দিয়েছে এবং প্রয়োগের নিয়ম বলেছে এভাবে:

  • জৈবসার, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, দস্তা ও বোরনের পুরোটা চারা রোপণের পাঁচ থেকে সাত দিন আগে মাদায় দিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
  • নাইট্রোজেন সার চারা রোপণের ১৫, ৩৫, ৫৫ ও ৭৫ দিন পর মাটি ভেজা থাকা অবস্থায় গাছের চারপাশে উপরি প্রয়োগ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে।
  • সারের পরিমাণ হবে জমির মাটি পরীক্ষার ফল অনুযায়ী; নির্দিষ্ট জমির জন্য সঠিক মাত্রা জানতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া যায়।

উৎপাদন খরচের প্রেক্ষাপট


খরচ নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ এসেছিল সারের সরকারি দাম দুই দফা বাড়ার পর। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল জানায়, ১০ এপ্রিল থেকে সরকার প্রধান সারগুলোর দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়েছে: কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়ার দাম ২২ টাকা থেকে ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকা হয়েছে। ডিলার পর্যায়ে ইউরিয়া ২০ টাকা থেকে ২৫ টাকা, টিএসপি ২৫ টাকা, ডিএপি ১৯ টাকা এবং এমওপি ১৮ টাকা হয়েছে। নয় মাসের মধ্যে এটি ছিল দ্বিতীয় দফা দাম বৃদ্ধি। সরকার জানায়, ভর্তুকির চাপ কমাতে এ সিদ্ধান্ত, আর কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এতে বছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

এগুলো সরকারি দাম। ২০২৪-২৫ মৌসুমে সার, কীটনাশক ও মজুরির যে হিসাব জুম্মন দিয়েছেন, তা জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তাঁর নিজের দেওয়া খরচের বিবরণ; প্রতিবেদনে তা সরকারি দামের কোনো তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখানো হয়নি।

কম দামের এক সবজি মৌসুম


সেই শীতে কিশোরগঞ্জ একা ছিল না। ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার বাংলা চাঁদপুর থেকে জানায়, সেখানে বিক্রি না হওয়া মিষ্টি কুমড়া গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্যে, সদর, হাজীগঞ্জ, মতলব দক্ষিণ ও উত্তরসহ কয়েকটি উপজেলায় আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়েছিল। হাজীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার হিসাবে সেখানে অন্তত ৬১৮ হেক্টরে চাষ হয়, যেখানে ২০২৩ সালে হয়েছিল ২৮৬ হেক্টরে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চাঁদপুরে ১ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ২৪ হাজার ৯৭১ টন; আর শীতকালীন সবজি মোট ৬ হাজার ১০০ হেক্টরে চাষ হয়েছে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ৫০০ হেক্টর, উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৭২৮ টন, লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার টন। দাম কমার কারণ হিসেবে কর্মকর্তা এ বাড়তি উৎপাদনের কথাই বলেন। দেবপুরের এক কৃষক জানান, তিনি প্রতি কেজি ৮ টাকা দরে গোখাদ্য হিসেবে কুমড়া বিক্রি করছেন; কৃষি বিভাগ কৃষকদের স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রির পরামর্শ দিয়েছিল।

আগের বছর অন্য জায়গার চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, শান্তিপুরের কুমড়া যে জেলাগুলোতে যায় তার একটি ফরিদপুরে, সদর উপজেলার ডিক্রিরচর ও চর মাধবদিয়া ইউনিয়নের পদ্মার চরে ৮৫০ হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়েছিল। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যে, আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলন ভালো হয়েছিল, খেত থেকেই প্রতি কেজি কুমড়া বিক্রি হচ্ছিল ১৫ থেকে ২০ টাকায়, আর জেলায় ৫০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের মিষ্টি কুমড়া উৎপাদিত হয়েছিল। সেখানকার এক কৃষক জানান, প্রতি বিঘা জমিতে চাষে খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা, আর ফসল বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়; তিন থেকে সাড়ে তিন মাসেই কুমড়া বিক্রির উপযোগী হয়।

খেত থেকেই পাইকারের কাছে কুমড়া বিক্রির রীতিও পুরোনো। ২০১৮ সালের মে মাসে দ্য ডেইলি স্টার মানিকগঞ্জের মিষ্টি কুমড়াচাষিদের নিয়ে লিখেছিল, তাঁরা মাঠেই পাইকারের কাছে ফসল বিক্রি করেন, কারণ এক চাষির ভাষায়, এত কুমড়া স্থানীয় বাজারে খুচরা বিক্রি করা সম্ভব নয়। সেখানকার পাইকারেরা জানান, মানিকগঞ্জের কুমড়ার চাহিদা আছে কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী ও বাইপাইলে; তাঁদের একজন বলেন, অতিবৃষ্টিতে তিনি কুমড়া মজুত রাখতে পারছেন না এবং পরিবহন খরচ বেড়েছে।

বাজার দেখভালের দায়িত্ব কার


কৃষিপণ্যের বিপণনের দিকটি দেখে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি বিপণন অধিদপ্তর (ডিএএম), কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮ (২০১৮ সনের ৪৪ নং আইন) অনুযায়ী। আইনের ২ ধারায় 'বাজারকারবারি' বলতে কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণের ক্রয়-বিক্রয়ে মধ্যস্থতাকারী পাইকারি বিক্রেতা, আড়তদার, মজুদদার, কমিশন এজেন্ট বা ব্রোকার, ওজনদার, নমুনা সংগ্রহকারী, ফড়িয়া বা বেপারীকে বোঝানো হয়েছে; হাওরের কুমড়া এই শৃঙ্খল ধরেই শহরের বাজারে পৌঁছায়।

আইনের ৪ ধারায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কার্যাবলি তালিকাভুক্ত আছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • কৃষি বিপণন তথ্য ব্যবস্থাপনা;
  • কৃষিপণ্যের মূল্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন;
  • কৃষক ও কৃষিপণ্যের বাজার সংযোগ সৃষ্টি এবং সুষ্ঠু সরবরাহে প্রয়োজনীয় সহায়তা;
  • উৎপাদন এলাকায় বাজার অবকাঠামো, গুদাম, হিমাগার ও কুলচেম্বার নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করা;
  • কৃষিপণ্যের সর্বনিম্ন মূল্য ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন;
  • কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তা এবং মূল্য সহায়তা প্রদান;
  • অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসার ও চুক্তিভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন।

২০২৪-২৫ মৌসুমে মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থার কোনোটি নেওয়া হয়েছিল কি না, কিশোরগঞ্জের প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি। জেলা কৃষি কর্মকর্তা নিজে যে সমাধানের কথা বলেছেন, অর্থাৎ প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানিগুলো আবার হাওর থেকে কুমড়া কিনুক, তা আইনে বর্ণিত মূল্য সংযোজনের সংযোগের দিকেই ইঙ্গিত করে।

ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (সার সুপারিশ নির্দেশিকা ২০২৪), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮ (বাংলাদেশ আইন সংকলন, bdlaws.minlaw.gov.bd)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

শাকসবজি

সম্পর্কিত খবর

শাকসবজি

কুয়াশায় শিকড় খাওয়ানোর প্রযুক্তিতে রোগমুক্ত আলুবীজ উৎপাদনের পরীক্ষা ইংল্যান্ডে

স্টার্টআপ এয়ারপনিক্স ও ডাইসন ফার্মিং ডেফরার অর্থায়নে দুই বছরের এক পরীক্ষা শুরু করেছে: কুয়াশাভিত্তিক পদ্ধতিতে বর্তমান খরচের অর্ধেকেরও কমে ইংল্যান্ডে রোগমুক্ত প্রথম প্রজন্মের আলুবীজ উৎপাদন সম্ভব কি না।

AgNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

মাশরুমের গাঁজন প্রযুক্তিতে টফুর বর্জ্য হলো প্রোটিনসমৃদ্ধ সুস্বাদু উপাদান

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা সয়া দুধ ও টফুর অবশিষ্ট ওকারা ঝিনুক মাশরুমের মাইসেলিয়াম দিয়ে গাঁজন করে এর প্রোটিন প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশে তুলেছেন, বাড়িয়েছেন উমামি স্বাদ।

Green Queen১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
শাকসবজি

মাদারগঞ্জে ৬০ হেক্টরে আগাম শসা, দুই হাজার টন উৎপাদনের আশা

জামালপুরের মাদারগঞ্জে এবার প্রায় ৬০ হেক্টরে আগাম শসার আবাদ হয়েছে, উৎপাদন হতে পারে প্রায় দুই হাজার টন; পাইকারি বাজারে কেজি ৩০-৪০ টাকা, বিঘায় খরচ ১৫-২০ হাজার আর বিক্রি ৩০-৪০ হাজার টাকা।

ডেইলি বাংলাদেশ১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)